কার্বন নি:সরণ যতই বাড়ছে ততই বাড়ছে নাগরিক জীবনের জটিলতা। দূষিত পরিবেশের অন্ধকার জগতে আগামী প্রজন্মের বেড়ে উঠা, টিকে থাকা এখন শুধু শঙ্কা মাত্র। এরই মাঝে উদ্ভাবনের নেশায় যারা ব্যুদ হয়ে আছেন আমাদের প্রাণ ভোমরা যেন তাদের হাতেই।
জলবায়ুর প্রভাবে বদলে গেছে আমাদের পরিবেশ, প্রকৃতি আর জীবকূলে চরিত্র। তবে কিছু উদ্ভাবন তো থাকেই যা পাল্টে দিতে বাস্তবতার চিত্র। বন্ধনের এ পর্বে থাকছে তেমনই এক আশা জাগানিয়া উদ্ভাবনী গল্পের কথা।
ইস্পাত! এটি এমনই এক ধাতু যা না হলে আজ আর কোন স্থাপনা নির্মাণ কল্পনাই করা যায় না। নির্মাণের অনেক উপকরণ আছে যা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে পরিবেশকে ধ্বংস করেছে। সেই তাগিত থেকে পরিবেশ বাঁচাতে উদ্ভাবনের যুদ্ধটাও তুমুল। সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ কার্বন নি:সরণ শূন্যে আনা।

কংক্রিটের প্রায় সমপরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂) নি:সরণের জন্য ইস্পাতকে দায়ী করা হলো আর হবে না। এক যাদুকরী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিবেশ দূষণ মোকাবিলায় ইস্পাতও অংশগ্রহণ করতে পারে বলেই উদ্ভাবকদের দাবি। ব্লাস্ট ফার্নেস থেকে বিদ্যুতায়িত এবং বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে ইস্পাতশিল্প।
কংক্রিটের মতোই ইস্পাতেরও একটি কার্বন নি:সরণের সমস্যা রয়েছে। বিশ্বে যত কার্বন নি:সরণ হয় তার ৮ শতাংশই সিমেন্ট উৎপাদন থেকে। ইস্পাত উৎপাদনও প্রায় একই পরিমাণ কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী। এ সময়ে সবচেয়ে সুখের খবর হলো, কংক্রিটের মতোই ইস্পাতও কার্বনমুক্ত হওয়ার পথে রয়েছে।
ইস্পাত তৈরির নতুন প্রজন্মের প্রক্রিয়াগুলো ইস্পাতের কার্বন ফুটপ্রিন্ট (কার্বন নি:সরণ) পরিমাপযোগ্যভাবে হ্রাস করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এখানে ইস্পাতের উপাদানে বিদ্যমান কার্বন নয় উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে নি:সৃত কার্বন ও কার্বনজাত উপাদানের কথাই বলা হয়েছে।

সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্ট এমন একটি আশ্চর্যজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ইলেক্ট্রা, বস্টন মেটাল এবং হারথা মেটালসের বড় বড় কোম্পানীগুলো লোহা ও ইস্পাত উৎপাদনে ভিন্ন প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিয়েছে। তারা কাঁচা আকরিক থেকে লোহা আলাদা করার নতুন পদ্ধতি তৈরি করছে। এতে লোহা ও ইস্পাত উৎপাদনের প্রচলিত প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত শক্তির চেয়ে কম শক্তি ব্যবহার করা হবে।
প্রথম দুটি সংস্থা আকরিক থেকে লোহা মুক্ত করতে ‘ইলেক্ট্রোউইনিং’ নামক একটি তড়িৎ-বিশ্লেষণ পদ্ধতির বিভিন্ন সংস্করণ ব্যবহার করে। এর বিপরীতে, হারথা মেটালস লোহা আলাদা করার জন্য একটি রাসায়নিক-বিজারণ পদ্ধতি তৈরি করেছে। বিজারণ প্রক্রিয়ায় একটি একক-ধাপের ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (EAF) ব্যবহার করে এটিকে গলিত ইস্পাতে রূপান্তরিত করে।

শুনতে মনে হবে এই উন্নয়নগুলো তাদের কোম্পানীর প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়াগত এক উন্নতির খবর। কথাটি নিরেট সত্য তবে এর তাৎপর্য পরিবেশ উন্নয়নেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো এমন এক ভবিষ্যৎ শিল্পের দিকেও ইঙ্গিত করে যা হবে আরও মডুলার, নমনীয় এবং বিদ্যুতায়িত।
এর পেছনেও আছে একটি বড় কারণ। প্রচলিত ব্লাস্ট-ফার্নেস-নির্ভর ইস্পাত উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগ এবং অবিরাম পরিচালনার প্রয়োজন হয়। যে প্রক্রিয়াটি বাস্তবে জটিল ও ব্যয়বহুল।
এছাড়াও কিছু নতুন প্রযুক্তি আরও দ্রুত ও স্বল্প পরিসরে নবায়নযোগ্য শক্তিকে ইস্পাত উৎপাদনে নানা প্রক্রিয়ায় কাজে লাগচ্ছে। এভাবে, এ ধরনের উন্নয়ন ইস্পাত উৎপাদনকে সমসাময়িক শক্তির সাথে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করছে।
এই রূপান্তর ইতোমধ্যেই শিল্প পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সুইডেনের HYBRIT ইতোমধ্যেই নবায়নযোগ্য হাইড্রোজেন উৎপাদনের মাধ্যমে কয়লাভিত্তিক উৎপাদনকে প্রতিস্থাপন করার কাজ করছে। HYBRIT-এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের “প্রথম জীবাশ্ম-মুক্ত ইস্পাত” তৈরি করা, যা সুইডেনের ইস্পাত শিল্পের এক-তৃতীয়াংশ কার্বন নি:সরণ এবং মোট নির্গমনের দশ শতাংশ হ্রাস করা।
HYBRIT প্রযুক্তি কার্বনের পরিবর্তে জলীয় বাষ্প নির্গত করে এবং এটি ইতোমধ্যেই ভবন নির্মাণে পরীক্ষামূলক প্রকল্পে সফলভাবে প্রয়োগও করা হয়েছে।
একইভাবে, সুইডেনের বোডেনের ইস্পাত উৎপাদনকারী কোম্পানী Stegra গিগাস্কেল প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ইস্পাত উৎপাদন করছে। নতুন এই প্ল্যান্টটি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, সবুজ হাইড্রোজেন এবং ডিজিটাইজড কার্যক্রমের সমন্বয়ে বছরে ১০ লক্ষ মেট্রিকটন ইস্পাত উৎপাদন করতে পারে। কোম্পানীটির দাবি বছরে তারা অন্তত ৭০ লক্ষ মেট্রিকটনেরও বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমাতে পারছে।

ভবন নির্মাণ শিল্পে, নকশা এবং নির্মাণ ব্যবস্থার পরিবর্তনে এই চিরাচরিত ধাতু উৎপাদনের উদ্ভাবিত নতুন প্রক্রিয়া বিদ্যাগত অগ্রগতিকে আরও বাড়িয়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয়। ইস্পাত এবং নির্মাণ শিল্পের এই পরিবর্তনগুলো স্থপতিদের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ দুই-ই উপস্থাপন করে।
একদিকে, নতুন পদ্ধতি এবং সার্টিফিকেশনের ব্যাপারতো আছেই। থাকছে উপকরণ নির্বাচন ও নির্দিষ্টকরণের অন্তর্নিহিত জটিলতা। সব “গ্রিন স্টিল” সমানভাবে তৈরি হয় না। আবার উপকরণের কার্বন ফুটপ্রিন্ট শক্তির উৎস, উৎপাদন পদ্ধতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ইকোসিস্টেমের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। অপরদিকে, কম-কার্বন স্টিলের বর্ধিত সহজলভ্যতা কাঠামোগত ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে না।

এছাড়াও, এই পরিবর্তনগুলো শিল্পের সাথে স্থাপত্যের সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে স্থপতি ও নির্মাতাদের। স্থপতিরা সরাসরি নির্মাণের সাথে যুক্ত না থাকলে নির্মাণ পরিকল্পনা তারাই করে থাকেন। কার্বনমুক্ত বিশ্ব নির্মাণে স্থপতিদের ভবিষ্যতের জীবাশ্ম-মুক্ত উপাদান ব্যবস্থা গ্রহণে আরও সক্রিয় ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করবে।
শিল্পে মুহূর্তে মুহূর্তেই পরিবর্তন আসছে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী। পরিবেশ বাঁচাতে ইস্পাত নির্মাণে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার নি:সন্দেহে আমাদের জন্য আশার আলো। নতুন এই প্রযুক্তি কার্বন কমিয়ে ধরণীকে বাসযোগ্য করে তোলুক।



















