মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে জীবনের বৈচিত্রতা। মানুষের জন্য আবাসন বাড়ছে, বাড়ছে আবাসনেরও জটিলতা। কোথায় বানাবেন বাড়ি? প্রতিবেশির বাড়ির সাথে সীমানা নিয়ে বিরোধ হবে নাতো? বাড়ি বানাতে কি পরিবেশ দূষণ করছেন?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্মাণ প্রকল্পগুলো ঘিরে আছে হাজারো প্রশ্ন শুধু নেই কোন উত্তর। রাজনীতির দাপট, গোষ্ঠীভিত্তিক দাপক আর অঢেল কালো টাকার গরমে অনেকেই মানছে না কোন নিয়ম নীতি। বাড়ছে শুধু গন্ডগোল। অথচ উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি কত শৃঙ্খলা, যেন উন্নতরাই শুধু সভ্য জাতি।
ইট থেকে শুরু করে নির্মাণের প্রায় প্রতিটি উপকরণের পেছনে থাকে অনেক গল্প। উপকরণ উৎপাদনের গল্প উৎপাদক ও শ্রমিকের । তবে আরও অনেক গল্প থাকে যা মানুষের জীবন, পরিবেশ কিংবা কখনো রাষ্ট্রের উপরও প্রভাব বিস্তার করে। কানাডার মন্ট্রিল শহরে নির্মাণের গল্প সম্পূর্ণই ভিন্নতর।
মন্ট্রিল শহরের কথাই বলা যাক। এ শহরে নতুন কোন বাড়ি নির্মাণ করতে হলে মানতে হয় সরকারের বিশেষ নির্দেশনা। চাইলেও আপনার ইচ্ছেমতো নকশা করতে পারবেন না। সরকারের কঠোর গাইডলাইন মেনে বানাতে হয় বাড়ি।
কানাডার কুইবেক প্রদেশে অবস্থিত মন্ট্রিয়াল (Montreal) শহর। এ নগরীর নকশা (Zoning) এবং বাড়ি বানানোর রয়েছে কঠিন ও কঠোর নিয়ম ও শৃঙ্খলা। এটি মূলত শহরের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং তীব্র শীতকালীন আবহাওয়াকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।

মন্ট্রিলে নতুন কোনো ভবন নির্মাণ বা বড় ধরনের সংস্কার করতে হলে ভিলে ডি মন্ট্রিয়াল (Ville de Montréal) বা স্থানীয় বরো (Borough) কাউন্সিলের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। নিচে মন্ট্রিয়াল শহরের আবাসন নকশা ও বাড়ি তৈরির প্রধান নিয়মগুলো উল্লেখ করা হলো:
মন্ট্রিল শহরের নকশায় রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য (Urban Design)। মন্ট্রিলের বাড়িগুলোর একটি নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী আছে, যা বিশ্বের অন্য শহর থেকে একে আলাদা করে।
শহরের আকাশসীমা (Skyline) সুরক্ষায় এখানকার নির্মাতাদের উচ্চতা নিয়ে মানতে হয় নীতিমালা। এদেশেরও রয়েছে একটি ঐতিহাসিক নিয়ম। শহরের কেন্দ্রস্থলে কোনো ভবনই মাউন্ট রয়্যাল (Mount Royal) পাহাড়ের চেয়ে উঁচু (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৩২.৫ মিটার বা সর্বোচ্চ ২০০ মিটার) হতে পারবে না।
মন্ট্রিয়ালের “প্লেক্স” (Duplex/Triplex) বাড়িগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বাইরের আঁকাবাঁকা লোহার সিঁড়ি। ঘরের ভেতরের জায়গা বাঁচাতে এবং শীতকালে হিটিং খরচ কমাতে উনিশ শতকে এই নকশা জনপ্রিয় হয়। এই আধুনিক সময়ে এ সিঁড়িগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
পুরোনো বা ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোতে (যেমন: ওল্ড মন্ট্রিল বা প্লেটো মাউন্ট-রয়্যাল) বাড়ির সামনের দেয়ালের ইট, জানালার রঙ এবং স্থাপত্যের ধরন অবশ্যই আশেপাশের ঐতিহাসিক ভবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
