পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মূলত শহর বা নগরের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার ও অপসারণ, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, মশা নিধন ইত্যাদি কাজের তদারক করা। কিন্তু বেশির ভাগ পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনকে ঠিকভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না। যার কারণে রাজধানী ও অন্যান্য নগরে নানা ধরনের ময়লা-বর্জে্যর ভাগাড় এবং মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রায় দুই কোটি মানুষের নগর ঢাকায় প্রতিদিন উৎপাদিত হয় বিভিন্ন ধরনের কয়েক লাখ টন ময়লা ও বর্জ্য। অথচ এই ময়লা-বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পৌর কর্তৃপক্ষের অধীনে নেই পর্যাপ্ত জনবল, যন্ত্রপাতি ও গারবেজ ইয়ার্ডস (এধৎনধমব উরংঢ়ড়ংধষ ণধৎফং). আবার এত বিশাল জনসংখ্যার ঢাকা মহানগরীতে দু-একটা গারবেজ থাকলেও সেগুলোর অবস্থাও ওভার ফিল্ড ও পরিবেশবান্ধব নয়। একই অবস্থা মশা নিধনের ক্ষেত্রেও! যত্রতত্র বর্জ্য ময়লা, পয়োপানি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে সমগ্র নগরে বিভিন্ন রকমের মশার জন্ম ও ব্যাপকতা খুবই বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এই মশা নিধনের জন্য প্রতিবছর প্রতিটা পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করে। কিন্তু বাস্তবে এর ফলাফল বা উপকারিতা প্রায় শূন্যই বলা যায়!
মশা সেই যুগেও ছিল এবং সমগ্র বিশ্বেই ছিল। আর সমগ্র বিশ্বের সব শহর-নগর এলাকায় বরাবরই পৌরসেবাও ছিল। তবে এই কথা সতি্য যে গরম ও উঞ্চতার বিবেচনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকায় মশার প্রজনন ও বিচরণ খুব বেশি। বিভিন্ন দেশের সরকার যুগে যুগে তাদের স্ব-স্ব উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করে নিজ দেশে বসবাসযোগ্য পরিবেশ বজায় রেখেছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমাদের সরকার ও পৌর কর্তৃপক্ষ বরাবরই এতে ব্যর্থ! প্রসঙ্গক্রমে, মোগল আমলের শেষ দিকে যেখানে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখ, সেখানে মশার অত্যাচার ও মহামারিতে ১৮০০ শতকের শেষে ঢাকার জনসংখ্যা কমে গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৬৮ হাজারে। অথচ নগরবাসী বরাবরই এ জন্য স্থানীয় পৌর দপ্তরকে নানা কর ও ট্যাক্স প্রদান করে আসছে। অপর দিকে দেশের প্রতিটি পৌর কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই তাতে মশা নিধন ইউনিটের সংস্থান রয়েছে, কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রে তা নামমাত্রই! তা ছাড়া আরও রয়েছে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন নামের আরও অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও সংগঠন। দেশের সব জায়গায় মশা নিধনের কার্যক্রমই চলছে অপরিকল্পিতভাবে। ফলে আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি!
আগেকার দিনে গৃহস্থালির বর্জ্যই ছিল প্রধান বর্জ্য, যা মানুষজন ঘরবাড়ির আশপাশে নিচু জমি বা গর্তে ফেলত এবং অনেকে তা মাটিচাপাও দিত। আবার এসব জমি/গর্তে ময়লার স্তূপ হয়ে গেলে তাতে অনেকে আগুনও লাগিয়ে দিত। এই প্রক্রিয়ায় ভরাটকৃত জমিতে একপর্যায়ে সেখানে ঘরবাড়িও নির্মিত হতো। এভাবে দেশে বাড়ি, গ্রাম ও শহরের পরিধি বড় হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মানবসভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও উন্নত হতে থাকে এবং স্থানে স্থানে বিভিন্ন পদ্ধতিতে এসব ময়লা-বর্জ্যকে বাছাই ও রিসাইক্লিং করে তা দ্বারা বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র প্রস্তুত ও তা মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় উন্নত দেশসমূহে রিসাইক্লিং পদ্ধতি অধিকতর আধুনিকও হয়ে গেছে এবং তা এখন শিল্প হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। ফলে এসব দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশের উন্নতিসহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও হয়েছে।
মোগল আমলে ঢাকায় নগরায়ণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সে সময় মহল্লার প্রবীণ ও প্রভাবশালী সরদারদের নেতৃত্বে ‘পঞ্চায়েত কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পৌর কাজ সম্পাদন করা হতো। ওই ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশ শাসনামলে নবাব পরিবারের ব্যবস্থাপনায় এবং ১৮২৩-৪০ সাল পর্যন্ত ‘নগর উন্নয়ন কমিটি’, ‘ঢাকা কমিটি’ ইত্যাদি গঠন করে এবং সুইপার নিয়োজিত করে শহরের ময়লা (গৃহস্থালি বর্জ্যসহ), আবর্জনা ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হতো। আর এই প্রক্রিয়ায় বর্জ্যরে মাধ্যমে ঢাকার উত্তর ও পূর্ব দিকে পর্যায়ক্রমে ভরাটকৃত অনেক নিচু জায়গা এবং জলাভূমিও বসবাসযোগ্য হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬৪ সালের আগস্ট মাসে ‘ঢাকা পৌরসভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটই পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন, তারপর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাই পৌরসভার সভাপতি বা প্রশাসক মনোনীত হতে থাকেন। ঢাকা পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. স্কিনার। সে সময় পৌরসভার প্রধান দায়িত্বই ছিল শহরের সব ময়লা-আবর্জনা অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার, মশা নিধন করা ইত্যাদি, যা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। এর মধে্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কর আদায় ও উন্নয়ন কর্মকাÐে অদক্ষতার জন্য কয়েক বছরের জন্য ঢাকা পৌরসভাকে বাতিল করা হয়। একইভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও বঙ্গবন্ধু ঢাকা পৌরসভার কার্যক্রমে অসন্তুষ্ট হয়ে এই সংস্থাটিকে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন বলে প্রকাশ!!
১৯৭৭ সালে ঢাকা পৌরসভাকে ঢাকা মিউনিসিপাল করপোরেশনে উন্নীত করা হয় এবং ব্যারিষ্টার আবুল হাসনাত ছিলেন ঢাকার প্রথম মেয়র। আবার সে সময় আলাদাভাবে গুলশান ও মিরপুর পৌরসভাও গড়ে তোলা হয়। কিন্তু আশির দশক পর্যন্ত সময়কালেও এই তিনটি পৌরসভা বা মিউনিসিপালটি ঢাকা নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নে তেমন কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি এবং সব পৌর কর্তৃপক্ষ তখন একধরনের দেওলিয়াত্বে পরিণত হয়েছিল! ওই অবস্থায় জেনারেল এরশাদের শাসনামলে ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনের আওতায় ঢাকা মিউনিসিপালটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়, তারপর আবার ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে ঢাকা মিউনিসিপালটিকে ডিআইটি ও ওয়াসার সঙ্গে একীভূত করার কথাবার্তাও হয়েছিল। তখন আবার অজ্ঞাত রহসে্য (!) এক সামরিক ডিক্রির মাধ্যমে ঢাকায় ডিআইটি ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনেক ভূসম্পত্তি, পার্ক, মার্কেট ইত্যাদি মিউনিসিপালটিকে হস্তান্তর করে ঢাকা মিউনিসিপালকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চলে। তখন আবার মিরপুর ও গুলশান পৌরসভাকে ঢাকা মিউনিসিপাল অথরিটির সঙ্গে একীভূত করা হয়। অতঃপর ১৯৯০ সালে (জেনারেল এরশাদের পতনের পূর্বে) পৌর আইনে ব্যাপক সংশোধনী এনে সংস্থাটিকে ঢাকা সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করা হয়।
ওই অবস্থায় ১৯৯৩ সালে পৌর/স্থানীয় সরকার আইনে আবারও সংশোধনী এনে সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনসহ সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম ও কার্যপরিধি অনেক বৃদ্ধি করা হয়। ওই সংশোধিত আইনের আওতায় মোহাম্মদ হানিফ ঢাকার প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। তখন ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় রাজধানীতে চলমান সব সংস্থার পরিকল্পনা ও উন্নয়নকাজের সমন্বয় সাধনেরও চেষ্টা চলে, কিন্তু এই পদক্ষেপটি কার্যকর হয়নি! এর মধ্যে ঢাকায় জনসংখ্যাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ঢাকা একটি মেগাসিটিতে পরিণত হয়ে যায়। তখন এও চেষ্টা করা হয়, মেয়রকে ‘নগর পিতা’ বানানোর জন্য এবং তাঁর অধীনে ঢাকার পরিকল্পনা ও উন্নয়নে নিয়োজিত সব সংস্থাকে একীভূত করে মহানগরী ঢাকার সমন্বিত উন্নয়ন সাধন করার জন্য, কিন্তু তা সম্ভবপর হয়নি! ওই পরিপ্রেক্ষিতে পৌর আইনে আবার ব্যাপক সংশোধনী এনে ২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে উত্তর ও দক্ষিণ ঢাকা সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়।
বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় রয়েছে ৫৪টি ওয়ার্ড আর দক্ষিণ সিটির আওতায় রয়েছে ৭৫টি ওয়ার্ড এবং প্রতিটা ওয়ার্ডে রয়েছে একেকজন নির্বাচিত কাউন্সিলর। তা ছাড়া রয়েছে ৩০ জন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর। এদিকে ১৯৯৩ ও ২০১১ সালে ঢাকার পৌর আইন সংশোধনীর মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের কার্যপরিধি ও কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট অপরাপর সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যে ড়াবৎষধঢ়ঢ়রহম বা সাংঘর্ষিক অবস্থারও সৃষ্টি করা হয়েছে। যখন সিটি করপোরেশনকে ঢাকার নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নগরীতে সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন এমনকি ফ্লাইওভার নির্মাণও; ঢাকায় বাস চালানো (বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের আওতায়); স্ট্রিট ও ট্রাফিক লাইট স্থাপন ও পরিচালনা; সারফেস ড্রেন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ; মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা; নগরীর সব ধরনের ময়লা-বর্জ্য অপসারণ; বস্তি উন্নয়ন; সড়ক ও অন্যান্য সব খোলা জায়গা ঝাড়ু দেওয়া; হাটবাজার এলাকার নিয়ন্ত্রণ; মশা নিধন; রাস্তায় পানি ছিটানো; কমিউনিটি হাসপাতাল (স্বাস্থ্যকেন্দ্র), কমিউনিটি সেন্টার ইত্যাদি নির্মাণ ও পরিচালনা; জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যুর নিবন্ধন; নগরীতে পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন; সড়ক খননের অনুমতি প্রদান ও সংস্কার; নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন/স্থাপনা অপসারণ; ঢাকায় টিকাদান ও ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম পরিচালনা; রিকশাসহ সব ধরনের নন- মোটরাইজড ভ্যান/গাড়ির নিয়ন্ত্রণ; বৃক্ষরোপণ; ট্রেড লাইসেন্স প্রদান; পাবলিক টয়লেট, কাঁচাবাজার ও মার্কেট নির্মাণ, কবরস্থান ও শ্মশানঘাটের উন্নয়ন ও পরিচালনা, নগরীর পার্ক-মাঠ ও খাল-নালা ইত্যাদির পরিচর্যার দায়িত্বও প্রদান করা হয়েছে। আর সর্বশেষ এতে যোগ হয়েছে ঢাকার সব খাল-নালা-নর্দমা ও জলাশয়ের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং নগরীর বিভিন্ন রুটে বাস চালানো। এর প্রতিটি কাজের জন্য উভয় সিটি করপোরেশনে আলাদা আলাদা ইউনিট বা বিভাগ রয়েছে।
অথচ সিটি করপোরেশনের কোনো একটি ইউনিটও পরিপূর্ণ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়! সবকিছুই কেমন যেন ভাসা ভাসাভাবে বা কোনো রকমে চলছে! কারণ বর্তমানে নগরীর অনেক সড়কের অবস্থা ভালো নয় এবং ফুটপাত তো হাঁটারই অযোগ্য! আবার অনেক জায়গায় পুরো ফুটপাতই বেদখলে! সারফেস ড্রেনগুলো ভাঙাচোরা – অর্থাৎ কোনো ড্রেন দিয়েই ঠিকমতো সারফেস ওয়াটার প্রবাহিত হয় না, তার মধ্যে অনেক জায়গায় ম্যানহোলের কাভার নেই! বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে, কয়েক বছরে ২০০ কোটির বেশি টাকা নগরীর ট্রাফিক লাইটের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হলেও এখনো অনেক জায়গায় ট্রাফিক লাইট কার্যকর নেই! বলা যায়, রাজধানী ঢাকায় অনেক জায়গায় এখনো ট্রাফিক পুলিশের ‘হাতের ইশারায়’ গাড়ি চলছে! অপর দিকে উভয় সিটি করপোরেশন অনেক হাঁকডাক দিয়ে ঢাকায় বাস চালানো শুরু করলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তা মুখথুবড়ে পড়ে! আবার নগরজুড়ে নিবন্ধিত রিকশার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অবৈধ/অনিবন্ধিত রিকশা চলছে। করপোরেশন কর্তৃক কোনো সংস্থাকে একটি সড়ক খননের অনুমতি দেওয়া হলে, সেই কাজ মাসের পর মাস ধরে চলে। অন্যদিকে সড়কের উন্নয়নের নামে সিটি করপোরেশন নিজেরাই নগরীর বৃক্ষ নিধন করে চলেছে।
সিটি করপোরেশন স্বপ্রণোদিত হয়ে কেন ওয়াসার কাছ থেকে খাল-নালা ও জলাশয়গুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিল, তাও অস্পষ্ট! কারণ সিটি করপোরেশনস কর্তৃক নগরীতে বিদ্যমান ২৬টি খালের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে গত ৩-৪ বছরে একটি খালের কিয়দংশও সংস্কার বা পরিষ্কার করতে পারেনি। বর্তমানে ঢাকায় কত রিকশা ও অন্যান্য নন-মোটরাইজড ভেহিক্যাল আছে, তার কোনো তথ্যও সিটি করপোরেশনসের কাছে নেই। এভাবে নগরীর প্রতিটা বস্তি ও নিম্ন আয়ের এলাকার মানুষজনের জীবন বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও চাঁদাবাজিতে খুবই দুরবস্থার মধ্য দিয়েই চলছে এবং নগরীর ময়লা-বর্জ্য পরিষ্কার ও অপসারণ এবং মশা নিধন কাজ তো চরমভাবে ব্যর্থ বলা যায়! এ অবস্থায় সব মিলে বর্তমানে বিশ্ব বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান একেবারে তলানিতে!
প্রকৃতপক্ষে এই বহুবিধ দায়িত্ব ও কার্যক্রমের পালন এবং ভারে এখন উত্তর ঢাকা এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন উভয়ের অবস্থা খুবই কাহিল! তা ছাড়া নগরীতে আগেকার একটি পৌর কর্তৃপক্ষের চেয়ে দুটি সিটি কর্তৃপক্ষ তৈরি করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হয়েছে তা নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দৃশ্যত দুটি সিটি করপোরেশনই এখন নগরীতে সেবামূলক কাজের চেয়ে উন্নয়নমূলক কাজেই বেশি মনোযোগী! আর এতসব কার্যক্রমের মধ্যে কোনো একটি কাজই যথাযথভাবে বাস্তবায়ন ও পরিচালিত হচ্ছে না! তন্মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো শহরের ময়লা-বর্জ্য পরিষ্কার ও অপসারণ এবং মশা নিয়ন্ত্রণ। বাস্তবে দুই কোটির বেশি জনঅধ্যুষিত ঢাকায় প্রকৃত কত পরিমাণে মিউনিসিপাল বর্জ্য উৎপন্ন হয় তার সঠিক হিসাব ঢাকার কোনো পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে নেই! তবে একটি একাডেমিক গবেষণার হিসাবমতে, প্রতিদিন ঢাকায় ৫ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়!
বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, হাটবাজার, বাণিজি্যক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প ইত্যাদি থেকে প্রাপ্ত ময়লা-আবর্জনা সিটি করপোরেশন কর্তৃক নিয়োজিত লোকবল বা ঠিকাদার দ্বারা প্রাথমিকভাবে বাছাই ও আলাদাভাবে সংগ্রহ করে এখন তা নিকটবর্তী সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (ঝঞঝ)-এ পরিবহন করে নিয়ে সেখানে আবারও কিছুটা বাছাই করে সেখান থেকে তা করপোরেশনের বাহনযোগে ডিসপোজাল ইয়ার্ড বা ল্যান্ড ফিলিং স্টেশনে মজুত করা হয়। এসব বর্জ্যরে মধ্যে হাসপাতালের বর্জ্য আবার খুবই বিষাক্ত ও মারাত্মক! বাস্তবে এসব বর্জ্যকে ওহপরহধৎধঃরড়হ করে ফেলা উচিত। কিন্তু আমাদের সিটি করপোরেশনের বর্জ্য বিভাগ তা করে না! তারা সংগৃহীত বর্জ্য উৎস পয়েন্টস বা ঝঞঝ থেকে প্রায় ঁহংড়ৎঃবফ অবস্থায় বহন করে নিয়ে তা বিভিন্ন সরাসরি ফঁসঢ়রহম ুধৎফং বা ষধহফ ভরষষরহম ঢ়ৎড়লবপঃ ংরঃব-এ এলোপাতাড়িভাবে ফেলে দেয়। আর সেখানে সমাজের ‘টোকাই’ শ্রেণির ছেলেমেয়েরা বা অসহায়-দুস্থ মানুষজন যথাসম্ভব তা থেকে স্বপ্রণোদিতভাবে কিছু বাছাই ও বিক্রি করে। অবশিষ্ট সব ময়লা-আবর্জনা ডাম্পিং ইয়ার্ডে পচে-গলে ও দুর্গন্ধ হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এলাকার পরিবেশদূষণসহ বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ের সৃষ্টি করে।
