Hashima

হাশিমা: যেন পরিত্যক্ত এক ‘যুদ্ধজাহাজ’

হাশিমার মাটির নিচে লুকিয়ে ছিল উন্নতমানের কয়লা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে জাপানের শিল্প বিপ্লবের সময় এই সম্পদ বেশ কয়েকটি কোম্পানির নজর কাড়ে। তবে বৈরী আবহাওয়া আর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের কারণে সেখানে কাজ করা ছিল অসম্ভব। ১৮৯০ সালে স্কটিশ ব্যবসায়ী থমাস ব্লেক গ্লোভারের পরামর্শে মিতসুবিশি কোম্পানি ১ লাখ ইয়েনের বিনিময়ে এই দ্বীপটি কিনে নেয়। শুরু হয় এক উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট।

কংক্রিটের জঙ্গলে আধুনিক জীবন

দ্বীপটিকে বাসযোগ্য করতে চারপাশ দিয়ে কংক্রিটের বাঁধ তৈরি করে এর আয়তন বাড়ানো হয়। ১৯১৬ সালে এখানেই নির্মিত হয় জাপানের প্রথম চারতলা চাঙ্গা কংক্রিটের (Reinforced Concrete) অ্যাপার্টমেন্ট। ধীরে ধীরে দ্বীপটি হয়ে ওঠে আধুনিক এক নগরী। খনি শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জন্য সেখানে স্কুল, হাসপাতাল, উপাসনালয় এমনকি জুয়া খেলার আড্ডাও তৈরি করা হয়েছিল। প্রযুক্তির চূড়ান্ত ব্যবহারের মাধ্যমে দ্বীপটিকে এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করা হয়।

চরম প্রতিকূলতা ও ‘নরকের সিঁড়ি’

হাশিমা এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিতি পায়। মাটির নিচে মাইলের পর মাইল সুড়ঙ্গ থাকলেও মাটির উপরে ছিল সরু গলি আর ঘিঞ্জি বাজার। সমুদ্রের নোনা বাতাস আর কয়লার ধুলোয় এখানকার আর্দ্রতা থাকতো প্রায় ৯৫ শতাংশ। দিনরাত কয়লার ধোঁয়ায় আকাশ কালো হয়ে থাকতো।

Hashima 2
দ্বীপটির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খনিজ উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত হতো,ছবি: ফ্লিকার

দ্বীপের সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিশাল এক সিঁড়ি, যা দ্বীপের নিচ থেকে সর্বোচ্চ চূড়া পর্যন্ত চলে গেছে। স্থানীয়রা একে ডাকত ‘নরকের সিঁড়ি’ নামে। কারণ এই খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে মানুষের দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার দশা হতো।

উজ্জ্বল আলোর নিচে অন্ধকার ইতিহাস

দ্বীপের কঠিন জীবনের বিনিময়ে শ্রমিকরা মূল ভূখণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি বেতন পেতেন। টোকিওর বড় বড় কর্মকর্তাদের চেয়েও এখানকার খনি শ্রমিকদের আয় ছিল বেশি। ফলে জাপানের অন্য কোথাও পৌঁছানোর আগেই এই দ্বীপের ঘরে ঘরে স্যাটেলাইট টেলিভিশন আর আধুনিক গ্যাজেট পৌঁছে গিয়েছিল।

Hashima 3
উঁচু ভবনগুলোর অবস্থানের ফলে সরু রাস্তার এক গোলকধাঁধা তৈরি হয়েছে,ছবি: ফ্লিকার

তবে এই প্রাচুর্যের আড়ালে ছিল এক কালো ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের যুদ্ধবন্দীদের এখানে এনে দাসদের মতো খাটানো হতো। বিপজ্জনক খনিগুলোতে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। ২০১৫ সালে ইউনেস্কো যখন দ্বীপটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন দক্ষিণ কোরিয়া এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। জাপানের এই ‘অন্ধকার অতীত’ আজও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের এক বড় ক্ষত।

পতন ও বর্তমান অবস্থা

সময়ের সাথে সাথে জ্বালানি হিসেবে কয়লার চাহিদা কমতে থাকে এবং হাশিমার খনিগুলোও ফুরিয়ে আসে। অবশেষে ১৯৭৪ সালের ২০ এপ্রিল মিতসুবিশি আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বীপটি বন্ধ করে দেয়। কয়েকদিনের নোটিশে বাসিন্দারা দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। কেউ কেউ তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্রও ফেলে যান। রাতারাতি একটি জীবন্ত শহর পরিণত হয় এক নিস্তব্ধ ধ্বংসস্তূপে।

Hashima 4
একটি সিঁড়ির অংশ যা পুরো দ্বীপটি জুড়ে বিস্তৃত ছিল,ছবি: ফ্লিকার

দীর্ঘদিন মিতসুবিশির মালিকানাধীন থাকার পর ২০০১ সালে এটি নাগাসাকি শহরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বর্তমানে হাশিমা আজ হাশিমা পর্যটকদের কাছে এক রহস্যময় গন্তব্য। ধূসর কংক্রিটের দালানগুলো এখন শ্যাওলা ধরা কঙ্কাল মাত্র। তবে এর প্রতিটি ভাঙা দেয়াল আজও শ্রমিকদের ঘাম, কান্না আর হারানো এক গৌরবময় সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিস্তব্ধতার মাঝেও যেন সেখানে কান পাতলে শোনা যায় এক সময়ের কর্মব্যস্ত জীবনের প্রতিধ্বনি।

Related Posts

আধুনিক বাড়ির নকশায় গৃহস্থালি কাজ ও করিডরের বিবর্তন

একটি বাড়ির নকশায় করিডর বা চলাচলের পথকে সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বসার ঘর, শোবার ঘর,…

আধুনিক বাড়ির স্বপ্ন: মানুষকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংকট

আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, আরামদায়ক ও স্বাধীন করে তোলা। বিংশ শতাব্দীতে স্থপতি…

পরিবেশগত নৈতিকতার আলোকে স্থাপত্যের ১০টি প্রধান চ্যালেঞ্জ

স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা নান্দনিক নকশা তৈরির শিল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর…

হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার

হাসপাতালের রোগী-কক্ষ বলতে আমাদের চোখে সাধারণত ভেসে ওঠে সাদা দেয়াল, ঠান্ডা আলো আর যান্ত্রিক পরিবেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি