স্থাপত্য বলতে এতদিন আমরা বুঝেছি ইট, কংক্রিট আর কাঁচের কাঠামো তৈরির শিল্প। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই ধারণা বদলে যাচ্ছে। ওএমএ (OMA), স্নোহেটা (Snøhetta), হারজোগ অ্যান্ড দ্য মেরোঁ (Herzog & de Meuron)-এর মতো বড় স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ভবনের কাঠামোর পাশাপাশি তার অভ্যন্তর, আসবাবপত্র এবং সামগ্রিক অভিজ্ঞতা সবকিছু একসঙ্গে ডিজাইন করছে।
সমন্বিত ডিজাইনের এই ধারণা নতুন নয়। বিগত কয়েক দশক ধরেই এটি চলে আসছে। তবে ভবনগুলো যত বহুমুখী হয়ে উঠছে, ততই এই প্রবণতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখন পাবলিক লাইব্রেরিকে শুধু বই সংরক্ষণের জায়গার মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। অফিসগুলো ইভেন্ট ভেন্যু ও সামাজিক স্পেস হিসেবেও কাজ করে। আবার হোটেলগুলো রেস্তোরাঁ, প্রাইভেট ক্লাব এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

সমন্বিত ডিজাইনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব
লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব আর্টের স্কুল অব আর্কিটেকচারের ভারপ্রাপ্ত ডিন সান্দ্রা ডেনিকে-পোলশার বলেন, এই প্রবণতা গত ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে চলে আসছে। তবে এখন এটি অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কারণ স্থপতিরা এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একসঙ্গে প্রকল্পে কাজ করছেন।
তার মতে, স্থাপত্যে কমপ্লেক্স ভবগুলোকে প্রায়ই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। তিনি বলেন, এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভিন্ন ভিন্ন শাখাগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি না করা। কারণ কাউকে না কাউকে সবকিছু একসঙ্গে নিয়ে আসতে হয় এবং সেটি কার্যকরভাবে কাজ করতে হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি এমন নয় যে স্থপতি শুধু ভবন আর কাঠামোটা তৈরি করে দেবেন, আর অন্য কেউ এসে আসবাবপত্র বসাবে। তাতে হয়তো ব্যাপারটা ঠিকঠাক মানানসই নাও হতে পারে। পুরো ধারণাটি হলো, মানুষ কীভাবে সেই স্পেসের মধ্য দিয়ে চলাচল করবে এবং সেখানে বসবাস করবে আর এখানেই স্থপতি অনেকটা একজন স্রষ্টার মতো কাজ করেন।

গেসামটকুন্সটভের্ক ধারণা ও সালোনে কনট্রাক্ট
এই দৃষ্টিভঙ্গি জার্মান ধারণা “গেসামটকুন্সটভের্ক” (Gesamtkunstwerk) বা “সম্পূর্ণ শিল্পকর্ম”-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে ভবনের কাঠামো থেকে শুরু করে তার আসবাবপত্র পর্যন্ত প্রতিটি উপাদান একটি একক স্থাপত্য দৃষ্টিভঙ্গিতে অবদান রাখে।
এই বছর মিলান ডিজাইন উইকের সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফার্নিচার মেলা সালোনে দেল মোবিলে “সালোনে কনট্রাক্ট” নামের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। যা উৎপাদক, স্থপতি, ডিজাইনার ও সরবরাহকারীদের একত্র করে বৃহৎ পরিসরের প্রকল্প এবং সম্পূর্ণ পরিবেশ তৈরির কাজে সহযোগিতা করার সুযোগ দেয়।
ওএমএ-র ম্যানেজিং পার্টনার ও স্থপতি ডেভিড গিয়ানোতেন মনে করেন, এখনকার আলোচনা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো বস্তু বা আসবাব নিয়ে নয়। মিলান ডিজাইন উইকে তিনি বলেন, বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট বস্তু নয়, বরং পুরো অভ্যন্তরীণ পরিবেশের সামগ্রিক সমাধান নিয়ে। আধুনিক স্থাপত্যে এখন সঠিক মানুষদের একত্র করে একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেমের মধ্যে কাজ বাস্তবায়ন করা হয়।
তার মতে, এই পদ্ধতি একটি প্রকল্পের পুরো জীবনচক্র পরিকল্পনা ও নির্মাণ থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্যন্ত জুড়ে সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। এতে ক্লায়েন্ট, ডিজাইনার, নির্মাতা, ঠিকাদার সবাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পাশাপাশি পরবর্তীতে যারা ভবনটি ব্যবহার করবেন এবং যারা এর রক্ষণাবেক্ষণ ও নবায়নের দায়িত্বে থাকবেন, তারাও এই প্রক্রিয়ার অংশ।

