Image

জল শাসনের দানব বাঁধগুলো

পৃথিবীর ৭১ শতাংশই নাকি পানি! সেই হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ এই পানিকে উপমা দিয়েছে ‘জীবন’ বলে। শুধু যে তেষ্টা মেটাতে পানি তা কিন্তু নয়। পানির মাঝে রয়েছে বিপুল শক্তি। যুগে যুগে মানুষ তা জেনেছে। সেই পানিতে বাঁধ দিয়ে আজ সারা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় উৎপন্ন হচ্ছে বিদ্যুৎ। আসুন না জেনে নিই বিশ্বখ্যাত ১০ ড্যাম বা বাঁধের খবরাখবর।

১. হুভার ড্যাম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল খরস্রোতা কলরোডা নদীর মুখে বিশ্বখ্যাত এই বাঁধের অবস্থান। হলিউড মুভির ভক্ত অথচ হুভার ড্যাম দেখেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। ‘ট্রান্সফরমার’ থেকে শুরু করে আরও কত যে হলিউডি মুভির শ্যুটিং হয়েছে হুভার ড্যামে তা আর বলতে! ১৯৩৬ সালে নির্মিত এই বাঁধের মূল উদ্দেশ্য আশপাশের এলাকার বন্যানিয়ন্ত্রণ, সেই সঙ্গে খরার সময় পানি সংরক্ষণ। ৭২৬ ফুট উচ্চতার উঁচু এ বাঁধের ওপরের ব্রিজ দিয়ে প্রতিদিন শত শত যান চলাচল করে। প্রতিবছর কংক্রিটের এই ড্যাম দেখতে আসে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হাভার্ড হুভারের নামে এই ড্যামের নামকরণ করা হয়েছে। ড্যামটি বানাতে সময় লেগেছিল পাঁচ বছর। কিন্তু বিশাল এই নির্মাণযজ্ঞ চলাকালীন প্রাণ হারায় ১১২ জন নির্মাণকর্মী। প্রচণ্ড প্রতিকূল আবহাওয়া, খরা, খননকাজের সময়ে গড়িয়ে পড়া পাথরে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায় নির্মাণে যুক্ত এই মানুষগুলো। লোকমুখে প্রচলিত আছে, আজও সেই সব মৃত শ্রমিকদের নাকি দেখা যায় হুভার ড্যামের আশপাশে। নির্মাণযজ্ঞে মারা পড়া শ্রমিকদের স্মৃতি রক্ষার্থে হুভার ড্যামের সঙ্গেই রয়েছে একটি স্তম্ভ।

২. থ্রি জর্জেস ড্যাম

এই ড্যামের অবস্থান চীনের হুবেইতে। ২২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই ড্যাম হুভার ড্যামের মতো ঠিক অতটা উঁচু নয়। এর উচ্চতা ৬০০ ফুট। আর লম্বায় প্রায় আড়াই কিলোমিটার। এর কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৪ সালে, এরপর দীর্ঘ নয় বছরে নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে শেষ হয় এর নির্মাণকাজ। প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ ড্যাম থেকে ২০১৬ সালে রেকর্ড ৯৮ দশমিক ১ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে, যা কিনা চীনের মোট জলবিদ্যুতের প্রায় ১৫ শতাংশ।

৩. আশওয়ান ড্যাম

মানব সভ্যতার বিস্তারে অন্যতম অবদান ছিল নীল নদের। সেই নীল নদেই অবস্থান এই বাঁধের। মিসরের এই ড্যামটি আশওয়ান ড্যাম আবার হাই ড্যাম নামেও পরিচিত। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এটি, আর উচ্চতা ৩৬৪ ফুট। দৃষ্টিনন্দন এই ড্যামটি মিসরের শুষ্ক অঞ্চলে বছরের সব সময় পানি সরবরাহে রাখে ব্যাপক ভূমিকা।

৪. ইটাইপু ড্যাম

দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত ড্যামটির মালিক যৌথভাবে ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ভিত্তিতে এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোইলেকট্রিক ড্যাম। ২০১৬ সালে এটি বিদ্যুৎ উৎপন্ন করেছে ১০৩ দশমিক ১ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। আকারেও এটি বিশাল। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৮ কিলোমিটার। ২০টি ৭০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন টারবাইন রয়েছে এতে। ১৯৯৪ সালে ‘আমেরিকান সোসাইটি ফর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স’ এই ড্যামটিকে আধুনিক যুগে নির্মাণের সেরা সপ্তাশ্চর্যের একটি বলে স্বীকৃতি দেয়।