মূল রাস্তা এবং প্রতিবেশীর সীমানা প্রাচীর থেকে বাড়িটি কতটা ভেতরে থাকবে তার সুনির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে নির্মাণ করতে হবে। ৩ তলার বেশি উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে ওপরের তলাগুলো সামনের থেকে অন্তত ২ মিটার পিছিয়ে তৈরি করার নিয়ম রয়েছে।
মন্ট্রিলে বাড়ি তৈরি করতে হলে স্থানীয় জোনিং বাই-ল (Zoning By-laws) মেনে চলতে হয়। যে জমিতে বাড়ি বানানো হবে সেটি আবাসিক (Residential), বাণিজ্যিক নাকি মিশ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, তা Ville de Montréal Zoning Map দেখে নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে প্লটের একটি নির্দিষ্ট অংশে ঘাস, গাছপালা বা ল্যান্ডস্কেপিং রাখা বাধ্যতামূলক। মন্ট্রিলে যেকোনো নতুন ভবন তৈরি, বর্ধিতকরণ বা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য পারমিট নেওয়া আবশ্যক।

নতুন ভবন বা প্রধান ফটক পরিবর্তনের নকশা প্রথমে Site Planning and Architectural Integration Plan (SPAIP) এবং নগর উপদেষ্টা কমিটি (CCU) থেকে অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে।
আবেদনের জন্য একজন সরকার স্বীকৃত ল্যান্ড সার্ভেয়ার দ্বারা তৈরি ‘সার্টিফিকেট অফ লোকেশন’, স্থপতি (Architect) বা ইঞ্জিনিয়ারের সিলমোহরযুক্ত নিখুঁত আর্কিটেকচারাল প্ল্যান এবং প্রজেক্টের খরচের বিবরণী জমা দিতে হয়।
আবেদনের খরচ প্রজেক্টের আনুমানিক মূল্যের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত প্রতি ১,০০০ ডলার কাজের জন্য ৯.৮০ ডলার ফি দিতে হয় (আবাসিক ভবনের সর্বনিম্ন ফি ১৬৭.৪০ ডলার)। মন্ট্রিল সিটির নতুন নিয়ম অনুযায়ী আবেদনের সাধারণত ১২০ দিনের মধ্যে পারমিট ইস্যু করা হয়।
এত কিছুর পরও চাইলে দিনে রাতে বা সপ্তাহে ৭ দিনই নির্মানকাজ চালিয়ে যাওয়া যায় না মন্ট্রিলে। নির্মাণকালীন নিরাপত্তা ও পরিবেশগত কারণে আবাসিক এলাকায় সাধারণত সোমবার থেকে শুক্রবার সকাল ৭:০০ টা থেকে বিকেল ৫:০০ টা পর্যন্ত কাজ করা যায়। শনি-রবিবার নির্দিষ্ট সীমিত সময়ে কাজ করা গেলেও মানতে হয় নানা শর্ত।
কাজের সতর্কতা
নির্মাণকাজ চলাকালীন শদ্বদূষণের কারণে প্রতিবেশীরা বিরক্ত হয়ে অভিযোগ করতে পারে এমনভাবে কাজ করা যাবে না। কাজ শুরুর আগে সাইটের চারপাশে কমপক্ষে ১.৮ মিটার (৬ ফুট) উঁচু মজবুত নিরাপত্তা বেষ্টনী বা ফেন্স দেওয়া বাধ্যতামূলক।
কনস্ট্রাকশনের আবর্জনা যত্রতত্র ফেলা যাবে না। এগুলো পরিবেশসম্মত উপায়ে নির্দিষ্ট ইকোকেন্দ্রে (Écocentre) অপসারণ করা বাধ্যতামূলক।
প্রতিদিনই কানাডায় চলছে নির্মাণযজ্ঞ, বাড়ছে স্থাপনা তবুও আশ্চর্যের বিষয় তাদের দেশে কোন ইটভাটা দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ইটের উপরই নির্ভর করতে হয় এ দেশের নির্মাতাদের। তবুও নির্মাণে নেই শৃঙ্খলার কমতি।
উন্নত দেশের বিষয়গুলোই আলাদা। আপাত দৃষ্টিতে নির্মাণকাজে জটিলতা মনে হলেও শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার স্বার্থে এ নিয়মগুলো নাগরিক জীবনে বয়ে আনে স্বস্তি। নিখুঁত ও টেকসই নির্মাণে শৃঙ্খলার কোন বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলোর নির্মাণশিল্পই এমনটিই শিক্ষা দেয়।
















