• Home
  • স্থাপত্য
  • ইরানের প্রাচীন বিষ্ণু মন্দিরে ভারতীয় ঐতিহ্যের ছাপ
Image

ইরানের প্রাচীন বিষ্ণু মন্দিরে ভারতীয় ঐতিহ্যের ছাপ

সম্প্রতি ভারতের কালজয়ী অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইরানের বন্দর আব্বাসে অবস্থিত ১৩৪ বছরের পুরনো একটি প্রাচীন বিষ্ণু মন্দিরের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেন। তার এ পোস্টের মাধ্যমে আবার আলোচনায় আসে ইরানের মতো মুসলিম-প্রধান দেশের প্রায় দেড়শত বছরের পুরনো একটি বিষ্ণু মন্দিরটি।

অমিতাভের পোস্টের পর বহু অনুরাগী মন্দিরটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে মন্তব্য করেন এবং ভারত-ইরান সম্পর্কের এই অজানা অধ্যায় নিয়ে নতুন করে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই রেশ ধরেই স্থাপত্যের দিক থেকে বিষ্ণু মন্দিরের আদ্যোপান্ত বোঝার চেষ্টায় এই রচনা।

ইরানের বন্দর আব্বাসে অবস্থিত ১৩৪ বছরের পুরনো একটি প্রাচীন বিষ্ণু মন্দির। ছবি: উইকিপিডিয়া

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী আব্বাসে অবস্থিত বিষ্ণু মন্দির দক্ষিণ এশিয়া ও পারস্যের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি এবং স্থানীয় ইরানি স্থাপত্যরীতির প্রভাব মিলিয়ে মন্দিরটি এক অনন্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পদচিহ্ন

বন্দর আব্বাস বহু শতাব্দী ধরে পারস্য উপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিল। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এসে বসতি গড়ে তোলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় তাদের নিজস্ব উপাসনালয় ছিল না। পরে স্থানীয় শাসক মোহাম্মদ হাসান খান সাদ আল-মুলকের অনুমতিতে ১৮৯২ সালে মন্দিরটি নির্মিত হয়। এর নির্মাণব্যয়ের বড় অংশ বহন করেছিলেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরাই।

মন্দিরটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এর স্থাপত্যে ভারতীয় ও ইরানি রীতির মেলবন্ধন। ছবি: উইকিপিডিয়া
স্থাপত্যে দ্বৈত ঐতিহ্যের প্রকাশ

মন্দিরটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এর স্থাপত্যে ভারতীয় ও ইরানি রীতির মেলবন্ধন। সাধারণত ভারতীয় মন্দিরের মতো উঁচু শিখরের পরিবর্তে এখানে ব্যবহৃত হয়েছে একটি বড় গম্বুজ, যা প্রচলিত ইসলামী স্থাপত্যরীতির প্রভাবকে স্পষ্ট করে। গম্বুজের ভেতরের অলংকরণে ইরানি ইসলামী শিল্পরীতির ছাপ দেখা যায়।

অন্যদিকে মন্দিরের বাইরের অংশে রয়েছে হিন্দু প্রতীক ও অলংকরণ। এতে ভারতীয় ধর্মীয় শিল্পরীতির উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সমন্বয় মন্দিরটিকে সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছে।

গম্বুজ ও অলংকরণের বৈশিষ্ট্য

পাথর, কাদা, কোরাল স্টোন, বালি ও চুনের মিশ্রণে, ইরানের মাখরানা শৈলী ও ভারতীয় স্থাপত্যকলার মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছিল অপুর্ব সুন্দর এই মন্দিরটি। মন্দিরটির উত্তর দিকে আছে তিনটি কক্ষ। মাঝের আয়তাকার কক্ষটি কাঠের তৈরি। পশ্চিমদিকে একটি ও দক্ষিণ দিকে আরও দু’টি কক্ষ আছে। মন্দিরের মাঝখানে থাকা বিশাল বর্গক্ষেত্রাকার কক্ষটির ওপরে আছে সুদৃশ্য গম্বুজ। কক্ষের পাশ থেকে ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গিয়েছে গম্বুজের দিকে। ইরানের মাকরানা স্থাপত্যে তৈরি গম্বুজটিকে ঘিরে আছে ৭২টি ছোট ছোট পদ্মকুঁড়ি আকৃতির চূড়া। এই ধরনের চূড়া সাধারণত দেখা যায় ভারতীয় শিব মন্দিরে।

মন্দিরের কেন্দ্রীয় গম্বুজটি এর প্রধান আকর্ষণ। গম্বুজের অভ্যন্তরে জ্যামিতিক নকশা ও খাঁজকাটা অলংকরণ ইসলামী শিল্পরীতির পরিচায়ক। একই সঙ্গে মন্দিরের ভেতরে কৃষ্ণের চিত্রকর্ম ও বুদ্ধমূর্তির উপস্থিতি এটিকে আরও ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। 

মন্দিরের বহির্ভাগে ছোট ছোট টাওয়ারসদৃশ অলংকরণও রয়েছে, যা পুরো স্থাপনাটিকে আলাদা নান্দনিকতা দিয়েছে।

অবহেলা ও পুনরুদ্ধার

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্দর আব্বাসে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি কমে গেলে মন্দিরটিও ধীরে ধীরে অবহেলিত হয়ে পড়ে। অনেক মূর্তি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং স্থাপনাটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পৌঁছায়। পরে সংস্কারের মাধ্যমে মন্দিরটি পুনরুদ্ধার করা হয়। বর্তমানে এটি দর্শনার্থী ও উপাসকদের জন্য উন্মুক্ত।

বান্দার আব্বাস বিষ্ণু মন্দির ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনন্য সংযোগস্থল। সমুদ্রপথের বাণিজ্য কেবল পণ্য আদান-প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সংস্কৃতি ও শিল্পরীতিরও বিনিময় ঘটায়। ভারতীয় ও ইরানি স্থাপত্য ঐতিহ্যের সমন্বয়ে নির্মিত এই মন্দির আজও দুই অঞ্চলের ঐতিহাসিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তথ্যসূত্র 

Atlas Obscura, NDTV

Related Posts

অন্ধকারে আলো হয়ে উঠা স্টকহোমের নতুন রেস্তোরাঁ ‘স্‌লুপোর্তেন’

ব্রিজ, ফ্লাইওভার জাতীয় নগর অবকাঠামোর নিচের অংশ সাধারণত মানুষের কাছে অনিরাপদ, অন্ধকার কিংবা অব্যবহৃত স্থান হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু…

জরিপে উঠে এলো স্থাপত্যে AI-এর উত্থান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এখন আর কেবল প্রযুক্তি জগতের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে স্থাপত্যচর্চারও অংশ হয়ে…

মিলানের প্রযুক্তি নগরে এক আধ্যাত্মিক স্থাপত্য

বর্তমান বিশ্বে দ্রুতগতির নগরজীবন মানুষকে যেমন প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে নিচ্ছে, তেমনি তাকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নও করে তুলছে আত্মজিজ্ঞাসা ও…

বাংলার বাঘা মসজিদ সুলতানী ঐতিহ্যের এক সাক্ষী

বাংলার ইতিহাস কত সমৃদ্ধ তা শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখলেই বুঝা যায়। দেশে দেশে ইতিহসে রয়েছে বৈচিত্রতা। কোন দেশে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *