লন্ডনের ইজলিংটনে অবস্থিত একটি গ্রেড-টু তালিকাভুক্ত দেরি জর্জিয়ান টেরেস বাড়িকে Studio Hagen Hall নতুনভাবে রূপ দিয়েছে। “হেইওন হাউস” নামের এই আবাসিক পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে জাপানি স্থাপত্যচিন্তা, সংযত আধুনিকতাবাদ এবং ঐতিহাসিক সংরক্ষণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে বাড়ির আয়তন বাড়ানো হয়নি বা নতুন কোনো বর্ধিত অংশ যোগ করা হয়নি। বিদ্যমান কাঠামোকেই পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নতুন অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়া হয়েছে।

পুরোনো বাড়ির ভেতরে নতুন বিন্যাস
হেইওন হাউসের নকশা মূলত অভ্যন্তরীণ বিন্যাসের পুনর্বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে। প্রচলিত পরিকল্পনার বিপরীতে প্রধান শয়নকক্ষকে নিচতলায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং বসার ঘরকে উপরের তলায় স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে উপরের তলায় দক্ষিণমুখী আলো এবং বাইরের সবুজ দৃশ্য আরও গভীরভাবে অনুভব করা যায়।
এই পুনর্বিন্যাস বাড়িটির ব্যবহারিক চরিত্রও বদলে দিয়েছে। প্রতিটি ঘর এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে চলাচল, আলো এবং নীরবতার মধ্যে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়। স্থাপত্য এখানে কেবল ঘরের বিন্যাসকে ছাপিয়ে জীবনযাপনের গতি ও অনুভূতিকেও প্রভাবিত করছে।

জাপানি স্থাপত্যভাবনার সংযত ব্যবহার
বাড়িটির ভেতরে জাপানি স্থাপত্যের বিভিন্ন ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত সংযতভাবে। প্রবেশমুখে তৈরি করা হয়েছে “গেনকান” মানে, জাপানি বাড়িতে ব্যবহৃত ধাপবিশিষ্ট প্রবেশ এলাকা, যেখানে বাইরের জুতা খুলে ভেতরে প্রবেশ করা হয়।
নিচতলার ছোট ও অন্তরঙ্গ বসার অংশে রয়েছে “তোকোনোমা” ধাঁচের একটি স্থাপত্য খোপ। জাপানি সংস্কৃতিতে এটি কেবল প্রদর্শনের জায়গা নয়, বরং শিল্প, নীরবতা ও মনোযোগের জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষ স্থান। এখানে বাসিন্দাদের সিরামিক সংগ্রহ প্রদর্শিত হয়েছে।
রান্নাঘর ও বসার অংশের মাঝখানে ব্যবহৃত টেক্সচারযুক্ত কাচের প্যানেলগুলো যা “শোজি” পর্দা থেকে অনুপ্রাণিত। এগুলো আলোর প্রবাহ বজায় রাখে, কিন্তু একই সঙ্গে ভেতরের অংশগুলোকে কিছুটা পৃথক করে।

উপকরণের নীরব ভাষা
হেইওন হাউসের অভ্যন্তরে উপকরণ ব্যবহারে রয়েছে স্পষ্ট সংযম। স্মোকড ওক কাঠ, মাইক্রোসিমেন্ট মেঝে, সাদা মোজাইক টাইলস এবং অপরিশোধিত পিতলের ব্যবহার পুরো বাড়িতে একটি স্থির ও শান্ত আবহ তৈরি করেছে।
স্থপতিরা উপকরণকে শুধুমাত্র নান্দনিক আবরণ হিসেবে ব্যবহার করেননি। কাঠের জয়নারি (জয়নারি) এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে তা সরিয়ে ফেললেও মূল ঐতিহাসিক কাঠামো অটুট থাকে। এর মাধ্যমে নতুন সংযোজন ও পুরোনো স্থাপত্যের মধ্যে একটি সংবেদনশীল সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে।

আলো, ছায়া ও পরিবেশের নির্মাণ
এই বাড়ির সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি হলো এর পরিবেশগত অনুভূতি। উজ্জ্বল ও সম্পূর্ণ খোলা অভ্যন্তরের পরিবর্তে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে নরম আলো, গাঢ়ভাবের কাঠ এবং ছায়ার স্তরবিন্যাস। ফলে পুরো বাড়িতে ধ্যানমগ্ন ও নীরব এক আবহ তৈরি হয়েছে।
পেছনের আউটরিগার অংশের মেঝে নিচে নামিয়ে একটি সাঙ্কেন ডাইনিং রুম তৈরি করা হয়েছে। এটি বাগানের স্তরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এর ফলে ভেতর ও বাইরের সীমারেখা অনেকটাই ঝাপসা হয়ে যায় এবং ডাইনিং অংশটি সরাসরি প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত বলে অনুভূত হয়।

সংরক্ষণ ও আধুনিকতার ভারসাম্য
পুরোনো স্কার্টিং বোর্ড, দরজার ফ্রেম এবং পূর্বে আড়াল হয়ে থাকা অগ্নিকুণ্ডের অংশগুলো পুরোপুরি বদলে ফেলা হয়নি। বরং সেগুলো মেরামত ও সংরক্ষণের মাধ্যমে নতুন নকশার অংশে পরিণত করা হয়েছে।
এই প্রকল্প দেখায় যে ঐতিহাসিক সংরক্ষণ মানে অতীতকে স্থির অবস্থায় আটকে রাখা নয়। নতুন ব্যবহার ও নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও পুরোনো স্থাপত্যকে জীবন্ত রাখা সম্ভব।

হেইওন হাউস এমন একটি প্রকল্প, যেখানে স্থাপত্যের ভাষা সংযত, ধীর এবং মনোযোগী। জাপানি নকশাচিন্তা, সংযত আধুনিকতাবাদ এবং জর্জিয়ান ঐতিহ্যের সমন্বয়ে Studio Hagen Hall এমন একটি আবাসিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যা একই সঙ্গে সমকালীন এবং গভীরভাবে মানবিক।
তথ্যসূত্র
ডিজেইন ম্যাগাজিন, মে, ২০২৬।
















