ব্যবসাটা পাটের; ছোট্ট পরিসরের। সফল ব্যবসায়ী হতে এমন কিছু করা চাই, যেখানে মুনাফা ও সম্মান উভয়ই মেলে। সময়টা নির্মাণপণ্যে ব্যবসার ক্রমজাগরণের, স্বভাবতই যা তাঁকে দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করে ব্যবসাটার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। কিন্তু বিধি বাম! বাধা হয়ে দাঁড়াল বাজারের প্রতিদ্বন্দ্বী নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ীরা। কিছুতেই তাঁকে এ ব্যবসা করতে দেবেন না তাঁরা। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল, যা থেকে নড়ার পাত্র নন তিনি। ফরিদপুরের আকিজ সিমেন্ট পরিবেশকের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে অনুনয়-বিনয় করে ১০০ ব্যাগ সিমেন্ট আনলেন। এরপরের গল্পটা অন্য রকম। দারুণ দক্ষতায় এলাকায় তো বটেই, ফরিদপুরের অন্যতম সফল একজন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেন। ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর বাজারের মেসার্স কামরুজ্জামান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. কামরুজ্জামানের (চাঁন মিয়া) জীবননাট্যের দৃশ্যপটটি এমনই। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা সুবোদ কুমার বসুর সহযোগিতায় বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার তাঁরই ব্যবসায়িক সাফল্য-কাহিনি।
ব্যবসায়ী চাঁন মিয়ার জন্ম ২২ ডিসেম্বর ১৯৭৪ ফরিদপুর জেলার গোহাইলবাড়ী গ্রামে। বাবা মরহুম হাজি আবদুস সাত্তার মোল্লা আর মা মোছা. শুকুরননেসা। ছয় ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ। খরসতী চন্দ্র কিশোর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণের পর জড়িয়ে যান বাবার পাটের ব্যবসায়। যৌথভাবে ব্যবসা করতেন বড় ভাইয়ের সঙ্গে। পরে অর্থাৎ ২০০৭ সালে পাটের ব্যবসার পাশাপাশি যুক্ত হন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়। শুরুতে সিমেন্ট বিক্রি করলেও বর্তমানে রড, সিমেন্ট, ঢেউটিন, স্যানিটারিসামগ্রী সবই মেলে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।
মূলত সাতৈর বাজার ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রাম্য বাজার। বাজারের ব্যবসায়িক গণ্ডি সীমিত। ক্রেতাদের অধিকাংশই কৃষক, যাঁদের হয়তো সামর্থ্য নেই বাড়তি দামে ভালো মানের পণ্য কেনার। নিম্নমানের কমদামি পণ্যই বিক্রি করাই লাভজনক এখানে। কিন্তু এ পথে হাঁটেননি চাঁন মিয়া। গুণগতমানের পণ্য বিক্রি করেন। দাম একটু বেশি হলেও তা কিনতে উৎসাহিত করেন সহজ-সরল ক্রেতাদের। মুনাফাও করেন অল্প। তাঁর সততা, ক্রেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, বাবার সুনামÑ এসবই তাঁকে এলাকার একজন সফল ব্যবসায়ী করে তুলেছে। প্রচুর নির্মাণপণ্য বিক্রির জন্য যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। আকিজ সিমেন্ট বিক্রিতে প্রথম থেকেই তিনি শীর্ষ বিক্রেতাদের তালিকায়। ২০১৩ সালে ফরিদপুর জোনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রেতা তিনি। এলাকায় বিএসআরএম রডের একজন ট্রায়াল ডিলার। অভাবনীয় এসব সাফল্যে বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন ফ্রিজ, টেলিভিশন, ল্যাপটপ, ক্যামেরা, ডিনার সেট, মাইক্রোওভেন, ফিল্টার, নগদ টাকাসহ অগণিত উপহারসামগ্রী। এ ছাড়া আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে নেপাল, থাইল্যান্ড ও কক্সবাজার ভ্রমণের সুযোগ পেলেও সময় স্বল্পতায় যেতে পারেননি।
যৌথ ব্যবসা ছেড়ে যখন একক ব্যবসা শুরু করলেন, তখন ব্যবসায়ী চাঁন মিয়ার মূলধন ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। সততা, মেধা ও শ্রম দিয়ে ছোট্ট বাজারেই তুলনামূলক বড় পরিসরে ব্যবসা করছেন তিনি। পাটের ব্যবসার পরিসরও বেড়েছে। জমি কেনাবেচার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন নিজেকে। এসব ব্যবসায় অর্জিত মুনাফা দিয়ে তৈরি করেছেন নিজস্ব একটি বাড়ি। জমিও কিনেছেন। বাজারে এখন তাঁর একই সঙ্গে চারটি দোকান ও একটি গোডাউন। তিনি বোয়ালমারী থানার বৃহত্তর সংগঠন পাট-ভুসিমাল ব্যবসায়ী সমিতির কার্যকরী পরিষদের অন্যতম সদস্য। ব্যবসার পাশাপাশি এলাকার সামাজিক কাজেও রয়েছে সমান অংশগ্রহণ। গ্রামে নিজেদের জায়গায় তাঁর ও অন্য আরেকটি পরিবারের যৌথ সহায়তায় গোহাইলবাড়ী পূর্বপাড়ায় একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া এলাকার দুস্থ ব্যক্তিদের সাধ্যমতো সহায়তার চেষ্টা করেন সব সময়।
সফল এ ব্যবসায়ী বিয়ে করেছেন ২০১১ সালে। স্ত্রী কানিজা জামান দৃষ্টি। সুখী এ দম্পতির এক মেয়ে নাজিয়া জামান তৈশী। বয়স ২১ মাস। তাঁর সহধর্মিণী ব্যবসায়িকসহ অন্যান্য বিষয়ে এগিয়ে যেতে সব সময় উৎসাহিত করেন। ব্যবসায়িক ব্যস্ততা সত্ত্বেও সময় পেলেই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে বের হন। সিলেট, ঢাকার ফ্যান্টাসি কিংডমসহ বেশকিছু দর্শনীয় স্থানে ঘুরেছেন। পছন্দের খাবারের তালিকায় রয়েছে শিং মাছ আর কবুতরের মাংস।
হাস্যোজ্জ্বল এ ব্যবসায়ী আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। বেশ কটি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও নির্মাণপণ্য ব্যবসা নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চান। এ ব্যবসাকেই বড় পরিসরে রূপ দেওয়াই তাঁর এখনকার লক্ষ্য।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