একসময় যেখানে ছিলো ময়লার ভাগাড় আজ সেখানেই তৈরি হলো দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ। বলছি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। মহাখালীর ১,৭০,০০০ বর্গমিটারের এক প্রাণবন্ত শিক্ষাঙ্গন। স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতায় ক্যাম্পাসটি অর্জন করেছে এশিয়া প্যাসিফিক পুরস্কার।
এখানে একসাথে ২০,০০০ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা হয়।। এর উদ্যোক্তা, ব্র্যাক ফাউন্ডেশন—দারিদ্র্য বিমোচন ও শিক্ষার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধকারী বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এনজিও। সমতা, স্থায়িত্ব এবং সামাজিক ক্ষমতায়নের মূল্যবোধের বাস্তব রূপ হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
১৩-তলা এই ক্যাম্পাসটি একটি “ক্লাব স্যান্ডউইচ” কৌশল ব্যবহার করে নির্মিত। এই সুসংহত নকশাটি ২.১৪ হেক্টর জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের স্থানও তৈরি করে। প্রকল্পটি একাধিক স্তরে শিক্ষাগত, নাগরিক এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রমকে একীভূত করেছে।
এখানে শ্রেণীকক্ষ, গবেষণাগার, অডিটোরিয়াম, বহুমুখী হল, অ্যাম্ফিথিয়েটার এবং ছাদে সুইমিং পুল, ক্রিকেট পিচ ও রানিং ট্র্যাকের মতো বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে।
এই ভবনটিতে রয়েছে আধুনিক ও প্রাকৃতিক ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা। এটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভরতা কমায় এবং এমন এক আরামদায়ক শিক্ষণ পরিবেশ তৈরি করে যা শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত করে।
ব্র্যাক ফাউন্ডেশন এমন একটি উদ্ভাবনী নগর ক্যাম্পাস চেয়েছিলো যা সমাজের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে এবং শিক্ষাগত উৎকর্ষের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে সহায়তা করবে। এই সংক্ষিপ্ত বিবরণে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ নগর প্রেক্ষাপটে স্থায়িত্ব, সামাজিক একীকরণ এবং মানব কল্যাণের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ডিজাইনে।
এই নকশায় পোড়ামাটির ইট, সবুজায়ন এবং উন্মুক্ত কংক্রিটের মতো স্পর্শযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, যা স্থানীয় ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করার পাশাপাশি স্থায়িত্ব এবং কম রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে। স্থানীয় টাইলস এবং ফিনিশিং আঞ্চলিক সরবরাহকারীদের সহায়তা করে।
মডিউলার পরিকল্পনা ভবিষ্যতের অভিযোজনযোগ্যতা এবং শিক্ষক সংখ্যা পরিবর্তনের সুযোগ করে দেয়। কাঠামোটি ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। শিক্ষাদান এলাকায় ন্যূনতম ব্যয়ে ফিনিশিং কাজ সম্পন্ন করা হয়। । শিক্ষার্থীদের হ্যাঙ্গআউটের জায়গাগুলোও যেনো প্রাণবন্ত থাকে সে বিষয়ও চিন্তা করেছেন স্থপতি।
উন্নয়ন শুরু হয় ২০১১ সালে, নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে এবং কার্যক্রম চালু হয় ২০২৪ সালে। যেহেতু নগর বাস্তবতার প্রেক্ষাপটের জন্য বিচক্ষণভাবে নির্ধারিত জায়গায় কাজটি করতে হবে তাই প্রকল্পটি উচ্চ-কার্যক্ষমতাসম্পন্ন ও টেকসইহবে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়। পাশাপাশি ব্যয়-সাশ্রয়ীতাকে অগ্রাধিকারও দেয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি অবহেলিত শহুরে জমি পুনরুদ্ধার করে সেটিকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে রূপান্তরিত করেছে। পাড়া-মহল্লার নেটওয়ার্কের সাথে একীভূত করা হয়েছে এই ক্যাম্পাসটি। কাজ শেষ হওয়ার পর থেকে, ক্যাম্পাসকে সহায়তা করার জন্য ছোট ছোট খাদ্য, পানীয় এবং বিনোদনমূলক ব্যবসা গড়ে উঠেছে। আবাসিক ইউনিটগুলো শিক্ষার্থী ও কর্মীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়, যা আয়ের উৎস তৈরি করে এবং শিক্ষামূলক পরিবেশকে উৎসাহিত করে।
নকশাটি ২৬,০০০ বর্গমিটার ল্যান্ডস্কেপিংয়ের মাধ্যমে ১৩০% সবুজ প্লট অনুপাতে সাজানো হয়েছে। এতে সবুজায়ন বৃদ্ধির পাশাপাশি শহুরে ঘনত্বের মধ্যে শ্বাস নেয়ার সুযোগ তৈরি করে।
ক্যাম্পাসটি মাঝারি-উচ্চতা, উচ্চ-ঘনত্ব এবং উচ্চ-সুবিধাসম্পন্ন নকশার একটি নতুন ধরন উপস্থাপন করে। শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য প্রধানত এসকেলেটর এবং প্রশস্ত সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়, যা সক্রিয়, স্বাস্থ্যকর এবং অত্যন্ত সামাজিক গতিশীলতার উপর জোর দেয়।
গ্রাউন্ড উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, যার ফলে এলাকার বাসিন্দারা ক্যাম্পাস পার্ক ব্যবহার করে যানবাহনের নাগালের বাইরে থাকা এলাকাগুলোতেও প্রবেশ করতে পারেন। নকশাটি সর্বজনীন নকশার নীতির উপর ভিত্তি করে তৈরি। ফলে সকল সক্ষমতার মানুষের জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করে। এটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বাধা দূর করে এবং বিভিন্ন শাখার মধ্যে মিথস্ক্রিয়াকে উৎসাহিত করে।
প্রকৃতি-বান্ধব ও জীবপ্রেমী এই পরিবেশটি নির্বিঘ্ন অভ্যন্তরীণ-বাহ্যিক সংযোগ এবং বিস্তৃত ভূদৃশ্যের মাধ্যমে বাসিন্দাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে আরও উন্নত করতে সহায়তা করে। ভবনের নকশাটি জমায়েতের স্থানগুলোতে বাতাস প্রবাহিত করে এবং একই সাথে রোদ ও বৃষ্টি থেকে ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষদের আশ্রয় প্রদান করে।
ক্যাম্পাস পার্কটি নাগরিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, যেখানে শিক্ষার্থী ও বৃহত্তর সম্প্রদায়ের উপকারে আসে এমন সর্বজনীন সুবিধা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে একটি পাড়া-মহল্লার অনুঘটকে রূপান্তরিত হয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে ব্র্যাক ফাউন্ডেশনের অঙ্গীকারকে তুলে ধরে।

