ঢাকায় এই বিশাল বর্জ্য ফেলা হয় মূলত দুটি ইয়ার্ডসে- একটি নগরীর দক্ষিণে মাতুয়াইলে আর অপরটি উত্তরে আমিনবাজারে এবং আরেকটি সাইট হলো নগরীর পশ্চিম দিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে, যেখানে ফেলা সব বর্জ্যই তুরাগ নদীতে পড়ে নদীকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে চলেছে। আর অপর দুটি (মাতুয়াইল ও আমিনবাজার) ইয়ার্ডসের ক্যাপাসিটিও অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তন্মধ্যে মাতুয়াইল সাইটে ডাম্পিং শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে, যেখানে প্রথম দিকে ৬০-৭০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় বর্জ্য স্তূপ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই সাইটটিকে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল হিসেবেও করার চেষ্টা চলে। কিন্তু তা তেমনভাবে কার্যকর হয়নি! আর আমিনবাজার সাইটে বর্জ্য স্তূপ করা শুরু হয় দুই যুগ আগে থেকে। কিন্তু বহু আগেই এই সাইটটি ল্যান্ডফিলের অযোগ্য হয়ে যায়। বাস্তবে সিটি করপোরেশনস নগরীতে অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষভাবে আগ্রহী হলেও ময়লা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় (ঝডগ) তেমন আগ্রহী নয়! ফলে এই সমস্যাটির এত ব্যাপকতা!!! এ ব্যাপারে ২০০৫ সালে জাপান সরকারের সহায়তায় একটি বিশদ সমীক্ষাও হয়েছিল, কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো সুপারিশের বাস্তবায়ন হয়নি!!
একই অবস্থা ঢাকায় মশা নিধনের ক্ষেত্রে! দুই সিটি করপোরেশনের পৃথক মশা নিধন-নিয়ন্ত্রণ ইউনিট থাকলেও সব মশা নিধনকাজ চলছে অপরিকল্পিভাবে। মশা নিধন বিশেষ করে ডেঙ্গুর ব্যাপারে সিটি করপোরেশন অনেকটাই উদাসীন! সবাই হাস্যরসের সঙ্গে বলে থাকেন- ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটানো হলে উত্তরের মশা দক্ষিণে যায় আবার দক্ষিণ থেকে উত্তরে আসে! বাস্তবে উভয় সিটি করপোরেশনই স্থানীয় অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে বিদেশ থেকে ভুল মশার ওষুধ আমদানি করে এবং তা ইচ্ছেমতো প্রয়োগ করে থাকে। এভাবে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করে থাকলেও মশা নিন্ত্রয়ণ হচ্ছে না। আর এবার এ ধরনের ভুল ওষুধ প্রয়োগের কারণে ডেঙ্গু মশার লার্ভিসাইড মারা না গিয়ে ডেঙ্গুরোগ এখন দেশব্যাপী মহামারিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৫৫০ জনের মতো মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন। এই অবস্থায় অবশেষে শেষ ভরসা হিসেবে উত্তর ঢাকার মেয়র তাঁর এলাকায় আমেরিকায় তৈরি জৈবনাশক ‘বিটিআই’ স্প্রে শুরু করেছেন।
ঢাকা সিটি করপোরেশনসের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলররা নির্বাচিত হন নগরবাসীর ভোটে, অথচ এর যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয় সরকার প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দ্বারা! পাশাপাশি আরও বড় দলাদলির সমস্যা রয়েছে নিজস্ব কর্মকর্তা ও বহিরাগত কর্মকর্তার মন-মানসিকতায়! কাজেই সিটি করপোরেশনকে সঠিকভাবে চলতে হলে উল্লেখিত সমস্যাবলির নিরসনসহ স্থানীয় পর্যায়ে কাউন্সিলরদের নগর প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃত্তকরণ ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। সে সঙ্গে যেসব কাজ বা দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের নয়, তা থেকে সরে এসে নিয়মিত নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নকরণ ও মশা নিধনে মনোযোগী হওয়া উচিত বলে মনে করি।
প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম
প্রকাশকাল: বন্ধন ১৫৭ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২৩