কাওসার আবেদীন সেতু
স্থাপত্য বলতে আমরা সাধারণত ইট, কাঠ আর কংক্রিটের কোনো সুউচ্চ বা সুদৃশ্য কাঠামোকে বুঝি। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, স্থাপত্যের মূল উদ্দেশ্য তো কেবল কাঠামো নির্মাণ নয়; বরং এমন একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলা, যা মানুষকে সুরক্ষা দেয়, লালন করে এবং ভালোবাসার ওম ছড়ায়। সেই দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে, আমাদের অস্তিত্বের প্রথম এবং সবচেয়ে নিখুঁত স্থপতি হলেন ‘মা’।
মা— ছোট এ শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা। আছে নিরাপত্তা আর নিঃস্বার্থ ত্যাগের গল্প। নিঃস্বার্থে এ মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতেই প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মা দিবস। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও আজ পালিত হবে বিশ্ব মা দিবস।
একটি বহুতল ভবন দাঁড় করানোর জন্য যেমন সবচেয়ে আগে প্রয়োজন হয় একটি মজবুত ভিত্তির (Foundation), ঠিক তেমনি মা আমাদের জীবনের শুরুতে নৈতিকতা ও ভালোবাসার এক অবিচল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। একজন স্থপতি যেমন ব্লু-প্রিন্টের রেখায় রেখায় একটি দালানের স্বপ্ন আঁকেন, মা-ও তেমনি পরম মমতায় আমাদের ভেতর থেকে তিল তিল করে গড়ে তোলেন।
স্থাপত্যের মৌলিক কিছু নীতির সাথে মাতৃত্বের এই অপূর্ব মিলগুলো সত্যিই অবাক করার মতো:
আশ্রয় ও উষ্ণতা
স্থাপত্যের প্রাথমিক উদ্দেশ্যই হলো রোদ, ঝড় ও বৈরী প্রকৃতি থেকে মানুষকে রক্ষা করা। আর এই পৃথিবীতে মায়ের কোলের চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় দ্বিতীয়টি নেই। বাইরের পৃথিবীর সমস্ত কাঠিন্য, প্রতিযোগিতা ও হতাশা থেকে তিনি তার অসীম স্নেহ দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন। নিছক ইট-পাথরের একটি ‘হাউস’-কে পরম মমতায় যিনি ‘হোম’ বা নীড়ে পরিণত করেন, তিনি তো মা-ই।
কার্যকারিতা ও নমনীয়তা
আধুনিক স্থাপত্যে স্পেসের ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ বা ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর খুব জোর দেওয়া হয়। একজন মা যেন এই গুণের চূড়ান্ত রূপ! একটি নিখুঁত নকশা যেমন মানুষের প্রয়োজন মেটায়, মা তেমনি না চাইতেই সন্তানের না-বলা কথাগুলো বুঝে নেন। সন্তানের আনন্দে তার উচ্ছ্বাস, আর সন্তানের কষ্টে তার বিষাদ—মায়ের এই সহজাত নমনীয়তা ও সহমর্মিতা পৃথিবীর কোনো যান্ত্রিক নকশায় ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব।
স্থায়িত্ব ও কালজয়ী আবেদন
যেকোনো স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থপতিরা দীর্ঘস্থায়িত্ব বা ডিউরেবিলিটি নিশ্চিত করতে চান। কিন্তু কাঠামোর ভিত্তি যতই মজবুত হোক না কেন, সময়ের স্রোতে কংক্রিটের দালানেও একদিন ফাটল ধরে, পলেস্তারা খসে পড়ে। অথচ মায়ের ভালোবাসার স্থায়িত্ব সত্যিই আজীবন। সময়ের সাথে সাথে এই ভালোবাসা কখনো জরাজীর্ণ হয় না, বরং আরও শক্তিশালী, গভীর ও অম্লান হয়ে ওঠে।
নান্দনিকতা ও প্রশান্তি
একটি সুদৃশ্য ও নান্দনিক বাড়ির নকশা যেমন আমাদের চোখ ও মনকে প্রশান্তি দেয়, মায়ের স্নিগ্ধ হাসি আর আলতো ছোঁয়া আমাদের জীবনের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে দূর করে দেয়। তার প্রতিটি শাসন, প্রতিটি দিকনির্দেশনা যেন আমাদের জীবনের ক্যানভাসে একজন দক্ষ শিল্পীর নিখুঁত তুলির আঁচড়।
আজকের এই মা দিবসে, একজন স্থপতি যেমন তার সেরা সৃষ্টিকে গভীর ভালোবাসায় ধারণ করেন, আমরাও আমাদের জীবনের সেই শ্রেষ্ঠ স্থপতি আমাদের মায়েদের জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। মা কেবল একটি ডাক বা শব্দ নয়, মা হলেন জীবনের সেই অবিচ্ছেদ্য ‘নকশা’ বা লাইফস্টাইল, যা আমাদের গড়ে তোলে, পরম আশ্রয়ে রাখে এবং আজীবন ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকে।
বিশ্বের সকল মায়ের প্রতি বিনম্র সালাম ও শ্রদ্ধা। শুভ মা দিবস।
















