মো: আকরামুজ্জামান খোকন

সততা, নিষ্ঠা এবং পরিশ্রমেই মানুষ বড় হয়

নববর্ষের আমেজটা তখনো কাটেনি। বন্ধনের ‘সফল যারা কেমন তারা’ বিভাগের সফল মুখের জন্য বর্ষবরণের পরদিনই পৌঁছলাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পনগরী নোয়াপাড়াতে। যশোর জেলার, অভয়নগর থানার ছোট একটি শহর এটি। শহরটির পাশ ঘেঁষেই বয়ে গেছে ভৈরব নদী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছোট বড় জাহাজ, লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা ইত্যাদি নানা জলযানে করে এই নদী দিয়েই এখানে মালামাল আনা-নেয়া করা হয়। শহরটির মাঝ দিয়ে চলে গেছে যশোর-খুলনা মহাসড়ক। সড়কের দুপাশ দিয়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা। তবে তার বেশিরভাগই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সার, সিমেন্ট, রড ইত্যাদি নির্মাণ সামগ্রীর দোকানই এখানে বেশি। তবে এসব দোকানগুলোর মাঝে চোখে পড়ল ভিন্নরকম একটি দোকান। নাম-মেসার্স জামান ব্রাদার্স। গন্তব্যটা সেখানেই। দোকানে ঢুকতেই হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো: আকরামুজ্জামান খোকন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আলাপচারিতা বেশ জমে উঠল। শুনতে চাইলাম তার জীবনের গল্প। বিনয়ী এই মানুষটি জানালেন খুব সাধারণ মানুষ তিনি। তার গল্পটাও সাধারণ। বন্ধনের পাঠকদের সফল ব্যবসায়ী  খোকনের সেই সাধারণ গল্পটিই আজ শোনাব।

১৯৬৮ সালের ২রা এপ্রিল, যশোর জেলার অভয়নগর থানার নোয়াপাড়ায় তার জন্ম। পিতা মৃত সামসুল আলম এবং মাতা আমেনা বেগম। ৩ ভাই ও ৬ বোনের মধ্যে তিনি ৪র্থ। স্কুল ও কলেজ শেষ করেছেন নোয়াপাড়াতেই। নোয়াপাড়া কলেজ থেকে তিনি এইচএসসি পাস করেন। এরপর ১৯৯০ সালে  ব্যবসায়িক জীবনে জড়িয়ে যান। পারিবারিক সূত্রেই অবশ্য তার ব্যবসাতে আসা। কাপড়, হোটেল, ধান, পাট ইত্যাদির ব্যবসা ছিল তাদের। ফলে ছোট বেলা থেকেই বাবার ব্যবসা দেখাশুনা করতেন এবং সেখান থেকেই ব্যবসায়ের হাতেখড়ি। ব্যবসায়িক কৌশল, ক্রেতাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং কিভাবে ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করা যায় তার সবই সে সময়টাতেই শিখেছেন। তবে নিজে যখন এই পেশায় এলেন, খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারলেন ব্যবসা খুব সহজ জিনিস নয়। এখানে টিকে থাকতে হলে ধৈর্য্য, কৌশল ও দুরদৃষ্টি প্রয়োজন। শুরুতেই বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করলেও তাতে আশানুরূপ ফল পাচ্ছিলেন না। তিনি বুঝতে পারেন এখানে এমন ধরনের ব্যবসা করতে হবে যা স্থানীয় পরিবেশের সাথে খাপ খায় এবং সেখান থেকে সফলতা আনা যায়। সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু করেন সারের ব্যবসা। কারণ নোয়াপাড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার নগরী। এখানে নদীপথে চট্রগ্রাম ও মংলা থেকে প্রচুর  সারসহ অন্যান্য পণ্য আসে। এ ব্যবসাতে ধীরে ধীরে সফলতা আসতে থাকে। খুচরা এবং পাইকারীতে দুভাবেই তিনি তার ব্যবসা চালিয়ে যান। পরিচিতিটাও আসে ভালই। এ ব্যবসায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন মৌসুমী ব্যবসাও চালিয়ে যান। এভাবেই চলছিল তার ব্যবসায়িক জীবন। ১৯৯৬ সালে তিনি বিয়ে করেন। বর্তমানে তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। বড় ছেলে ৯ম এবং ছোট ছেলে ৩য় শ্রেণীতে পড়াশোনা করে। মেয়ের বয়স মাত্র দুই বছর। বেশ সুখেরই সংসার তাদের। দোকানের সামনেই একটি ফ্ল্যাট সপরিবারে বাড়িতে থাকেন। চোখের সামনেই তার নিজের শহরের রূপ বদলের চিত্রটা দেখতে পান। ক্রমেই শহরের আয়তন বৃদ্ধি, পাশাপাশি এখানকার দালান-কোঠারও উন্নয়ন হতে থাকে। নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। ঢাকা শহরের মত এত বেশি না হলেও নগরায়নের প্রভাব যে তার এলাকাতেও পড়েছে সেটা তিনি খুব গভীরভাবেই টের পান। আর এ কারণেই ২০০৭ সালে আসেন সিমেন্টের ব্যবসায়। ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিসর বাড়তে থাকে। নোয়াপাড়া বাজারে আজ তার দুটি দোকান। তিনি অভয়নগর থানার আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির সাব-ডিলার। ব্যবসায়ের সুবিধার্থে বাড়িতেই তৈরি করছেন গোডাউন। ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমেই আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জানান। স্বল্প মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও গুটি গুটি পায়ে আজ তার ব্যবসা লাখ ছাড়িয়ে কোটিতে পৌঁছে গেছে। তবে তার জন্য ব্যয় করতে হয়েছে জীবনের অনেকটা সময়। ব্যবসায়িক সহযোগিতা পেয়েছেন বিভিন্ন কোম্পানি থেকে। তবে আকিজ সিমেন্টের বিপণন বিভাগের কর্মচারীদেরকে তিনি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। ব্যবসা কার্যে ব্যস্ত থাকার কারণে পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারেন না। তারপরও পরিবারের সবাই তাকে সবসময় প্রেরণা যুগিয়েছে বলে তাদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, মধ্যমমানের ব্যবসায়ী তো, এ জন্য পরিশ্রম ও যোগাযোগ বেশি করতে হয়। এলাকার মানুষের ভালবাসা ও সমর্থন পাওয়ার জন্যও তাদেরকে তিনি ধন্যবাদ জানান।

আমি একটু রগচটা ধরণের মানুষ, মাথাও কিছুটা গরম, কথাটি অবশ্য হাসি মুখেই বললেন। সততা, বিশ্বাস আর আদব-কায়দা মানুষের মাঝ থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি কখনোই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না এবং সবসময় মিথ্যা এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করেন। নিয়মিত নামাজ পড়েন। নিজের বিচার-বুদ্ধির উপরই সবসময় আস্থা তার। তিনি বলেন, তিনটি জিনিস থাকলে ভাগ্য আপনার সহায় হবে। তা হল- সততা, নিষ্ঠা এবং পরিশ্রম। তিনি অত্যন্ত যুক্তিবাদী মানুষ। তিনি মনে করেন, যার যার সম্মান তার তার কাছে। নিজেকে তার আস্থার অবস্থান তৈরি করে নিতে হবে। যে কোনো কাজ সময় নিয়ে করতে হবে। তাতে কাজে সফলতা আসবেই।

দোকান থেকে বের হয়ে খোকন সাহেবের সাথে হাঁটছিলাম। পথে অনেকের সাথেই তার কুশল বিনিময় হল। মনে হল এখানে সবাই কমবেশি তার পরিচিত। একটা প্রয়োজনে তার সাথে রিকশা করে যেতে হল। তিনি রিকশাওয়ালার নাম ধরে ডাকলেন। সে হাসি মুখেই এগিয়ে এসে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিল। কাজ শেষে যখন ফিরে আসি তখনো আরেকজন রিকশাওয়ালাকে নাম ধরে তিনি ডাক দিলেন। একই ঘটনা ঘটল। কিছুটা বিস্মিত হলাম এটা জেনে যে, তিনি এখানকার রিকশাওয়ালাদের নামও জানেন। এলাকার সমাজ সেবামূলক কাজের সাথেও এ ব্যবসায়ী নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। তবে সে কথা জানতে চাইলে তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি প্রতি বছর গরিব-দুঃখিদের উদ্দেশে যাকাত দেন। খুলনা-সাতক্ষীরা এলাকায় যখন আইলা আঘাত হানে, মানুষ হয়ে পড়ে খাদ্য, বস্ত্র ও গৃহহীন। ঠিক তখন তিনি ছুটে যান তাদের পাশে। চিড়া, গুড়, খাবার স্যালাইন, খাবার পানি, বিস্কিট ইত্যাদি সামগ্রী নিজ খরচে আইলা দুর্গত এলাকায় বিতরণ করেন। পরবর্তীতে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা নিয়ে এবং তাদের সাথে নিয়ে একই কাজ অব্যহত রাখেন। এছাড়াও মসজিদ, মাদ্রাসা এবং গরিব মানুষকেও তিনি দান ও সাহায্য করে থাকেন।