রটারডাম সেন্ট্রাল লাইব্রেরি: এক প্রতীকী রূপান্তর
সমন্বিত ডিজাইনের এই ধারণার একটি বাস্তব উদাহরণ হলো রটারডামের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি। শহরের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি এই লাইব্রেরি ২০৩০ সালে পুনরায় খুলবে। তবে তার আগে সেটি ব্যাপক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর পরিচিতমূলক বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- বড় আকারের হলুদ ভেন্টিলেশন টিউব, একে অপরকে ছেদ করা এস্কেলেটর, ধাপে ধাপে সাজানো টেরেস এবং শিল্প-ধাঁচের বহিরাবয়ব যা অক্ষত থাকবে।
পাশাপাশি নতুন কাঁচের ফ্যাসাড ভবনের ভেতরে আরও বেশি দিনের আলো প্রবেশ করাবে এবং অতিরিক্ত প্রবেশপথ ভবনটিকে চারপাশের রাস্তা ও বাজার চত্বরের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করবে। গত বছর বন্ধ হয়ে যাওয়া এই লাইব্রেরির সংস্কারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো দর্শনার্থীরা সচেতনভাবে খেয়ালই করবেন না। তা হলো, ভবনটিকে অনুভব করার পুরো পদ্ধতিকেই নতুন করে সাজানো।
পাওয়ারহাউস কোম্পানি নরওয়ের দুটি স্টুডিও আটেলিয়ে অসলো ও লুন্দহাগেমের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। পাওয়ারহাউস কোম্পানির পার্টনার স্থপতি আলবার্ট রিখটার্সের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল ৪৩ বছরের পুরনো এই লাইব্রেরিকে নতুন প্রজন্মের উপযোগী করে তোলা এবং একই সঙ্গে এর মূল ধারণার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা।
ভান দেন ব্রুক এন বাকেমা স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানের করা মূল ডিজাইনে লাইব্রেরিকে শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা হিসেবে নয়, বরং একটি উল্লম্ব পাবলিক স্কয়ার হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল। রিখটার্স বলেন, তারা এমন একটি খোলা জায়গার কথা ভেবেছিলেন যেখানে জ্ঞানের বিনিময় হবে, মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হবে, শহর একত্র হবে অনেকটা শহরের জন্য একটি চত্বরের মতো।

নতুন ডিজাইনে পুরনো ধারণার পুনরুজ্জীবন
সংস্কার প্রকল্পে বিশাল খোলা মেঝেগুলোকে সাধারণ তাক দিয়ে ভরে না ফেলে, স্থপতিরা লাইব্রেরির সংগ্রহকে ভবনের কাঠামোগত কেন্দ্রগুলো যেমন সিঁড়ি, লিফট ও সার্ভিস শ্যাফট ঘিরে পুনর্বিন্যস্ত করবেন। এতে লাইব্রেরিতে আরও বেশি খোলামেলা পরিবেশ তৈরি হবে, যা মূলত ১৯৮০-এর দশকের সেই ধারণারই প্রতিফলন যেখানে দর্শনার্থীরা মুক্তভাবে ঘুরে দেখতে পারবেন।
একই ধারণা প্রতিফলিত হবে ভবনের ভেতরে চলাচলের ক্ষেত্রেও। খোলা এস্কেলেটরগুলোর পাশাপাশি একটি নতুন কাঠের সম্প্রসারণ যুক্ত হবে, যেখানে থাকবে চওড়া কাঠের সিঁড়ি, যা ওপরের তলাগুলোকে সংযুক্ত করবে এবং ভবনে চলাচলের আরেকটি বিকল্প পথ তৈরি করবে। লক্ষ্য হলো, লাইব্রেরিতে যেন কোনো “মৃত প্রান্ত” না থাকে, যাতে এটি অন্বেষণের অনুভূতিকে আরও জোরালো করে তোলে।
এই সংস্কার শুধু ভবনের কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর অভ্যন্তর এবং বিশেষভাবে তৈরি আসবাবপত্রও একই স্থাপত্য দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হিসেবে ডিজাইন করা হচ্ছে। রিখটার্সের কাছে স্থাপত্য ও অভ্যন্তরীণ ডিজাইন কখনোই সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় ছিল না।
তিনি বলেন, স্থাপত্য এমন হওয়া উচিত নয় যে মানুষ ভবনের ভেতরে যা করতে চায় তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তার ভাষায়, তিনি চান লাইব্রেরির বেশিরভাগ অংশই যেন “অদৃশ্য” থেকে যায়। অর্থাৎ, ডিজাইন এতটাই স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে যে সেটি আলাদা করে চোখে পড়বে না।

মিলান ডিজাইন উইকের নতুন সহযোগিতা
মিলান ডিজাইন উইকের সময় সালোনে দেল মোবিলেতে বেশ কিছু ইনস্টলেশন স্থাপত্য, অভ্যন্তরীণ ডিজাইন এবং পণ্য ডিজাইনের মধ্যকার সীমারেখা মুছে দিচ্ছে, যা স্পেস তৈরির ক্ষেত্রে আরও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির দিকে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন নির্দেশ করে।
২০২৬ সালে সালোনে দেল মোবিলে মিলানো কর্তৃক চালু হওয়া সালোনে কনট্রাক্ট প্ল্যাটফর্মটি এপ্রিল মাসের এই আয়োজনে স্টুডিও সাবিন মার্সেলিস এবং নয়ট্রার মতো প্রতিষ্ঠানের ইনস্টলেশন প্রদর্শন করেছে, যা এই খাতে উদ্ভাবনের নতুন সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান স্থাপত্যচর্চা কেবল দেয়াল আর ছাদ তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ওএমএ-র মতো বড় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পাওয়ারহাউস কোম্পানির মতো স্টুডিও সবাই এখন ভবনের কাঠামো, অভ্যন্তর, আসবাব এবং মানুষের চলাচলের অভিজ্ঞতাকে একটি অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে। রটারডাম সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সংস্কার প্রকল্প এবং মিলান ডিজাইন উইকের নতুন উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, স্থপতিরা এখন শুধু ভবন নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা ডিজাইন করছেন। যেখানে ক্লায়েন্ট, ডিজাইনার, নির্মাতা এবং শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারী সবাই এই প্রক্রিয়ার অংশীদার।
তথ্যসূত্র:
সিএনএন

















