বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটি হলো কার্থেজ সভ্যতা। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি হলো কার্থেজ। এই শহরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠে কার্থেজ সভ্যতা। এটি শুধু শহরই নয় প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রও।বর্তমান তিউনিসিয়ার তিউনিস হ্রদের পূর্ব তীরে অবস্থিত ছিল।
শহরটি আসলে ফিনিসীয়দের উপনিবেশ হিসেবে গড়ে উঠেছিলো। কালক্রমে তা পিউনিক সাম্রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে এ অঞ্চলে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলো পিউনিক সাম্রাজ্য।
এক কাহিনীতে বলা হয়, তিনি এক স্থানীয় গোত্রের কাছে জমি চেয়ে বলেন, একটি বলদের চামড়া যতটুকু এলাকা ঢাকতে পারে ততটুকু জমি চাহিয়া নিয়েছিলেন। এরপর তিনি চামড়াটি সরু করে কেটে শহরের পরিসীমা নির্ধারণ করেন। কার্থেজ সমৃদ্ধ হলে তারা উপনিবেশ স্থাপন ও উপনিবেশগুলো শাসনের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট পাঠাতে শুরু করে।

এই প্রাচীন নগরী তৃতীয় পিউনিক যুদ্ধের সময় রোমানদের প্রায় তিন বছরের অবরোধের ফলে খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এক শতাব্দী পর এটিকে পুনর্গঠন করে রোমান কার্থেজ হিসেবে গড়ে তোলা হয়, যা পরবর্তীকালে আফ্রিকা প্রদেশের একটি প্রধান নগরীতে পরিণত হয়। কার্থেজের পতন ও ধ্বংসের বিষয়টি প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্যে, রাজনীতি, শিল্প এবং দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে থেকেছে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সময়েও কার্থেজ বাইজান্টাইন যুগে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ৬৯৮ সালে কার্থেজের যুদ্ধে উমাইয়া বাহিনী শহরটি দখল করে ধ্বংস করে, যেনো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য পুনরায় এটি দখল করতে না পারে।
মুসলিম যুগে এটি একটি দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং হাফসিদ যুগে অষ্টম ক্রুসেডের সময় শহরটি দখল করে বাসিন্দাদের হত্যা করা হয়। এরপর হাফসিদরা এটিকে শত্রুপক্ষের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রোধ করতে এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়। কার্থেজ তখনও একটি ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় ছিলো।
মধ্যযুগে আঞ্চলিক কর্তৃত্ব কাইরোয়ান ও তিউনিসের মদিনায় স্থানান্তরিত হয়। ২০শ শতকের গোড়ার দিকে এটি তিউনিস শহরের উপকূলীয় শহরতলি হিসেবে গড়ে ওঠে এবং ১৯১৯ সালে কার্থেজ পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে প্রথম জরিপ হয় ১৮৩০ সালে, ডেনিশ কনসাল ক্রিশ্চিয়ান টাক্সেন ফালবে-এর মাধ্যমে। পরে চার্লস আর্নেস্ট বেলু ও আলফ্রেড লুই ডেলাত্রে খননকার্য পরিচালনা করেন। কার্থেজ জাতীয় জাদুঘর ১৮৭৫ সালে কার্ডিনাল চার্লস লাভিজেরি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২০-এর দশকে ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদদের খননে শিশু বলিদান সংক্রান্ত প্রমাণ উঠে আসে, যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিস্তর মতবিরোধ আছে।

