• Home
  • স্থাপত্য
  • মিলানের প্রযুক্তি নগরে এক আধ্যাত্মিক স্থাপত্য
Image

মিলানের প্রযুক্তি নগরে এক আধ্যাত্মিক স্থাপত্য

বর্তমান বিশ্বে দ্রুতগতির নগরজীবন মানুষকে যেমন প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে নিচ্ছে, তেমনি তাকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নও করে তুলছে আত্মজিজ্ঞাসা ও মানবিক সংযোগ থেকে। এই কারণেই হয়তো আজ মানসিক রোগীর সংখ্যা এতটাই বেশি।

এমন এক সময়ে ইতালির স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্টেফানো বোয়েরি আর্কিতেত্তি (Stefano Boeri Architetti) মিলানের মাইন্ড- মিলানো ইনোভেশন ডিস্ট্রিক্ট-এ (MIND – Milano Innovation District) “অ্যামব্রোসিয়ান মনাস্টেরি” নামে একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা দিয়েছে। প্রকল্পটি সমসাময়িক স্থাপত্যচর্চায় নতুন ধরনের চিন্তা ও ধারণা যোগ করেছে।

এই প্রজেক্টটি এখনো ডিজাইন ও প্রস্তাব পর্যায়ে আছে, তাই নির্দিষ্ট নির্মাণ শুরুর বছর ঘোষণা করা হয়নি।
তবে MIND জেলার উন্নয়ন কাজের সঙ্গে সমন্বয় করে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মঠকে নগরের কেন্দ্রে রেখে দ্রুত নগরজীবনের সঙ্গে আধ্যাত্মিক নীরবতার সুন্দর সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। ছবি: ডিজাইনবুম
নগরের ভেতরে মঠের নতুন অবস্থান

ঐতিহ্যগতভাবে মঠকে দেখা হয় শহরের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন এক ধ্যানমগ্ন স্থাপনা হিসেবে। কিন্তু স্টেফানো বোয়েরি’র এই প্রকল্প সেই ধারণাকে নতুনভাবে পুনর্ব্যাখ্যা করেছে। এখানে মঠকে নগরজীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে। MIND জেলার কার্দো ও দেকুমানুস অক্ষের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই কমপ্লেক্সটি গবেষক, শিক্ষার্থী, বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ফলে এটি নাগরিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক বিনিময়ের একটি shared civic space-এ রূপ নিয়েছে। 

স্পেসের আতিথেয়তা এটিকে স্থির ধর্মীয় কাঠামোর বদলে জীবন্ত সামাজিক পরিসরে রূপ দিয়েছে। ছবি: ডিজাইনবুম
ত্রিভুজাকার প্রাঙ্গণ ও চলাচলের উন্মুক্ততা 

প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যিক উপাদান হলো এর ত্রিভুজাকার প্রাঙ্গণ। নগর যাতায়াত ও জনগণের চলাচলের উন্মুক্ততার সঙ্গে এটি এক নতুন সম্পর্ক তৈরি করে। একইসঙ্গে অন্তর্মুখী ও উন্মুক্ত এই স্থান। বিষয়টি একদিকে যেমন ধ্যান ও নীরবতার পরিবেশ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে শহরের মানুষের চলাচল ও সামাজিক যোগাযোগকে স্বাগত জানায়। এই যে স্পেসের আতিথেয়তার আবেদন, এটাই প্রকল্পটিকে একটি স্থির ধর্মীয় অবকাঠামোর পরিবর্তে জীবন্ত সামাজিক পরিসরে রূপ দিয়েছে। 

স্বচ্ছ প্রিজম-আকৃতির লাইব্রেরিতে থাকবে নানা ধর্ম ও বিজ্ঞানের বই। ছবি: ডিজাইনবুম
ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংলাপের স্থাপত্য

প্রকল্পটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো “Library of Religions”। স্বচ্ছ প্রিজম-আকৃতির এই ভলিউম ধর্মতত্ত্ব, নৈতিকতা, বিজ্ঞান ও সমসাময়িক মানবিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে। এখানে পাঠকক্ষ, বহুমুখী আলোচনা-পরিসর এবং একটি উন্মুক্ত এম্ফিথিয়েটার (amphitheater) রাখা হয়েছে, যাতে জ্ঞানচর্চা শুধুমাত্র একাডেমিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না থেকে জনপরিসরে বিস্তৃত হতে পারে।

ধর্মীয় প্রতীক ও সমসাময়িক রূপভাষা

প্রকল্পের গির্জাটি ত্রিভুজভিত্তিক পরিকল্পনায় নির্মিত, যেখানে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন উপাসক একত্রিত হতে পারবেন। মিলানের ঐতিহ্যবাহী ক্যাথিড্রালেও এরকমটা দেখা যায়। ফলে সমসাময়িক স্থাপত্যভাষার মধ্যেও স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। একই সঙ্গে পুরো কমপ্লেক্সটিকে sail-like form মানে নৌকার পালের মতো কল্পনা করা হয়েছে। যা প্রতীকীভাবে আশ্রয়, যাত্রা ও মানবিক সহাবস্থানের ধারণাকে প্রকাশ করে। 

প্রতীকল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনে “গার্ডেন অব রিলিজিয়ন্স”-এ বিভিন্ন একেশ্বরবাদী ধর্মের উদ্ভিদ রাখা হয়েছে। ছবি: ডিজাইনবুম
ল্যান্ডস্কেপ, স্মৃতি ও অংশগ্রহণ

প্রকল্পটির ল্যান্ডস্কেপ ডিজানেই আছে বিচক্ষণতার স্বাক্ষর। “Garden of Religions”-এ বিভিন্ন একেশ্বরবাদী ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত উদ্ভিদ সংযোজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই বাগানের রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় নাগরিক ও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের ধারণা প্রকল্পটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। 

প্রযুক্তিনির্ভর নগরে ধীরতার অনুসন্ধান

MIND জেলা মূলত উদ্ভাবন, গবেষণা ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক নগর উন্নয়নের অংশ। সেই প্রেক্ষাপটে একটি মঠ নির্মাণ প্রথমে বৈপরীত্য মনে হলেও প্রকল্পটির মূল শক্তি আসলে এখানেই। দ্রুতগতির প্রযুক্তিনির্ভর নগরজীবনের মধ্যে এই স্থাপনা ধীরতা, নীরবতা ও আত্মজিজ্ঞাসার জন্য একটি বিকল্প পরিসর তৈরি করতে চায়।

কমপ্লেক্সটিকে নৌকার পালের মতো কল্পনা করা হয়েছে, যা আশ্রয়, যাত্রা ও মানবিক সহাবস্থানের প্রতীক। ছবি: ডিজাইনবুম

অ্যামব্রোসিয়ান মনেস্টেরি সমসাময়িক স্থাপত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখানে ধর্মীয় স্থাপনাকে কেবল উপাসনার স্থান হিসেবে দেখা হয়নি। এটি এমন এক সাংস্কৃতিক অবকাঠামো, যা প্রযুক্তিনির্ভর নগর সভ্যতার মধ্যে মানবিকতা, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে। নগরে মানুষের মানসিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার জন্যও জায়গা থাকা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র

Designboom ও Domus-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে রচিত।

Related Posts

দক্ষিণ কোরিয়ায় সিউলের আবাসন স্থাপত্যে নতুন দিগন্ত

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চঘনত্বের নগর আবাসনের এক অনন্য উদাহরণ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, সীমিত ভূমি এবং উন্নত নগরজীবনের…

ভবিষ্যতের ৮টি স্টেডিয়াম যা প্রচলিত ধারণা বদলে দেবে

সময়ের সাথে সাথে সবই বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে স্টেডিয়ামের গঠনশৈলীতে। স্টেডিয়ামগুলো এখন আর শুধু ম্যাচের দিনের জন্য ডিজাইন করা হচ্ছে…

নুহাশ পল্লী: হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের সবুজ রাজ্য

নুহাশ পল্লী বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এবং কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর স্বপ্নে গড়ে ওঠা একটি অনন্য সবুজ…

গ্রামীণ অবকাশ যাপনে কটেজের ইন্টেরিয় কেমন হওয়া উচিত?

ঘরের পরিবেশ আমাদের শান্ত রাখে, অশান্ত করে তোলে কখনো সংগঠিত হতেও সাহায্য করে। বলছি আমাদের মনের উপর ঘরের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *