দূরদৃষ্টি যাঁর সাফল্য-মন্ত্রক

ছেলেবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল ব্যবসা করে আত্মনির্ভরশীল হওয়া; দেশ, মানুষ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করা। ব্যবসার মাধ্যমে যেমন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়, তেমনি দেশ ও দশের সেবাও করা যায়। উদ্যোক্তা হওয়ার এমন প্রাণান্ত আকাক্সক্ষা ও অদম্য প্রচেষ্টায় নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী হিসেবে। পশ্চিম কাচারীপাড়া, জামালপুরের ‘মেসার্স আদিব ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী সফল এ নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী অধ্যাপক আলতাফ হোসেন। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব এ ব্যবসায়ীর সাফল্য-রহস্য। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন ব্যবস্থাপক ওমর ফারুক।

ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি, জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম আবুল হোসেন ও মা রওশন আরা বেগম। তিনি ১৯৮৬ সালে সিংহজানী বহুমুখী বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৮৮ সালে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে ঠিকাদারি করেন কিছুদিন। এরপর শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বেসরকারী আলেয়া আজম কলেজ, মেলান্দহ, জামালপুরে। পাশাপাশি শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লি. জামালপুরের একজন সেরা বিক্রেতা ও কেএসআরএম স্টিলের এক্সক্লুসিভ ডিলার।

জামালপুরের সেরা নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ীদের নামের সঙ্গে উচ্চারিত হয় ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেনের নাম। কিন্তু সহজে আসেনি এমন কৃতিত্ব। নেপথ্যে রয়েছে তাঁর সততা, মেধা, দূরদৃষ্টি ও সীমাহীন পরিশ্রমের উপাখ্যান। প্রথম জীবনে ঠিকাদারি করেছেন কিন্তু সেখানে আসেনি তেমন সাফল্য। যে কলেজে শিক্ষকতা করছেন, সেটিও তখন এমপিওভুক্ত হয়নি বিধায় বেতনও পাচ্ছিলেন না। এ পরিস্থিতিতে সংসারে দেখা দেয় চরম অভাব-অনটন। স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ চালানো হয়ে পড়ে রীতিমতো দুরূহ। অনেকটা দিশেহারা আলতাফ হোসেন অনেক ভেবে ব্যবসা করবেন বলেই সিদ্ধান্ত নেন। পশ্চিম কাচারীপাড়ায় একটি নির্মাণপণ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। মূলধন না থাকায় নিজের মোটরবাইকটি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে মাত্র ১০০ ব্যাগ সিমেন্ট ওঠান। কিন্তু প্রথম দিকে তেমন বিক্রি হতো না, হলেও বড়জোর দিনে তিন-চার ব্যাগ। তিনি উপলব্ধি করেন এভাবে ব্যবসা চলতে থাকলে কখনোই তিনি লাভবান হবেন না। 

তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি কোনো ব্যবসাবান্ধব জায়গায় ছিল না। সেখানে হতো আবাদ; ডোবা জায়গায় লোকজন মাছ ধরত। এমন অবিবেচকের মতো জায়গা নির্ধারণে সবাই হাসি-বিদ্রুপ করত! তবে তিনি ধৈর্যহারা না হয়ে ব্যবসা উন্নয়নে মনোযোগী হন। তাঁর বিশ^াস ছিল একসময় এই এলাকার উন্নয়ন হবেই। তাঁর দূরদৃষ্টি ক্রমেই বাস্তবে রূপ নেয়; উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে এলাকাটিতে। সিমেন্টের বিক্রি বেড়ে যায়, পাশাপাশি রডের ব্যবসাও শুরু করেন। ব্যবসা উন্নয়নে তাঁর নানা পদক্ষেপ বেশ কাজে লাগে। প্রতিবছরই একটি সময় রড-সিমেন্টের দাম বেড়ে যায়। এতে ক্রেতারা পড়েন বিপাকে। এই সমস্যাকে চিহ্নিত করে তিনি ঘোষণা দেন, কেউ অগ্রিম টাকা প্রদান করলে পণ্যের দাম বাড়লেও তিনি আগের মূল্যেই পণ্য সরবরাহ করবেন। এ প্রতিশ্রুতিতে প্রচুর ক্রেতা তাঁকে অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখেন। তিনিও আস্থার প্রতিদান দেন। দাম বাড়লেও প্রতিশ্রুত মূল্যে পণ্য প্রদান করেন। এই সততায় মুগ্ধ হয়ে ক্রেতারা অন্যকেও তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত করেন। ফলে ক্রমেই বাড়তে থাকে ব্যবসায়িক পরিসর। তা ছাড়া ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়ালেখাও হয় দারুণ ব্যবসা সহায়ক।

ব্যবসার শুরু থেকেই বিক্রি করতেন গুণগতমানের পণ্য। সে সূত্রেই বিক্রি করেন আকিজ সিমেন্ট। গুণগতমানের এ পণ্যটি তাঁকে এনে দেয় অনন্য ব্যবসায়িক সাফল্য। পণ্যটি বিক্রিতে তিনি সেরাদের সেরা। বিগত দুই অর্থবছরে তিনি অত্র এলাকার সর্বোচ্চ বিক্রেতা। অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ল্যাপটপ, এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, ডিনার সেট, স্মার্ট ফোন, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা প্রভৃতি। এ ছাড়া কোম্পানি প্রদত্ত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার। বর্তমানে তাঁর ব্যবসাসম্ভারে রয়েছে সিমেন্ট, রড, হার্ডওয়্যার ও প্লাস্টিকসামগ্রী।

ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন বিয়ে করেন ১৯৯১ সালে। স্ত্রী আফরোজা খানম মুন্নী। এ দম্পতির এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে মো. রেজোয়ান হোসেন আদিব ফজিলাতুন্নেসা বিশ^বিদ্যালয়, জামালপুর-এ কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এ শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত। ছোট মেয়ে আফসানা খানম অথৈ জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ছে। ব্যবসার পাশাপাশি আলতাফ হোসেন ব্যবসায়িক, সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গনের সঙ্গেও সমানভাবে জড়িত। তিনি জামালপুর দোকান মালিক সমিতির শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক, বার্সেলোনা ক্লাবের সভাপতি ও স্থানীয় মসজিদের মসজিদ কমিটির সদস্য।

একনজরে

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম: মেসার্স আদিব ট্রেডার্স

সত্ত্বাধিকারী : আলতাফ হোসেন

অবস্থান: পশ্চিম কাচারীপাড়া, জামালপুর

ব্যবসা শুরু: ১৯৯০ সালে

নির্মাণপণ্য: সিমেন্ট, রড, ইট ।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top