প্রধান প্রবেশদ্বারের বিশালত্ব দেখে বোঝা যায়, জায়গাটি জ্ঞান ও গবেষণার পবিত্র স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আলোকচিত্রী: রুম্মান মাশরুর

সেলসাস গ্রন্থাগার

প্রাচীন রোমান সভ্যতার জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য

তুর্কির আনোতোলিয়া উপদ্বীপের এফেসোস শহরে অবস্থিত, ‘‘সেলসাস গ্রন্থাগার’’ প্রাচীন রোমান স্থাপত্যশৈলীর একটি অনন্য নিদর্শন। এটি ছিল প্রাচীনকালের এক বিখ্যাত গ্রন্থাগার, যা মূলত রোমান সাম্রাজ্যের সময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। খ্রিস্টীয় ১১৫-১২০ সালের মধ্যে রোমান সিনেটর টিবেরিয়াস জুলিয়াস সেলসাস পোলেমায়ানাসের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তার ছেলে এই গ্রন্থাগারটি নির্মাণ করেন। এটি শুধু একটি গ্রন্থাগার নয়, বরং সেলসাসের সমাধিস্থল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল এই জায়গাটি। সেলসাস গ্রন্থাগার প্রাচীন রোমান সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

গ্রন্থাগারটির বিশাল কাঠামো এবং সূক্ষ্ম স্থাপত্যশৈলী আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে। এর সম্মুখভাগে আছে দুটি স্তম্ভের সারি। প্রধান প্রবেশদ্বারের বিশালত্ব দেখে বোঝা যায়, জায়গাটি জ্ঞান ও গবেষণার পবিত্র স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গ্রন্থাগারটির তিনটি তলা ছিল, যেখানে প্রায় ১২,০০০ বই সংরক্ষিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। সেলসাস গ্রন্থাগারের আরও একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, ভবনের পিছনের অংশে থাকা সেলসাসের সমাধি। সেই সময়ের এটি একটি বিরল উদাহরণ। প্রাচীন কালে এফেসোস ছিল এশিয়া মাইনরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এই গ্রন্থাগারটি সেখানকার জ্ঞানভাণ্ডারের অন্যতম প্রধান প্রতীক ছিল।

১৯০০ সালের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে গ্রন্থাগারটির ধ্বংসাবশেষ পুনরুদ্ধার করা হয়, আলোকচিত্রী: রুম্মান মাশরুর

সেলসাস গ্রন্থাগার ধ্বংস হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। খ্রিস্টীয় ২৬২ সালে একটি বড় ভূমিকম্পের পর গ্রন্থাগারটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসময় গোথদের একটি আক্রমণেও এফেসোস শহরের অন্যান্য স্থাপনার পাশাপাশি সেলসাস গ্রন্থাগারও ধ্বংস হয়। গ্রন্থাগারটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং সংরক্ষিত বইপত্র তখন ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর খ্রিস্টীয় ৪০০ সালের দিকে আরেকটি ভূমিকম্প সেলসাস গ্রন্থাগারের বাকি অবকাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়। ধ্বংসাবশেষগুলো কয়েক শতাব্দী ধরে মাটির নিচে চাপা পড়েছিল। ১৯০০ সালের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে গ্রন্থাগারটির ধ্বংসাবশেষ পুনরুদ্ধার করা হয়। এর মূল কাঠামোর কিছু অংশ, বিশেষত প্রধান সম্মুখভাগ পুনর্নির্মাণ করা হয় যা আজও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত এফেসোস শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে সেলসাস গ্রন্থাগার আজও প্রাচীন রোমান সভ্যতার জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য বহন করছে। এর স্থাপত্যশৈলী এবং ইতিহাসের গুরুত্ব যুগ যুগ ধরে মানুষকে প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করে যাচ্ছে।

সুপ্রভা জুঁই

স্থপতি ও লেখক

shuprovajui@gmail.com

Related Posts

সবচেয়ে বড় হিন্দু তীর্থস্থান পশুপতিনাথ মন্দির

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর বাগমতী নদীর তীরে অবস্থিত পশুপতিনাথ মন্দির। বিশ্বের অন্যতম পবিত্র শিবমন্দির। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি যেমন…

দিইয়ি-গিদ-বিইয়ি: এক পাথুরে সভ্যতার গল্প

মধ্য আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন তার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, জাতিগোষ্ঠী এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত। এই দেশের উত্তরাঞ্চলের মান্দারা পর্বতমালা…

কার্থেজ: তিউনিসিয়ার ধ্বংসপ্রায় ইতিহাসের ক্রন্দন

বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটি হলো কার্থেজ সভ্যতা। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি হলো কার্থেজ। এই শহরকে কেন্দ্র…

মুসলিম স্থাপত্যে স্পেনের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ‘আল হামরা’

আল হামরা। স্পেনের একটি বিখ্যাত রাজ প্রাসাদ। আরবি ‘আল হমরা’ শব্দের অর্থ লাল। এই প্রাসাদের বাইরের দেয়ালও লাল…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *