Teroshri Mosq

মুঘলদের এক ক্ষতচিহ্ন যেন ‘তেরোশ্রী মসজিদ’

মসজিদটি কবে নির্মাণ হয়েছিল, কে-ইবা নির্মাণ করেছিলেন তার কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না কোথাও। নেই কোন শিলালিপি। তবুও দেয়ালের গায়ে হাত দিয়ে বারবার শিহরিত হন দর্শনার্থী, এমনকি স্থানীয় মানুষও। মসজিদটির প্রধান আকর্ষণ কালো এক বিশালাকার গম্বুজ। সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও এমনই এক কালের সাক্ষী হয়ে ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ময়মনসিংহের তেরোশ্রী মসজিদ।

বাংলার ইতিহাস মুঘল আর বারো ভূঁইয়াদের খ্যাতির জন্য একটু যেন বেশিই সমৃদ্ধ। তাদের রেখে যাওয়া ইতিহাস ঐতিহ্যের অনেক স্মারক, ধারক ও বাহক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে আজও এক বিস্ময়ের কারণ। তেরোশ্রী মসজিদ তেমনিই এক কালের সাক্ষী।

প্রধান গম্বুজের পাশে শৃঙ্খলিত তেরো গম্বুজ মসজিদটিকে দিয়েছে বাড়তি সৌন্দর্য। নির্মাণের নান্দনিকতায় তেরো গম্বুজের সৌন্দর্য থেকেই মসজিদের নামকরণ তেরোশ্রী বলে দাবি অনেকের।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের একটি গ্রাম তেরোশ্রী। জনশ্রুতি অনুযায়ী শত শত বছর আগে মসজিদের নাম থেকেই গ্রামেরও নামকরণ করা হয়। গবেষকদের মতে ৫০০ বছরেরও আগে নির্মাণ করা হয় এই মসজিদ। কেউ কেউ দাবি করেন ৭০০ বছরেরও আগের কথা।

প্রতি দিন শত শত মুসলিমের পদচারণায় মুখর থাকে মসজিদ প্রাঙ্গণ। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরাি। প্রতি ওয়াক্তে দুই কাতারে নামাজ পড়তে পারেন মুসল্লিরা।

সময়ের শ্রোতে ইতিহাস বারবার বদলে গেছে। স্থানীয় জ্যৈষ্ঠ প্রজন্ম হারিয়ে গেছে সেই কবে কোথায়। তবু মুঘলদের সাক্ষী ঐতিহাসিক তেরোশ্রী মসজিদের লোকগাঁথা হারায়নি কালের গর্ভে।

মসজিদের নির্মাণশৈলী বাংলার মুঘল ইতিহাসকে প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে। এত কিছুর পরও আক্ষেপেরও কমতি নেই জনমনে। সরকারি উদ্যোগ না থাকায় তেরোশ্রী মসজিদের জৌলুস কেবল মানুষের মনের কোণেই সীমাবদ্ধ।

স্থানীয় অনেকেরই দাবি, তাদের পূর্বসূরীদের কথা অনুযায়ী চতুর্থ মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে নির্মাণ করা হয়েছিলো এই মসজিদ। সে সময় এটিই ছিলো গফরগাঁওয়ের প্রথম মসজিদ।  

নির্মাণশৈলী

অন্য সব মুঘল স্থাপত্যের মতো তেরোশ্রী মসজিদও স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে থাকা এই মসজিদের গঠনশৈলী এতই শক্তিশালী যার অস্তিত্ব জানান দিতে এখনও অবিকল রয়েছে অনেক নান্দনিক নিদর্শন।

মসজিদের মাঝখানে রয়েছে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিশাল আকৃতির এক কালো গম্বুজ। ২২ ফুট x ২২ ফুট আয়তনের এই মসজিদের চার কোণের চারটি পিলারের উপর চারটি মিনার সাদৃশ দন্ডের মাথায় আছে চারটি গম্বুজ। চার পিলার থেকে ভেতারে দুই পাশে আরও চারটি মিনার সাদৃশ পিলার রয়েছে। এই চার পিলারের চূড়ায়ও আছে একই আকারের চারটি গম্বুজ। এই আটটি গম্বুজের পিলারগুলো মিনার সাদৃশ্য মনে হলেও কোনটিই মিনার নয়। মূল গম্বুজকে ঘিরে আছে আরও চারটি গম্বুজ। মোট তেরোটি গম্বুজের সমন্বিত শ্রীবর্ধনেই মসজিদটি তেরোশ্রী নামে খ্যাতি লাভ করে।

ঐতিহাসিক এই মসজিদের দেয়ালের ব্যাস ৪-৬ ফুট। দুই পাশে দুটি দরজা ও দুটি জানালা আছে মুঘল স্থাপত্যকলায় সজ্জিত। ভেতরের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা আছে গুল্ম, লতা ও ফুলের নকশা। তবে অযত্ন অবহেলায় দিনে দিনে ম্লান হচ্ছে এই মুঘল মসজিদের এসব শান-শওকত।

দীর্ঘ প্রস্থের দেয়ালের গাঁথুনিতে ব্যবহার করা হয়েছে পাতলা ইট ও টালি। চুন-সুরকির প্লাস্টারে মসৃণ হয়েছে ভেতর ও বাইরেটা। জনশ্রুতি আছে মসুর ডালেরও ব্যবহার হয়েছে চুন-সুরকির মিশ্রণে।

ভেতরের দেয়ালে রয়েছে ছয় কুঠরির মেহরাব। হয়তো রাত-নিশিতে আলোক শিখারই ঠাঁই হতো এসব মেহরাবগুলোতেই। অথবা প্রয়োজনীয় তসবিহ কিতাবে সমৃদ্ধ ছিলো মেহরাবগুলো। মসজিদের শিলালিপি থেকে অনেক আগেই মুছে গেছে মুঘলদের নাম, তারিখ। আজ যেনো তা ‍ইতিহাসেরই ক্ষতচিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে।

২০০৪ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে রং করা হলেও প্রশাসনের হৃদয়ে সাড়া জাগেনি। প্রত্নতত্বের তালিকার বাইরে থাকা এই ঐতিহাসিক মসজিদ অবহেলায় হারাতে বসেছে ঐতিহাসিক জৌলুস। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের কোন উদ্যোগ না থাকায় মানুষের আহাজারি যেনো শুধু মহান স্রষ্টার দরবারেই আছড়ে পড়ে বারংবার।

ইতিহাস আর ঐতিহ্যের অবক্ষয়ে বাংলাদেশের অনেক পুরতাত্বিক নিদর্শনের মতো তেরোশ্রী মসজিদও কি একদিন  হারিয়ে যাবে কালের শ্রোতে?

Related Posts

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম

শুধু দৃশ্যত নান্দনিকতাই নয়, স্থাপত্যের শিখরে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জলবায়ুর সম্পৃক্ততা। আর এসবের পরিপূর্ণ সংমিশ্রণেই সম্ভব স্বতন্ত্র…

দরাসবাড়ি মসজিদ: বাংলার সুলতানি স্থাপত্যের হারিয়ে যাওয়া গৌরব

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন দরাসবাড়ি মসজিদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার গৌড় অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদ…

ByBySarwar Alam Oct 9, 2026

কুসুম্বা মসজিদ: বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন

বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে কুসুম্বা মসজিদ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত…

সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি: ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য স্মারক

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের মাটিতে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের নানা নিদর্শন। কোথাও প্রাচীন মসজিদ, কোথাও মন্দির, আবার কোথাও জমিদার বাড়ি…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি