স্ল্যাব কিউরিং। ছবি: দ্যহিন্দু

ইমারত নির্মাণ ও নিয়মনীতি

পয়ঃপ্রণালি
টয়লেট ও রান্নাঘরের বর্জ্য নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করাই পয়ঃপ্রণালি নির্মাণের মূল লক্ষ্য। একটি ভবন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু ও সঠিক পয়ঃপ্রণালি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি এবং এর গুরুত্ব অনুধাবন করে সব ধরনের কাজ সম্পন্ন করা অত্যাবশ্যক। ভবনের বর্জ্য কোথায় ও কীভাবে নিষ্কাশিত হবে, তার ওপর ভিত্তি করে নিতে হয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। যেমন- এলাকায় যদি সুষ্ঠু ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকে সে ক্ষেত্রে ভবনের জন্য নির্মিত পয়ঃপ্রণালিটি অত্র ড্রেনের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া যেতে পারে। অন্যথায় নিজস্ব জমির ওপর সেপ্টিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল নির্মাণ করে সেখানে সংযোগ দিতে হবে, যাতে পরিবেশ নষ্ট না হয়। পয়ঃপ্রণালি নির্মাণের সময় ইমারতে ব্যবহৃতব্য টয়লেট ও রান্নাঘরের সংখ্যা অনুযায়ী পাইপ লাইনের ডিজাইন অর্থাৎ কত মোটা পাইপ বসাতে হবে, সেটি আগেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া পাইপের বাঁক ও দৈর্ঘ্যরে ওপর নির্ভর করে মাঝে মাঝে ইনস্পেকশন পিটের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নইলে পাইপ লাইন যেকোনো সময় জ্যাম হলে তা ক্লিয়ার করা কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। সর্বোপরি, পাইপ লাইন বসানোর সময় যথোপযুক্ত স্লোপ দেওয়ার বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

রুফ ট্রিটমেন্ট
ইমারতে সর্বশেষ নির্মিত ছাদ, যার ওপর আর কোনো নির্মাণকাজ করা হবে না, সে ক্ষেত্রে ছাদের ওপর পতিত বৃষ্টির পানি দ্রæত নিষ্কাশন এবং রোদের তাপ নিরোধক হিসেবে বিভিন্নভাবে সারফেস ট্রিটমেন্ট করা হয়ে থাকে, যা ওই ইমারতটির স্থায়িত্ব ও ব্যবহার উপযোগিতা বাড়ায়। সাধারণত স্ট্রাকচারাল ডিজাইন অনুযায়ী নির্মিত আরসিসি ছাদের ওপর ৩ ইঞ্চি (গড় মাপ) পুরু লাইম কংক্রিট (চুন, সুরকি ও ইটের খোয়ার মিশ্রণ) সংক্ষেপে এলসি ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে এলসির পরিবর্তে নতুন কিছু প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন- সর্বশেষ ছাদটি করার সময় তাপ নিরোধক ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য হলো বøক বসিয়ে আরসিসি ঢালাই করা এবং বৃষ্টির পানি দ্রæত নিষ্কাশনের জন্য তার ওপর ১.৫ ইঞ্চি পুরু স্ক্রিডিং ঢালাই দিয়ে নিট-সিমেন্ট ফিনিশিং করা। এ ছাড়া এসব ফিনিশিংয়ের ওপরের পৃষ্ঠে রুফিং কম্পাউন্ড নামে তাপ নিরোধক এক প্রকার রং ব্যবহার করা হয়। মনে রাখা দরকার, ছাদের ওপর এ ধরনের ট্রিটমেন্ট সুচিন্তিত ও সুষ্ঠুভাবে করা না হলে রোদের উত্তাপের কারণে টপ ফ্লোরে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বৃষ্টির পানিতে ছাদ তথা ইমারতের স্থায়িত্ব কমে যায়।

