‘ঈদ’ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগের মহিমা নিয়ে হাজির হয় ঈদুল আজহা। ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন পোশাক পরে সবার গন্তব্য থাকে এক জায়গাতেই। বিশাল খোলা মাঠ, সারি সারি মানুষ, আর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সেই অপূর্ব দৃশ্য হ্যাঁ, বলা হচ্ছে ‘ঈদগাহ’-এর কথা।
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে মহামিলন। আর এই মহামিলনের সূচনাটি ঘটে খোলা আকাশের বিশাল শামিয়ানার নিচে, এই ঈদগাহ ময়দানেই। ইসলামী ঐতিহ্যে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ার বিধান থাকলেও, ঈদগাহের আবেদন একদম ভিন্ন। কারণ, এখানে সমাজের ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। তৈরি হয় ভ্রাতৃত্ব, সমতা আর ঐক্যের এক অনবদ্য বন্ধন।
তবে বাংলাদেশের ঈদগাহগুলো শুধু বছরে দুই দিন নামাজ পড়ার মাঠ নয়। এর অনেকগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে শত শত বছরের ইতিহাস, মুঘল স্থাপত্যের রাজকীয় আভিজাত্য এবং সুফি-সাধকদের স্মৃতি। চলুন, আজ পাঠক হিসেবে ঘুরে আসি দেশের বুকে ছড়িয়ে থাকা এমন কিছু ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ থেকে।
জাতীয় ঈদগাহ: যেখানে মেলে পুরো দেশ রাজধানীর একদম কেন্দ্রস্থলে, হাইকোর্ট প্রাঙ্গণের পাশেই অবস্থিত জাতীয় ঈদগাহ। আজ আমরা যে বিশাল ও সুশৃঙ্খল ময়দানটি দেখি, তার অতীত কিন্তু এমন ছিল না। একসময় জায়গাটি ছিল ঝোপঝাড়ে ঘেরা একটি পুকুরপাড়। পাশেই একটি মাজার থাকায় ওরস হতো, আর সেই সুবাদেই মানুষের আনাগোনা বাড়ে। প্রথমে সামিয়ানা টাঙিয়ে খুব ছোট পরিসরে এখানে ঈদের নামাজ শুরু হয়।
পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে পুকুর ভরাট করে বিশাল মাঠ তৈরি করা হয় এবং ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে সরকার এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় ঈদগাহ’ হিসেবে ঘোষণা করে। ধারণক্ষমতা একসঙ্গে প্রায় এক লাখ মুসল্লি।
দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সবাই এখানে এক কাতারে দাঁড়ান। তাই এটি কেবল ধর্মীয় স্থান নয়, বরং আমাদের জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক।
ধানমন্ডির মুঘল ঈদগাহ: চার শতাব্দীর রাজকীয় আভিজাত্য ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ৪০০ বছরের পুরনো এক মুঘল স্মৃতিচিহ্ন। ১৬৪০ সালে বাংলার সুবেদার শাহ সুজার আমলে তাঁর দেওয়ান মীর আবুল কাসেম এটি নির্মাণ করেন।

প্রথমদিকে এই ঈদগাহে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না, এটি ছিল কেবল মুঘল প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও অভিজাতদের জন্য। তবে উনিশ শতকের শেষের দিকে সাধারণ মানুষের জন্য এটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, এমনকি ঈদের সময় মেলাও বসত এখানে। মাটি থেকে চার ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্ম, পোড়ামাটির ইটের গাঁথুনি, অষ্টভুজাকার বুরুজ এবং দৃষ্টিনন্দন মেহরাব সব মিলিয়ে এটি মুঘল স্থাপত্যরীতির এক জীবন্ত জাদুঘর। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বর্তমানে এই পুরাকীর্তির রক্ষণাবেক্ষণ করছে।
শোলাকিয়া ঈদগাহ: ‘সোয়া লাখি’ মানুষের অনন্য মিলনমেলা উপমহাদেশের ঈদের জামাতের কথা উঠলেই কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘শোলাকিয়া’ ঈদগাহের নাম চলে আসে সবার আগে। ১৮২৮ সালে ইয়েমেন থেকে আগত সুফি সাধক সৈয়দ আহমেদ এই ময়দানে প্রথম ঈদের জামাতের আয়োজন করেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, সেই প্রথম জামাতেই প্রায় সোয়া লাখ মুসল্লি অংশ নিয়েছিলেন। সেই ‘সোয়া লাখি’ মাঠ থেকেই কালক্রমে মানুষের মুখে মুখে এর নাম হয়ে যায় ‘শোলাকিয়া’।
আয়তন ও ধারণক্ষমতা: প্রায় সাত একর আয়তনের এই মাঠের ভেতরে ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দাঁড়াতে পারেন। তবে রাস্তার আশপাশ মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে।
নামাজ শুরুর আগে শর্টগানের ফাঁকা গুলি ছুড়ে জামাতের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হয়, যা এখানকার এক রোমাঞ্চকর ঐতিহ্য।
গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ: দেশের বুকে সর্ববৃহৎ জামাতের নতুন ইতিহাস আয়তনের দিক থেকে বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ দিনাজপুরের ‘গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান’। প্রায় সাড়ে ১৪ একর জমির ওপর নির্মিত এই ঈদগাহটি ২০১৫ সালে নতুন করে মুঘল স্থাপত্যরীতিতে সাজানো শুরু হয়। ইসলাম প্রচারক শাহ আমির উদ্দিন ঘুরী (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে এই ময়দানের নামকরণ।

স্থাপত্যশৈলী: এর প্রধান মেহরাবের উচ্চতা প্রায় ৫৫ ফুট! এতে রয়েছে ৫২টি দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ এবং দুটি সুউচ্চ মিনার। ধারণক্ষমতা একসঙ্গে প্রায় ৭ লাখ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। ২০১৭ সালে প্রথম জামাতেই ৪ লাখ মানুষের উপস্থিতির মাধ্যমে এটি ইতিহাস গড়েছিল।
শাহি ঈদগাহ, সিলেট: পাহাড় চূড়ায় মুঘলদের নান্দনিকতা। সিলেট শহরের একটি টিলার ওপর অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘শাহি ঈদগাহ’ যেন সৌন্দর্যের আরেক নাম। সপ্তদশ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সিলেটের ফৌজদার ফরহাদ খাঁ এটি নির্মাণ করেন। মূল প্রাঙ্গণে পৌঁছাতে হলে আপনাকে পার হতে হবে ২২টি সিঁড়ি। পশ্চিম প্রাচীরের প্রধান মেহরাব এবং এর দুই পাশের ১৪টি ছোট মেহরাব এর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পরবর্তীতে এখানে ২০০ ফুট উচ্চতার একটি মিনার যুক্ত করা হয়, যা দূর থেকে পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

শাহ মখদুম, জমিয়তুল ফালাহ ও গুঠিয়া: দেশের আরও কিছু অবিচ্ছেদ্য নাম শাহ মখদুম ঈদগাহ, রাজশাহী। পদ্মার তীরের শীতল বাতাসে ঘেরা এই ঈদগাহটি ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। হজরত শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন ৪০০ ফুট বাই ৪০০ ফুট আয়তনের এই মাঠে রাজশাহীর প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

জমিয়তুল ফালাহ ঈদগাহ, চট্টগ্রাম: বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ওয়াসা মোড়ে অবস্থিত বিশাল এই ঈদগাহ মাঠটি চট্টগ্রামবাসীর আবেগের জায়গা। সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে এখানেই শহরের সবচেয়ে বড় জামাতটি অনুষ্ঠিত হয়।
গুঠিয়া মসজিদ ঈদগাহ, বরিশাল: ২০০৬ সালে নির্মিত উজিরপুর উপজেলার বাইতুল আমান জামে মসজিদ কমপ্লেক্সের ঈদগাহটি আধুনিক স্থাপত্যের এক চমৎকার নিদর্শন। ফুলবাগান, পুকুর আর এতিমখানার মাঝে অবস্থিত এই মাঠে ২০ হাজার মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন। এর ১৯৩ ফুট উঁচু মিনারটি দূর থেকেই মানুষের চোখ জুড়িয়ে দেয়।।
গুঠিয়া মসজিদ ঈদগাহ, বরিশাল ছবিঃ এআই
বাংলাদেশের এই ঈদগাহগুলো নিছক ইট, পাথর আর মাটির তৈরি কোনো প্রাঙ্গণ নয়। এগুলো আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আত্মিক প্রশান্তির কেন্দ্রবিন্দু। যুগ যুগ ধরে এই খোলা মাঠগুলোই সাক্ষী হয়ে আছে লাখো মানুষের প্রার্থনা, কোলাকুলি আর মহামিলনের এক পবিত্র উৎসবের।
















