সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে মানুষের রুচিবোধ। তবে সময়ের বিবর্তনে আসবাব হিসেবে কাঠের ব্যবহার ও চাহিদা কমেনি এতটুকু, বরং বেড়েছে অনেকগুণ। নির্মাণশিল্পে কাঠের অবদান নেহাত কম নয়। বনের জংলিগাছকে সরাসরি নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। একে নির্দিষ্ট কাজভেদে উপযোগী করে চেরাই করা হয়। কাজভেদে ভিন্ন ভিন্ন আকার-আকৃতি নির্ধারণ করা হয়। বাণিজ্যিক প্রয়োজনেও আকার-আকৃতির এ পরিবর্তন দরকার। তদুপরি চেরাইকরণ প্রক্রিয়া ও মানের ওপর কাঠ বা টিম্বারের দাম, কার্যোপযোগিতা ও বাজার চাহিদা নির্ভর করে অনেকাংশে। তাই সঠিক মাপে এবং মানে কাঠ চেরাই খুব জরুরি।
বিভিন্ন কাঠামোগত (দরজা, জানালা, আসবাব, রাফটার ট্রাস ইত্যাদি) কাজে আকার আকৃতিভেদে কাঠের দরকার। কেননা সব ধরনের কাজে একই আকৃতির কাঠ বা টিম্বারের দরকার হয় না। তাই লগ টিম্বারকে নির্মাণের চাহিদানুরূপ আকার-আকৃতিতে রূপান্তরিত করা হয়। করাতের সাহায্যে লগকে চাহিদানুযায়ী আকার-আকৃতিতে রূপান্তরই চেরাই। টিম্বারকে চেরাই করে তক্তা, চৌকাঠ, ডাঁসা, পালা, বিম, রাফটার, পারলিনে রূপান্তরিত করা হয়। চেরাইয়ের মাধ্যমে একটা লগ থেকে কী পরিমাণ ব্যবহারের উপযোগী টিম্বার পাওয়া যাবে তা অনেকটাই নির্ভর করে চেরাই প্রক্রিয়ার ওপর। মেডুলারি রশ্মি ও বার্ষিক চক্রের সঙ্গে চেরাই তলের কৌণিক অবস্থানের ওপর চেরাইকৃত টিম্বারের গুণাগুণ, শক্তি, চাপ প্রতিরোধক্ষমতা, স্থায়িত্ব অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হয়।
চেরাইয়ের রকমফের
আমাদের এখানে প্রধানত পাঁচ ধরনের চেরাই-প্রক্রিয়া প্রচলিত। সেগুলো হচ্ছে:
১. সরল বা সাধারণ চেরাই (Simple or Ordinary Sawing)
২. স্পর্শকারী বা স্ল্যাশশ চেরাই (Tangential or Slash Sawing)
৩. ব্যার্সাধীয় বা ভেলা চেরাই (Radial or Raft Sawing)
৪. সিকি চেরাই (Quarter Sawing)
ক. ভেলা বা ব্যার্সাধীয় সিকি চেরাই (Raft or Radial Quarter Sawing)
খ. সরল বা সাধারণ সিকি চেরাই (Simple or Ordinary Quarter Sawing)
৫. সম্মিলিত চেরাই (Combination Sawing)
নানামাত্রিক চেরাই
টিম্বার চেরাইয়ের ওপর টিম্বারের গুণাগুণ অনেকাংশে নির্ভর করে। টিম্বার কি ধরনের কাজে ব্যবহার করা হবে এবং লগের আকার কেমন হবে এসব বিবেচনা করে চেরাই প্রক্রিয়ার ধরন নির্ধারণ করা হয়।
সাধারণ বা সরল চেরাই
আমাদের এখানে এ ধরনের চেরাইয়ের প্রচলন বেশি। গাছের লম্বালম্বি দিকের সঙ্গে উলম্বভাবে যে চেরাই করা হয়, তাকে সরল বা সাধারণ চেরাই বলা হয়। এ ধরনের চেরাইকে অনুপ্রস্থ চেরাইও বলে। এ জাতীয় চেরাইয়ে প্রাপ্ত তক্তার কেন্দ্রীয় অংশে থাকে সার কাট এবং দুই পাশে রসাল কাঠ। এ ধরনের তক্তায় দুই ধরনের কাঠ থাকে বলে এগুলো এমনভাবে সংকুচিত হয়, যাতে তক্তাও হয় সংকুচিত।
২. স্পর্শকীয় চেরাই
