Image

ভুটানের গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি

মাইন্ডফুলনেস সিটি হলো এমন শহর ধারণা যেখানে শুধু অবকাঠামো বা অর্থনীতি নয়, মানুষের মানসিক শান্তি ও সচেতন জীবনযাপনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে প্রকৃতি, খোলা জায়গা ও সামাজিক সংযোগকে নগর নকশার অংশ হিসেবে ধরা হয়। সহজভাবে, এটি এমন শহর যেখানে “ভালোভাবে বাঁচা”ই প্রধান লক্ষ্য।

বিশ্বজুড়ে নতুন নগর প্রকল্পগুলো সাধারণত অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত হয়। কিন্তু ভুটান ভিন্নভাবে শহরকে দেখতে চেয়েছে। শহর কি মানুষের সুখ, মানসিক সুস্থতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক দক্ষিণ ভুটানের গেলেফু অঞ্চলে “গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি” (Gelephu Mindfulness City) প্রকল্পের ঘোষণা দেন।

BIG (Bjarke Ingels Group), Arup এবং Cistri-এর পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত এই নগর প্রকল্প ভুটানের গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (GNH) দর্শনকে সমকালীন নগর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ।

এই শহরে মানুষের মানসিক শান্তি ও সচেতন জীবনযাপনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছবি: ডিজাইনবুম
গেলেফুকে কেন বেছে নেওয়া হলো?

গেলেফু ভুটানের দক্ষিণ সীমান্তে ভারতের আসামের সংলগ্ন একটি অঞ্চল। প্রস্তাবিত শহরটির অবস্থান এমন যে এটি ভবিষ্যতে দক্ষিণ-এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। ভুটানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অঞ্চলকে একটি নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।

এই অঞ্চলকে একটি নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ছবি: ডিজাইনবুম
গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস: নগর পরিকল্পনার ভিত্তি

গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর পরিকল্পনাগত দর্শন। মাস্টারপ্ল্যানটি ভুটানের গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (GNH) সূচকের নয়টি ক্ষেত্র থেকে অনুপ্রাণিত। এর মধ্যে রয়েছে মানসিক সুস্থতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনযাত্রার মান, সময়ের সুষম ব্যবহার, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা, সুশাসন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সামাজিক প্রাণশক্তি। নগরটিকে এমনভাবে কল্পনা করা হয়েছে যাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক কল্যাণও গুরুত্ব পায়।

গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর পরিকল্পনাগত দর্শন। ছবি: ডিজাইনবুম
নদীকেন্দ্রিক নগর ও ‘ইনহ্যাবিটেবল ব্রিজ’

মাস্টারপ্ল্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো নদী ও প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নগর বিন্যাস। পরিকল্পনায় একাধিক নদীকে কেন্দ্র করে শহরের বিভিন্ন অংশ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এসব অঞ্চলকে সংযুক্ত করবে “Inhabitable Bridges” বা বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য সেতু, যা শুধু যাতায়াতের মাধ্যম এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের স্থান হিসেবেও কাজ করবে।

পরিবেশ ও কার্বন-নেগেটিভ ভবিষ্যৎ

ভুটান বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র কার্বন-নেগেটিভ দেশ হিসেবে পরিচিত। সেই প্রেক্ষাপটে গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটিকেও একটি পরিবেশ-সচেতন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পের নথিতে নবায়নযোগ্য শক্তি, সবুজ অবকাঠামো, প্রকৃতি সংরক্ষণ, নিম্ন-কার্বন পরিবহন এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে শহরটি এখনো নির্মাণাধীন। তাই এর পরিবেশগত লক্ষ্যগুলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ, কোনো অর্জিত বাস্তবতা নয়।

মাস্টারপ্ল্যানটি ভুটানের গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (GNH) সূচকের নয়টি ক্ষেত্র থেকে অনুপ্রাণিত। ছবি: ডিজাইনবুম
অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি কেবল একটি বিশেষ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবেও পরিকল্পিত। মাস্টারপ্ল্যানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেল সংযোগ, জনপরিসর, শিক্ষা ও গবেষণা অবকাঠামো এবং সবুজ প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের প্রস্তাব রয়েছে। ভুটানের প্রত্যাশা, এই প্রকল্প দেশের অর্থনীতিকে পর্যটন ও জলবিদ্যুতের বাইরে আরও বৈচিত্র্যময় করবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে।

ভুটানের লক্ষ্য, এই প্রকল্প অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় করা ও বিদেশি বিনিয়োগ আনা। ছবি: ডিজাইনবুম
স্থাপত্যে ঐতিহ্য ও সমকালীনতার সংলাপ

প্রকল্পটির নকশায় আধুনিক নগর অবকাঠামোর সঙ্গে ভুটানি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে একত্রিত করার চেষ্টা দেখা যায়। পরিকল্পনায় স্থানীয় নির্মাণভাষা, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক উপকরণ এবং ভুটানের ভূদৃশ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি কেবল একটি নতুন শহর নয়, বরং সমকালীন স্থাপত্যের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয় প্রকাশেরও একটি প্রচেষ্টা।

আধুনিক অবকাঠামো ও ভুটানি সংস্কৃতির সমন্বয় করা হয়েছে। ছবি: ডিজাইনবুম

২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি মূলত পরিকল্পনা ও প্রাথমিক বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৪ সালে রয়্যাল চার্টারের মাধ্যমে বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চলের কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রকল্পের জন্য প্রশাসনিক ও বিনিয়োগ কাঠামো গঠনের কাজ চলছে এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

BIG-এর প্রকল্প তালিকায় এখনো এর অবস্থা “In Design” হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিমানবন্দর ও লজিস্টিক অবকাঠামো-সংক্রান্ত প্রাথমিক কাজের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, তবে শহরের পূর্ণাঙ্গ নির্মাণ এখনো সম্পন্ন হয়নি।

মাস্টারপ্ল্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো নদী ও প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নগর বিন্যাস। ছবি: ডিজাইনবুম

গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে। তবে ইতোমধ্যে এটি বিশ্বব্যাপী নগর পরিকল্পনা ও স্থাপত্য আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একটি শহর সমাজের মূলে রয়েছে এর মানুষ ও তাদের সাথে প্রকৃতির বন্ধুত্ব যাতে নিজের মাঝে অবগাহনের সমূহ সম্ভাবনা রচিত হয়।

তথ্যসূত্র: 

Designboom, BIG (Bjarke Ingels Group), Gelephu Mindfulness City Royal Charter ও সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত প্রকল্প-তথ্য (২০২৩–২০২৬)।

Related Posts

ভবিষ্যতের ৮টি স্টেডিয়াম যা প্রচলিত ধারণা বদলে দেবে

সময়ের সাথে সাথে সবই বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে স্টেডিয়ামের গঠনশৈলীতে। স্টেডিয়ামগুলো এখন আর শুধু ম্যাচের দিনের জন্য ডিজাইন করা হচ্ছে…

নুহাশ পল্লী: হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের সবুজ রাজ্য

নুহাশ পল্লী বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এবং কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর স্বপ্নে গড়ে ওঠা একটি অনন্য সবুজ…

গ্রামীণ অবকাশ যাপনে কটেজের ইন্টেরিয় কেমন হওয়া উচিত?

ঘরের পরিবেশ আমাদের শান্ত রাখে, অশান্ত করে তোলে কখনো সংগঠিত হতেও সাহায্য করে। বলছি আমাদের মনের উপর ঘরের…

ঢাকা: এক অবিরাম অন্তবিস্ফোরণ

অ্যারন বেটস্কি ফিলাডেলফিয়ার একজন সমালোচক ও শিক্ষক। এর আগে তিনি ভার্জিনিয়া টেকের স্কুল অফ আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইনের অধ্যাপক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *