বিদ্যুৎ! বিদ্যুৎ! বিদ্যুৎ! আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বিদ্যুৎহীন অবস্থা আমাদের অতীতের দুর্বিষহ জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল এ দেশে এখনকার প্রধান সমস্যা বিদ্যুৎবিভ্রাট বা লোডশেডিং। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালের এ সময়টায় লোডশেডিংয়ের কারণে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। প্রতিদিন গড়ে সাত-আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা বেশ স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর চেয়ে বড় সমস্যা শৃঙ্খলহীন লোডশেডিং যা পিক আওয়ারে প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর পর আসা-যাওয়া করে। ফলে বিদ্যুৎবিভ্রাটে আমাদের দৈনন্দিন জীবন প্রায়ই অসহনীয় হয়ে ওঠে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক। কিন্তু বাংলাদেশে ৫,৫০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় ৩,৭০০ থেকে ৩,৮০০ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা আর বিতরণের মধ্যে পার্থক্য থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার ১৮৩ ইউনিট, যা দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে ষষ্ঠ। এ থেকেই বোঝা যায়, দেশে এখন বিদ্যুতের সমস্যা কতটা প্রকট। বাংলাদেশের এই জাতীয় সমস্যার কারণে বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান এ দেশ থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে এবং নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। ফলে কমছে বিদেশি বিনিয়োগ, যা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
আধুনিক এ যুগে অনেক আগে থেকে নবায়নযোগ্য শক্তি হিসেবে বিদ্যুতের বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। শুধু আমাদের দেশে নয়, সমগ্র বিশ্বে এ তৎপরতা বেড়েছে। উন্নতসহ উন্নয়নশীল দেশেও বিকল্প শক্তির প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব বিকল্প শক্তি যেমন- সোলার প্ল্যান্ট, উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট, পারমাণবিক শক্তি, ভূ-উত্তাপ শক্তি, সাগরের তাপশক্তির রূপান্তর উল্লেখযোগ্য।
এমনই এক নতুন উৎসের সন্ধানে অনুপ্রাণিত হয়ে দুই উদ্ভাবনী তরুণ, রাস্তার গতিরোধককে (স্পিডব্রেকার) বিকল্প উৎস হিসেবে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সহজ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) তড়িৎকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন সনেট ও শাহাদাৎ হোসেন মানিক। উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিতে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
প্রকল্পটি সম্পর্কে উদ্ভাবকেরা জানালেন, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে উৎপাদনের বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে গিয়ে রাস্তায় গতিরোধক (স্পিডব্রেকার) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভাবনা মাথায় আসে। উৎপাদিত সেই বিদ্যুৎ দিয়ে আলোকিত করা যাবে রাস্তার পাশে অবস্থিত বাড়িঘর, সড়কবাতি ও ট্রাফিক সিগন্যাল।
বিদ্যুৎ সমস্যা নিরসনে শেষ বর্ষের প্রকল্প হিসেবে নেওয়া উদ্ভাবন সম্পর্কে উদ্ভাবকেরা জানান, রাস্তায় বিশেষ গতিরোধক (স্পিডব্রেকার) বসিয়ে গাড়ির চাকার গতি থেকে ডায়নামো ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সহজ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন তাঁরা। প্রকল্পটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন চুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছোটন কান্তি দাশ। প্রকল্পটি কীভাবে কাজ করে এ বিষয়ে তরুণ প্রকৌশলীরা বলেন, ‘রাস্তায় গাড়ি চললে প্রতিনিয়ত প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। কিন্তু এই শক্তির পুরোটাই অপচয় হয়। এই পদ্ধতিতে গাড়ি গতিরোধক পার হওয়ার সময় চাকার অপচয়কৃত গতিশক্তিকে স্পিডব্রেকার ব্যবহার করে ঘূর্ণনশক্তি হিসেবে সঞ্চিত করা হয়। গৃহীত এই শক্তিকে লোহার চেইনের মাধ্যমে যান্ত্রিকশক্তিতে রূপান্তরিত করে ঘোরানো হয়। ডায়নামো থেকে ব্যাটারিতে সঞ্চিত হয় বিদ্যুৎশক্তি। ব্যাটারি থেকে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায় বিভিন্ন কাজে।’
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন : রোলার স্পিডব্রেকার, গিয়ার, শিকল, ডায়নামো ও ব্যাটারি। যেকোনো রাস্তায় এ রকম একটি মডেল তৈরি করে বিদ্যুৎসুবিধা পেতে খরচ পড়বে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ক্রমবর্ধমান যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণও বাড়বে বলে উদ্ভাবকেরা মনে করেন।
উদ্ভাবন প্রসঙ্গে প্রকল্পটির তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ‘কয়লা, তেল, গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক উৎস যে হারে কমে যাচ্ছে, তাতে এখনই বিকল্প উৎসের সন্ধান করা অত্যন্ত জরুরি। উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় কিছুটা হলেও সরকারকে সহায়তা করবে।’
মোয়াজ্জেম হোসেন সনেট
প্রকাশকাল: বন্ধন ৩৭ তম সংখ্যা, মে ২০১৩