গাছের বার্ষিক বলয়ের সঙ্গে স্পর্শক এবং মজ্জা রশ্মির সমকোণে যে চেরাই করা হয়, তাকে বলে স্পর্শক চেরাই। এ জাতীয় চেরাইকে স্ল্যাশশ চেরাইও বলা হয়। এ চেরাইয়ে খরচ ও অপচয় কম এবং চেরাই কালে লগকে কম নাড়াচাড়া করতে হয়। যেহেতু এতে মজ্জা রশ্মি কাটা পড়ে, ফলে লম্বালম্বি বন্ধন শক্তি কমায়। এ জাতীয় চেরাইয়ে প্রাপ্ত তক্তা শুকালে কাপ আকৃতির বক্রতা দেখা দেয়। শক্তি কম হওয়ায় এ জাতীয় চেরাইয়ে প্রাপ্ত লাম্বারকে ফ্লেট গ্রেইন লাম্বার বলা হয়।
এ ধরনের চেরাইয়ে সুবিধা-
- এ চেরাইয়ে সময় লাগে কম, অপচয় কম হয় বিধায় ব্যয়ের পরিমাণও কম।
- এ ধরনের চেরাইয়ে প্রাপ্ত তক্তা শুকানোর সময় নষ্ট হয় কম।
- ফাটল ও অন্যান্য সমস্যাজনিত ত্রুটি হয় কমসংখ্যক তক্তায়।
- গিরার জন্য শক্তি অপচয়ের পরিমাণ অন্যান্য চেরাইয়ের তুলনায় কম।
- এ চেরাইয়ে প্রাপ্ত তক্তায় বার্ষিক বলয়ের সুস্পষ্ট ছাপ দৃশ্যমান।
ব্যার্সাধীয় বা ভেলা চেরাই
এ ধরনের চেরাইয়ে চেরাই করা হয় বৃক্ষ কাণ্ডের মজ্জা রশ্মির সমান্তরালে ও বার্ষিক বলয়ের সমকোণে। এ ধরনের চেরাইয়ে প্রাপ্ত কাঠ বেঁকে কম কুঞ্চিত হয়। এ চেরাইয়ে উন্নতমানের কাঠ পাওয়া যায়। কিন্তু এ পদ্ধতিতে চেরাই খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি। এ ধরনের চেরাইয়ে প্রাপ্ত লাম্বারকে এজ গ্রেইন লাম্বার বলা হয়।
এ জাতীয় চেরাইয়ে সুবিধাসমূহ-
- এ চেরাইয়ে প্রাপ্ত তক্তার প্রস্থে কুঞ্চন ও স্ফীত হওয়ার মাত্রা কম।
- এতে প্রাপ্ত তক্তায় দোমড়ানো বা কাপ আকৃতি হওয়ার প্রবণতা কম।
- এতে প্রাপ্ত তক্তা শুষ্ককরণ ও ব্যবহারে ফেটে যায় না।
- এ প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত তক্তা টেকসই।
- প্রাপ্ত কাঠে মজ্জারশ্মি, দোমড়ানো আঁশ, ঢেউ খেলানো আঁশ, মোছড়ানো আঁশ স্পষ্ট দেখা যায়।
- এ জাতীয় চেরাইয়ে প্রাপ্ত কাঠে বার্ণিশ করা সহজ এবং বার্ণিশে পৃষ্ঠ দৃশ্য সুন্দর দেখায়।
- এ চেরাইয়ে প্রাপ্ত কাঠে রসাল কাঠের পরিমাণ নির্ভর করে লগের রসাল কাঠের পরিমাণের ওপর।
সিকি চেরাই
লগকে প্রথমে চতুর্থাংশে বিভক্ত করে চেরাই করার প্রক্রিয়াকে সিকি চেরাই বলা হয়। সিকি চেরাই মূলত দুই প্রকারের-
- সরল বা সাধারণ সিকি চেরাই।
- ভেলা বা ব্যার্সাধীয় সিকি চেরাই।
সরল বা সাধারণ সিকি চেরাই
এ ধরনের চেরাইয়ে চতুর্থাংশের কেন্দ্রীয়াংশ ব্যার্সাধী চেরাই পদ্ধতিতে এবং উভয় পার্শ্ব আংশিক ব্যার্সাধীয় ও আংশিক স্পর্শকীয় পদ্ধতিতে চেরাই করা হয়। এ পদ্ধতির চেরাইয়ে প্রাপ্ত মাঝের বা কেন্দ্রীয়াংশের তক্তা কয়টি বেশ শক্তিসম্পন্ন কিন্তু পাশেরগুলো মজবুত না হওয়ায় তক্তার প্রস্থ কমে যায়। চেরাইয়ের এটি একটি সহজ পদ্ধতি।
ভেলা বা ব্যার্সাধীয় সিকি চেরাই
এ পদ্ধতিতে লগের চতুর্থাংশে চেরাইকালে মজ্জারশ্মির সমান্তরালে এবং বার্ষিক বলয়ের সমকোণে চেরাই করা হয়। এ চেরাইয়ে প্রাপ্ত তক্তার কুঞ্চন ও দোমড়ানোর মাত্রা খুবই কম এবং উন্নতমানের কাজের জন্য এ পদ্ধতিতে চেরাইকৃত তক্তার ব্যবহার করা হয়। তবে এ ধরনের চেরাইয়ে অপচয় বেশি হয়। এ ধরনের চেরাই করা টিম্বার উন্নতমানের কেবিনেট, মেঝে ও অলংকারমূলক কাজের জন্য বেশ উপযোগী। এ ধরনের চেরাইয়ে খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি।
৫. সম্মিলিত চেরাই
এ পদ্ধতিতে লগের কেন্দ্রীয় অংশে সাধারণ চেরাইয়ের মতো চেরাই করা হয় এবং বাদবাকি অংশে ভেলা বা ব্যার্সাধীয় পদ্ধতিতে চেরাই করা হয়। যেহেতু কেন্দ্রীয় অংশে মজ্জারশ্মি কাটা পড়ে না। তাই এ অংশের তক্তা অধিক শক্তিসম্পন্ন। তবে প্রতি তক্তায় সাধারণ চেরাইয়ের মতো হৃদ কাঠ ও রসাল কাঠ থাকে বিধায় অসম সংকোচন হয় এবং তক্তা বেঁকে যায়।
টিম্বার চেরাই ও এর রূপান্তর
পরিপক্ব বৃক্ষকে কাটার পর এগুলোর শাখা-প্রশাখা ছেদ করা হয়। এরপর বাকল অপসারণ করা হয়। তারপর গাছের কাণ্ডকে কাজের উপযোগী দৈর্ঘ্যে কেটে লগে পরিণত করা হয়। লগকে ছেঁটে চতুর্ভুজ বা অষ্টভুজ আকৃতির প্রস্থচ্ছেদে রূপ দেওয়া হয়। লগগুলোকে পানিতে ডুবিয়ে বা শুষ্ক পাটাতনের ওপর গুদামজাত করা হয়। প্রয়োজনের সময় এ লগগুলোকে চেরাই করে বাজার আকৃতিতে কাঠে (Market form of Wood) পরিণত করা হয়। এসব কাজ টিম্বার রূপান্তরের (Conversion of Timber) আওতায় পড়ে। সাধারণভাবে বলা যায়, গাছ কাটা থেকে ব্যবহারের উপযোগী বাজার আকৃতির কাঠ পাওয়ার জন্য যেসব কাজ করতে হয়, এগুলো টিম্বার রূপান্তর প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত। কাজেই টিম্বার রূপান্তর একক কোনো কাজ নয়।
এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গাছকে লগে রূপান্তর করা কালে বাজার চাহিদা অনুযায়ী ঈপ্সিত দৈর্ঘ্যরে লগে রূপান্তর করতে হয়। কেননা লগের দৈর্ঘ্য ঈপ্সিত বা চাহিদানুরূপ দৈর্ঘ্যরে চেয়ে অধিক কেটে ফেলতে হয় অথবা লগের দৈর্ঘ্য ঈপ্সিত দৈর্ঘ্যরে চেয়ে খাটো হলে জোড়া দিতে হয়। ফলে উভয় ক্ষেত্রে কাঠের অপচয় হয়। তাই কাঠের অপচয় একটা বিশেষ নিয়মে হিসাব করা হয়।
চেরাই টিম্বারের অপচয়
গাছের লগকে টিম্বারে রূপান্তর করলে লগের সময় আয়তনে বাজার আকার আকৃতির ব্যবহারের উপযোগী টিম্বার পাওয়া যায় না। কাণ্ডের আকার-আকৃতি, শাখা-প্রশাখার অবস্থান, লগের ধরন, গাছের পরিপক্বতা ও শ্রেণী ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ের ওপর টিম্বারের পরিমাণ নির্ভর করে। লগের আকার, আকৃতি ও পরিপক্বতার ওপর নির্ভর করে প্রতিটি লগের জন্য প্রাথমিক ছাঁটন পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়। কাজেই একটি লগ হতে কী পরিমাণ কাঠ পাওয়া যাবে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে সচরাচর লগের আয়তনের ৫০ শতাংশ হলে ৬৫ শতাংশ ব্যবহারের উপযোগী বাজার আকার আকৃতির কাঠ পাওয়া যায় এবং বাদবাকি অংশ চেরাইকৃত বর্জ্য বা অপচয় হিসেবে গণ্য হয়।
প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
eng_ssaha@yahoo.com
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৭ তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৪