কার্থেজ একটি উচ্চভূমিতে গড়ে উঠেছিল, যার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বড় খাল ছিলো। এই ভৌগোলিক অবস্থান কার্থেজকে ভূমধ্যসাগরীয় সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করে। যেকোনো জাহাজকে সাগর অতিক্রম করতে হলে সিসিলি ও তৎকালীন তিউনিসিয়ার উপকূল—যেখানে কার্থেজ অবস্থিত ছিল—এর মধ্য দিয়ে যাত্রা করতে হতো।
শহরের ভেতরে দুটি বিশাল কৃত্রিম বন্দর নির্মাণ করা হয়েছিলো। একটি ছিল কার্থেজের বিশাল নৌবাহিনীর জন্য। কার্থেজের নৌবহরে ছিলো ছোট, বড় প্রায় ২২০টি নৌযান। আরেকটি বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হতো। উভয় বন্দরকে নজরদারি করতে একটি প্রাচীরঘেরা টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিলো।
শহরটি ঘিরে ছিল বিশাল প্রাচীর, যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩৭ কিমি। এটি সমসময়ের অন্য যেকোনো শহরের প্রাচীরের চেয়ে অনেক দীর্ঘ। এ প্রাচীরটি ছিলো তুলনামূরক দুর্বল। কারণ প্রাচীরের বেশিরভাগ অংশ উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত ছিলো এবং সাগর থেকে আক্রমণ প্রায় দুরূহ।
কিন্তু শহরের পশ্চিমাংশে ইস্থমাসে অবস্থিত ৪ থেকে ৪.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীর ছিল অত্যন্ত মজবুত ও দুর্ভেদ্য।
পিউনিক কার্থেজ চারটি সমান আকারের আবাসিক এলাকায় বিভক্ত ছিলো। এখানে ধর্মীয় এলাকা, বাজার, একটি কাউন্সিল হাউস, টাওয়ার, একটি থিয়েটার এবং একটি বিশাল নেক্রোপলিস ছিলো। শহরের প্রায় মাঝখানে বাইর্সা নামক একটি উঁচু দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিলো।
কার্থেজের চারপাশে প্রাচীর ছিল “অসাধারণ শক্তিশালী”, যা প্রাচীন লেখকদের মতে কিছু জায়গায় ১৩ মিটারেরও বেশি উঁচু এবং প্রায় ১০ মিটার পুরু ছিল। পশ্চিমে তিনটি সমান্তরাল প্রাচীর নির্মিত হয়েছিলো। প্রাচীরগুলি শহরটিকে ঘিরে রাখার জন্য প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ছিলো।
বাইর্সার উচ্চতা অতিরিক্তভাবে সুরক্ষিত ছিলো। এই এলাকাটি ১৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমানদের কাছে আত্মসমর্পণকারীর সর্বশেষ স্থান ছিলো। মূলত রোমানরা তাদের সেনাবাহিনী শহরের দক্ষিণে বিস্তৃত ভূমিতে অবতরণ করেছিল।
কার্থেজের নগর প্রাচীরের বাইরে ছিল কোরা বা কার্থেজের কৃষিজমি। কোরা একটি সীমিত এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল: উত্তর উপকূলীয় টেল, নিম্ন বাগ্রাদাস নদীর উপত্যকা (ইউটিকার অভ্যন্তরীণ অংশ), কেপ বন, এবং পূর্ব উপকূলের সংলগ্ন সাহেল।

পিউনিক সংস্কৃতি এখানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ভূমির জন্য প্রথম বিকশিত কৃষি বিজ্ঞানের প্রবর্তন এবং স্থানীয় আফ্রিকান অবস্থার সাথে তারা নিজেরা অভিযোজিত হয়েছিলো।
কার্থেজের শহুরে ভূদৃশ্য আংশিকভাবে প্রাচীন লেখকদের কাছ থেকে জানা যায়। তাদের মতে, কার্থেজ সম্পকে যত তথ্য এখন পাওয়া যায় তার সবই প্রত্নতাত্ত্বিকদের আধুনিক খনন এবং সমীক্ষার ফলে।
কারও কারও মতে, কার্থেজ হলো সপ্তম শতাব্দীর “প্রথম শহুরে কেন্দ্র”, যার আয়তন প্রায় ১০ হেক্টর (২৫ একর)। দৃশ্যত উপকূল বরাবর নিচু ভূমিতে (পরবর্তী বন্দরগুলোর উত্তরে) অবস্থিত ছিলো। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে নিশ্চিত হওয়া গেছে, কার্থেজ ছিলো একটি “এক্স নিহিলো সৃষ্টি”।
এ শহরটি ‘কুমারী’ জমিতে নির্মিত এবং ভূমধ্যসাগরীয় এটি উপদ্বীপের প্রান্তে অবস্থিত। এখানে “কাদা ইটের দেয়াল এবং পেটানো মাটির মেঝে” (সম্প্রতি উন্মোচিত) এর মধ্যে বিস্তৃ অনেক কবরস্থানও পাওয়া গেছে।
রোমানদের শহর সমতল করার কারণে, কার্থেজের মূল পিউনিক শহুরে ভূদৃশ্য মূলত হারিয়ে গেছে। ১৯৮২ সাল থেকে, ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক সার্জ ল্যান্সেল রোমান কার্থেজের ফোরামের কাছে বাইর্সা পাহাড়ের উপরে পিউনিক কার্থেজের একটি আবাসিক এলাকা খনন করেছেন।
এই পাড়াটি খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম দিকে চিহ্নিত করা যেতে পারে, এবং এর বাড়ি, দোকান এবং ব্যক্তিগত স্থানগুলোর সাথে, পিউনিক কার্থেজের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে যা প্রকাশ করে তার জন্য এটি তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্তমানের কার্থেজ আসলে কার্থেজ নয়। এক সময় এ সভ্যতার ছিলো জৌলুস। তাকে স্মৃতি হিসেবে বহন করা যায়নি আধুনিক প্রযুক্তিময় জগতে। নতুন শহর গড়তে কার্থেজের অনেক কিছুই বিসর্জন দিতে হয়েছে। এভাবেই মুছে যায় পৃথিবীর বুক থেকে ইতিহাসের চিহ্ন। তবুও কার্থেজ ইউনেস্কো ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।




















