মার্কিন মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র ফ্লোরিডার নাসা কেনেডি স্পেস সেন্টার কিংবা সার্চ জায়ান্ট গুগলের সানফ্রান্সিসকোর হেডকোয়ার্টারের মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যিক ভবন এখন বাংলাদেশে। ভাবছেন, বাড়িয়ে বলছি। না, পাঠক একদমই বাড়িয়ে বলছি না। এমন আদলেই নির্মিত হচ্ছে প্রকৃতিবান্ধব ১৭তলা সিটিস্কেপ টাওয়ার, যা এ মুহূর্তে প্লাটিনাম লিড সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত বাংলাদেশের একমাত্র পরিবেশবান্ধব স্থাপনা।
বিশ্বে পরিবেশবান্ধব আবাসন গড়ার যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তাতে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। রাজধানীর বুকে গুলশান অ্যাভিনিউয়ে নির্মিত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব, পানি ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী গ্রিন বিল্ডিং বা সবুজ আবাসন। সেই সঙ্গে এটি অর্জন করতে চলেছে ‘লিড প্লাটিনাম সার্টিফিকেট’, যার নির্মাতা দেশে সবুজ আন্দোলনের পথিকৃৎ আবাসন নির্মাণ ও কনসালটিং প্রতিষ্ঠান সিটিস্কেপ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটির ‘আই অ্যাম গ্রিন’ নামে পরিচালিত কার্যক্রমের আওতায় রাজধানীর ৫৩ গুলশান অ্যাভিনিউয়ে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হচ্ছে তিন ইউনিটের ১৭তলা ‘সিটিস্কেপ টাওয়ার’ নামের বাণিজ্যিক এ ভবনটি, যার প্রতিটি ফ্লোরের পরিসর পাঁচ ৭৭০ বর্গফুট। ভবনটিতে ফ্লোর পেতে এরই মধ্যে আগ্রহী বিশ্বের নামীদামি তেল-গ্যাস ও বহুজাতিক কোম্পানি। ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষে সিটিস্কেপ টাওয়ারের উদ্বোধন হবে জানুয়ারিতে।
ইউএসজিবিসির (ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল) পরিবেশ ও মানবসম্পদের প্রতি পাঁচটি আলাদা আলাদা সূচক বিবেচনায় নিয়ে তবেই লিড (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভারমেন্ট ডিজাইন) সার্টিফিকেট দেয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভবনটির অবস্থান, নির্মাণসামগ্রী, পরিবেশের প্রতি ভবনটি কতটা যত্নশীল, ভবনটি পানির অপচয় রোধ করছে কি না, ভবনের ভেতরকার পরিবেশ ও ডিজাইন এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতা। লিড সার্টিফিকেশনের চার পর্যায়ের মধ্যে কেয়ার অ্যান্ড সেল ক্যাটাগরির সর্বোচ্চ সনদ লিড প্লাটিনাম পেতে অর্জন করতে হয় ৮০-এর ওপর পয়েন্ট। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে ১২৬টি প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব ভবন (গ্রিন বিল্ডিং) রয়েছে। এর মধ্যে এশিয়ায় রয়েছে মাত্র ২৬টি। প্রকৃতিবান্ধব সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে নির্মিত প্রথম বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ‘সিটিস্কেপ টাওয়ার’। গ্রিন বিল্ডিং হিসেবে এশিয়ায় যার অবস্থান ২৭তম। ইমরাত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ৫০ শতাংশ জায়গা ছেড়ে দিয়ে নির্মিত হচ্ছে ভবনটি। নির্মাণকাজে নিয়োজিত কর্মীদের পরিধেয় হলো নিরাপদ পোশাক এবং ব্যবহৃত হচ্ছে সর্বোচ্চ মানের সর্বাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। অথচ বিশাল এ কর্মযজ্ঞের সামান্যতম আভাস নেই বাইরে। এক টুকরো ইট বা সুরকি পড়ে নেই রাস্তা কিংবা ফুটপাতে।
সিটিস্কেপ টাওয়ারটির বিশেষত্ব হচ্ছে অন্যান্য বাণিজ্যিক ভবনের তুলনায় এর বিদ্যুৎ খরচ হবে প্রায় ৬০ শতাংশ কম, যার ৭ শতাংশ পূরণ হবে সোলার প্যানেলের সাহায্যে। স্বাভাবিকমাত্রায় এ বাণিজ্যিক ভবনে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ১ দশমিক ৬ মেগাওয়াট হওয়ার কথা। সেখানে ভবনটিতে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে মাত্র ৭৩০ কিলোওয়াট। এখানে এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার না করে এলইডি লাইট ব্যবহার করা হবে, যা কক্ষে কেউ প্রবেশ করা মাত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠবে; আবার কক্ষ ত্যাগ করা মাত্র বন্ধ হয়ে যাবে। লিফটের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা থাকবে, যার মাধ্যমে লিফটের ভেতরের বিদ্যুতের চাহিদা সে নিজেই পূরণ করতে পারবে। ভবনের ছাদে থাকবে পানির রিজার্ভার, যার সাহায্যে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যাবে। সে সঙ্গে বেসিনে ব্যবহৃত পানি কমোডের ফ্লাশে ব্যবহারের জন্য ধারণ করে রাখার ব্যবস্থা থাকবে, যার মাধ্যমে ঢাকার অন্যান্য বাণিজ্যিক ভবনের তুলনায় এ ভবনে পানির ব্যবহার হবে কম প্রায় ৬০ শতাংশ। বাইরের তাপ থেকে ভবনের সুরক্ষার জন্য ভবনের চারপাশে ব্যবহার করা হবে দুই স্তরবিশিষ্ট গ্যাস। এর ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ব্যবহার কমে আসবে।
যেসব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করা হবে, তার কার্বন নিঃসরণের মাত্রা থাকবে সহনীয় পর্যায়ে। ভবনে ব্যবহৃত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব সব নির্মাণ উপকরণ, যা বিশ্বখ্যাত পরিবেশবান্ধব ভবনের উপকরণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমদানিকৃত। ব্যবহৃত পরিবেশবান্ধব অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে: ১. আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবস্থায় নিñিন্দ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্ডার ভেহিকেল সারভিলেন্স সিস্টেম, টার্নস্টাইল সিস্টেম, জার্মানি, পিনপয়েন্ট ওয়েক থ্রু মেটাল ডিটেকটর, যুক্তরাষ্ট্র, গ্যারেট সুপার ওয়ান্ট, যুক্তরাষ্ট্র, সিকিউরিটি ডোম ক্যামেরা, কোরিয়া, ইনফারেড নাইটভিশন ক্যামেরা, কোরিয়া, ভ্যারি ফোকাল লেন্স ব্ল্যাক এলইডি, গ্যাস এক্সটিনগুয়েশার সিস্টেম, কার্বন ডাই-অক্সাইড এক্সটিনগুয়েশার সিস্টেম, এবিসি ড্রাই পাউডার ফায়ার এক্সটিনগুয়েশার, গ্যাস সাসপেনশন সিস্টেম, হিট অ্যান্ড স্নোমক ডিটেকটর, ভেন টাইপ ওয়াটার ফ্লো অ্যালার্ম সুইচ, ফায়ার রেটেড ডোর, ফায়ার প্রুভ ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার, লাইটিং অ্যারেস্টার, ফ্রান্স। ২. শক্তি সংরক্ষণের জন্য রয়েছে লিফট জেন-২ প্রিমিয়ার ওটিআইএস, ফ্রান্স, রিমোট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট, এইচভিএসি সিস্টেম, জাপান, এলইডি ইন্টেলিজেন্স লাইটিং সিস্টেম, সোলার প্যানেল, জার্মানি, পিলকিনটোন গ্লাস, বাসবার ট্র্যাকিং সিস্টেম, ফ্রান্স। ৩. শক্তি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। সঙ্গে রয়েছে বিশ্বমানের অক্সেস সিস্টেম ও অগ্নিপ্রতিরোধী সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। ভবনটি ৭ দশমিক ৫ রিখটার স্কেল পর্যন্ত ভূমিকম্প সহনীয় বলে বুয়েট ও বিটিআরসি কর্তৃক স্বীকৃত। নান্দনিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন আর আমদানিকৃত স্পেনের বিশ্বখ্যাত পোরসিলেনোসা ফিটিংস ও টাইলের ব্যবহার ভবনটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুণ। আভিজাত্য আর দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যে যার রয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। আর এক্সটেরিয়রে ব্যবহৃত হয়েছে স্পেনের বিশ্বমানের প্রোডেমা উড কভারিং, যা তাপ প্রতিরোধী। এ উড কভার ভেতরে তাপ প্রবেশে বাধা দিয়ে ভবনকে রাখে শীতল ও প্রকৃতিবান্ধব।