বাংলার ইতিহাস কত সমৃদ্ধ তা শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখলেই বুঝা যায়। দেশে দেশে ইতিহসে রয়েছে বৈচিত্রতা। কোন দেশে হয়তো গল্প আছে জীবনে। বাংলাদেশের ইতিহাস জীবন গল্প আর দৃশ্যমান ঐতিহ্যের এক সমাহার। এমনই এক ঐতিহ্যবাহী গল্পগাঁথা রাজশাহীর বাঘা মসজিদ।
দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী জেলা সদর থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বের উপজেলা বাঘা। এই উপজেলাতেই রয়েছে ঐতিহাসি বাঘা মসজিদ। ইতিহাস থেকে জানা যায় সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ ১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন।
মসজিদে আছে পোড়ামাটির অসংখ্য কারুকাজ যার ভেতরে রয়েছে আমগাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতাসহ ফার্সি খোদাই শিল্পে ব্যবহৃত হাজার রকম নকশা। মসজিদ প্রাঙ্গণের উত্তর পাশো বাঁধানো আছে হযরত শাহদৌলা ও তার পাঁচ সঙ্গীর মাজার।

নাসিরউদ্দীন নুসরত শাহ মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সুবিধার জন্য বিশাল দিঘী খনন করে দেন মসজিদের সামনেই। এই দিঘীর আয়তন ৫২ বিঘা যার চারপাশে শোভা পাচ্ছে শত শত নারকেল গাছ। আরামদায়ক আবহাওয়ার জন্য প্রতিবছরই অতিথি পাখিরা আসে এই দিঘীতে।
শীতে পাখির কলতানে মুখরিত এ দিঘীতে রয়েছে ৪টি বাঁধানো ঘাট। ১৯৯৭ সালের খননের ফলে আরও একটি পুকুরের সন্ধান মেলে মাটির নিচে। এ পুকুরটি ছিলো মূলত অন্দরমহলের জন্য। অন্দরের সাথে সুরঙ্গের মাধ্যমে যুক্ত আছে পুকুরটি। অন্দরের পুকুরটির আয়তন প্রায় ৩০ফুট x ২০ফুট।
মসজিদের ভেতরে ও বাইরে টেরাকোটার পাশাপাশি প্রচুর মাটির ফলকেরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ভেতরের পশ্চিত কোণে রয়েছে নামাজের বিশেষ জায়গা।
ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় প্রতি বছর ঈদ-ঊল-ফিতরের দিন থেকে ৩দিন ব্যাপী মেলা আয়োজন করা হয়। এ মেলার ঐতিহ্যও প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো।

বাঘা মসজিদের ইতিহাস
হিজরি ৯৩০ এবং ১৫২৩-১৫২৪ খ্রিষ্টাব্দে বরেন্দ্র অঞ্চল শাসন করতেন হুসেন শাহীর বংশের শাসকরা। এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা আউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নুসরাত শাহ। নুসরাত শাহ মসজিদটি নির্মাণ করলেও পরে তা বহুবার সংস্কার করা হয়। তার মৃত্যুর পর অযত্ন অবহেলায় ভেঙ্গে যায় মসজিদের গম্বুজগুলো। পরে ১৮৯৭ সালে নতুন করে দেয়া হয় ছাদ। বর্তমানে এ রূপেই আমরা মসজিদটি দেখে থাকি।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য
প্রায় ২৫৬ বিঘা জমির উপর নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদটি। সমতলের অন্তত ৮-১০ ফুট উঁচুতে আঙিনা তৈরি করে তাতে নির্মাণ করা বাঘা মসজিদ। মূল মসজিদটি ৬টি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এর আয়তন দৈর্ঘ্যে ৭৫ ফুট এবং প্রস্থে ৪২ ফুট। মসজিদটির উচ্চতা ২৪ফুট ৬ইঞ্চি।
উত্তর পাশের ফটকের উপর ছিলো অত্যন্ত নান্দনিক কারুকার্য যা বর্তমানে ধ্বংসপ্রায়। বর্তমানে মসজিদটিতে মোট ১০টি গম্বুজ রয়েছে। রয়েছে ৪টি দারুণ কারুকার্যখচিত মেহরাব। ৮ফুট চওড়া দেয়াল রয়েছে চারদিকে।
বাঘা মসজিদের সবচেয়ে বড় গম্বুজের ব্যাস প্রায় ৪২ফুট এবং উচ্চতা ১২ফুট। এতে রয়েছে চৌচালা গম্বুজও যার ব্যাস ২০ফুট এবং উচ্চতা ৩০ফুট। চুন সুড়কির গাঁথুনির এ মসজিদটির মূল দরজার উপরে রয়েছে ফার্সি ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি।
মূল মসজিদের দরজা রয়েছে মোট পাঁচটি। চারদিক ঘেরা প্রাচীরের দুপাশে রয়েছে আরও দুটি প্রবেশদ্বার। ভেতরে বাইরে সর্বত্রই টেরাকোটার চোখে পড়ার মতো। সামনের পুকুরটি মসজিদের মতোই জনপ্রিয় এবং পর্যটকনন্দিত। এছাড়া বাঘা মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি মাজার শরীফ।






