ভবনে রঙের কাজ

পেইন্টিং
ইমারত নির্মাণের সর্বশেষ কাজের আইটেম পেইন্টিং ও পলিশিং। ওয়েদার প্রোটেকশন অর্থাৎ ক্ষয় রোধ করা, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং সৌন্দর্যবর্ধনই এ কাজের প্রধান উদ্দেশ্য। ব্যবহার ও স্থানভেদে পেইন্টিংয়ের প্রিপারেশন, অ্যাপ্লিকেশন ও মালামাল আলাদা হয়ে থাকে। সিমেন্ট সারফেসে ব্যবহারের জন্য হোয়াইট ওয়াশ (চুনকাম), কালার ওয়াশ, ডিসটেম্পার, প্লাস্টিক পেইন্ট, স্নো-সেম, ওয়েদার কোট ইত্যাদি পেইন্ট ব্যবহৃত হয়। কাঠ ও স্টিল সারফেসে শুধু এনামেল পেইন্ট ব্যবহার করা হয়। সিমেন্ট, কাঠ ও লোহা এই তিন ধরনের বেইজ মেটারিয়ালের জন্য ব্যবহৃতব্য রঙের মালামালের বৈশিষ্ট্য ও কর্মপদ্ধতি আলাদা। তবে প্রতিটা পেইন্টেরই মূল উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তাই সব ক্ষেত্রেই মালামাল ও কাজের গুণাগুণ রক্ষা করা অতীব জরুরি। সব ধরনের পেইন্টই রেডি মিক্সড আকারে পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেরাও রঙের মিশ্রণ তৈরি করে নেয়। উভয় ক্ষেত্রেই সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। কাজের গুণাগুণ রক্ষার্থে যেকোনো সারফেসে পেইন্টিং মেটারিয়ালস লাগানোর আগে সারফেস ট্রিটমেন্ট (প্রয়োজনীয় ফিনিশিং এবং ঘষা-মাজা করা) করার পর উত্তমরূপে পরিষ্কার করে নিতে হয়।

তারপর নির্দিষ্ট পেইন্টিং মেটারিয়ালস প্রস্তুতকারী কোম্পানির ম্যানুয়াল অনুযায়ী প্রাইম কোট, সেকেন্ড কোট ও ফাইনাল কোট প্রয়োগ করে রঙের ফিনিশিং দিতে হয়। খেয়াল রাখতে হয় কোনো অবস্থাতেই ভেজা সারফেসে পেইন্টিং মেটারিয়ালস লাগানো যাবে না। তাই রঙের কাজের প্রিপারেশন নেওয়ার আগেই সারফেস শুকানোর ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘সব ভালো যার শেষ ভালো তার’। সুতরাং এ কাজটিতে কোনো রকম অবহেলা করা যাবে না। সামান্যতম অবহেলার কারণে নষ্ট হবে রঙের সৌন্দর্য্য ও স্থাপনার স্থায়িত্ব। এ ছাড়া রং নির্বাচনও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা একটা মানুষের রুচির বহিঃপ্রকাশ। ফলে সবকিছুর সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রেখে রং নির্বাচন করতে হবে। সর্বোপরি, গুণগতমান সম্পন্ন কাজ করতে অভিজ্ঞ মিস্ত্রি দিয়ে নিয়মমাফিক কাজ করানো এবং সার্বক্ষণিক তদারকির বিকল্প নেই।

পলিশ
ইমারতে ব্যবহৃত সব ধরনের কাঠের কাজ যেমন- ফার্নিচার, জানালা-দরজার চৌকাঠ ও পাল্লা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পলিশের কাজ করা হয়, যা তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল তবে দৃষ্টিনন্দন। পলিশে কাঠের আঁশগুলো প্রাকৃতিকভাবে দৃশ্যমান থাকায় বাড়ে নান্দনিকতা। ফলে এই কাজটি অভিজ্ঞ মিস্ত্রি দিয়ে করানো প্রয়োজন। অনভিজ্ঞ মিস্ত্রিরা অনেক সময় অধিক রং ব্যবহার করে কাঠের আঁশগুলো ঢেকে ফেলে, ম্লান করে দেয় এর প্রাকৃতিক নান্দনিকতা। তাই কাজটি করার আগেই মালামাল এবং কাজের পদ্ধতিগত ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন অত্যাবশ্যক।

