২২ মিলিয়ন মানুষের শহর ঢাকায় মাত্র তিনটি ট্র্যাফিক লাইট। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সরকারিভাবে আসলে ৭২টি ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রক রয়েছে। তবে এতগুলো নিয়ন্ত্রকের মধ্যে মাত্র তিনটি সচল দেখা যায়। কখনো কখনো তাও দেখা যায় না। শুধু দুটো নিয়ন্ত্রণ চোখে পড়ার মতো।
কাদার মতো ধীরগতিতে যান চলাচল করে এই শহরে। সাথে অবিরাম হর্নের বিকট শব্দ তো আছেই যা বহিরাগতদের রীতিমতো অবাক করে। একটি মহানগরে এই নূন্যতম অবকাঠামো না থাকায় জনজীবন নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন উঠে।
বিদেশি এক পর্যটকের ঢাকা সফরের কিছু অভিজ্ঞতা আছে আমাদের কাছে খুব সাধারণ মনে হলেও বিশ্ববাসীর কাছে দেশের মান অনেকটাই ক্ষুণ্ন করে।
ঢাকার ইতিহাস সহস্রাব্দেরও বেশি পুরনো, তবুও একে আশ্চর্যজনকভাবে তরুণ মনে হয়। এই প্রাণশক্তি শুধু জনসংখ্যার দিক থেকেই নয় অর্থনৈতিকভাবেও সুস্পষ্ট। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে শহরটি এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
শহরের সীমানার ভেতরে ও বাইরে সর্বত্রই নির্মাণকাজ চলে সারা বছর। ফলে যানজট ও বায়ুদূষণ দিনকে দিন ক্রমাগত বাড়ছে। এই বিপুল পরিমাণ নতুন ভবন নির্মাণের ফলে দৃশ্যমান ইতিহাস বা ঐতিহ্যের ছাপও প্রায় নেই বললেই চলে।

যেহেতু ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ার আগে একটি ছোট প্রাদেশিক শহর ছিল, তাই এখানে খুব বেশি বড় মাপের স্থাপত্য নিদর্শন নেই। তা সে মুঘল আমলেরই হোক যে সময়ে শহরটির প্রথম বিকাশ ঘটেছিলো অথবা ব্রিটিশ রাজত্বকালেরই হোক। কোনটিরই কোন অস্তিত্ব নেই।
তবে এখানে একটি উল্লেখযোগ্য নাগরিক স্থাপত্য নিদর্শন রয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবন, যা লুই কান-এর নকশায় ১৯৭৭ সালে সম্পন্ন হয় এবং ১৯৮২ সালে উৎসর্গ করা হয়। কিন্তু বর্তমান নামমাত্র নির্বাচিত সরকার নিরাপত্তাজনিত কারণে সংসদের আলোচনা কক্ষ, দপ্তর এবং বাসভবনসহ বিশাল এলাকাটি বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। ফলে পুরো ভবনটি শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না হয়ে বরং একটি শূন্যস্থানের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
তাছাড়া, সেখানে কান-এর কাজ যার মধ্যে একটি মহিলা হাসপাতালও রয়েছে। হাসপাতালটি কোনো বিশেষ ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয় এবং স্থপতির ইট, মিনার, খিলান ও বৃত্তের প্রতি মোহের সঙ্গে বেশি সম্পর্কযুক্ত বলে মনে হয়।
তবে কান যা তৈরি করেছিলেন তা হলো আধুনিকতাবাদের জন্য একটি প্রভাবশালী স্থানীয় শৈলী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে নির্মিত প্রায় সমস্ত ভালো স্থাপত্য কান-এর উদ্ভাবনের উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টা মাত্র।
যদিও এগুলো কারুশিল্পের ঐতিহ্য এবং ভৌগোলিক নদীমাতৃক প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। কার্যত বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ। গঙ্গার প্রধান শহর হিসেবে ঢাকা নিউ অরলিন্স, আলেকজান্দ্রিয়া বা রটারডামের মতো একটি অবস্থানে রয়েছে। তবে সেই সংযোগগুলোও খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এই কাজটি উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে কান-এর করা কাজের সাথেও বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। বিশেষ করে আহমেদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট-এর মতো। এর পরিবর্তে যা ঘটেছে তা হলো, খানের সহযোগী মুজহারুল ইসলামকে দিয়ে শুরু করে স্থপতিরা কংক্রিটের কাঠামোকে ইটের পর্দা দিয়ে পূর্ণ করে এক নতুন শৈলী তৈরি করেছেন। সেই উপাদানগুলো দিয়ে গভীর, স্তরযুক্ত ও ছায়াদানকারী স্থান গড়ে তুলেছেন যা সেখানকার নির্মাণ পদ্ধতির জন্য যেমন উপযুক্ত তেমনই ঢাকায় একটি উদীয়মান দেশীয় স্থাপত্যের আভাসও দেয়।

স্থাপত্য নিয়ে মগ্ন একজন ব্যক্তি হিসেবে অ্যারন ভেটস্কির কাছে এটিই ছিলো প্রথম অদ্ভুত বিষয়। প্রায় সম্পূর্ণভাবে একজন বিদেশি স্থপতির কাজের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক আধুনিকতাবাদ, যার কোনো স্পষ্ট স্থানীয় ভিত্তি নেই। অথচ এই স্থাপনাটি একটি সফল শৈলী বা দৃষ্টিভঙ্গিতে বিকশিত হতে পেরেছে।
তার সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফর থেকে থেকে দ্বিতীয় যে উপলব্ধিটি করেছেন, যে ভবনগুলো তেমন উচ্চ শৈলীতে নকশা করা হয়নি, সেগুলোর চরিত্র এতটাই স্তরবিন্যাসহীন যা তার অন্যান্য অনেক প্রত্যাশাকেই ভুল প্রমাণ করে। এখানে কয়েকটি বহুতল ভবন আছে, আরও কয়েকটি নির্মাণাধীন, কিন্তু সামরিক ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ঢাকার কেন্দ্রস্থলে বিশ তলার বেশি উঁচু যেকোনো ভবন নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে।
অর্থনৈতিক চাপের কারণে অপরদিকে, উচ্চতার দিক থেকে দেখলে এখন মাত্র কয়েকটি নিচু ভবন অবশিষ্ট আছে। এর মানে হলো ঢাকার বেশিরভাগ রাস্তার ভবনগুলো ছয় থেকে উনিশ তলার মধ্যে সীমাবদ্ধ। যেহেতু ভবনগুলো খুব কাছাকাছি অবস্থিত এবং খোলা জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে তাই তার কাছে মনে হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরটি যেন মানুষের তৈরি একটি বিশাল ভূখণ্ড। এর মধ্য দিয়ে মানুষকে এঁকেবেঁকে চলতে হয়।
এখানে মানুষের তৈরি বা প্রাকৃতিক এমন কোনো নির্দেশক চিহ্ন প্রায় নেই বললেই চলে, যা একজন পর্যটককে দিকনির্দেশনা দেবে বা বিভিন্ন এলাকাকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে।
ভেটস্কি ঢাকায় তৃতীয় যে বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন তা হলো, গণপরিসরের প্রতি যত্নের অভাব। মনে হয়, সরকারের প্রতিটি স্তরই রাস্তাঘাট, পার্ক, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকেও পুরোপুরি উপেক্ষা করে।
তাকে বলা হয়েছিলো সুন্দর গণপরিসরের জন্য তথাকথিত “ক্যান্টনমেন্ট”-এ যেতে হবে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন শাখা তাদের বর্তমান ও প্রাক্তন সদস্য এবং তাদের পরিবারের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রাচীরঘেরা সামরিক এলাকা যা স্পষ্টতই অন্য সবার জন্য নিষিদ্ধ। এটিরে আরেকটি স্থানীয় বৈশিষ্ট্য কিন্তু তিনি তা উপভোগ করতে পারেননি।

একমাত্র মোটামুটি ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা খোলা জায়গা ছিল মসজিদ ও স্কুলের চারপাশের ধর্মীয় চত্বরগুলো। গণপরিসরের প্রতি এই যত্নের অভাব ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অংশেও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তিনি সেখানকার যে অন্য শহরগুলোতে ভ্রমণ করেছেন সেখানে আরও বেশি গণ-আনুষ্ঠানিক স্থান ছিল যা সহজলভ্য এবং ভালোভাবে পরিচর্যা করা হতো।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গণপরিসরের কি কোনো প্রয়োজন আছে? রাস্তায় এবং অপরিচ্ছন্ন পার্কে লোকজন জড়ো হয়, কিন্তু উন্নততর সুযোগ-সুবিধার জন্য তাদের কোনো সুস্পষ্ট দাবি ছিলো না।
