ছিমছাম সাজে ছোট্ট গৃহকোণ

অন্দরসজ্জায় রং নিয়ে খেলা চলে কখনো আসবাবে, দেয়ালে আবার কখনো বা গৃহসজ্জাসামগ্রীতে। রঙের ব্যবহার হয় ঋতুভিত্তিক, কখনো বা উৎসবের ওপর, আবার কখনো ঘরে বসবাসরত ব্যক্তির রুচির ওপর। এমন অন্দরসজ্জা অনেকেই করছেন দেশীয় উৎসবের বিষয়কে ভিত্তি ধরে রঙের নান্দনিক ব্যবহারে। আবার দেশীয় আমেজের সঙ্গে বিদেশি সংস্কৃতির মিশ্রণে তৈরি করছেন ফিউশন অন্দরসজ্জা; যেমন- লাল-সবুজ স্বাধীনতা দিবসে আবার লাল-সাদা বড়দিনের উৎসবে। রংগুলো যেন ফুটিয়ে তুলছে  দিবসটির প্রতীকী রূপ। আর উৎসবভিত্তিক রংগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে অনেকেই সাজাচ্ছেন আপন গৃহ।

ঘরকে সুন্দরভাবে সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ ঘরটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। পরিষ্কার অভিযানের শুরুটাই হয় আপনার ঘরের প্রবেশদ্বারে। এটিই হচ্ছে আপনার ঘরের প্রথম ও শেষ ইমপ্রেশন-এক্সপ্রেশন। ঘরের প্রবেশপথকে নজরে আনার জন্য ব্যতিক্রমী ডেকোরেশনের বিকল্প নেই। একটি লম্বা ফুলদানি বা বড় কোনো ভাস্কর্য রাখতে পারেন প্রবেশপথের দেয়ালের কোণে অথবা মাটির পটারির সঙ্গে ভাসমান মোমদানি সহযোগে। দেয়ালে টাঙিয়ে দিন কাঠ, বাঁশ, বেত অথবা আলপনা করা আয়না। স্বাধীনতা দিবসের আমেজ আনতে শিল্পীর আঁকা পেইন্টিংও টাঙিয়ে দিতে পারেন দেয়ালে। একটি ছবিই অনেক সময় বলে দেবে অন্দরসজ্জার মূল থিমটি কী। বড়দিনের আমেজ আনতে প্রবেশপথে রাখুন একটি ক্রিসমাস ট্রি। মরিচবাতি লাগিয়েও ডেকোরেশন করতে পারেন ট্রিটিকে। নানা ধরনের রঙিন বল, তারা ইত্যাদি দিয়েও সাজাতে পারেন প্রবেশপথকে।

মেহমান আসার ঘরটি যদি সুন্দরভাবে সাজানো না থাকে তবে সব আয়োজনই কিন্তু মাটি হতে বাধ্য। তাই উৎসবে অতিথি আপ্যায়নে বসার ঘরটি কীভাবে সাজাবেন তা নিয়ে চলে নানা জল্পনা-কল্পনা। ঘরের প্রধান সৌন্দর্য হলো পর্দা, ঘরের পর্দা হওয়া চাই পরিষ্কার, সঙ্গে ভালোমতো ইস্ত্রি করে পর্দা ঝোলাতে হবে। আর নতুন পর্দা হলে তো কথাই নেই। স্বাধীনতা দিবসের জন্য লাল-সবুজ রং আর বড় দিনের জন্য লাল-সাদাকে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। যদি বৈচিত্র্য আনতে চান, নতুনত্ব আনতে চান তাহলে শাড়িকেই পর্দা হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তবে আরও নতুনত্ব আনতে চাইলে আপনার ঘরের সঙ্গে মানানসই এক রঙা পর্দা কিনে তাতে অন্য রঙের ব্লকপ্রিন্ট করতে পারেন। যেমন- সাদা পর্দায় লাল রঙের, লাল পর্দায় সবুজ রঙের আর সবুজ পর্দায় লাল রঙের ব্লক করাতে পারেন। সোফার কভার ও কুশন কভার বেছে নিতে পারেন উৎসবের থিমকে মাথায় রেখে।

যদি আপনার শোবার ঘরের ইন্টেরিয়র করতে চান সেক্ষেত্রে প্রথমেই আপনি পর্দা, বিছানার চাদর, কুশন কভার পছন্দ করে নিন। পর্দার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে চাদর, কুশন কভার, কার্পেট, শতরঞ্জি নির্বাচন করুন। সম্ভব হলে নতুন কুশন কভার ব্যবহার করুন। কুশন কভার শুনেই হয়তো দামের কথা চিন্তা করছেন। এক কাজ করুন না, সস্তা কাপড় কিনে বাড়িতেই কুশন কভার বানিয়ে নিন। এবার বাড়িতে পড়ে থাকা কোনো পুরোনো জামদানি কিংবা জরির পার কেটে লাগিয়ে নিন কুশন কভারে। দেখুন তো আপনার কুশনগুলো দোকান থেকে কেনা দামি কুশনের থেকে কোনো অংশে কম কি না। ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে এসব খুঁটিনাটি জিনিস মাথায় রাখলে খুব কম খরচে ঘরকে সাজিয়ে তোলা যায়। কম পয়সায় এসব জিনিস আমাদের চারপাশেই রয়েছে। শুধু দরকার ইচ্ছে, সৃজনশীল মন আর রুচিশীল চোখ। কোন জিনিসটি ঠিক কোন জায়গায় মানাবে, এটা জানা থাকলে আপনিও খুব সহজেই ঘরকে সাজিয়ে তুলতে পারেন বৈচিত্র্যতা নিয়ে।

সাজানো-গোছানো সুন্দর ডাইনিংরুমে অতিথিকে লাঞ্চ অথবা ডিনারে নিমন্ত্রণ করতে কার না ভালো লাগে। ডাইনিংরুমের সাজে চাই স্মার্ট ফ্যাশনেবল ডাইনিং টেবিল। খুব প্রচলিত কথা- ‘এসো বসো আহারে’, ছোট্ট এই কথাটিতেই জমজমাট ডাইনিং টেবিলের সমাহারের স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। লাল মেঝেতে কাঠের চওড়া পিঁড়ি কিংবা লাল পাড় বসানো বাপ-দাদার তৈরি আসনে বসার ব্যবস্থা। অথবা শ্বেত পাথরের টেবিল সঙ্গে কারুকাজ করা ভারী কাঠের চেয়ার। লাইফস্টাইল বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে এ  চিত্রও। বদলেছে আসবাব ও সরঞ্জামের দৃশ্যপটও। কিন্তু মূল সুরটি অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। খাওয়ার সময় আরাম-আয়াসের প্রয়োজন আজও। তা সে যে আসনই হোক। হোক না তা রট আয়রনের কুশন চেয়ার, লাল মেঝে কিংবা উডেন ফ্লোর। ডাইনিংরুমের সজ্জা ঠিক কেমন হবে তা নির্ভর করবে আপনার ঘরের আয়তন, ব্যবহারিক প্রয়োজন, অন্যান্য ঘরের অন্দরসাজের ওপর। যদি খাবার ঘরটি মোটামুটি বড় হয়, তবে বাড়ির অন্য আসবাবের সঙ্গে মিল রেখে বেশ পুরোনো একটা মেজাজে সাজানো যায় তা। ওভাল শেপের মেহগনি রাঙা ডাইনিং টেবিল, উজ্জ্বল লাল ম্যাট, নান্দনিক কোস্টার, লাল বর্ডারের সাদা চিনেমাটির প্লেট ও ডিজাইন করা গ্লাস ডাইনিংয়ের স্টাইলটিতে যোগ করতে পারে অনন্য এক মাত্রা। এর সঙ্গে যোগ হতে পারে হ্যাংর্ঙ্গি ল্যাম্প শেডে এস্থেটিক টাচ। খাবার ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়ার প্যাসেজে সামান্য একটা লাল পর্দাতেই সাজ সম্পূর্ণ হতে পারে। এখানেই অন্দরসাজের মুন্সিয়ানা। বাড়ি সাজানো মানেই যে একগাদা খরচ করতে হবে তা কিন্তু নয়। যথাযথ পরিকল্পনা, রঙের কম্পোজিশন ও ব্যবহারিক দিকটা মাথায় রেখে সাজানোয় হাত দিলেই কেল্লাফতে।

পুরোনো আসবাবে ফেলে আসা দিনের নস্টালজিয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন খারাপেরও একটা বিষয় থাকে। সাজে উজ্জ্বল লাল রঙের সংযোজনে উষ্ণতা ফিরে পায়, তৈরি হয় প্রার্থিত পরিবেশ। আবার ঘর যদি ছোট হয়, তবে আসবাব যথাসম্ভব সিম্পল রাখুন। কারুকাজ করা, কার্ভ এড়িয়ে চলুন। স্ট্রেট লাইন ফার্নিচার ব্যবহার করলে ভালো দেখাবে, জায়গা কম নেবে। যেমন হতে পারে কিচেন আর মূল ঘরের মাঝের প্যাসেজটুকুই একধারে বসার এবং একধারে প্লেন অ্যান্ড সিম্পল চৌকা একটা কাঠের টেবিল কিংবা সাধারণ চেয়ারে খাবার ব্যবস্থা। স্ট্রেট ব্যাকড চেয়ার ও টেবিলে চারজনের বসার ব্যবস্থায় স্থানাভাববশত কোনো বাহুল্য থাকবে না। তবে টেবিল চেয়ার ছোট ও সিম্পল হলেও ভ্যালু অ্যাডিশন করতে ব্যবহার করতে পারেন উজ্জ্বল সবুজ ম্যাট আর চেয়ারে ডিম্বাকৃতির দড়িবাঁধা কুশন। ঝাড়বাতির শখ থাকলেও ছোট্ট বাড়িতে বেমানান। মেলা বা খুচরা দোকান থেকে কেনা ল্যাম্পশেডের বিভিন্ন পিস জুড়ে জুড়ে ঝাড়বাতির আদল তৈরি করতে পারেন। আসলে ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন হলো ক্রিয়েটিভ প্রসেস। কিছু ব্যাকরণসম্মত নিয়ম থাকলেও আপনার খুশিমতো ব্যবহারে অদল-বদল করতেই পারেন। আপনার ঘর লাগোয়া খোলা জায়গা থাকলে অথবা একটা সুন্দর সাজানো ছাদ থাকলে তো কথাই নেই। ওপেন এয়ার ওয়াইন অ্যান্ড ডাইনের দারুণ ব্যবস্থা রাখতে পারেন। ডাইনিং চেয়ার-টেবিল আম কাঠের হতে পারে। কেননা, খোলা ছাদে আম কাঠের ডাইনিং টেবিলে শুধু একটা সাদামাটা লুকই তৈরি হয় না, এর ব্যবহারিক দিকও মাথায় রাখার মতো। আর এর ওয়েদার ডিউরেবিলিটি দারুণ। ফলে খোলা আকাশের নিচে মনোরম পরিবেশ দেবে দারুল প্রশান্তি। ল্যাম্প শেড হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন চিরাচরিত মাটির হাঁড়ি। এথনিক অ্যামবিয়েন্ট লাইটিং যাকে বলে আর কি! গাছপালা ব্যবহারে ইনডাইরেক্ট লাইটিং তৈরি করে দারুণ রোমান্টিক পরিবেশ। সাদা দেয়াল আর সাদা মেঝে যদি হয়ে থাকে, তবে তার মাঝে লাল ও হালকা সবুজের কটর টেবিল ক্লথ ব্যবহারে রঙের ছোঁয়া আনতে পারলে দেখতে দারুণ লাগবে। চেয়ারে লাল সবুজ অথবা লাল-সাদা কনট্রাস্ট কম্বিনেশনে তৈরি করতে পারেন ইন্টারেস্টিং কালার স্কিম। আর পুরোটাই নির্ভর করবে উৎসবের রঙের ওপর। আপনার ঘর যদি প্রশস্ত হয়, আর যদি ইচ্ছা থাকে, ঘরের ডাইনিং স্টাইলে থাকবে ফরমাল টাচ, তাহলে অন্যভাবে ভাবতে পারেন। আপনার বাড়ির খাবারঘরের কালার যদি হয় থিম হোয়াইট, তবে সাদা মার্বেলের মেঝে, দুধসাদা চেয়ার কভার, সাদা পর্দার সঙ্গে আয়তাকার গ্লাসটপ একেবারেই মানানসই হবে। অন্দরসাজে প্লেসমেন্ট অব ফার্নিচারও খুব জরুরি। কোনাকুনিভাবে রাখা খাবার টেবিল একটা বিশেষ ডায়মেনশন তৈরি করে।

অতএব কেমন হবে আপনার অন্দরসাজ, কোন ধরনের আসবাব আর ফেব্রিক্স ব্যবহার করবেন, তা আপনার পছন্দ আর চাহিদার ওপরেই নির্ভর করে। আর ইচ্ছাটাও একান্তই আপনার।

টিপস

  • বাড়তি মেহমানের বসার জন্য ড্রয়িংরুমে সোফাই যথেষ্ট নয়, সে জন্য কিছুটা জায়গা বের করে শতরঞ্জি, কার্পেট বা শীতল পাটি দিয়ে ফ্লোরিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। এতে দিন ছোট-বড় বিভিন্ন আকৃতির কয়েকটি কুশন।
  • সোফার পাশাপাশি বাড়তি কিছু চেয়ারও যোগ করতে পারেন ড্রয়িংরুমে। বেতের মোড়া বা টুলও রাখতে পারেন। ড্রয়িংরুম থেকে সেন্টার টেবিল সরিয়ে ফেলুন। বেশ খানিকটা জায়গা পাওয়া যাবে।
  • বেডরুমে কিছু অতিথির বসার ব্যবস্থা রাখতে পারেন। ফ্লোরিং করুন অথবা চেয়ার, মোড়া বা টুল রাখুন।
  • বাচ্চাদের পুরো ঘরটা কার্পেটিং করে তাতে কিছু কুশন, পুতুল ও খেলনা রাখুন। অতিথি শিশুরা এখানেই সময় কাটাতে পারবে।
  • ফ্ল্যাটের বারান্দায়ও কিছু চেয়ার, মোড়া বা টুল দিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারেন।
  • ডাইনিংরুমে বুফে স্টাইলে খাবার পরিবেশন করুন। জায়গাও কম লাগবে আর অনেক অতিথি একসঙ্গে খেতে পারবে।
  • বিছানায় রঙিন চাদর ব্যবহার করুন। ময়লা কম হবে। ঘরের পর্দা আগেই ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। বাথরুম পরিষ্কার ও শুকনা রাখুন। ঘরের আয়নাগুলো পরিষ্কার কি না খেয়াল রাখুন।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪

(অথর ‍যুক্ত করুন)

+ posts
Scroll to Top