অন্দরে উৎসবের ছোঁয়া
ঈদ ও উৎসবের গৃহসজ্জার নানা কথা

ঈদ উৎসবে সবাই চায় অন্দরমহলে পরিবর্তন আনতে। নতুন কিছু যুক্ত করতে। উৎসবের এ সময় নিজেকে সাজানোর পাশাপাশি আপনার গৃহের প্রতিটি কর্নারকে সাজিয়ে তুলুন ভিন্ন আঙ্গিকে। একটু শৌখিন চিন্তা আর সীমিত বাজেটের মধ্যে বেডরুম, লিভিংরুম, কিচেন ছাড়াও অন্যান্য অবহেলিত জায়গায় নিয়ে আসুন নতুনত্বের ছোঁয়া। ঝাঁঝাল রোদ কিংবা বৃষ্টি বলে তো আর থেমে নেই কোনো কিছুই। বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণের পাশাপাশি চলতে থাকবে অন্যান্য সামাজিকতাও। বেড়াতে যেতেও হবে সেজেগুজে আবার ঈদে বাড়ি আসবে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, তাদের জন্য অন্দরমহলকে সাজাতে-গোছাতে হবে সুন্দর থেকে আরেকটু সুন্দরভাবে। রং ও উপাদান নির্বাচনের ক্ষেত্রে গরমের উপযোগিতা থাকা চাই। ঈদ এলেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন গৃহিণীরা। তাই বলে কর্তারাও পিছিয়ে নেই এখন। গৃহিণী কীভাবে অন্দরসাজে নতুনের পরশ বুলাবেন, তার সহযোগিতায় থাকে কর্তার সতর্ক দৃষ্টি।

সামনেই আসছে মহা উৎসব ঈদ। যদি নিজের ঘরে একটা জমজমাট সাজ দিতে পারেন, তবে তো কথাই নেই। চাইলেই তো আর সবকিছু সম্ভব নয়, যেখানে বাজেট একটা বড় বিষয়। একজন দক্ষ ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পরামর্শে কম খরচেও আপনার ঘরের ইন্টেরিয়র হয়ে উঠবে নান্দনিক ও আকর্ষণীয়। ইন্টেরিয়র মানেই শুধু ঘরের রং করানো, ফার্নিচার কেনা, মেঝের টাইলস বদলানো নয়। এগুলোর পাশাপাশি আরও অনেক অনুষঙ্গ আছে, যেগুলোর পরিবর্তন বা নতুন সংযোজনেই পেতে পারেন নান্দনিক ইন্টেরিয়র সজ্জা আপনার অন্দরমহলে। কিছুটা ক্রিয়েটিভ আইডিয়া আর সদিচ্ছার যুগলবন্দীই হয়ে উঠতে পারে আপনার প্রধান সহায়ক। 

সাজানো গোছানো ডাইনিং রুম

লিভিংরুম
অতিথির আনাগোনার প্রথম স্থানই আপনার লিভিংরুম কিংবা বসার ঘর। এই ঘরটিতেই প্রথম আপ্যায়ন করা হয় অতিথিদের। আপনার লিভিংরুম কোন থিম নিয়ে সাজাবেন, সেটা চিন্তা করুন শুরুতেই। বসার ঘরের চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে দেখুন যে আপনার ফার্নিচারের স্টাইল আসলে কোনটি। দেশীয়, মডার্ন নাকি ভিক্টোরিয়ান? ভিক্টোরিয়ান বলতে বোঝায় কাঠের কারুকার্যময় আসবাবকে। মডার্ন ফার্নিচারের ধরন এখন খুবই সিম্পল আর জিম্যাট্রিক ফর্মের। দেশীয় আসবাব কেমন হবে, সেটা কমবেশি আমাদের সবারই জানা আছে। ঘরের পর্দা নির্বাচনের আসবাবকে মাথায় রাখতে হবে। ভিক্টোরিয়ান ফার্নিচারের সঙ্গে একটু গর্জিয়াস ড্রেপিং, লেইসযুক্ত পর্দা ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে দ্বিগুণ। মসলিন, জর্জেট, সিল্ক, নেটের পর্দাকে প্রাধান্য দিন মডার্ন ফার্নিচারের ক্ষেত্রে। আর দেশীয় আসবাবের সঙ্গে যাবে খাদি, এন্ডি ব্লক, বাটিক, টাইডাই, এপ্লিক, জামদানি অথবা নকশিকাঁথার কাজ করা পর্দা।