ঢাকার চতুর্থ যে বিষয়টি তাকে অবাক করেছিল তা হলো, ব্যাংককের মতো জায়গায় যেমনটা দেখা যায়, তেমন ধরনের সুস্পষ্ট সাইনবোর্ডের অভাব। এই সাইনবোর্ডগুলোর বেশিরভাগই বাণিজ্যিক। এসব সাইনবোর্ডের আড়ালে রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বার ইত্যাদি।
সে অর্থে, ঢাকা আবারও ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য শহরের মতোই। এখানে ইলেকট্রনিক এক্সপ্রেশনিজমের প্রভাব খুব কম, যা এই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করে। এই শহরটি কংক্রিটের কাঠামোর এক অখণ্ড স্তম্ভ হিসেবেই যেনো নির্মিত।
এর ভেতরের সমস্ত কার্যকলাপকে আবদ্ধ রাখার জন্য নিবিড়ভাবে ভরাট করা হয়েছে। এখানকার আধুনিকতা পুরোনো কাঠামোগুলোর মতোই প্রচ্ছন্ন।
এই সমস্ত উপাদান একত্রিত হয়ে এমন একটি রূপ তৈরি করে যা একজন বহিরাগতের কাছে আরও বেশি বিভ্রান্তিকর। কারণ এতে চেনা বিন্যাস বা আকৃতির অভাব রয়েছে। এশিয়ার অনেক শহরের মতোই ঢাকাও তার জন্মদাতা বুড়িগঙ্গা নদী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কেবল একটি ঘাট এলাকা ছাড়া আর কোন ঘাট নদীর উজানও ভাটির শহর, গ্রামগুলোকে ঢাকার যুক্ত করে না। ঢাকায় উল্লেখযোগ্য রাজপথ, চত্বর বা ময়দান খুব কমই আছে, যার ফলে কোথায় আছেন তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকায় একটি পাতাল রেল ব্যবস্থা তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু আপাতত এই পাতাল রেলের এমন কোনো স্টেশন নেই যা বিভিন্ন এলাকাকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। যে পার্কগুলো আছে সেগুলো শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেইসব খাঁড়ি, ঝর্ণা আর পুকুরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। এই পার্কগুলোও কোনোমতে টিকে থাকতে পারছে। আর এগুলো ঢাকার মূল ভিত্তি না হয়ে, বরং পথের মাঝে বাধা হিসেবে কাজ করছে বলে ভেটস্কির মনে হয়েছে।

কেন্দ্রীয় এলাকাকে ঘিরে নির্মাণাধীন, সদ্য সমাপ্ত বা পরিকল্পিত নতুন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও ভেটস্কি সুস্পষ্ট শৃঙ্খলার অভাব দেখেছেন যা আজও অব্যাহত রয়েছে। যদিও এগুলো গ্রিড-আকারে বিন্যস্ত, তবুও এখানে স্মারক কেন্দ্রবিন্দু প্রায় নেই বললেই চলে।
এই সবকিছু মিলিয়ে ঢাকার ইতিহাস ও গঠন নিয়ে এই গবেষকের গভীর পর্যবেক্ষণ, আলোচনা এবং কিছুটা অধ্যয়নের পরেও শহরটি তার কাছে এক রহস্যময়ই রয়ে গেছে। মুম্বাইতে পুরনো ডাউনটাউন এলাকা এবং সমুদ্রের অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করা যায়। ব্যাংককে মন্দির চত্বর এবং বিশাল শপিং মলগুলো অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয়। চীনে সরকার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের নির্দেশ দেয় এবং বিশাল ব্লকে উন্নয়নে উৎসাহিত করে। ঢাকায় তিনি নিজেকে ক্রমাগত লক্ষ্যহীন ও দিশেহারা অনুভব করেছেন।
জনসাধারণের বিরোধিতা কম থাকায়, এত বড় একটি রাজধানী শহরে প্রত্যাশিত ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদানে সরকারের কোনো তাগিদ নেই। উন্নয়নের চাপ কেবল আরও ঘনত্বের দিকেই, শৃঙ্খলা বা স্বাতন্ত্র্যের দিকে নয়।
এই ধরনের শক্তির সংমিশ্রণ আরও অনেক শহরেই বিদ্যমান, কিন্তু তিনি অন্য কোথাও নগর ঘনত্বের এমন অবিরাম অন্তর্বিষ্ফোরণ দেখেননি। এই অন্তর্বিষ্ফোরণ কি নগর রূপের উৎপাদক হতে পারে? তা কি কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে?
মূল লেখক: স্থপতি ও গবেষক, অধ্যাপক অ্যারন ভেটস্কি
তথ্যসূত্র: আর্কিটেক্ট ম্যাগাজিন




















