স্থাপত্য জগতে নারীদের অবদানকে সম্মান জানাতে প্রতি বছর আয়োজিত হয় আর্কিটেকচারাল রেকর্ডের “উইমেন ইন আর্কিটেকচার ডিজাইন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডস”। যা পেশাদার জগতে নারীদের অর্জন ও নেতৃত্বকে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের বিজয়ীদের সম্মাননা প্রদান করা হবে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়, শিকাগোর ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ক্যাম্পাসে অবস্থিত মিস ভান ডার রোহে-নির্মিত এস.আর. ক্রাউন হলে। একই দিন দুপুরে একই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে “সাসটেইনেবিলিটি ইন প্র্যাকটিস” সম্মেলনও।
এ বছরের পাঁচজন নতুন সম্মাননাপ্রাপ্ত হলেন— মার্লিন ইমিরজিয়ান, মে-লিং লোককো, ক্লেয়ার মিফলিন, অ্যান শপফ এবং ক্যারল ওয়েজ।

মার্লিন ইমিরজিয়ান: টেকসই ও স্থানভিত্তিক নকশার পথিকৃৎ
মার্লিন ইমিরজিয়ান হলেন মার্লিন ইমিরজিয়ান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস আর্কিটেক্টস-এর প্রতিষ্ঠাতা, যার কার্যালয় ফিনিক্স ও ক্যালিফোর্নিয়ায়। তার প্রতিষ্ঠান টেকসই ও স্থানভিত্তিক নকশায় বিশেষভাবে পরিচিত, এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্যিক ও আবাসিক নানা খাতে কাজ করে। তিনি ২০১৩ সালে এআইএ কলেজ অব ফেলোজে উন্নীত হন এবং ২০১১ সালে এআইএ অ্যারিজোনা আর্কিটেক্টস মেডেল পান। ২০১৫ সালে তার প্রতিষ্ঠান এআইএ অ্যারিজোনার সেরা ফার্মের স্বীকৃতি পায়।

তার কাজ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে, সম্প্রতি “আউট দেয়ার” বইয়েও তিনটি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শিক্ষকতাও করেছেন অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে, আর দায়িত্ব পালন করেছেন এআইএ ন্যাশনাল কমিটি অন ডিজাইনসহ একাধিক নেতৃত্বমূলক পদে।

মে-লিং লোককো: বায়োভিত্তিক উপকরণের গবেষক
ঘানা ও ফিলিপাইন বংশোদ্ভূত মে-লিং লোককো একজন স্থাপত্য বিজ্ঞানী, ডিজাইনার ও শিক্ষক, যার কাজ মূলত বায়োভিত্তিক উপকরণ নিয়ে গড়ে ওঠা মূল্যব্যবস্থার নকশা নিয়ে। তার কাজ ভেনিস বিয়েনালে, নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট, স্টকহোমের নোবেল প্রাইজ মিউজিয়ামসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রখ্যাত স্থানে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্কিটেকচারে সহকারী অধ্যাপক এবং ঘানার আক্রায় প্রতিষ্ঠিত উইলো টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা। ইয়েলে তার গবেষণা মূলত অ-বিষাক্ত, স্বল্প-কার্বন উপকরণ ও বিকেন্দ্রীভূত অবকাঠামো নকশা নিয়ে। এর আগে তিনি কুপার ইউনিয়ন ও রেনসেলার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে (আরপিআই) শিক্ষকতা করেছেন।

তার গবেষণা ইউএন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থায়ন পেয়েছে। তিনি আরপিআই থেকে পিএইচডি ও টাফ্টস ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন, এবং বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল লিভিং ফিউচার ইনস্টিটিউট ও নিউইয়র্কের আর্কিটেকচারাল লিগের বোর্ড সদস্য।

ক্লেয়ার মিফলিন: বর্জ্যমুক্ত নগর নকশার প্রবক্তা
ক্লেয়ার মিফলিন একজন স্থপতি ও বৃত্তাকার (সার্কুলার) ব্যবস্থার চিন্তাবিদ, যিনি নগর অবকাঠামোকে এমনভাবে নতুন করে ভাবেন যেখানে সম্পদের পুনর্ব্যবহার ক্রমাগত চলতে থাকে। তিনি সেন্টার ফর জিরো ওয়েস্ট ডিজাইন নামক অলাভজনক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক এবং থিংকওভেন নামক নকশা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রধান, যা রৈখিক “তৈরি করো-ব্যবহার করো-ফেলে দাও” প্রবাহকে বৃত্তাকার প্রবাহে রূপান্তরের কাজ করে। দুটি প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে ২০১৭ সালে তার নেতৃত্বে প্রণীত “জিরো ওয়েস্ট ডিজাইন গাইডলাইনস”-এর ধারাবাহিকতায়, যা নিউইয়র্কের সেন্টার ফর আর্কিটেকচার ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের সহায়তায় তৈরি হয়েছিল।

বর্জ্যকে একটি নকশাগত ত্রুটি হিসেবে দেখেন মিফলিন এবং এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা করেন যেখানে আবর্জনার অস্তিত্ব থাকবে না। নিউইয়র্কে বসবাসরত তিনি এআইএ কমিটি অন দ্য এনভায়রনমেন্টসহ বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।

অ্যান শপফ: প্রমাণভিত্তিক নকশার চার দশক
মাহলাম আর্কিটেক্টস-এর সিনিয়র ডিজাইন প্রিন্সিপাল অ্যান শপফ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নকশার উৎকর্ষতা, পরিবেশগত দায়িত্বশীলতা ও প্রমাণভিত্তিক গবেষণা নিয়ে কাজ করছেন। সিয়াটল ও পোর্টল্যান্ডভিত্তিক তার কাজের পরিধি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে বিস্তৃত। তার নেতৃত্বে গত ৩৬ বছরে মাহলাম চারটি এআইএ কোট টপ টেন পুরস্কার ও শতাধিক ডিজাইন সম্মাননা অর্জন করেছে।

তার কাজ প্রকৃতি ও জলবায়ুর সঙ্গে গভীর সংযোগের জন্য পরিচিত, এবং তিনি লেখক জো মেয়োর সঙ্গে ম্যাস টিম্বার নির্মাণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এআইএ-তে তিনি ২০১১ সালে ন্যাশনাল কমিটি অন ডিজাইনের সভাপতিত্ব করেছেন এবং ২০০৭ সালে ফেলোশিপে উন্নীত হন। তিনি রেনসেলার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে স্থাপত্য ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

ক্যারল ওয়েজ: এআইএ-র নেতৃত্বে
ক্যারল ওয়েজ বর্তমানে এআইএ-র নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এর আগে তিনি টানা ১৭ বছর বোস্টনভিত্তিক শেপলি বুলফিঞ্চের প্রেসিডেন্ট ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে উন্মুক্ত ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত করে ডারহাম, হার্টফোর্ড, হিউস্টন ও ফিনিক্সে কার্যালয় খুলে একে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন।
ওয়েজ এআইএ-র একজন ফেলো এবং ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব মাইনরিটি আর্কিটেক্টসের সদস্য। তিনি এআইএ আর্কিটেক্টস ফাউন্ডেশন ও বোস্টন সোসাইটি অব আর্কিটেক্টসের বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এআইএ উইমেন’স লিডারশিপ সামিটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বিএসএর ২০২৩ সালের অনার অ্যাওয়ার্ড ও এআইএ-র ২০২০ সালের এডওয়ার্ড সি. কেম্পার অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন।

২০২৬ সালের এই পাঁচজন সম্মাননাপ্রাপ্ত স্থপতি প্রমাণ করেন, স্থাপত্য শুধু ভবন নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি টেকসই উপকরণ গবেষণা, বর্জ্যমুক্ত নগর পরিকল্পনা ও পেশাগত নেতৃত্বের মতো বহুমুখী ক্ষেত্রেও বিস্তৃত। মার্লিন ইমিরজিয়ান, মে-লিং লোককো, ক্লেয়ার মিফলিন, অ্যান শপফ ও ক্যারল ওয়েজের কাজ দেখায় কীভাবে নারী নেতৃত্ব ধীরে ধীরে স্থাপত্য পেশার কেন্দ্রীয় স্থানে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর শিকাগোর এস.আর. ক্রাউন হলে তাদের এই অবদান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাবে, যা কর্মসূচির ত্রয়োদশ বছরে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
তথ্যসূত্র: আর্কিটেকচারাল রেকর্ড
















