ব্যস্ত ট্রাফিক, আধুনিক ক্যাফে, আর বহুতল ভবনের ভিড়ে ঠাসা আজকের ধানমন্ডি। ঢাকার অন্যতম অভিজাত ও কোলাহলপূর্ণ এই এলাকার সাতমসজিদ রোডে (পুরোনো ১৫ এবং নতুন ৮/এ সড়ক) চোখ মেললেই দেখা মিলবে চার দেয়ালের ঘেরাটোপে থাকা এক বিশাল সবুজ মাঠের। প্রথম দেখায় এটিকে সাধারণ খেলার মাঠ মনে হতে পারে, কিন্তু একটু ভালোভাবে তাকালেই এর পশ্চিমে থাকা প্রাচীন দেয়ালটি আপনাকে নিমেষেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে চারশ বছর আগের এক রাজকীয় অতীতে। এটিই ঐতিহাসিক ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ যা ঢাকার বুকে টিকে থাকা অন্যতম প্রাচীন মুঘল স্থাপত্যকীর্তি।
আসুন জেনে নেই, ইট-পাথরের এই শহরের বুকেও কীভাবে ৪ শতাব্দী ধরে নিজের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছে এই মোঘল নিদর্শন।

ইতিহাসের সোনালী পাতায় ধানমন্ডি ঈদগাহ
আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের কথা। সুবা বাংলার (বাংলার প্রদেশ) শাসনভার তখন মোগল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার হাতে। ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে শাহ সুজার প্রধান অমাত্য বা দেওয়ান মীর আবুল কাসেম ধানমন্ডির এই শাহী ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠা করেন।
কৌতূহল জাগতে পারে, ৪০০ বছর আগের এই নিখুঁত সময়কাল আজ আমরা জানলাম কীভাবে? উত্তর লুকিয়ে আছে ঈদগাহের মূল মেহরাবের গায়ে। ঈদগাহের কেন্দ্রীয় মেহরাবে খোদাই করা একটি প্রাচীন শিলালিপি রয়েছে, যা আজও এই ঐতিহাসিক সত্যের অকাট্য প্রমাণ বহন করছে। মোঘল আমলে ঢাকার মীরপুর, সাভার বা কাফরুল থেকেও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এখানে ঈদের নামাজ আদায় করতে আসতেন।
স্থাপত্যশৈলী: মোঘল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অনন্য নিদর্শন
ধানমন্ডি ঈদগাহ শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, বরং এটি তৎকালীন মোঘল স্থাপত্য ও দূরদর্শী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক চমৎকার উদাহরণ। এক নজরে এর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যগুলো দেখে নেওয়া যাক:
বন্যা থেকে সুরক্ষায় উঁচু প্ল্যাটফর্ম: ঈদগাহটি চারপাশের সাধারণ ভূমি থেকে প্রায় ৪ ফিট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল বর্ষাকালে বন্যার পানি থেকে মাঠটিকে রক্ষা করা।
আয়তন: মাঠটির দৈর্ঘ্য ১৪৫ ফিট এবং প্রস্থ ১৩৭ ফিট। চারকোণে রয়েছে মোঘল স্থাপত্যের সিগনেচার স্টাইল অষ্টাভূজাকৃতির বুরুজ বা মিনার।
উঁচু প্রাচীর: এক সময় ঈদগাহটি চারদিকে ১৫ ফিট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। তবে কালের বিবর্তনে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বের দেয়াল হারিয়ে গেলেও, পশ্চিম দিকের প্রাচীরটি আজও আদি মোঘল রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তিন ধাপের মিম্বর: ঈদগাহের উত্তর পাশে রয়েছে তিন ধাপবিশিষ্ট একটি চমৎকার মিম্বর, যেখানে দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেবরা খুতবা দিতেন এবং নামাজ পড়াতেন।

দৃষ্টি নন্দন মেহরাব: পশ্চিমের মূল দেয়ালের ঠিক মাঝখানে রয়েছে প্রধান মেহরাব। এই মেহরাবটির দুই পাশে বহু খাঁজবিশিষ্ট চমৎকার নকশা করা প্যানেল রয়েছে। এছাড়াও মূল মেহরাবের দুই পাশে রয়েছে আরও দুটি ছোট আকারের মেহরাব, যা পুরো দেয়ালটিকে এক রাজকীয় রূপ দিয়েছে। প্রতিটি মেহরাবই দেয়ালের চমৎকার আয়তাকার ফ্রেমের ভেতরে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কালের খেয়া পার হয়ে: অতীত থেকে বর্তমান শত শত বছরের ঝড়-ঝাপটা, রোদ-বৃষ্টি এবং মানুষের অসচেতনতায় এক সময় এই অনন্য নিদর্শনটি ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। এক পর্যায়ে চারপাশের প্রাচীর ধসে পড়ে এবং মাঠটি বেদখল হওয়ার উপক্রম হয়।
অবশেষে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয়। তাদের সংস্কারকাজের ফলেই ঈদগাহটি তার প্রাচীন রূপের কিছুটা হলেও ফিরে পেয়েছে।
সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, ৪০০ বছর আগের এই ঈদগাহটি আজও তার মূল চরিত্র হারায়নি। ১৬৪০ সালে যে উদ্দেশ্যে এটি তৈরি হয়েছিল, আজও (এমনকি ২০১৯ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এবং বর্তমান সময়েও) প্রতি বছর দুই ঈদে এখানে হাজার হাজার মানুষ অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ কেবল একটি প্রাচীন দেয়াল বা মাঠ নয়, এটি আমাদের ঢাকার গৌরবময় মোঘল ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। শত ব্যস্ততার মাঝেও বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন স্থাপত্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আধুনিকতার ভিড়েও নিজের শিকড় আর ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা কতটা জরুরি। আগামীতে যখনই ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোড দিয়ে যাবেন, ক্ষণিকের জন্য হলেও দাঁড়িয়ে মীর আবুল কাসেমের এই ৪০০ বছরের প্রাচীন সৃষ্টিকে দেখে আসতে ভুলবেন না!
















