• Home
  • স্থাপত্য
  • প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানে টানাটাপ ক্যানোপি গার্ডেন ক্যাফে
Image

প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানে টানাটাপ ক্যানোপি গার্ডেন ক্যাফে

সমসাময়িক উষ্ণমণ্ডলীয় স্থাপত্যে পরিবেশগত সংবেদনশীলতা, প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ এবং প্রকৃতির সঙ্গে স্থাপত্যের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের প্রচেষ্টা ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার বেকাসি রিজেন্সিতে অবস্থিত টানাটাপ ক্যানোপি গার্ডেন ক্যাফে এই প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। 

২০২২ সালে সম্পন্ন এবং RAD+ar (Research Artistic Design + Architecture) এর ডিজাইনে এই প্রকল্পটি একটি বাণিজ্যিক উদ্যান, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ হিসেবে নির্মিত হয়েছে। 

৪৫০ বর্গমিটার আয়তনের এই স্থাপনাটি এমন এক স্থাপত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে ভবনটি প্রকৃতির উপর আরোপিত কোনো বস্তুরূপে না থেকে প্রাকৃতিক পরিবেশের একটি সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে।

প্রকল্পের প্রেক্ষাপট ও ডিজাইন দর্শন

ক্যাফেটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার মধ্যে নির্মিত। এখানে তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই কঠিন জলবায়ুগত বাস্তবতাকে নকশার সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেন স্থপতিরা। তাদের লক্ষ্য ছিল উষ্ণমণ্ডলীয় উন্নয়নশীল দেশেও কম-শক্তিনির্ভর, প্যাসিভ বাণিজ্যিক স্থাপত্যকে  একই সঙ্গে কার্যকর, আরামদায়ক এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করতে পারা। 

ক্যাফেটি যেন প্রাকৃতিক পরিবেশের একটি সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে। ছবি: আর্কডেইলি
উন্মুক্ততা ও স্বচ্ছতার স্থাপত্য

প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর উন্মুক্ত এবং স্বচ্ছ বিন্যাস। স্থপতিদের ভাষায়, ভবনটি মূলত একটি “ডাবল মাল্টি-অ্যাক্সিয়াল পিগমেন্টেড কংক্রিট প্লেট”, যা বাগানের উপর ভাসমান অবস্থায় কল্পনা করা হয়েছে। এই শেল আকৃতির ঢেউ খেলানো কাঠামোটি দারুনভাবে ছাদের উপর বসার স্থান ও নিচতলার স্থানিক বিন্যাস গঠন করে। ফলে ভূমিতলটি বাগানের একটি স্বাভাবিক সম্প্রসারণে পরিণত হয়েছে।

প্রচলিত বদ্ধ ভবনের পরিবর্তে এখানে স্থাপত্যকে একটি ছাউনিরূপে কল্পনা করা হয়েছে। এতে করে ব্যবহারকারীরা প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হতে পারেন। এই উন্মুক্ততা ভবনের ভিজ্যুয়াল স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি বায়ু চলাচলকেও সহজতর করেছে।

জলবায়ু-সংবেদনশীল ও প্যাসিভ ডিজাইন

ক্যাফের নকশায় যান্ত্রিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে প্রাকৃতিক পরিবেশগত কৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। খোলা পরিকল্পনা, ছায়া সৃষ্টিকারী কংক্রিট ছাউনি এবং পর্যাপ্ত বায়ুপ্রবাহের সুযোগ মিলিয়ে ভবনটি একটি আরামদায়ক মাইক্রোক্লাইমেট তৈরি করে। 

উন্মুক্ত বিন্যাসের কারণে বাতাস পুরো স্থাপনার মধ্য দিয়ে অবাধে চলাচল করতে পারে, যা উচ্চ তাপমাত্রার পরিবেশে ব্যবহারকারীদের স্বস্তি প্রদান করে। এই পদ্ধতি প্রকল্পটিকে একটি কার্যকর লো-এনার্জি স্থাপত্যের উদাহরণে পরিণত করেছে।

ক্যাফেটি শুধুমাত্র খাদ্য পরিবেশনের স্থান ছাড়াও একটি সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পিত। ছবি: আর্কডেইলি
ট্রপিক্যাল অ্যালমন্ড বৃক্ষের ছাউনি থেকে অনুপ্রেরণা

