Image

বিস্ময়কর লবণ খনি ভিয়েলিচ্কা

পৃথিবীর আশ্চর্য সুন্দর স্থাপনাখ্যাত লবণ খনি ভিয়েলিচ্কার অবস্থান পোল্যান্ডে। পৃথিবীর দৃষ্টিনন্দন সব স্থাপত্য থেকে এর গঠনশৈলী একেবারেই ভিন্ন। কেননা মাটির নিচে লবণের খনি কেটে করা বিশ্বের একমাত্র স্থাপত্যকর্ম এটি।

মাটির নিচের এক বিশাল লবণ খনি ভিয়েলিচ্কা। প্রায় এক হাজার বছর ধরে এ খনি থেকে লবণ তোলা হচ্ছে। সুড়ঙ্গ কেটে লবণ উত্তোলনের ফলে খনির ব্যাপ্তি বেড়েছে বৃহৎ পরিসরে। মাটির নিচে লবণের এ খনির গভীরতা প্রায় সাড়ে তিনশ মিটার অর্থাৎ এক হাজার ফুট। নয়টি বিভিন্ন ধাপে সব মিলিয়ে সুড়ঙ্গের মোট বিস্তৃতি প্রায় ৩০০ কিলোমিটার।

স্থাপনাটির সৌন্দর্য দর্শনে যে সকল পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন প্রথমে তাদেরকে দল আকারে একত্র করা হয়। পরে টিকেট সংগ্রহের মাধ্যমে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মেলে। লবণ খনিটির প্রবেশ পথে লোহার দরজার পাশেই রয়েছে কাঠের সিঁড়ি। এই সিঁড়িটা খুবই সরু ও নিচু। প্রস্থ আর উচ্চতায় ৬x৬ ফুটের বেশি নয়। স্থাপনাটির দেয়াল ও সিঁড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ। এর পুরো জায়গা জুড়ে জ্বলছে টিমটিমে হলদে আলোর আভা।

এরপর শুরু হয়েছে দীর্ঘ সিঁড়ির লাইন। ৩০-৩৫ তলার মতো পার হওয়ার পর মিলবে বিরাট এক গুহা। মাটির এতটা নিচে এই গুহাটা কিন্তু মানুষেরই তৈরি। আস্ত পাথর খোদাই করে নির্মিত এটি। গুহার দেয়াল নিরেট রক সল্ট দিয়ে তৈরি। এখানেই দেখা মিলবে গোলক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোস্লার্নিকাসের ভাস্কর্য। যার অবস্থান গুহার ঠিক মাঝ বরাবর। রক-সল্ট কেটেই তৈরি করা হয়েছে পুরো ভাস্কর্যটি। ভিয়েলিচ্কার রক-সল্ট সবুজাভ রঙের। গুহার দেয়াল কালচে সবুজ।

গুহা আর সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধা এই ভিয়েলিচ্কা। প্রতিটি সুড়ঙ্গের আদল মোটামুটি একই রকম। একটু পর পর দেখা যাবে বাল্বের ফিকে আলো। সুড়ঙ্গের শেষে একের পর এক গুহা। কোনো কোনো গুহা বিশাল আকৃতির। ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত উঁচু। কোনো কোনোটি ছোট কিন্তু প্রতিটিতেই রয়েছে ভাস্কর্য কিংবা নিদর্শন। নিদর্শনগুলো প্রতিটি লবণ-পাথর খোদাইয়ে নির্মিত। অন্য ভাস্কর্যগুলো বিখ্যাত রাজাদের প্রতিকৃতি। এরই একটিতে রয়েছে মধ্যযুগের পরাক্রমশালী পোলিশ রাজা কাসিমিরের (Kazimierz) ভয়ঙ্কর এক আবক্ষ মূর্তি।

পোলিশরা সাধারণত ধর্মপ্রাণ কিন্তু খনি শ্রমিক পোলিশরা একটু বেশিই ধর্মপ্রাণ। কেননা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস-ভরসা রাখা অনেক বেশি দরকার। এই খনি কমপ্লেক্স খুঁড়তে গিয়ে যুগে যুগে অনেক শ্রমিক অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। এ কারণে তিন চারটে চ্যাপেল (ছোট প্রার্থনার ঘর) গোছের গুহাও আছে ভিয়েলিচ্কায়। এর মধ্যে দুটোতে রয়েছে যিশু ও মাতা মেরির লাইক সাইজ মূর্তি। যা যথারীতি কালো-সবুজ রক-সল্ট দিয়ে নির্মিত। এখানে আর্টিফিশিয়াল বা কৃত্রিম আঘ্নেরগ্রাউন্ড লেক রয়েছে কয়েকটি। মানবসৃষ্ট খোদাইকৃত এ লেকগুলো লবণাক্ত পানি দিয়ে ভরা। এখানে নেই কোনো আলো। কিন্তু আঁধার পেরিয়ে ভেসে আসে পোল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত পিয়ানিস্ট ও কম্পোজার ফ্রেডেরিক শোপিনের সুর মূর্ছনা। ধীর লয়ে মিউজিকের তালে তালে বাড়তে থাকে আলোর উন্মাদনা। এভাবে আলো-আঁধার আর সুর-তাল-লয় মিলিয়ে আশ্চর্য এক আবহ তৈরি হয় লবণ খনি ভিয়েলিচ্কায়।

প্রচলিত আছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী এই লবণ খনির ভেতরে অস্ত্র নির্মাণ কারখানা বসিয়েছিল। ১৭৯০ সালে ভিয়েলিচ্কা পরিদর্শন করতে মহাকবি গ্যেটে এখানে এসেছিলেন। জার্মান কানেকশনের নমুনা হিসেবে মহাকবির একটি বড় মূর্তি রয়েছে এখানে।

ভিয়েলিচ্কার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সেইন্ট কিংগার চ্যাপেল। এই চ্যাপেলটি বিশাল হলঘরের মতো। এই হলঘরটার বিশেষত্ব- এর স্থাপত্যকর্মে রয়েছে সুচারু নকশার তাক লাগানো কারুকার্য। সিঁড়ির নিচের অংশে রাখা আছে প্রখ্যাত ধর্মযাজক পোপ জন পলের আবক্ষ মূর্তি। প্রতিটি দেয়ালে খ্রিস্টধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় খোদাই করে চিত্রিত করা হয়েছে। এমনকি লিও নার্দো দ্য ভিঞ্চির বিশ্বখ্যাত পেইন্টিং ‘দ্য লাস্ট সাপার’ দেয়ালে খোদাই করা আছে। অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যে শিল্পী এই লবণের দেয়ালে একেবারে অবিকলভাবে চিত্রিত করেছেন যিশু ও তাঁর ১২ শিষ্যের বিখ্যাত নৈশভোজের দৃশ্য। এই সেইন্ট কিংগার চ্যাপেলে বিয়ের অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ আবেদনপত্র জমা দিয়ে এই বিশেষ হলঘর ভাড়া নেওয়া যায়।

আধুনিক সভ্যতার স্থাপত্যকলায় এ এক ভিন্নধর্মী সংযোজন। জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংগঠন ইউনেস্কোর তালিকায় বিশ্বজুড়ে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট নিদর্শনের তালিকার অন্যতম স্থাপনা এটি। UNESCO World Heritage Site-এর তালিকায় যুক্ত হয়েছে ব্যতিক্রমী স্থাপনা লবণ খনি ভিয়েলিচ্কা। পোল্যান্ডের ডজন খানেক পর্যটকপ্রিয় জায়গার মধ্যে বিস্ময়কর লবণ খনি ভিয়েলিচ্কার স্থান সর্বাগ্রে।

সুমনা বিশ্বাস

প্রকাশকাল: বন্ধন ৩৩ তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৩

Related Posts

মরুভূমির দেশে বিশ্বমানের স্থাপত্যের নতুন দিগন্ত হার্জগ অ্যান্ড ডি মেউরন

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার গত দুই দশকে অবকাঠামো, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্য খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপের…

মরক্কোয় বিলাসবহুল রকেট বিল্ডিং

চারদিকে আকাশচুম্বী ভবনের প্রতিযোগিতা চলছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে একের পর এক আকাশচুম্বী ভবন। সম্প্রতি মরক্কোতে রকেট বিল্ডিং যার…

ক্লক টাওয়ার দুনিয়া কাঁপানো সময় দানব

ক্লক টাওয়ার বললেই এক নামে সবাই বুঝে ফেলে সহজেই। ক্লক টাওয়ার জিনিসটা কী তা আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে…

দ্য শার্দ আকাশ ছোঁয়া সুউচ্চ স্থাপনা

দ্য শার্দ যুক্তরাজ্য তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহের মধ্যে সবচে উচু স্থাপনা। এই স্থাপনাটি এতটাই আকাশছোঁয়া, যেখান থেকে অনায়াসেই…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি