নদী বিস্তৃত ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। ছোট-বড় অসংখ্য নদী জালের মতো ঘিরে আছে নদীমাতৃক এ দেশটিকে। কিন্তু আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট নানা কারণে আজ বিলীন হতে চলেছে নদীগুলো। খরস্রোতা ও প্রমত্তা নদী শুকিয়ে রূপ নিয়েছে বিরাণভূমিতে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে জাগছে চর। আর এই চরগুলোই হচ্ছে বালু উত্তোলনের মূল উৎস। বালু মিশ্র কিন্তু স্বচ্ছ দানাদার পদার্থ। স্থাপনা তৈরির প্রধান উপাদান এটি। বালু সিমেন্ট ও পানির সঙ্গে মিশে দ্রুত জমাট বেঁধে তৈরি করে শক্তিশালী অবকাঠামো। বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত বালুর প্রধান উৎস নদীর তল ও নদী তীরবর্তী চর। উত্তোলিত এ বালু দিয়েই যেমন গড়ে উঠছে হাজারো স্থাপনা, তেমনি একে ঘিরে চলছে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, মালিক, পরিবহন সম্পৃক্ত হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা। তবে সঠিক দিকনির্দেশনা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে অপরিকল্পিত ও যত্রতত্র বালু উত্তোলনের ফলে নদীভাঙন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ফসলি জমি উজাড়সহ ঘটছে নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়।
নানা ধরনের বালু রয়েছে। এর মধ্যে স্থাপনা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় মোটা ও চিকন বালু। আমাদের এখানে নির্মাণকাজে সিলেটের বালুর সুখ্যাতি রয়েছে। এ ছাড়া পাকশীর বালুও উন্নতমানের। বড় ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরিতে সিলেটি বালুকে উৎকৃষ্ট বিবেচনা করা হয়। কারণ, এ এলাকার পাহাড়ি নদীগুলো প্রচুর পরিমাণে দানাদার বালু বয়ে আনে। আর এ জন্য এই বালু উৎকৃষ্ট মানের। মূলত এ অঞ্চলের নদীর চরগুলো থেকে বালু উত্তোলন করা হয় বেশি। এ ছাড়া নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদী থেকে উত্তোলিত বালুও বিখ্যাত। সিলেটের সুরমা, সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, রংপুর-গাইবান্ধার তিস্তা, নওগাঁর আত্রাই, সিরাজগঞ্জের যমুনা, রাজবাড়ী-রাজশাহীর পদ্মা, গোপালগঞ্জের খাগড়াবাড়িয়া খালসহ দেশের প্রায় সব বালুময় নদী থেকে নানাভাবে চলছে বালু উত্তোলন। তবে নদী থেকে বালু সংগ্রহে সাধারণত শ্যালো ড্রেজার আবার কখনো বা একাধিক বলগেট ড্রেজার ব্যবহার করা হয়। উত্তোলনে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় যেমন- নদীতীর কেটে আবার নদীতে নৌকা, ট্রলার বা লঞ্চে শ্যালো মেশিন দিয়ে ভাসমান অবস্থায় পাইপের সাহায্যে নদীর তলদেশে থেকে বালু তোলা হয়। এতে ৮-১০ জনের শ্রমিকের দল অথবা শতাধিক শ্রমিকও যুক্ত থাকে। অনেক সময় দিনের পাশাপাশি তারা রাতেও কাজ করে। কোথাও আবার কোদাল ও বেলচার সাহায্যে বালুকাময় জমি থেকে বালু সংগ্রহ করা হয়।
অনেক আগ থেকেই বাড়ি বা অবকাঠামো নির্মাণে নদী বা খাল থেকেই বালু সংগৃহীত হচ্ছে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে বাড়িঘর নির্মাণের গতি বাড়ায় মাত্রাতিরিক্ত হারে চলছে বালু উত্তোলন। বিশেষত অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে দিন দিনই অত্র এলাকার তীরবর্তী জনবসতি ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার জনজীবন পড়ছে ঝুঁকির মধ্যে। হুমকির মুখে পড়ছে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ জনপদ। প্রতিদিন শত শত শ্রমিক নদীতীরের কয়েক কিলোমিটার জায়গাজুড়ে ৮০ থেকে ১০০ ফুট গভীর গর্ত করে উত্তোলন করছে বালু। এতে নদীর গতিপথও যাচ্ছে বদলে। যমুনা নদীসহ বেশকিছু নদীর সেতুসংলগ্ন অঞ্চল থেকে বালু উত্তোলন করায় হুমকির মুখে এসব সেতুর স্থায়িত্ব। মূলত নদী এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আইনের তোয়াক্কা না করে বালুর রমরমা ব্যবসা করছে। হঠাৎ করেই এ তৎপরতা বন্ধে মোবাইল কোর্ট চালানো হলেও কয়েক দিনের জন্য বন্ধ থাকে এ প্রক্রিয়া তবে কিছুদিন পর আবারও শুরু হয় সরবে।
বালু উত্তোলন, সংগ্রহ ও বিপণনে নিয়োজিত শ্রমিকেরা যথেষ্ট পারদর্শী। প্রথমে তারা বালুগুলো চর থেকে এনে জমা করে। এরপর ওঠায় ছোট-বড় বালুবাহী ট্রলার ও লঞ্চে। নৌযান ছোট হলে চার থেকে ছয় হাজার ফুট এবং বড় হলে আট থেকে দশ হাজার ফুট বালু ধরে। এগুলো ট্রলারে এমনভাবে বোঝাই করা হয়, যেন তা নদীতে প্রায় ডুবেই থাকে। বালুবোঝাই ট্রলারগুলো আসা-যাওয়া করে দেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে ঢাকা শহরে মূলত কাঁচপুর ও গাবতলী এলাকায় ট্রলারগুলো আসে বেশি। এখান থেকে বালু দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায়। বালুগুলো ট্রলারে আনতে তেমন খরচ হয় না। কিন্তুবর্তমানে তেলের মূল্য বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছে। আর এ সুযোগে বালুর দাম বাড়াচ্ছে মালিকপক্ষ। তা ছাড়া এখন শ্রমিকের খরচও বেশি। তারা ট্রলার থেকে বালু ট্রাকে তুলতে বা বালু জমা করে রাখার কাজে তাদের পারিশ্রমিক বাড়াচ্ছে দিন দিন। বালু শ্রমিকেরা কাজ করে কেউ দিন হিসাবে, কেউ সাপ্তাহিক হিসাবে। সময়ভেদে ওদের মজুরি ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বালু উত্তোলনের জায়গা থেকে বালু কিনতে চাইলে ওখানকার বালুর দোকান বা মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এখান থেকে বালু পরিমাণে বেশি নিলে দাম পড়বে কম। আর যদি বাজারের দোকান থেকে কেনা হয় তাহলে বালুর দাম প্রায় এক হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা বেশি পড়বে। বালু দোকান থেকে কিনলে বস্তা হিসাবে নেওয়া যায়। আবার বেশি করে নিলে স্কয়ার ফুট হিসেবে কেনা যায়।
বালু কেনার পর তা সংরক্ষণের কাজটি কিন্তু সহজ নয়। বালুগুলো ছেঁকে নিলে বালু থেকে ময়লা দানাদার পর্দা সরে যায়। তাই নির্মাণকাজ চলাকালীন বালু প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সঠিক পরিমাণে বালু প্রয়োগে নির্মিত বাড়ি মজবুত হয়। তা ছাড়া বাড়ি তৈরিতে পরিমাপমতো ভালো বালু ব্যবহার করা উচিত। এতে আপনার বাড়িটি থাকবে সুরক্ষিত। নিরাপদ থাকবে আপনার আগামী প্রজন্ম।
মো. ওয়ালিউর রহমান (অভি)
ove_rahman@gmail.com
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৮ তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৪