প্রকল্পটির নান্দনিক ও স্থানিক ধারণা মূলত সাইটে বিদ্যমান ট্রপিক্যাল অ্যালমন্ড গাছের বিস্তৃত ছাউনিগুলো থেকে অনুপ্রাণিত। গাছের শাখা-প্রশাখার গঠন, তাদের ছায়া এবং প্রাকৃতিক স্তরবিন্যাস ভবনের সামগ্রিক পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। ছাদ ও কাঠামোর বিভিন্ন অংশ বিদ্যমান বৃক্ষচ্ছায়ার সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত হয়েছে, যাতে স্থাপত্য ও প্রকৃতির মধ্যে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এর ফলে দর্শনার্থীরা যেন বৃক্ষের ছাউনির মধ্যেই অবস্থান করছেন এমন এক অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

উপাদান, আলো ও স্থানিক অভিজ্ঞতা

এই প্রকল্পের উপাদানসমূহ বাগানের দৃশ্যকে উন্মুক্ত রাখে এবং প্রাকৃতিক আলোকে গভীরভাবে স্থাপনার ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়। দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যালোকের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কংক্রিটের ভাসমান ছাউনিগুলো ভিন্ন ভিন্ন ছায়া সৃষ্টি করে। ফলে প্রতিটি মুহূর্তে স্থাপত্যিক পরিবেশের চরিত্র পরিবর্তিত হয় এবং ব্যবহারকারীরা একটি গতিশীল স্থানিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হন।

ক্যাফের নকশায় যান্ত্রিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে প্রাকৃতিক পরিবেশগত কৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ছবি: আর্কডেইলি
সামাজিকতা, কমিউনিটি ও ব্যবহারিক বিন্যাস

ক্যাফেটি শুধুমাত্র খাদ্য পরিবেশনের স্থান ছাড়াও একটি সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পিত। খোলা পরিকল্পনার মাধ্যমে বার এলাকা, কমিউনাল টেবিল এবং চলাচলপথের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এই বিন্যাস ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত যোগাযোগ ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে উৎসাহিত করে।

এছাড়া প্রকল্পটি এই অঞ্চলের বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির অংশ। যেখানে টেকসই ব্যবসার মাধ্যমে টেকসই স্থাপত্যকে বিকেন্দ্রীভূত করার ধারণা উপস্থাপিত হয়েছে। সেই লক্ষ্যেই স্থাপনাটিকে একটি গ্যালারি-কমার্শিয়াল গার্ডেন হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা সৃজনশীল কমিউনিটির কর্মকাণ্ডের জন্যও একটি প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করে।

স্থাপনাটিকে একটি গ্যালারি-কমার্শিয়াল গার্ডেন হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। ছবি: আর্কডেইলি

টানাটাপ ক্যানোপি গার্ডেন ক্যাফের উন্মুক্ত বিন্যাস, প্যাসিভ পরিবেশগত কৌশল, ট্রপিক্যাল অ্যালমন্ড বৃক্ষের ছাউনি থেকে নেওয়া অনুপ্রেরণা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এটিকে একটি স্বতন্ত্র স্থাপত্যিক প্রকল্পে পরিণত করেছে। প্রকল্পটি দেখায় যে টেকসই স্থাপত্য কেবল প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের পাশাপাশি সাইট, জলবায়ু এবং মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়েও তা অর্জন করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র

১. আর্কডেইলি প্রকাশকাল: ১৭ নভেম্বর ২০২২।

Related Posts

ব্লব স্থাপত্যের যুগ কি শেষ?

স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণের শিল্প নয়। এটি মানুষের জীবনধারা, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কেরও প্রতিফলন। গত তিন দশকে…

আরব সাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কমিউনিটি সেন্টার

প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে তার মধ্যেই স্থাপত্য গড়ে তোলা, এটাই আধুনিক নকশাচর্চার একটি বড় ধারা। মহারাষ্ট্রের আনজারলের সমুদ্রতীরবর্তী পাহাড়ে…

যে শিল্প নেমেছে খেলার মাঠে! 

সাধারণত পাবলিক আর্ট বলতে আমরা বুঝি রাস্তার দেয়ালে আঁকা গ্র্যাফিতি, শহরের কোনো চত্বরে বসানো ভাস্কর্য কিংবা কোনো ভবনের…

আধুনিক সভ্যতার বুকে মেঘ ছোঁয়ার প্রত্যাশায় কাঠের এক ভবন

স্থাপত্যে কাঠ একটি আদিম নির্মাণ উপকরণ। সেই অন্ধকার যুগ থেকে আজ পর্যন্ত নির্মাণশিল্পে কাঠের চাহিদার একটুকুও কমতি নেই।…