স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণের শিল্প নয়। এটি মানুষের জীবনধারা, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কেরও প্রতিফলন। গত তিন দশকে বিশ্বজুড়ে এমন অনেক ভবন নির্মিত হয়েছে যা মানুষের নজর কেড়েছে। কিছু ভবন বাঁকানো, তরল ও ভাস্কর্যসদৃশ নকশা, স্থাপত্যে নতুন এক যুগের সূচনা করেছিলো। এই ধারা পরিচিতি পায় ”ব্লব স্থাপত্য” নামে।
কিন্তু বর্তমানে স্থপতি ও স্থাপত্য সমালোচকদের মধ্যে নতুন একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে। শুধু আকর্ষণীয় আকৃতি কি ভবিষ্যতের স্থাপত্যের জন্য যথেষ্ট? নাকি ভবিষ্যতের ভবনকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব, মানুষের জন্য উন্মুক্ত এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আলোচনায় এসেছে ম্যাড আর্কিটেক্টস এর ডিজাইন করা ”শেনঝেন বে কালচারাল সেন্টার”। অনেকের মতে, এটি প্রমাণ করছে ভবিষ্যতের স্থাপত্য আর শুধুমাত্র একটি ভবন হিসেবে নির্মিত হবে না। আগামীর বাসভবনগুলো হয়ে উঠতে পারে একেকটি জীবন্ত ল্যান্ডস্কেপ।
ব্লব স্থাপত্য কী?
ইংরেজি‘Blob’ শব্দটির অর্থ হলো এমন একটি জৈবিক বা অনিয়মিত আকৃতি, যার নির্দিষ্ট কোণা বা সরল রেখা নেই। ১৯৯০-এর দশকে ডিজিটাল মডেলিং সফটওয়্যারের উন্নতির ফলে স্থপতিরা এমন সব ভবনের নকশা করতে শুরু করেন। আগে হাতে আঁকা ভবনগুলোতে এমন নকশা করা প্রায় অসম্ভব ছিলো।
এই ধারার ভবনগুলোর বৈশিষ্ট্য—
- বাঁকানো ও তরল আকৃতি
- প্রচলিত আয়তাকার নকশার পরিবর্তে ভাস্কর্যধর্মী রূপ
- উন্নত কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহার
- দর্শনীয় ও আইকনিক উপস্থিতি
বিশ্বজুড়ে এই ধারা জনপ্রিয় করে তুলেছেন জাহা হাদিদ, ফিউচার সিস্টেমস, ইউএনস্টুডিও, গ্রেগ লিনের মতো নামকরা স্থপতি ও স্থাপত্য সংস্থাগুলো।

কেন জনপ্রিয় হয়েছিলো ব্লব স্থাপত্য?
বিশ শতকের শেষ দিকে শহরগুলো নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে চেয়েছিল নতুন ধরণের আইকনিক ভবনের মাধ্যমে। ফলে স্থাপত্যে শুরু হয় এক ধরনের প্রতিযোগিতা। কে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ভবন নির্মাণ করবে কিংবা কে সবচেয়ে সাহসী আকৃতি ব্যবহার করবেন সেটিই ছিলো প্রতিযোগিতার মূল বিষয়।
এছাড়া কোন ভবন পর্যটকদের আকর্ষণ করবে এ বিষয়টিকেও প্রাধান্য দেয়া হতো ভবনের ডিজাইনের প্রতিযোগিতায়। এই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য জাদুঘর, কনসার্ট হল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও বাণিজ্যিক ভবন ব্লব নকশায় নির্মিত হচ্ছে।
ব্লব স্থাপত্যের যুগ কি শেষ?
বর্তমানে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এ ধরণের ভবনের অনেকগুলোই শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর নির্ভরশীল। সমালোচনার প্রধান কারণগুলো হলো—
১. নকশা বাস্তব ব্যবহারের সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক ভবনের বাইরের অংশ অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও ভেতরের পরিকল্পনা প্রচলিত ভবনের মতোই থাকে।
২. নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি হয়ে থাকে। এ ধরণের ভবন নির্মাণে বিশেষ ধরণের ইস্পাত, কংক্রিট, কাচ ও জটিল প্রযুক্তি প্রয়োজন।
৩. ভবনের পরিবেশগত প্রভাব একটি ব্যাপক বিষয়। বড় আকারের কংক্রিট ও স্টিল ব্যবহারের কারণে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়।
৪. এ ধরণের ভবন রক্ষণাবেক্ষণের জটিলতা অনেক বেশি হয়ে থাকে। অনিয়মিত আকৃতির ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অন্য সাধারণ আকৃতির ভবনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে নতুন করে রং করা, পলেস্তরা করা ইত্যাদি কাজে।

নতুন ধারণা হিসেবে ব্লব স্থাপত্য
চীনের বিখ্যাত স্থপতি ম্যাঁ ইয়ানসং বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতের স্থাপত্য কেবল একটি ভবন হিসেবেই নির্মাণ করা হবে না। একটি প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের অংশ হিসেবে আগামীর স্থাপত্য ও নতুন নির্মিত ভবনগুলোকে ভাবা উচিত।
শেনঝেনের এই কালচারাল সেন্টারটির স্থপতি ম্যাঁ ইয়ানসং বলেন, একটি ভবন যেন পাহাড়, নদী কিংবা প্রাকৃতিক ভূমির মতো মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। এই ধারণা থেকেই তিনি তৈরি করেছেন ”শেনঝেন বে কালচারাল সেন্টার”
ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক নগরভূমি
চীনের শেনঝেন শহরে নির্মিত এই বিশাল প্রকল্পটি শুধু স্থানীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেই নির্মাণ করা হয়নি। এতে অনেক কিছুও যুক্ত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ডিজাইন মিউজিয়াম
- প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর
- থিয়েটার
- প্রদর্শনী এলাকা
- উন্মুক্ত জনপরিসর
- সবুজ ছাদ
- হাঁটার পথ
- সামাজিক মিলনকেন্দ্র

চীনা ঐতিহ্যের প্রভাব
ম্যাঁ ইয়ানসং এর নকশায় চীনা ল্যান্ডস্কেপ চিত্রকলার গভীর প্রভাব রয়েছে। চীনের প্রাচীন শিল্পে পাহাড়, মেঘ, পানি ও প্রকৃতি একসঙ্গে মানুষের অনুভূতির প্রতীক। এই দর্শন আধুনিক স্থাপত্যেও প্রয়োগ করেছেন তিনি। ফলে ভবনটি দূর থেকে অনেকটা প্রাকৃতিক পাহাড়ের মতো দেখায়।
ভবিষ্যতের শহরে ল্যান্ডস্কেপ স্থাপত্যের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। বিশ্বের বড় শহরগুলো ক্রমেই ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় মানুষের প্রয়োজন উন্মুক্ত স্থান, সবুজ পরিবেশ, হাঁটার সুযোগ, সামাজিক যোগাযোগের স্থান এবং মানসিক প্রশান্তি। শুধু উঁচু ভবন নির্মাণ করে এসব চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। তাই আধুনিক নগর পরিকল্পনায় ল্যান্ডস্কেপভিত্তিক স্থাপত্যের গুরুত্ব বাড়ছে।
টেকসই স্থাপত্যের সঙ্গেও সম্পর্ক আছে ব্লব স্থাপত্যের। বর্তমানে স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে কম কার্বন নিঃসরণে উন্নত ভবন নির্মাণ করা যায়। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সবুজ ছাদ, প্রাকৃতিক আলো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, শক্তি সাশ্রয়ী নকশা, উন্মুক্ত জনপরিসর, স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়
বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়নের পথে এগোচ্ছে। নতুন শহর, আবাসন প্রকল্প, বাণিজ্যিক ভবন ও সরকারি স্থাপনা নির্মাণের সময় ল্যান্ডস্কেপভিত্তিক নকশা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নদীতীর উন্নয়ন, হাওর ও জলাভূমি অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাপত্য দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।
স্থাপত্য গবেষক এরন বেটস্কির লেখনী থেকে
১৯৯০-এর দশকে অ্যাভান্ট-গার্ড স্থপতিরা তাদের কম্পিউটার স্ক্রিনে প্রথম যে সাবলীল স্থাপত্যের জন্ম দিয়েছিলেন তার পরবর্তী দশকগুলোতে পরিবর্তিত হয়েছে। জাহা হাদিদ, ইউএনস্টুডিও ও ফিউচার সিস্টেমসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পুরনো ধাচের স্থাপত্যগুলো বড় বড় ভবনের জগতে নিয়ে আসে। বর্তমানে এই ধারাই আমাদের স্থাপত্য জগতের নকশা ও নির্মাণের একটি প্রতিষ্ঠিত অংশ হয়ে উঠেছে।
অনেক ক্ষেত্রে, আধুনিক এই ভবনগুলোর বক্রতা কেবলই শৈলীগত হয়ে থাকে। হোক সে সর্পিল বারান্দা বা ছাদ, সম্মুখভাগে সামান্য বাঁক বা ভাঁজ, অথবা স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে যতটুকু সম্ভব প্রসারিত ক্যান্টিলিভার কিন্ত ভেতরের এর কোন প্রভাব নেই। মূল কাঠামোটি ধাতু ও কাচের প্যানেল দিয়ে আবৃত করা হয়।
এমনকি যখন ভবনটিকে একটি সাবলীল বস্তুপুঞ্জ বলে মনে হয়, তখনও এর নকশা এবং অন্যান্য বিষয়গুলো প্রচলিতই থাকে। কাচের প্রতিটি ফলক আকৃতিযুক্ত কি না, তা দেখেই বাজেটের আকার বোঝা যায়।
এই পরিবর্তনশীল স্থাপত্যকে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে তার কাছে প্রশ্নটি শুধু এটাই নয় যে, কোথায় শৈলী নকশার বিষয়বস্তুকে নিয়ে আবার পুন:মূল্যায়ন করা। তার প্রশ্নটি হলো সম্ভাব্য এই পুনর্মূল্যায়ন কিসের ওপর নির্ভর করে করা যাবে?
ম্যাঁ ইয়ানসং এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান, এম.এ.ডি.-এর কাজকে একটি কেস স্টাডি হিসেবে ব্যবহার করেছেন বেটস্কি। ম্যাঁ এর নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি তাঁর ভবনগুলোকে স্থূল বস্তু হিসেবে নয়, বরং ভূদৃশ্য হিসেবে দেখেন।
প্যারামেট্রিক্সের পাশাপাশি চীনা চিত্রকলা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এ ডিজাইন করেছেন। চীনের শহরগুলো বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় গণ-কার্যক্রমের ব্যাপকতা ও জটিলতার প্রতি সাড়া দিয়েছেন ম্যাঁ। তিনি ভূদৃশ্য-ভবনগুলোকে আকাশচুম্বী অট্টালিকার চেয়েও বেশি কিছুতে পরিণত করার একটি উপায় তৈরি করেছেন।
বাহ্যিক ভূদৃশ্যের ক্ষেত্রে একই কথা বলা যায় না। প্রবেশদ্বারের বাইরে ভবনটির বহিঃভাগ অবিচ্ছিন্ন এবং প্রায় নিরবচ্ছিন্ন। এটি উপসাগরীয় এলাকা থেকে উঠে এসে নুড়িপাথরের জন্য যেনো একটি মঞ্চ তৈরি করেছে। যার ভেতরে নান শান শওকতের অফিস, হোটেল ও আবাসিক টাওয়ারের আধুনিকতাবাদ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
পথগুলো তৃণভূমি ও টেরেসের চারপাশে বাঁক নিয়ে উপরে উঠে গেছে, যা দেখলে মনে হয় উন্মুক্ত দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এগুলো দর্শনার্থীদের মনে স্বস্তির মুহূর্ত এনে দেয়। কেবল আগে থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সতর্ক নিরাপত্তা ও শিষ্টাচার নির্দেশিকাগুলো একজন দর্শনার্থীকে মাঝে মাঝেই থামিয়ে দিতে পারে।
এম.এ.ডির সকল প্রকল্পের মধ্যে শেনজেন প্রকল্পের ভিন্নতা হলো, গ্যালারি, পারফরম্যান্স স্পেস, আঁকাবাঁকা লবি ও মিলনস্থল। দোকান ও রেস্তোরাঁর বিশাল, অর্ধ-ভূগর্ভস্থ, অর্ধ-উন্মুক্ত ভূখণ্ডে ম্যাঁ-এর স্থাপন করা জলের বুদবুদ বা পাথরের উপস্থিতি।
স্থাপত্য গবেষক ও সমালোচক এরন বেটস্কি এই প্রকল্প সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্যই করেছেন। তবে কিছু নেতিবাচক মন্তব্য আছে যা সময়ে সাথে সাথে বদলানোর সম্ভাবনাও থাকে। মূল্যায়ন অনুযায়ী এই প্রকল্পের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিকটি হলো, এখানে এক নতুন ধরনের স্মারকত্বের ছোঁয়া রয়েছে যা এর উদ্ভবের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে যথাযথ।
এই প্রকল্প সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমার দীর্ঘদিনের আবেদনটি অব্যাহত রেখে আমি শুধু এটাই কামনা করি যে, এই ধরনের রূপ ও তাৎপর্য যেন বিদ্যমান কাঠামো এবং ভূমিরূপের ভেতরেই খুঁজে পাওয়া যায়। শেনজেন ও অন্যত্র দ্রুতগতিতে চলমান কার্বন-অপচয়কারী নির্মাণকাজের বিশাল স্তূপের সাথে এগুলোকে যেন অতিরিক্ত হিসেবে নির্মাণ করা না হয়।
‘ব্লব’ স্থাপত্য আধুনিক স্থাপত্যকে এক নতুন ভাষা দিয়েছিলো। এটি দেখিয়েছে যে ভবন শুধু চার দেয়ালের কাঠামো নয়, বরং শিল্পেরও একটি শক্তিশালী প্রকাশ এতে হতে পারে। তবে বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন এবং জনপরিসরের সংকট স্থপতিদের নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
শেনঝেন বে কালচারাল সেন্টার সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি দেখায়, ভবিষ্যতের স্থাপত্য কেবল চোখে সুন্দর হলেই চলবে না। মানুষের জীবন, প্রকৃতি এবং নগর পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হতে হবে। সবুজ ছাদ, উন্মুক্ত জনপরিসর, পরিবেশবান্ধব নকশা এবং ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে সংযোগ—এসবই আগামী দিনের স্থাপত্যের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: আর্কিটেক্ট
















