Zabun Nesa Mosq.

সাধারণ মসজিদের অসাধারণ পুরস্কার ‘রিবা ২০২৬’

সাভার শিল্পাঞ্চলের একটি অনুন্নত জোন। এখানে কখনও কিছু করা হবে হয়তো ভাবতো কারখানা মালিক। অথচ ২০২৬ সালে এমন কিছু হলো না শিল্পগুণে পুরস্কৃত হলো আন্তর্জাতিক মহলে। কারখানা পরিত্যক্ত একটি কোণে গড়ে উঠা নান্দনিক একটি সাধারণ মসজিদ জিতলো রিবা পুরস্কার ২০২৬

এই সাধারণ মসজিদটির নাম জেবুন নেসা মসজিদ। এর নির্মাণের পেছনে রয়েছে অনেক গল্প। সময়ের ব্যবধানে কখনো গড়ার গল্প, কখনো ভাঙ্গার গল্প, কখনো আবার থেমে থাকার গল্প। আর এমনই পর্যায়ক্রমিক উন্নয়নের অংশ এই জেবুন নেসা মসজিদ।

এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১৪ হাজার বর্গমিটারের একটি ধোলাই কেন্দ্র, একটি প্রস্তাবিত দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং পুরো চত্ত্বরজুড়ে নান্দনিকতার যেনো শেষ নেই।

শ্রমিক ও অংশীজনদের সাথে অংশগ্রহণমূলক আলোচনার মাধ্যমে এই প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি হয়, যার ফলস্বরূপ এমন একটি সাধারণ মসজিদ নির্মিত হয়েছে যা আধ্যাত্মিকতা, সুস্থতা এবং অন্তর্ভুক্তির প্রতীক। এটি পবিত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার এক অভিন্ন ক্ষেত্র।

মালিকের প্রয়াত মায়ের নামে নামকরণ করা এই ছিদ্রযুক্ত মণ্ডপ-আকৃতির নান্দনিক মসজিদটি অন্যথায় রুক্ষ শিল্পাঞ্চলে এক স্নিগ্ধতা বয়ে নিয়ে আসে। খোলা ও আধা-খোলা জায়গাসহ মসজিদের মোট আয়তন ৫৭২ বর্গমিটার।

একসময় কৃষিনির্ভর জলাভূমি থাকা আশুলিয়ার একটি প্রাকৃতিক জলাশয়ের পাশে অবস্থিত এই সাধারণ মসজিদটি বন্যার বিপদসীমা থেকে উঁচুতে নির্মাণ করা হয়েছে। বর্ষার ভূদৃশ্য রক্ষার জন্য স্থানীয় “খনন ও ঢিবি” কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে নির্মাতারা।

এই পরিবেশ-বান্ধব নকশাটি এটিকে ব-দ্বীপীয় ভূখণ্ডের সাথে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করে। একই সাথে বন্যা প্রতিরোধ ও সামাজিক সমাবেশের স্থানও প্রদান করে। এর নকশাটি জ্যামিতিক বিমূর্ততা থেকে উদ্ভূত: একটি বর্গাকার আকৃতি একটি বৃত্তাকার কেন্দ্রকে ঘিরে রেখেছে, যার সাথে রয়েছে চারটি আলো-ভরা আঙিনা।

সূক্ষ্ম বক্রতাগুলো লম্ব-কোণীয় নকশার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে যা স্থানিক শক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পূর্ব দিকের দেয়ালটি কারখানার চত্বরের দিকে এবং পশ্চিম দিকের দেয়ালটি কমিউনিটির হ্রদ ও তার ওপারের কবরস্থানের দিকে মুখ করে আছে। উত্তর-পূর্ব দিকের বাঁকানো দেয়ালের ঝুলন্ত কোণ দ্বারা চিহ্নিত প্রধান প্রবেশদ্বারটি অভ্যন্তরীণ প্রবেশ পথের দিক নির্দেশ করে।

সাধারণ মসজিদ
জেবুন নেসা মসিজেদর প্যাঁচানো সিড়িও গাছ। ছবি: রিবা

ঢালাই করা উন্মুক্ত রঙিন কংক্রিট দিয়ে নির্মিত এই একক-আকৃতিটি শিল্প-কারখানার পরিবেশের সাথে এক ধ্যানমগ্ন বৈপরীত্য তৈরি করে। ছিদ্রযুক্ত, দ্বি-স্তরবিশিষ্ট দেয়ালগুলো ঐতিহ্যবাহী জালির পর্দারই যেনো প্রতিফলন। এটি রিইনফোর্সমেন্টের ফাঁক থেকে উপাদানের ব্যবহার কমায়।

সাধারণ মসজিদের নকশা ও ডিজাইন

এই জালিকাময় নকশাটি বিচ্ছুরিত দিনের আলো ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এর ফলে কৃত্রিম আলোর প্রয়োজনীয়তা কমায় এবং স্বাভাবিক বায়ুচলাচল নিশ্চিত করে। দর্শনার্থীরা একটি সম্মুখ প্রাঙ্গণ ও ছায়াময় আঙিনা পেরিয়ে ‘অপবিত্র থেকে পবিত্র’-এর দিকে অগ্রসর হন। একটি লুকানো পাতলা গম্বুজের নিচে অবস্থিত স্তম্ভবিহীন শান্ত প্রার্থনা কক্ষে প্রবেশ করেন মুসল্লিরা।

এর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, কিবলা প্রাচীরটি হ্রদের দিকে উন্মুক্ত, যা প্রকৃতির সাথে আধ্যাত্মিক সংযোগকে আরও গভীর করে। ২০১৯ সালে এর নির্মাণকাজের অনুমোদন দেওয়া হলেও, কোভিড-১৯ এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে তা ২০২৩ সালের শেষভাগ পর্যন্ত বিলম্বিত হয়।

পর্যায়ক্রমে কাজ, পার্শ্ববর্তী ভবনগুলো থেকে ৪০%-এর বেশি ফর্মওয়ার্কের পুনঃব্যবহার এবং স্বল্পমূল্যের উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে সীমিত বাজেট সামাল দেওয়া হয়েছে এই সাধারণ মসজিদটির নির্মাণ কাজ। পুনর্ব্যবহৃত ইটের টুকরো ব্যবহার করে টেরাজো মেঝেতে আঞ্চলিক কারুশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। মেহরাবটি সম্পূর্ণরূপে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কাটা কাচ দিয়ে তৈরি, যা স্থানীয় শিল্পী ও কারিগরদের সাথে এক অনুকরণীয় সহযোগিতার নিদর্শন।

মসজিদটিতে ভেতরে ২৫০ জন এবং ভিত্তি ও প্রাঙ্গণে আরও ২০০ জন মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির মেজানিন নারীদেরও নামাজে অংশগ্রহণকে সহজতর করে।

প্রশস্ত র‍্যাম্প সকলের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। সুসজ্জিত ভিত্তি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্মিলনের প্রতীক হিসেবে প্রকাশ পায়।

বাংলাদেশের প্রথম নেট-জিরো মসজিদ হওয়ার পথে থাকা এই নান্দনিক সাধারণ মসজিদটি সৌর প্যানেল এবং ব্যবহৃত পানি সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করে থাকে। অলঙ্করণ বর্জন করে জেবুন-নেসা মসজিদ প্রথম মসজিদের মূল সত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে, যা একটি আধ্যাত্মিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব এবং গভীরভাবে সাম্যের সামাজকে উপস্থাপন করে।

Related Posts

সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোট নদীর নাম চেওংগিয়েচন। এক সময় নগরায়নের কারণে এই…

হোমালি যেনো রেস্তোরাঁ নয় ধান গাছের জীবন গল্প

নিউইয়র্কের পশ্চিম গ্রামের থাই রেস্তোরাঁর ইন্টেরিয়র ডিজাইন যেনো শুধু খাবারের পরিবেশই নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক গল্প বলার মাধ্যমও…

স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও উজ্জ্বল হলো বাংলাদেশের স্থাপত্যশৈলী। কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টসের (সিএএ) ২০২৬ সালের পুরস্কার তালিকায় জায়গা করে…

আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?

স্থাপত্য বলতে এতদিন আমরা বুঝেছি ইট, কংক্রিট আর কাঁচের কাঠামো তৈরির শিল্প। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই ধারণা বদলে…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

অভিনেতার নিউ ইয়র্কের বাড়িতে এক অবাক করা পল্লীসুলভ ছোঁয়া
সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট
হোমরালি রেস্তোরাঁ
স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন
আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?
স্থাপত্যে প্রায়েমিয়াম ইম্পেরিয়াল পুরস্কার জিতলেন লিবেসকিন্দ
Arch De Trump
কেন স্বেচ্ছায় নিজের “স্থপতি” উপাধি মুছে ফেললেন RIBA সভাপতি?
construction