ডিসকভার তাসমানিয়া

৫. গর্ডন ড্যাম

অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ার গর্ডন নদীতে গড়ে তোলা হয়েছে বাঁধটি। তাসমানিয়ার মোট বিদ্যুতের ১৩ শতাংশ আসে এখান থেকে। এর ওপরেই অবস্থান গর্ডন পাওয়ার স্টেশনের। এটি গর্ডন রিভার ড্যাম নামেও পরিচিত। গর্ডন নদীতে এই বাঁধ দেওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে মনোরম গর্ডন লেকের, যা দেখতে প্রতিবছর এখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পর্যটকের আনাগোনা লক্ষ করা যায়। অবশ্য ২০১৬ সালে তীব্র খরায় এই নদী ও লেকে পানির অভাব দেখা দেওয়ায় গর্ডন ড্যামে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেয়, যা কি না তাসমানিয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটায়। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারদের দ্রুত মেরামতের পর ২০১৭-এর জানুয়ারিতে আবার পানির লেভেল ২৮ মিটার বাড়ে গর্ডন লেকে এবং ড্যামে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে আসে। তাসমানিয়া বিদ্যুৎ বিভাগ আশা করছে এ বছর আবারও আগের মতোই স্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাবে গর্ডন ড্যাম থেকে।

৬. লেক ভ্যার্নি ড্যাম

১৮৮৮ সালে নির্মিত হয় সুপ্রাচীন এই বাঁধটি। নদীর বুকে পুরোপুরি পাথরের তৈরি এমন বিশালাকার স্থাপনার কথা তখন সেভাবে চিন্তাই করা যেত না। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলসের মন্টেগোমারশায়ারে অবস্থান এই বাঁধটির। বাঁধটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বাদু পানির একটি কৃত্রিম লেক তৈরি করা। লিভারপুল ও মারসিসাইডের বসবাসকারী মানুষের জন্য পানি সরবরাহ করতে এই বাঁধটি নির্মাণ করে একটি কৃত্রিম লেক সৃষ্টি করা হয়। লেকের নাম রাখা হয় লেক ভ্যার্নি আর বাঁধের নাম হয় লেক ভ্যার্নি ড্যাম। এই বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল বিশাল পাথরের ব্লকের সাহায্যে। ব্রিটিশ স্থ্যাপত্যের অনুপম এক নিদর্শন লেক ভ্যার্নি ড্যাম।

৭. মংলা ড্যাম

ভূস্বর্গ কাশ্মীরের অপরূপ সৌন্দর্যের কথা নতুন করে বলাটা বোধ হয় আদিখ্যেতা। কাশ্মীরের পাকিস্তান অংশে ঝিলম নদীর ওপরে অবস্থান এই বাঁধের। ঝিলমের বুকে এই বাঁধ দিয়ে মংলা লেক গড়ে তোলা হয়েছে। মংলা নামটা এসেছে স্থানীয় গ্রাম মংলা থেকে। মংলা হল হিন্দুদের দেবী। ১৯৬০ সালে ভারত-পাকিস্তান পানি চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান অধিকার পায় ঝিলম নদীর। এর আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের কৃষি সেচব্যবস্থা পুরোপুরি নির্ভর করত সিন্ধু নদের ওপর। কিন্তু ঝিলম নদের ওপর নির্মিত মংলা ড্যাম সেই একক নির্ভরতা কমিয়েছে অনেকটাই। এই বাঁধের নকশা করেছে লন্ডনের ‘বিন্নি অ্যান্ড পার্টনারস’ এবং নির্মাণে যুক্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আটটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বিশেষ কনসোর্টিয়াম। ১৯৭৪ সালে শেষ হয় মংলা ড্যামের নির্মাণকাজ। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাঁধটি।

৮. মার্টিঞ্জ ড্যাম

ইউরোপের মন্টিনিগ্রোর পিভা নদীর ওপরে এই ড্যামের অবস্থান। দৃষ্টিনন্দন এই ড্যামটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর নির্মিত ব্রিটিশ চলচ্চিত্র ‘ফোর্স টেন ফ্রম নেভারন’-এ ব্যবহৃত হয়েছে। মুভিতে এই ড্যামটিই ছিল শক্রপক্ষের মূল লক্ষ্য। ১৯৭৮ সালে রিলিজ পাওয়া এই মুভিটির পোস্টারেও ব্যবহৃত হয়েছিল এই ড্যামের ছবি। তারপর থেকেই কংক্রিটের এই ড্যামটি হয়ে ওঠে পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

৯.  গ্লেন ক্যানিয়ন ড্যাম

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর আরিজোনায় কলরাডো নদীর ওপরেই আরেকটি বিশালাকৃতির ড্যাম গ্লেন ক্যানিয়ন। এই ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বিশাল একটি লেকে, লেক পাওয়েল গড়ে তোলা হয়েছে। এই ড্যামটি একই সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ করছে। ২ লাখ ৫৪ হাজার হর্স পাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন আটটি টারবাইন অনবরত এখানে ঘুরছে। ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই ড্যামটি প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার ২১৭ গিগাওয়াট-ঘণ্টা জলবিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।

কমেডি অন ডেক ট্যুরস

১০. কন্ট্রা ড্যাম

সুইজারল্যান্ডের ভারজেসকা নদীর ড্যাম এই কন্ট্রা। এটি আঞ্চলিকভাবে ভারজেসকা ড্যাম ও লকর‌্যানো ড্যাম নামেও পরিচিত। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে আহামরি তেমন কিছু না। এর ক্ষমতা মাত্র ১০৫ মেগাওয়াট, বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ২৩৪ গিগাওয়াট-ঘণ্টা। কিন্তু এই ড্যামটির খ্যাতি অন্য জায়গায়। ৩৮০ মিটার দীর্ঘ এই বাঁধটির উচ্চতা ৭২০ ফুট। দূর-দূরান্ত থেকে অ্যাডভেঞ্চারপিপাসু মানুষ এখানে ভিড় জমায় বিশেষ একটি কারণে। আর তা হলো ‘বাঞ্জি জাম্পিং’! পায়ে ও কোমরে নিরাপত্তা সামগ্রী বেঁধে দড়ি ধরে এই ড্যামের চূড়া থেকে শূন্যে গা ভাসিয়ে দিয়ে এক অন্য রকম অনুভূতি নেয় সাহসী পর্যটকেরা। আর যারা ওদের মতো এত দুঃসাহসী নয়, তারা ড্যামের চূড়া থেকে উপভোগ করে শিহরণ জাগানো এ দৃশ্য।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৫তম সংখ্যা, মে ২০১৭।

Related Posts

মরক্কোয় বিলাসবহুল রকেট বিল্ডিং

চারদিকে আকাশচুম্বী ভবনের প্রতিযোগিতা চলছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে একের পর এক আকাশচুম্বী ভবন। সম্প্রতি মরক্কোতে রকেট বিল্ডিং যার…

ক্লক টাওয়ার দুনিয়া কাঁপানো সময় দানব

ক্লক টাওয়ার বললেই এক নামে সবাই বুঝে ফেলে সহজেই। ক্লক টাওয়ার জিনিসটা কী তা আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে…

দ্য শার্দ আকাশ ছোঁয়া সুউচ্চ স্থাপনা

দ্য শার্দ যুক্তরাজ্য তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহের মধ্যে সবচে উচু স্থাপনা। এই স্থাপনাটি এতটাই আকাশছোঁয়া, যেখান থেকে অনায়াসেই…

গা ভেজানোর পুলগুলো…

পুকুর, নদী, সমুদ্র-সবই হয়তো দেখেছেন। কিন্তু চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি আকাশে ভাসমান ‘সুইমিংপুল’ দেখেননি নিশ্চয়। কী? অবাক হচ্ছেন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

রাস্তা থেকে রেস্তোরাঁ: কাপ-পিরিচে মন হাল্কা করার স্থাপত্যের গল্প
নাভিদ বারাতির ‘হিডেন সিটি’ 
বিশ্বকাপ ২০২৬: স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক মেগা-ইভেন্টের নতুন মানচিত্র
মে মাসের সেরা পাঁচটি আবাসিক স্থাপত্য
প্রেইরির নীরবতায় অবতরণ করা এক ভবিষ্যত স্থাপত্য
নিখিল: নৃত্যের ছন্দে গড়া স্মৃতির অনুরণন
Carthage
Dhanmondi Mogal Eidgah
Kaba Ghor