এই সময়ে বেছে নিতে পারেন হালকা রংগুলোকে, যেগুলো চোখে প্রশান্তি এনে দেবে। সাধারণত ইটলাল, হালকা লাল, বেইজ, পেঁয়াজ, মভ, গোল্ডেন এই রংগুলো মানানসই। কুশন কভার ও সোফার কভারের কাপড় নির্বাচন করুন পর্দার সঙ্গে ম্যাচ করে। কন্ট্রাস্টিং যেকোনো কিছুতেই নতুনত্ব লাগবে। শোপিস কেনার ক্ষেত্রে ঘরের ফার্নিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কিনুন, ক্রিস্টাল, কাচ, মাটি, বেত, বাঁশ, কাঠ, সিরামিক যা-ই আপনার পছন্দের তালিকায় থাকুক না কেন সবার প্রথমে দেখুন ঘরের বাকি আয়োজনটা কেমন। ঘরের অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে মিল রেখে শোকেসে রাখা কিছু পুরোনো শোপিস সরিয়ে নতুন কিছু যোগ করুন।

একটু বেশি শৌখিন যাঁরা এবং যাঁদের আয় কিংবা বাজেট নিয়ে চিন্তা নেই, তাঁরা ঘরের একপাশে অথবা চারপাশের দেয়ালজুড়ে তৈরি করে নিন ডেকোরেটিভ ফলস সিলিং। ডিফিউস লাইট, স্পট লাইট এবং হ্যাঙার লাইটের আলোয় তৈরি করুন রহস্যময় মায়াবী এক পরিবেশ। খালি দেয়ালজুড়ে তৈরি করে নিন বুক শেলফের কম্পোজিশন। এলসিডিই বা বাদ যাবে কেন? নান্দনিক এলসিডি ইউনিট তৈরি করে সাজিয়ে নিন কম্পোজিট ফার্নিচারে।

খাবার ঘর
অতিথির মন জয়ের অন্যতম জায়গা খাবার ঘর। শুধু মজাদার খাবারই নয়, তার সঙ্গে এই ঘরটির আশপাশের আয়োজনও হওয়া চাই খাবারের মতো আকর্ষণীয়। খাবার ঘরের থিম হিসেবে বেছে নিন সবুজ, কমলা ইত্যাদি রংকে। পর্দা, টেবিল ক্লথ, টেবিল রানার দেশি-বিদেশি যা-ই ব্যবহার করুন না কেন, পর্দার সঙ্গে মিল অথবা কন্ট্রাস্ট রং ব্যবহার করুন।

খাবার টেবিলে বিছিয়ে নিন টেবিল ম্যাট, সঙ্গে রাখুন আকর্ষণীয় ন্যাপকিন। নতুনত্ব আনতে ন্যাপকিন হোল্ডার ব্যবহার করুন। খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হোপ ও ডিজাইনের ক্রোকারিজ ব্যবহার করুন। একটু ভিন্নমাত্রা দিতে নান্দনিক গ্লাসগুলোকে উল্টো করে ব্যবহার করুন ক্যান্ডেল থেন্ডার হিসেবে। শুকনো ডাল ভালো করে পরিষ্কার করে তাতে রং দিয়েও ব্যবহার করতে পারেন খাবার টেবিলে খাবার পরিবেশনের নতুন ডেকোরেটিভ আইডিয়া হিসেবে।

রঙে রঙিন শোবার ঘর

রাতের আয়োজনটা হওয়া চাই একটু ভিন্ন। তাই ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ব্যবস্থা রাখুন। সঙ্গে একটা ফ্রুট কাভিং খাবার টেবিলের আকর্ষণ বাড়িয়ে দেবে।

বেডরুম
ঘরের আসবাবপত্র একটু এদিক-ওদিক সরিয়ে নতুনভাবে সাজিয়ে ফেলাই হচ্ছে বেডরুম মেকওভারের সবচেয়ে সহজ উপায়। নতুন পোশাক কেনার পাশাপাশি নতুন বিছানার চাদর, পর্দা, কুশন কভার ইত্যাদি পরিবর্তনে আপনার শোবার ঘরটি হয়ে উঠবে আরও বেশি আকর্ষণীয়। শোবার ঘরের থিম রং হিসেবে প্রাধান্য দিতে পারেন নীল, আকাশি, পার্পেল, অফহোয়াইট রংকে। তবে লক্ষ রাখবেন, একঘেয়েমি ভাবটা দূর করতে কন্ট্রাস্ট রং বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

বেডরুমে একটু ভিন্নমাত্রা দিতে বেডের মাথার কাছে হালকা একটু ফলস সিলিং করে নিতে পারেন। এলসিডির ওয়ালে ডেকোরেটিভ ওয়াল পেপার লাগাতে পারেন অথবা মাল্টি ফ্যাংশনাল কেবিনেট বানিয়ে নিন। এখুনই একটা দেয়ালে নিজের বিশেষ কিছু মুহূর্তের ছবি দিয়ে কম্পোজিশন করে নান্দনিকতার ছোঁয়া দিন। ফ্লোরে এক কর্নারে আড্ডা দেওয়া কিংবা মিউজিক শোনা এবং বই পড়ার জন্য ছোট বড় বিভিন্ন সাইজ ও আকৃতির কুশন দিয়ে সাজিয়ে নিন।

সিঁড়ি ও ফয়ার
নিজের অবয়ব দেখতে আয়নার গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যকে সাজাতে ব্যবহৃত এই আয়নাটি কখনো নিজেই সেজে ওঠে আপনার অন্দরমহলের সিঁড়ি কিংবা ফয়ারের কোনো দেয়ালজুড়ে। একটি নান্দনিক আয়না পাল্টে দিতে পারে ঘরের গুমোট পরিবেশকে। আজকাল ঘর সাজানোর অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে আয়নার ব্যবহার হচ্ছে। ঘরের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় আয়না লাগানো যেতে পারে। আলোর প্রতিফলনে ঘরটা আরও উজ্জ্বল ও বড় দেখাতে সাহায্য করে এই আয়না। বিভিন্ন ধরনের স্পটলাইট, ওয়াল ব্রাকেট, হ্যাংগিং লাইট এসব জোড় বাড়িয়ে দিতে পারে আয়নার সৌন্দর্য বহুগুণ। ফয়ারে আয়নার সঙ্গে সংযোজন করতে পারেন একটি কনসোল টেবিল। কনসোল টেবিলটি সাজিয়ে নিন টেবিল ল্যাম্প অথবা পছন্দের শোপিস দিয়ে কিংবা ফটোফ্রেম দিয়ে। সিঁড়িতে আয়নার চারপাশের দেয়ালে কিছু মুখোশ টানিয়ে দিতে পারেন।

সজ্জাবিন্যাস লিভিং রুম

জেনে রাখুন

  • ঈদের কয়েক দিন আগেই ঘরের রং পরিবর্তন করুন। সব ঘরের ঝুল ঝেড়ে ফেলুন।
  • পুরোনো আসবাব নতুন করে বার্নিশ অথবা লেকার কালার করে নিন। দেখবেন ফার্নিচারে নতুনত্ব আসবে।
  • ঘরের পুরোনো ইনডোর প্লান্টসগুলো সরিয়ে নতুন ইনডোর প্লান্টস নিয়ে আসুন।
  • ঘরের পুরোনো পাপোশ অথবা রাগের পরিবর্তে নতুন পাপোশ ও রাগ ব্যবহার করুন।
  • বেডটিকে নতুন লুক দিতে বেডের মাথার সাইজটি বদলে ফেলুন।
  • সাইড টেবিলের পরিবর্তে ওয়ান ক্যাটিং করে নিয়ে তাতে সাইড টেবিল যুক্ত করুন।
  • বাচ্চাদের ঘরে কার্টুন ক্যারেক্টারের আসবাব, পর্দা অথবা দেয়াল পেইন্ট করুন। পুরোনো খেলনা সরিয়ে নতুন খেলনা যুক্ত করুন।
  • ঘরে রং করানো সম্ভব না হলে কিছু দেয়ালে ওয়াল পেপার লাগিয়ে ভিন্ন মাত্রা দিতে পারেন।
  • সম্ভব হলে পুরোনো ওয়াল ব্রাকেট সরিয়ে নতুন ব্রাকেট লাগিয়ে নিন।
  • সেন্টার টেবিল, ডাইনিং টেবিল, বেসিন অথবা ড্রেসিং টেবিলে ফুলদানি হিসেবে বেছে নিন বিভিন্ন ধরনের মগ, কাপ অথবা কাচের জার। গতানুগতিক ফুলদানির চেয়ে এগুলো দিয়ে ঘরে বাড়তি সৌন্দর্য যোগ করুন।
  • আপনার ঘরটি আপনার মনের মতো করে সাজিয়ে মেতে উঠুন ঈদের আনন্দে।

ফারজানা গাজী
প্রধান নির্বাহী ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার
ফারজানা’স ব্লিস
www.farzanasbliss.com

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫১ তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৪

+ posts