পুরাতন নদী ঘাট জগন্নাথগঞ্জ। ব্রিটিশ আমল থেকেই নদীবন্দর। যমুনা সেতু চালুর আগে এই ঘাট থেকেই বড় বড় ফেরি চলত। উত্তরবঙ্গের সাথে দেশের অন্যান্য এলাকার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যমও ছিল এই ঘাট। এলাকাটি আগের সেই কোলাহলমুখরতা হারালেও এর ব্যবসায়িক গুরুত্ব এখনও কমেনি। নৌ, সড়ক ও রেল তিন পথেই দেশের অন্যান্য এলাকার সাথে রয়েছে এখানকার যোগাযোগ সংযোগ। নদীর পাশেই যমুনা সার কারখানা। সারাদেশ থেকে ট্রাক এসে ভিড় করে সার নিতে। তবে আমার এখানে আসা বন্ধনের নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যারা কেমন তারা’ পর্বের সফল ব্যবসায়ীর খোঁজে।
ঢাকা থেকে জামালপুর পৌঁছে সময় নষ্ট না করে আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মোঃ ওমর ফারুককে সাথে নিয়ে পৌঁছলাম সরিষাবাড়ী থানার জগন্নাথগঞ্জের ব্যস্ত বাজারে। এখানকার মেসার্স মরিয়ম ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোঃ মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক মুকুল। একজন সফল ব্যবসায়ী। তিনি আমাদের স্বাগত জানালেন। তরুণ এই ব্যবসায়ী শোনালেন তার জীবনের ব্যবসায়িক সফলতার গল্প।
ব্যবসায়ী মুকুলের জন্ম ১৯৮০ সালের ১ জুলাই। পিতা মৃত মজিবর রহমান ও মা মৃত মরিয়ম বেগম। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। তারাকান্দির পোগলদিঘা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৫ সালে এসএসসি এবং ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে ১৯৯৭-এ এইচএসসি পাস করেন। এরপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় স্লাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৪ সালে পিতা মারা যাওয়ার পরই হাল ধরেন পারিবারিক ব্যবসার। শুরু হয় তার ব্যবসায়িক জীবন। পিতা ছিলেন এলাকার একজন পরিচিত মুদি দোকানদার। পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও পরিবহন ব্যবসাতেও ছিল তার সমান পদচারণা। বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসাগুলো এখন চালিয়ে যাচ্ছেন মুকুল। শুধু তাই নয়, ক্রমেই বাড়ছে ব্যবসার পরিসর। ইটভাটা, ফিলিং স্টেশন, বাস-ট্রাক ও ঠিকাদারি যুক্ত হয়েছে আগের ব্যবসার সাথে। তবে তিনি শুধু একা নন, সব ধরনের ব্যবসার সাথে জড়িয়ে আছে তার ভাইয়েরাও।
এই অল্পসময়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শুরুতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠা পেতে দারুণ কষ্ট করতে হয়েছে। নতুন ব্যবসায়ী হিসেবে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করাটা সহজ ছিল না। তবে পিতার সুনাম, নিজের ঐকান্তিক চেষ্টা ব্যবসা সম্প্রসারণে দারুণ সাহায্য করেছে। শিক্ষাজীবনে পঠিত বিষয় ব্যবস্থাপনাও ব্যবসা পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ব্যসায় তিনি গুরুত্ব দেন বিক্রীত পণ্যের গুণগত মান, সঠিক মূল্য ও ক্রেতাদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ককে। ফলে দ্রুতই সফলতা আসতে থাকে ব্যবসায়। নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা কঠিন হলেও দারুণ লাভজনক। এই উপলব্ধি থেকেই সিমেন্ট, ঢেউটিনের মতো নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসাতে আসা। সরিষাবাড়ীতে যেভাবে রাস্তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে ততই বাড়ছে ব্যবসার পরিসর। তাই নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। ব্যবসায়িক জনপ্রিয়তা, ক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা, বিক্রয় কৌশল ইত্যাদি কারণে এরই মধ্যে তিনি অর্জন করেছেন বেশ ক’টি কোম্পানির পরিবেশক হওয়ার দুর্লভ কৃতিত্ব। নিজ এলাকায় আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিঃ, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, আরামিট লিঃ, পিএইচপি এ্যারাবিয়ান হর্স সুপার ঢেউটিনের একমাত্র পরিবেশক তিনি। পাশাপাশি তার রয়েছে অন্য পরিচিতিও। তিনি টাঙ্গাইল জেলা মিনিবাস মালিক সমিতি তারাকান্দি প্রান্ত শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এ ছাড়াও স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য ও পুরাতন ঘাট বাজার জামে মসজিদের সভাপতি। এলজিইডির ঠিকাদারি কাজের সাথেও তিনি যুক্ত। বর্তমানে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক কর্মচারী ও শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

তিনি বিয়ে করেন ২০০৫ সালে। স্ত্রী কামরুন্নাহার পাপিয়া ও দুটি সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। বড় ছেলে মুবতাসিম হক নাবিল ও ছোট ছেলে মুনতাসিম হক ফাহিম। ব্যস্ততার কারণে তাদের বেশি সময় দিতে পারেন না। ছেলেদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করানোই তার ইচ্ছা। একসময় খেলাধুলার প্রতি ছিল দারুণ আগ্রহ। স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে বইগুলো কোনো রকমে রেখেই দৌড় দিতেন মাঠে। সবচেয়ে পছন্দের খেলা ফুটবল। আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় খেলেছেন। খেলাধুলা করে, নদীতে নৌকায় ঘুরেই কেটেছে দুরন্ত শৈশব। খেতে ভালোবাসেন সাদা ভাত, ইলিশ মাছ ও টাকি মাছ ভর্তা। গরুর মাংসও বেশ প্রিয়। বছর শেষে পরিবার নিয়ে তিনি ঘুরতে বের হন। সামাজিক কাজেও রয়েছে সমান অংশগ্রহণ। স্থানীয় মসজিদে সহায়তা করেন। বাবার কবরের পাশে নিজস্ব এতিমখানায় (হাফেজী খানা) সাহায্য করেন। নিয়মিত ট্যাক্স দেন। চেষ্টা করেন কথা দিয়ে কথা রাখার। সব ধরনের কাজে পরিবার ও শুভাকাক্সক্ষীদের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা পান সবসময়।
জীবনে একজন সফল ব্যবসায়ী হতে হলে নিজে অবশ্যই সৎ হতে হবে, পাশাপাশি থাকতে হবে সদিচ্ছা- এমনটিই মনে করেন সফল ব্যবসায়ী মুকুল। কাউকে কোনো কথা দিলে তা যেন বরখেলাপ না হয় সেদিকেও গুরুত্ব দেন। নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা করতে প্রচুর মূলধন লাগে, তাছাড়া এটা পুরোটাই বাকিনির্ভর ব্যবসা। তাই ভালোমতো বুঝে এই ব্যবসায় আসা উচিত। ভালো করতে হলে ধৈর্য সহকারে ধীরে ধীরে এগোতে হবে। ব্যবসা গুছিয়ে নিতে অনেক বেগ পেতে হয়। সাহসের সাথে তা কাটিয়ে উঠতে হবে। ক্রেতাদের উদ্দেশে তার আহŸান, টাকা একটু বেশি লাগলেও ভালো পণ্য কিনুন। কেননা একটি অবকাঠামো তৈরি হয় দীর্ঘদিনের জন্য। তাই এটার নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপোস করা ঠিক নয়।
আর দশ জন যেমন নিজের ব্যবসাকে নিয়ে যেতে চায় অন্যরকম উচ্চতায়, নিজেকেও দেখতে চায় সম্মানজনক অবস্থানে, তেমনি মুকুলও চান ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে ও তার ব্যবসার অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে। প্রেরণা হিসেবে কাজ করে তার পিতার রেখে যাওয়া সম্পদ, যা কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দেননি। সেটা আরো কয়েক গুণ বেড়েছে। এগিয়ে যাওয়ার সেই বিশ্বাস থেকেই নির্মাণ শিল্প ব্যবসায় নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে চান।
মাহফুজ ফারুক
প্রকাশকাল: বন্ধন ৩১ তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১২