নুহাশ পল্লী বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এবং কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর স্বপ্নে গড়ে ওঠা একটি অনন্য সবুজ আবাসভূমি। প্রকৃতি, সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং নান্দনিক স্থাপত্যের এক অসাধারণ সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই স্থানটি গাজীপুর জেলার পিরুজালী গ্রামে অবস্থিত। প্রতি বছর হাজারো দর্শনার্থী নুহাশ পল্লীতে ভ্রমণ করতে আসেন, যেখানে তারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানোর পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিকে অনুভব করার সুযোগ পান।
আজ ১৯ জুলাই বিখ্যাত এই কথা সাহিত্যিকের প্রয়াণ দিবস। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের একটি হাসপাতালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। এই দিনে তার স্মৃতিতে বন্ধনের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা।
নুহাশ পল্লীর ইতিহাস
নুহাশ পল্লী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৭ সালে। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর বড় ছেলে ‘নুহাশ আহমেদের’ নাম অনুসারে এর নামকরণ করেন। শুরুতে এটি ছিল একটি ব্যক্তিগত অবকাশযাপন কেন্দ্র। পরে ধীরে ধীরে এটি একটি নান্দনিক উদ্যান, চলচ্চিত্রের শুটিং স্পট এবং সাহিত্যপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়।
হুমায়ূন আহমেদ প্রকৃতিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। সেই ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটেছে নুহাশ পল্লীর প্রতিটি গাছ, ফুল, জলাশয় এবং পথের নকশায়। জীবদ্দশায় তিনি এখানেই অসংখ্য উপন্যাস, নাটক এবং চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা ও নির্মাণ করেছেন।

কোথায় অবস্থিত?
নুহাশ পল্লী ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে গাজীপুর জেলার সদর উপজেলার পিরুজালী গ্রামে অবস্থিত। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক হয়ে সহজেই সেখানে পৌঁছানো যায়। ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস কিংবা বাসে করে স্বল্প সময়েই নুহাশ পল্লীতে যাওয়া সম্ভব।
নুহাশ পল্লীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত দেশি-বিদেশি বৃক্ষ, রঙিন ফুলের বাগান, কৃত্রিম লেক, ছোট ছোট দ্বীপ, বাঁশঝাড়, সবুজ ঘাসের মাঠ, পাখির কলতান আর নিরিবিলি হাঁটার পথ। এখানে প্রবেশ করলেই মনে হয় যেন শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির এক শান্ত রাজ্যে চলে এসেছেন।
নুহাশ পল্লীর সবচেয়ে আবেগঘন স্থান হলো হুমায়ূন আহমেদের সমাধি। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ২০১২ সালে তাঁকে এখানেই সমাহিত করা হয়। সমাধির চারপাশে রয়েছে বিশাল সবুজ প্রান্তর, গাছপালা এবং নীরব পরিবেশ। প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
চলচ্চিত্র ও নাটকের শুটিং স্পট
বাংলাদেশের অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক ও চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছে নুহাশ পল্লীতে। এখানে নির্মিত উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, শ্যামল ছায়া, ঘেটুপুত্র কমলা, বিভিন্ন ঈদের নাটক, টেলিফিল্ম। নুহাশ পল্লীর প্রাকৃতিক পরিবেশ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে আজও একটি জনপ্রিয় লোকেশন।
ভাস্কর্য ও নান্দনিক স্থাপনা
নুহাশ পল্লীতে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য রয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ডাইনোসরের প্রতিকৃতি, হাতির ভাস্কর্য, কুমিরের মডেল, গ্রামীণ বাংলার প্রতীকী স্থাপনা, ছোট সেতু এবং কাঠের নির্মাণশৈলী। এসব স্থাপনা শিশুদের কাছেও অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

নুহাশ পল্লীর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
নুহাশ পল্লী শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হুমায়ূন আহমেদের অসংখ্য ভক্ত এখানে এসে তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনকে স্মরণ করেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাহিত্যপ্রেমীরা সময়ে সময়ে এখানে আয়োজন করেন স্মরণসভা, সাহিত্য আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
স্থাপত্যশৈলী
নুহাশ পল্লীর স্থাপত্যশৈলী কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ধারার (যেমন মুঘল, ঔপনিবেশিক বা আধুনিক) অনুসারী নয়। বরং এটি প্রকৃতিনির্ভর, নান্দনিক (Organic Architecture), গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য এবং শিল্প-ভাস্কর্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র স্থাপত্যধারা। হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত রুচি, সাহিত্যিক কল্পনা এবং প্রকৃতিপ্রেম এই স্থাপত্যের প্রতিটি অংশে প্রতিফলিত হয়েছে।
১. প্রকৃতির সঙ্গে স্থাপত্যের সমন্বয়
নুহাশ পল্লীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ভবনগুলোকে প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। গাছ, জলাশয়, উন্মুক্ত মাঠ ও প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থাপন করা হয়েছে। ফলে পুরো এলাকা একটি প্রাকৃতিক বনভূমির মধ্যেই নির্মিত শিল্পকর্মের মতো মনে হয়।
২. অর্গানিক (Organic) স্থাপত্যের প্রভাব
স্থাপনাগুলোর নকশায় সোজাসাপ্টা জ্যামিতিক রেখার পরিবর্তে বাঁকানো, প্রাকৃতিক ও মুক্তরূপী নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে সুইমিং পুল, হাঁটার পথ এবং জলাশয়ের চারপাশের বিন্যাসে অর্গানিক ডিজাইনের প্রভাব স্পষ্ট। এগুলো পরিবেশের সঙ্গে মিশে গিয়ে একটি স্বাভাবিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।

৩. বাংলার গ্রামীণ স্থাপত্যের ছাপ
নুহাশ পল্লীর কটেজ ও বাংলোগুলোতে বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বাড়ির সরলতা ফুটে ওঠে। ঢালু ছাদ, খোলা বারান্দা, চারপাশে গাছপালা এবং উন্মুক্ত উঠান—এসব উপাদান গ্রামীণ বাংলার আবহ তৈরি করে। এখানে আড়ম্বরের চেয়ে আরাম, আলো-বাতাস এবং প্রকৃতির সংস্পর্শকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. বৃষ্টি বিলাস ও ভূত বিলাস
নুহাশ পল্লীর সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে ‘বৃষ্টি বিলাস এবং ‘ভূত বিলাস’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘বৃষ্টি বিলাস’ এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে বসে বর্ষার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। ‘ভূত বিলাস’ অপেক্ষাকৃত নির্জন পরিবেশে নির্মিত, যেখানে রহস্যময় আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে।
৫. জলভিত্তিক নকশা
নুহাশ পল্লীর পরিকল্পনায় জল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। লীলাবতী দিঘি, কৃত্রিম দ্বীপ, কাঠের সেতু, পদ্মপুকুর এবং ছোট ছোট জলাধার পুরো স্থাপত্যকে প্রাণবন্ত করেছে। জলাশয়গুলোর অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে ভবন ও প্রকৃতির মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়।
৬. ভাস্কর্য ও শিল্পের ব্যবহার
নুহাশ পল্লীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন শিল্পভাস্কর্যের উপস্থিতি। জলপরী, রাক্ষস, ডাইনোসর, প্রাণীর ভাস্কর্য, বিশাল দাবার গুটি এবং অন্যান্য শিল্পকর্ম স্থানটিকে একটি উন্মুক্ত ভাস্কর্য উদ্যানে রূপ দিয়েছে। এগুলো শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেনি, বরং হুমায়ূন আহমেদের কল্পনাশক্তিরও প্রকাশ ঘটিয়েছে।
৭. উন্মুক্ত স্থান পরিকল্পনা
নুহাশ পল্লীতে ভবনের তুলনায় খোলা সবুজ জায়গার পরিমাণ অনেক বেশি। হাঁটার পথ, বিশ্রামস্থল, বাগান ও লন এমনভাবে বিন্যস্ত যে দর্শনার্থীরা প্রকৃতির মধ্যে অবাধে চলাফেরা করতে পারেন। এই উন্মুক্ত পরিকল্পনা স্থানটিকে প্রশান্ত ও আরামদায়ক করে তুলেছে।

স্থাপত্যগত গুরুত্ব
নুহাশ পল্লী বাংলাদেশের প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্র বা ব্যক্তিগত বাগানবাড়ির তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি এমন একটি স্থান যেখানে স্থাপত্য, ল্যান্ডস্কেপ, সাহিত্য, শিল্প এবং প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। তাই নুহাশ পল্লীকে শুধু একটি অবকাশকেন্দ্র নয়, বরং বাংলাদেশে প্রকৃতিনির্ভর সৃজনশীল স্থাপত্যের একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
নুহাশ পল্লী শুধু একটি ভ্রমণস্থান নয়; এটি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক আবেগময় স্মৃতিবিজড়িত অধ্যায়। সবুজ গাছপালা, নীরব লেক, পাখির কলতান এবং হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিচিহ্ন একে দিয়েছে আলাদা মর্যাদা।
যারা প্রকৃতি ভালোবাসেন, সাহিত্যকে অনুভব করতে চান কিংবা শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য মুক্তি খোঁজেন, তাদের জন্য হুমায়ুন আহমেদের নুহাশ পল্লী একটি আদর্শ গন্তব্য। একবার এখানে গেলে বোঝা যায়, কেন এই স্থানটি আজও লাখো মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
