সপরিবারে মো: আকরামুজ্জামান খোকন

শৈশবটা তার কেটেছে বেশ চমৎকার। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার দোকানে বসতেন। হাডুডু, ফুটবল, কাবাডিসহ নানা ধরনের খেলাধুলা করতেন। নদীর সাথে জড়িত স্মৃতির কথা জানতে চাইলে যেন ভেসে গেলেন সূদুর অতীতে। চোখে খেলে গেল স্মৃতির এক অন্যরকম দ্যুতি। সারা দিনে চার-পাঁচবার গোসল, মাছ ধরা, নদীতে সাঁতার কাটাসহ আরো কতরকম দুরন্তপনায় মেতে ওঠার গল্প বললেন। কলাগাছ দিয়ে ছাড়াও ভেলা তৈরি করতেন কচুরিপানা দিয়ে। আর তাতেই ভেসে চলে যেতেন বসুন্দিয়া, ফুলতলা বা তার থেকেও দূরে। তবে দিন বদলে গেলেও কিছু শখ তার এখনো রয়ে গেছে। পছন্দ করেন ঘুরে বেড়াতে। বেড়াতে গেছেন ভারতের কলকাতা, দিল্লীসহ বেশকিছু জায়গায়। দেশের ভেতর প্রায় সব জায়গা ঘুরলেও তার সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলকে। তিনি বেশ ভোজনপ্রিয় মানুষও বটে। খেতে ভালবাসেন পোলাও, গরুর মাংস, বিরিয়ানী প্রভৃতি। এতে অবশ্য বাধ সাথে হাইপ্রেসার। তারপরও সুযোগ পেলেই ভোজনের ঠিকই সদ্ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, সময় ও পরিবেশের সাথে খাপ খায় এমন কাজ করার ব্যাপারটা শিখেছি ছোটবেলা থেকেই। আমার প্রতি মায়ের দাবি ছিল যেন কোন খারাপ কাজে না যাই। তাই সবসময়ই এগুলো এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করেছি। বাবার কাছ থেকে দেখেছি কিভাবে মানুষের মত মানুষ হতে হয়। ফলে এগুলো আমাকে এতটা পথ চলতে সাহায্য করেছে। আর এসব কিছুই পুঁজি করে তিনি চান একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হতে। অভয়নগরে সিমেন্ট ব্যবসাতে তার অবস্থান আরো সুদৃঢ় করতে চান। তিনি বলেন, আমি ডিলার না হলেও আমি চাই এ অঞ্চলে ব্যবসায়িক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। এছাড়াও সুখে দুখে যেন সবার পাশে থাকতে পারি। এখন স্বপ্ন দেখি ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে তাদেরকে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তোলার। মানুষটির আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। তার প্রতি মানুষের ভালবাসাও উল্লেখ করার মত। যেহেতু এতদিন তিনি সুনামের সাথে ব্যবসা করে এসেছেন, তাই বন্ধন সবসময়ই চায় যেন তার সে সুনাম অটুট থাক এবং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাক।  

মাহফুজ ফারুক

প্রকাশকাল: বন্ধন ২৫ তম সংখ্যা, মে ২০১২

Related Posts

ব্যবসার সাফল্যে চাই পরিকল্পনা

জীবন মানে যুদ্ধ; আর যুদ্ধে জেতার বড় উপায় কৌশল। তেমনি ব্যবসায় সাফল্য পেতেও হতে হয় কৌশলী; দিতে হয়…

ব্যবসায় সফলতায় চাই মনোবল

দেশের প্রাচীন জনপদ নওগাঁ। ছোট ছোট নদীবহুল বরেন্দ্র এ ভূমি প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিকাজের জন্য প্রসিদ্ধ। কৃষিকাজের উপযোগী হওয়ায়…

সততায় যিনি আপসহীন

একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সকলে তাঁকে আদর্শ মানলেও ব্যবসায়িক জীবনের শুরুতে অনেক ব্যবসাতেই  হয়েছেন ব্যর্থ। ব্যক্তিজীবন ও সংসারেও…

ব্যবসায়ীকে হতে হবে সাহসী

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জ। ঢাকার সঙ্গে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার; গড়ে উঠছে অসংখ্য…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq