Image

হাতিরঝিল: জলাশয় সঙ্কট ও সম্ভাবনা

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ

বিকেলের শেষ আলো যখন ঢাকার আকাশে ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, তখন শহরের কোলাহলের মাঝখানে এক বিস্তৃত জলরেখা নিঃশব্দে ঝলমল করে ওঠে। চারপাশে কংক্রিটের দেয়াল, ব্যস্ত সড়ক, অবিরাম যানজট তবু তাদের মাঝখানে শান্তভাবে শুয়ে আছে প্রশান্ত এক জলাশয় হাতিরঝিল। যেন এক ক্লান্ত মহানগরের বুকের উপর রাখা শীতল জলপট্টি।

সন্ধ্যা নামলে সেতুগুলোর আলো একে একে জ্বলে ওঠে। সেই আলো জলের বুকে ভেঙে পড়ে হাজার টুকরো হয়ে। বাতাসে ভেসে আসে মানুষের হাসি, গল্প, পদচারণার শব্দ। মনে হয় এই শহর এখনও পুরোপুরি কঠিন হয়ে যায়নি; তার ভেতরে কোথাও পানি আছে, আলো আছে, স্বপ্ন আছে।

Hatirjheel Dusts
হাতিরঝিলের ওয়াকওয়ের পাশে ময়লার স্থূপ পথচারীদের বিব্রত করে সবসময়। ছবি: সংগৃহীত

তবে হাতিরঝিলের গল্প শুধু সৌন্দর্যের নয়। এর ভেতরে আছে ইতিহাস, নগর পরিকল্পনার বাস্তবতা, পরিবেশগত সংকট ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দীর্ঘ কাহিনী।

ইতিহাসের ভাঁজে এক জলাভূমি

ঢাকার ইতিহাসে জলাশয়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় এই অঞ্চল ছিল বিস্তৃত জলাভূমি ও খাল-নদীর জালের অংশ। বর্ষার সময় এই জলাভূমি শহরের অতিরিক্ত পানি ধারণ করত, আবার ধীরে ধীরে সেই পানি বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে প্রবাহিত হতো।

ঐতিহাসিক জনশ্রুতি বলছে, মুঘল আমলে রাজধানীর রাজকীয় হাতিদের এখানে এনে গোসল করানো হতো। সেই স্মৃতিই নাম হয়ে রয়ে গেছে হাতিরঝিল।

কালের প্রবাহে শহর বড় হতে থাকে। ১৯৬০-৭০-এর দশকের পর ঢাকার দ্রুত নগরায়নের ফলে জলাভূমিগুলো ধীরে ধীরে দখল ও ভরাটের শিকার হয়। খালগুলো সংকুচিত হতে থাকে, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে বর্ষা এলেই শহরের নানা এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিতে শুরু করে।

শহুরে পরিকল্পনার নতুন এক মাইলফলক

জলাবদ্ধতার সংকট মোকাবিলার জন্য সরকার ও নগর পরিকল্পনাবিদরা হাতিরঝিল এলাকাকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দীর্ঘ গবেষণা ও পরিকল্পনার পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা।

Hatirjheel Boat
পানির সঙ্কট না থাকলে চলে হাতিরঝিলের নৌকা পারাপার। ছবি: শরীফ মাহমুদ

প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল তিনটি—
১. ঢাকার মধ্যাঞ্চলের জলাবদ্ধতা কমানো
২. আধুনিক নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা
৩. একটি নান্দনিক নগর জলাশয় ও বিনোদন কেন্দ্র সৃষ্টি করা

প্রায় ৩০০ একরেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হাতিরঝিলে নির্মিত হয়েছে একাধিক সেতু, উড়ালপথ, সড়ক ও জলাধার। ২০১৩ সালে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। গুলশান, তেজগাঁও, মগবাজার, রামপুরা ও বনশ্রী এলাকাকে সংযুক্ত করে এটি ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

যেন শহরের বুকে ফুসফুস

আজ হাতিরঝিল শুধু একটি জলাধার নয়,এটি ঢাকার নাগরিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অবকাশস্থল। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে আসে হাঁটতে, ছবি তুলতে, কিংবা শুধু কিছুক্ষণ শান্তভাবে বসে থাকতে।

ভোরের সময় দেখা যায় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের হাঁটার দল। সকালের আলো পানির উপর পড়ে সোনালি রেখা আঁকে। দুপুরে শহর ব্যস্ত থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাতিরঝিল আবার জেগে ওঠে মানুষের পদচারণায়।

এখানে রয়েছে নৌবিহারের সুযোগ, উন্মুক্ত হাঁটার পথ, সাইক্লিংয়ের স্থান ও নান্দনিক সেতু। শহরের কংক্রিটের ভিড়ে এটি যেন এক ছোট্ট মুক্ত আকাশ।

hatirjheel Moon
জোছনা রাতে হাতিরঝিল যেমন। ছবি: শরীফ মাহমুদ

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এ ধরনের জলাশয় একটি শহরের ইকোলজিক্যাল বাফার হিসেবে কাজ করে। এটি বৃষ্টির পানি ধারণ করে, তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে ও শহরের পরিবেশে আর্দ্রতাসহ ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

দূষণের কালো ছায়া

তবে হাতিরঝিলের এই স্বপ্নময় চিত্রের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কিছু অস্বস্তিকর বাস্তবতা। আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি উন্নত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য ও দূষিত পানি এসে ঝিলের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পানির স্বচ্ছতা অনেক সময় কমে যায় ও তীব্র দুর্গন্ধও তৈরি হয়।

এছাড়া দর্শনার্থীদের অসচেতন আচরণও সমস্যার একটি বড় কারণ। প্লাস্টিক বোতল, খাবারের প্যাকেট, পলিথিনের মতো বর্জ্য প্রায়ই ঝিলের আশপাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

পরিবেশবিদদের মতে, যদি নিয়মিত পানি পরিশোধন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এই জলাশয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অপরিকল্পিত ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

হাতিরঝিল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তবে এত বড় এলাকা নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ কাজ নয়।

কখনো কখনো অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল, অবৈধ দোকান বা অপরিকল্পিত ব্যবহার এই সৌন্দর্যের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাছাড়া পর্যাপ্ত সবুজায়নের অভাবও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে একটি সীমাবদ্ধতা।

যদি পরিকল্পিতভাবে আরও গাছপালা ও পার্ক এলাকা তৈরি করা যায়, তবে এটি ঢাকার অন্যতম প্রধান সবুজ করিডর হয়ে উঠতে পারে।

সম্ভাবনার নতুন পথ

সব সীমাবদ্ধতার মাঝেও হাতিরঝিলের সম্ভাবনা এখনও বিশাল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি হতে পারে ঢাকার অন্যতম নগর পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্প। আধুনিক পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে ঝিলের পরিবেশ অনেক উন্নত করা সম্ভব।

hatirjheel dust
হারিতঝিলের ময়লা আবর্জনা সৌন্দর্য নষ্ট করছে। করছে পরিবেশ দূষণ। ছবি: সংগৃহীত

এছাড়া এখানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উন্মুক্ত শিল্প প্রদর্শনী, পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রম কিংবা সাইক্লিং উৎসবের আয়োজন করা যেতে পারে। এতে এটি শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে উঠবে। যদি হালে কিছু সাইক্লিংয়ের প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে।
রাত বাড়লে হাতিরঝিলের পানিতে শহরের আলো নিঃশব্দে দুলতে থাকে। দূরে সেতুর উপর দিয়ে গাড়ি ছুটে যায়, বাতাসে ভেসে আসে শহরের মৃদু শব্দ। ঢাকা তখনও ব্যস্ত, তখনও ক্লান্ত।

তবু তার বুকের মাঝখানে এই জলরেখা শান্তভাবে বলে যায়-একটি শহর শুধু ইট-পাথরে তৈরি হয় না; তার ভেতরে দরকার পানি, বাতাস, আর মানুষের একটু স্বপ্ন। হাতিরঝিল সেই স্বপ্নেরই এক টুকরো প্রতিচ্ছবি, যেখানে সংকট আছে, আবার পানির মতোই গভীর সম্ভাবনা এখনও জেগে আছে।

যদি হাতিরঝিলকে যত্নে আগলে রাখা যায়,তবে একদিন এই জলরেখাই হয়তো ঢাকার ক্লান্ত বুকে বইয়ে দেবে নতুন প্রাণের স্রোত। পানির আয়নায় ঝলমল করবে শহরের স্বপ্ন,আর ব্যস্ত ইট কংক্রিটের ভিড়ে এই জলাশয়ই ধীরে ধীরে ঢাকাকে করে তুলবে আরও প্রাণবন্ত, আরও মানবিক।

Related Posts

স্মার্ট বিল্ডিং নয় মাটির দেয়ালে হোক আরামদায়ক আবাসন

সময়ের ব্যবধানে ভবনের দেয়ালগুলো আধুনিক হয়ে উঠছে। কাদামাটি আর চুনসুরকির প্রলেপ নয় প্রযু্ক্তির ছোঁয়ায় স্মার্ট হয়ে উঠেছে আমাদের…

গোয়ার ঘরবাড়ি ও বালকাঁওয়ের ঐতিহ্য স্থাপত্য এবং জীবনের গল্প

ভারতের ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোর একটি হলো গোয়া। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক ভিড় করে ভারতের ক্ষুদ্রতম…

স্থাপনা নির্মাণ ও পরিবেশ সুরক্ষার সমীকরণ

আপনি কি জানেন কেন নির্মাণ শিল্প বিশ্বব্যাপী বায়ু দূষণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য দায়ী? শহরের বায়ুর মান নষ্ট…

অসমাপ্ত মহাকাব্য: এন্টনি গাউডি’র সাগ্রাদা ফামিলিয়া আজ কোথায়?

স্পেনের বার্সেলোনার আকাশরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা সাগ্রাদা ফামিলিয়া ছুড়ে দেয় এক অদ্ভুত প্রশ্ন, ‘একটি স্থাপত্য নির্মাণের কাজ সত্যিই কি…