প্রত্যয় যখন এগিয়ে চলার

চলছে একটি সিমেন্ট কোম্পানির উদ্যোগে সেরা বিক্রেতাদের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। যেখানে জড়ো হয়েছেন দেশসেরা সব নির্মাণপণ্যের সফল ব্যবসায়ী। মঞ্চে এসে সফল ব্যবসায়ীরা যখন গৌরবদীপ্ত চিত্তে পুরস্কার নিচ্ছিলেন, তখন সাধারণ সারিতে বসা দুজন ব্যবসায়ী ভাবছিলেন, ‘আমরা কি কখনো পারব তাঁদের মতো সেরা বিক্রেতা হতে!’ ওখানে বসেই একদিন ওদের কাতারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্প নেন তাঁরা। এমন আত্মপ্রত্যয় ঠিকই তাঁদের পৌঁছে দিয়েছে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। বছর কয়েকের মধ্যেই তাঁরা জিতে নেন সর্বোচ্চ বিক্রেতার স্বীকৃতি। কেদারগঞ্জ, নতুন বাজার, চুয়াডাঙ্গার ‘মেসার্স বাণী ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী এ ভ্রাতৃদ্বয় হচ্ছেন সফল ব্যবসায়ী হাজি মো. আব্দুল হামিদ (খোকা) ও আব্দুল হালিম (শান্তি)। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব ব্যবসায়ী ভাইদের সাফল্য-কাহিনি। সহসঙ্গী আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. নাজমুল হোসেন।

সফল এ ব্যবসায়ীদের বাবা মরহুম নূর আলম মিয়া ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সদরের একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। পাট, ধান ও অন্যান্য পণ্যের আড়তের ব্যবসা ছিল তাঁর। লোকে ডাকত ‘মিয়া’ বলে! বড় ও সম্মানিত ব্যবসায়ীদেরই বলা হতো ‘মিয়া’। তিনি তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল ও পরিশ্রমের মাধ্যমে যে বিশাল ব্যবসায়িক পরিসর গড়ে তোলেন, তা নিজ শহরেই সীমাবদ্ধ না রেখে বিস্তৃত করেন দেশের নানা প্রান্তে। দেশের বড় বড় কল-কারখানায় সরবরাহ করতেন পাট ও অন্যান্য পণ্য। একবার নৌপথে অনেক বড় একটি পাটের চালান পাঠান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় পণ্যবাহী সেই যানটি নদীতে ডুবে যায়। এতে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কবলে পড়ে হন একেবারে সর্বস্বান্ত। ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয় নেমে আসে পরিবারটিতে। তখন বয়সে দুই ভাই কিশোর। ব্যাপক আর্থিক দৈন্যদশায় চেষ্টা করেন সংসারের হাল ধরার। নিজেদের মতো করেই শুরু করেন ব্যবসা। এ ভ্রাতৃদ্বয় এখন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের চুয়াডাঙ্গা টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। তাঁদের ব্যবসাসম্ভারে রয়েছে সিমেন্ট, রড, ইট, বালু, খোয়াসহ নানা নির্মাণসামগ্রী।

প্রায় ৩০ বছর আগে বাবার মতো আড়তের ব্যবসা শুরু বড় ভাই আব্দুল হামিদের। তবে তা খুবই সীমিত পরিসরে। পরে এতে যুক্ত হন আব্দুল হালিম। বছর ১০ আগে শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। শুরু থেকেই বিক্রি করছেন আকিজ সিমেন্ট। অত্যন্ত স্বল্পপরিসরে; মাত্র ৫০ ব্যাগ সিমেন্ট দিয়েই শুরু বিক্রয়যাত্রা। গুণগতমানে সমাদৃত এ পণ্যটি তাঁদের এনে দিয়েছে এমন অনন্য ব্যবসায়িক সাফল্য, যার বিক্রয়মাত্রা ছাড়িয়ে যায় ৪০ হাজার ব্যাগ। নজরকাড়া বিক্রির ফলে ক্রমেই তাঁরা হয়ে ওঠেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির চুয়াডাঙ্গা টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। প্রায় প্রতিবছরই পেয়েছেন সেরা বিক্রেতার পুরস্কার। এমন অভূতপূর্ব ব্যবসায়িক সাফল্যে কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ল্যাপটপ, এলইডি টিভি, স্মার্ট ফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ নানা দেশ ভ্রমণের অফার। 

অনন্য ব্যবসায়িক সাফল্যের নেপথ্যে ছিল একটাই প্রত্যয়, পারিবারিক ব্যবসার সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা। সে পর্যায়ে যেতে না পরলেও চেষ্টা করছেন। পণ্য বিক্রিতে তাঁরা অত্যন্ত সচেতন। নিজে যা ব্যবহার করতে না পারেন, তা বিক্রিও করেন না। গুণগতমানের পণ্য বিক্রির পাশাপাশি সততা, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম তাঁদের ব্যবসা প্রসারে সহায়তা করেছে। তা ছাড়া বাবার সুনাম ও সম্মান ব্যবসা প্রসারে রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা। বাবার অনুপস্থিতিতে মা আফরোজা বেগম তাঁদের জুগিয়েছেন সাহস। 

হাজি মো. আব্দুল হামিদ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৯ সালে চুয়াডাঙ্গা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বিয়ে করেন ১৯৯৭ সালে। সহধর্মিণী মিন্নাতারা। এ দম্পতির তিন মেয়ে। বড় মেয়ে বদরুন্নাহার বাণী, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের ইংরেজি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। মেজ মেয়ে ইশরাত নাহার ইশা ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে মারিয়ম মিম-এর বয়স ৪ বছর।   

আব্দুল হালিমের (শান্তি) জন্ম ১৯৮০ সালের ১ অক্টোবর কেদারগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গায়। তিনি ১৯৯৬ সালে শিশুকুঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঝিনাইদহ থেকে মাধ্যমিক এবং ২০০১ সালে কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বিয়ে করেন ২০১৩ সালে। সহধর্মিণী কবিতা খাতুন। এ দম্পতির এক ছেলে।  মো. আমীর হামজা, প্রদীপন বিদ্যালয়ে কেজি ওয়ানে পড়ছে। 

একনজরে

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম: মেসার্স বাণী ট্রেডাস

অবস্থান: কাউন্সিল মোড়, কার্পাসডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা

ব্যবসা শুরু: ২০১১ সালে

নির্মাণপণ্য: সিমেন্ট, রড, ইট, বালু, খোয়াসহ নানা নির্মাণসামগ্রী

সাফল্যসূত্র

পণ্য বিক্রিতে অত্যন্ত সচেতন তাঁরা। নিজে যা ব্যবহার করতে না পারেন, তা বিক্রিও করেন না। গুণগতমানের পণ্য বিক্রির পাশাপাশি সততা, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম তাঁদের সহায়তা করেছে ব্যবসায়িক পরিসর বাড়াতে। তা ছাড়া বাবার সুনাম ও সম্মান ব্যবসা প্রসারে রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৭তম সংখ্যা, মার্চ ২০২১

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top