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প কারখানাগুলোকে সবুজ আবাসনের আওতায় আনার জন্য আন্তর্জাতিক চাপের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের কর্তাব্যক্তিরা সিটিস্কেপ টাওয়ারের মতো গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণে উদ্যোগী হচ্ছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এ দেশে তাদের কার্যালয় স্থাপনের জন্য সবুজ আবাসনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই দেশে বিপ্লব ঘটবে সবুজ আবাসনশিল্পের, যার পথিকৃৎ সিটিস্কেপ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।
যোগাযোগ
সিটিস্কেপ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড
৭/এ গুলশান পয়েন্ট (৫ম তলা), গুলশান-১, ঢাকা।
টেলিফোন: ৯৮৮১৮৬৭, ৯৮৮১৮৬৮।
আমাদের সিটিস্কেপ টাওয়ারটি লিডের প্লাটিনাম ক্যাটাগরিতে সনদপ্রাপ্ত; বাংলাদেশে যা প্রথম
নাহিদ সারোয়ার
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
সিটিস্কেপ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড
ভবিষ্যতে বিশ্বে জমি, বিদুৎ, খাবার পানির অভাব প্রকট আকার ধারণ করবে। আমার যদি এখন থেকে সেই চিন্তা না করি তাহলে আমরা ভুল করব। এ ব্যাপারে সারা বিশ্ব যেভাবে ভাবছে, আমরা সেভাবে চিন্তা করছি না। যেকোনো কাজে স্বীকৃৃতিটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর তা যদি হয় বিশ্বমানের তবে তো কথাই নেই। আমাদের সিটিস্কেপ টাওয়ারটি লিডের প্লাটিনাম ক্যাটাগরিতে সনদপ্রাপ্ত; বাংলাদেশে যা প্রথম। বিশ্বে বেশি পরিবেশদূষণ হয় বিল্ডিং তৈরিতে। কেননা পরিবেশের এই দূষণের সসেঙ্গ যুক্ত নির্মাণসামগ্রী তথা ইট, বালু, রড, সিমেন্ট, রং, টাইল প্রভৃতি। কিন্তু গ্রিন বিল্ডিং তৈরিতে ব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় দূষণ হয় না। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, হংকংয়ে নগরায়ণ হচ্ছে ভার্টিক্যাল গ্রোথে। জায়গা কম হওয়ায় বেশি নির্মিত হচ্ছে বহুতল আকাশচুম্বী ভবন। আমাদের এখন এ বিষয় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। গ্রিন বিল্ডিংয়ের কর্মপরিবেশ কর্মদক্ষতা বাড়ায় কর্মীদের। ফলে উপকৃত হয় কোম্পানি। সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগের অন্তরায় নির্মাণ কর ও গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণ উপকরণের আমদানি শুল্ক। সরকার এটি কমিয়ে দিলে গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবে। বাণিজ্যিক পরিবেশবান্ধব এ স্থাপনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আমাদের ইচ্ছে আছে ঢাকার আশপাশে মধ্যবিত্তদের জন্য কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য কন্ডোনিয়াম নির্মাণের, যাতে সুলভে তারা তাদের আবাসনসুবিধা পেতে পারে। বাংলাদেশের পরিবেশের সুরক্ষায় এখনই আমাদের প্রকৃদতিবান্ধব গ্রিন বিল্ডিংয়ের পাশাপাশি গ্রিন ইপিজেড ও গ্রিন সিটি নির্মাণে এগিয়ে আসা উচিত।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪
(অথর যুক্ত করুন)