পলিশে কাঠের আঁশগুলো প্রাকৃতিকভাবে দৃশ্যমান থাকায় বাড়ে নান্দনিকতা। ছবি: ইন্ডিয়ামার্ট

পরিশেষে
ধারাবাহিক এই লেখার মাধ্যমে একজন সাধারণ মানুষকে ‘ইমারত নির্মাণ ও নিয়মনীতি’ সম্পর্কে ন্যূনতম কিছু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে ইমারত নির্মাণের কাজটি যেমন সহজ, তেমনই কঠিন। শুধু অর্থের জোগান দিলেই তরতরিয়ে উঠে যাবে ইমারত; ধারণাটা ভুল। বিভ্রাটটা বাধে তখনই, যখন মানের প্রশ্ন আসে। এখানে মান তথা কোয়ালিটির অর্থ ব্যাপক। কোয়ালিটি বলতে মানুষ, মালামাল, কর্মপদ্ধতি এবং নির্মিত কাজসহ সার্বিক বিষয়াবলিকে বোঝায়, যা একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমাদের সমাজে সবার মাঝেই নির্মাণসামগ্রীর কোয়ালিটি সম্বন্ধে কমবেশি সচেতনতা থাকলেও কর্মপদ্ধতি ও কাজের কোয়ালিটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অনেকেরই নেই। ফলে অজ্ঞাতসারেই নিজেরাই নিজেদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষেত্রবিশেষে সুষ্ঠু কোনো তদারকি ছাড়াই নির্মিত হয় ইমারত। দেশের সার্বিক উন্নতি সাধিত হওয়া সত্তে¡ও এখনো কোনো কোনো জায়গায় গড়ে উঠছে মিস্ত্রিসর্বস্ব ইমারত। এসব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষতির হিসাব মেলাতে না পারলেও সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েই যায়। সময়ের ব্যবধানে বোঝা যায় এর সমস্যা, যখন আর কিছুই করার থাকে না। মনে রাখা দরকার, আমরা যে স্থাপনাটি তৈরি করব, তার একটি নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল আছে, আছে ব্যবহার উপযোগিতা। আমরা জ্ঞাতসারে কেউই চাইব না অনেক শ্রম, সাধনা ও অর্থের বিনিময়ে গড়া একটি ইমারত অকালে নষ্ট হোক, হারিয়ে ফেলুক ব্যবহার উপযোগিতা কিংবা ব্যবহারের স্বাচ্ছন্দ্যতা। ফলে এ ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, প্রয়োজন দক্ষ জনবল নিয়োগ দিয়ে সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি নিশ্চিন্ত ও স্বাচ্ছন্দ্য বসবাসের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্যে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, কোয়ালিটি সম্পন্ন মালামাল, কর্মপদ্ধতি এবং কাজের গুণগতমান নিশ্চিতকরণার্থে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী তদারকিতে দক্ষ মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান

পিইঞ্জ, দ্য স্ট্রাক্চারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.

প্রকাশকাল: বন্ধন ৭০ তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৬

Related Posts

নির্মাণে উচ্চশক্তির রড ব্যবহারে বিএনবিসি কোড

কি সত্যিই অন্তরায়? ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে উঠে আসা পৃথিবীর ১৯৫টি দেশের মধ্যে ৩২তম শক্তিশালী দেশ বাংলাদেশ।…

প্লাস্টার ও প্লাস্টারে ফাটল

একটি ইমারতের ইটের গাঁথুনি কিংবা অমসৃণ কংক্রিটকে মসৃণ করতে সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণে যে বহিরাবরণ দেওয়া হয়, তার নামই প্লাস্টার…

নগর পরিকল্পনায় বিবেচ্য বিষয়াদী

নগর পরিকল্পনা একটি কারিগরী ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ভূমির ব্যবহার এবং নাগরিক জীবনব্যবস্থার নকশা প্রণয়ন করা হয়।…

বৃষ্টির দিনে কংক্রিটিং

কয়েক দিন আগে একজনের কাছ থেকে জানতে পারলাম, তার বাসার তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের ৪০-৫০ মিনিট পর বৃষ্টি…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq