অংশীদারত্বের উন্নয়নে

যেকোনো দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব প্রধানত সরকারের আর সরকারের গঠন কাঠামোর বিবেচনায় একেক স্থানে একেক ধরনের উন্নয়ন হয়। যেমন- রাজতন্ত্রের দেশে রাজা ও রাজপরিবারের ইচ্ছেমতো; সমাজতন্ত্রের দেশে সমতার ভিত্তিতে আর গণতান্ত্রিক দেশে নেতা বা নেত্রীর ইচ্ছেমতো। তা ছাড়া সামরিক বা স্বৈরতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার উন্নয়ন তো আছেই, যা আমরা এ দেশে জেনারেল আইয়ুব খান ও এরশাদের আমলে দেখেছি। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের ‘বুনিয়াদি গণতন্ত্র ও উন্নয়ন’-এর আদলে স্বাধীন বাংলাদেশে এরশাদের উন্নয়ন পরিচালিত হয়েছে। তাঁরা যা চেয়েছেন তা-ই হয়েছে। এ জন্য রাজতন্ত্র ও সামরিক সরকারের উন্নয়নের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই বলা যায়। অর্থাৎ রাজা-রানী বা সামরিক শাসকেরা যা চান তা-ই হয়। তাঁদের উন্নয়নের সংজ্ঞা হলো- Let there be a new town, (without question) there is a new town’. এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে দেশে দেশে যুদ্ধ করে সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু ইদানীং অনেক জায়গায় রাজতন্ত্র বা সামরিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু রাজা কিংবা রানী নির্বাচিত হয় উত্তরাধিকারের মাধ্যমে আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটের মাধ্যমে। এ জন্য হয়তো, বর্তমানে বিশ্বের কোথাও কোনো সরকার পদ্ধতিই সুখকর অবস্থায় নেই। অনেক জায়গায় রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সমাজতন্ত্র তো প্রায় বিদায় নিয়েছে, আর গণতান্ত্রিক শাসনের নামে একেক জায়গায় একেক অবস্থা। অনেক দেশে তো স্বৈরাচারী শাসনের চেয়েও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এখন বেশি মাত্রায়  দুর্নীতিগ্রস্ত। 

এসব বিবিধ কারণে বিশ্বজুড়ে উন্নয়নের মডেল বা ফরম্যাটে পরিবর্তন এসেছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরকারের সঙ্গে উন্নয়নের অংশীদার হচ্ছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, পরিকল্পনা, ডিজাইন ও তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। আবাসন ও শিল্প সেক্টর তার অন্যতম উদাহরণ। কোথাও সরকারের মধ্যে (Govt. to Govt.-G to G) এবং কোথাও বিনিয়োগকারীদের অংশীদারির (Public Private Partnership-PPP) ভিত্তিতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। মুক্তবাজার ও বিশ্বয়ানের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও এ ধরনের উন্নয়নের সূচনা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এর ঈপ্সিত অগ্রগতি হচ্ছে না। এ জন্য অনেকে দেশের ধারাবাহিক রাজনৈতিক স্থি’তিশীলতা, নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব এবং উন্নয়ন কর্মকান্ড ধারাবাহিকতা না থাকাকে দায়ী করেন।

আদমজী ইপিজেড, নারায়ণগঞ্জ

এটা সত্যি যে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থি’রতায় অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। কোনো সরকারের আমলেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ঘটেনি। পক্ষান্তরে বিকল্প কোনো উন্নয়ন পদ্ধতিও গড়ে ওঠেনি। বলা যায়, যা কিছু হয়েছে সবই গড্ডালিকা প্রবাহে হয়েছে। ছিল না কোনো নতুনত্ব ও নিজস্বতা। তা ছাড়া চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উন্নয়নেও সৃষ্টি হয়েছে ‘বিভক্তির উন্নয়ন’ অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের পর অগ্রাধিকার পরিবর্তন হয়ে যায়, অনেক ক্ষেত্রে আগের সরকারের আমলে গৃহীত প্রকল্পের ভালো-মন্দ বিচার না করেই তা স্থ’গিত বা বাতিল করে দেওয়া হয়। যে কারণে দেশে বড় বা মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। স্বাধীনতার আগ থেকেই আমরা রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, বাঁশখালী-মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মা-যমুনা ব্রিজ নির্মাণ এবং স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে, রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এমআরটি, এলআরটি ইত্যাদি আরও কত কী বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ ও নির্মাণ কিংবা স্থাপনের কথা শুনছি, কিন্তু দেশের ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিশীলতা ও আমলাতান্ত্রিক জঠিলতায় পড়ে আজ অবধি এসব প্রকল্পের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। যদিও এর মধ্যে আন্তর্জাতিক সাহায্যে যমুনা সেতু নির্মিত হয়েছে এবং বর্তমানে সরকারি অর্থায়নে ধুঁকে ধুঁকে পদ্মা ব্রিজের কাজ চলছে। 

এই অবস্থায় বিশ্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে Alternative Development হিসেবে অংশীদারির উন্নয়নের অর্থাৎ Public Private Partnership Development-এর আবির্ভাব ঘটে। ইতিমধ্যে এর বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় (BOO, BOT, BOOT ইত্যাদিতে) সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ও দেশি-বিদেশি অর্থায়নে বিভিন্ন ধরনের অংশীদারির চুক্তিতে (Concession Agreement) দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু পার্ক-রিসোর্ট, আবাসন ও বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখনো তেমন আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। জানামতে, অংশীদারির চুক্তিতে ঢাকায় যাত্রাবাড়ী থেকে গুলিস্তান ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পটি দেশের প্রথম অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প। ২০০৪ সালে প্রণীত পাবলিক সেক্টর ইনফ্রাস্ট্রচার গাইড লাইনস (PSIG) এর আওতায় দেশি-বিদেশি একটি কনসোর্টিয়ামের (ওরিয়ন-বেলহাসা) সঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশন এই প্রকল্পটির কাজ হাতে নেয়। কিন্তু সরেজমিনে কাজ শুরু হওয়ার আগেই এই চুক্তিটিতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এতে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়, কনসোর্টিয়ামটি ভেঙে যায়। পরবর্তী সময়ে (২০০৯ সালে) এক সংশোধিত চুক্তির আওতায় BOT ভিত্তিতে কাজটি পুনারম্ভ হয় এবং ইতিমধ্যে ফ্লাইওভারটির অংশবিশেষ চালু হয়। কিন্তু অভিযোগ ওঠে যে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সম্পাদিত চুক্তির ব্যত্যয় ঘটিয়ে অধিক পরিমাণে টোল আদায় করছে এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ইকুইটি শেয়ার বেনিফিট দিচ্ছে না। অন্যদিকে আরেক অংশীদারির চুক্তির ভিত্তিতে ইঙঞ ভিত্তিতে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত আরেকটি ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড নির্মাণের জন্য ২০১০ সালে চুক্তি সম্পাদনের পরও অদ্যাবধি এই প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়নি। যার প্রধান কারণ জানা যায় জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়া এবং বিনিয়োগকারী কর্তৃক কাজটির প্রয়োজনীয় ফান্ডের ব্যবস্থা করতে না পারা। এসব নানা কারণে, দেশে অংশীদারির উন্নয়নে ঈপ্সিত অগ্রগতি হচ্ছে না এবং কিছুক্ষেত্রে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধও হয়ে পড়েছে।

নৌবন্দর, পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম

অংশীদারত্বের উন্নয়ন 
সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রয়াসের কর্মকান্ড ও বিনিয়োগকে অংশীদারির উন্নয়ন বলা হয়। বর্তমানে যা Public-Private Partnership সংক্ষেপে PPP হিসেবে বেশি পরিচিত। অনেক দেশে এটি Foreign Direct Investment (FDI) হিসেবেও পরিচিত। আবার অনেক ক্ষেত্রে এটা Product Development Partnerships (PDP) নামেও পরিচিত। যেমন- ওষুধ, রেডিমেড গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ইত্যাদি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়। তবে সব প্রক্রিয়ায় চচচ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় Special Purpose Vehicle (SPV) নামে একটি কোম্পানি গঠন করতে হয় এবং প্রতিটি কাজ বা প্রকল্পের জন্য পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে Concession Aggrement সম্পাদিত হয়। প্রথম দিকে অনেকটা ব্যক্তি উদ্যোগে এ ধরনের কার্যক্রম গৃহীত হলেও এখন সর্বত্র সরকারি ছত্রচ্ছায়ায় এসব পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। যতটুকু জানা যায়, ব্রিটেনে নব্বইয়ের দশকে প্রথম Public Sector Finance (PFI) নামে এই উদ্যোগ শুরু হয়, অতঃপর যা পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এশিয়ার কিছু দেশে যেমন- সিঙ্গাপুর, জাপান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ায় আশির দশক থেকে কিছুটা ভিন্ন প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ Third Sector পদ্ধতিতে এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় সিঙ্গাপুরের লি-কুয়ান আর মালয়েশিয়ায় মাহাথির মুহম্মদের বীরোচিত নেতৃত্বে অল্প কিছুদিনের মধ্যে তাঁদের দেশের চেহারায় পরিবর্তন আসে। অতঃপর থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও ভারতের উন্নয়নে এর প্রভাব পড়ে। এক পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯০-২০০৯ মেয়াদে শুধু ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে এসব দেশ বা সংস্থার ২৬০ বিলিয়ন পাউন্ডের বিভিন্ন ধরনের কাজের বাস্তবায়নে প্রায় এক হাজার ৪০০ অংশীদারির প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভার

বাংলাদেশে বেসরকারি উদ্যোগে PPP বা PDP কার্যক্রম চালু হয়েছে আশির দশক থেকে। যেমন- রেডিমেড গার্মেন্টস ও ওষুধ প্রস্তুতের ক্ষেত্রে। সরকারি পর্যায়ে Export Processing Zone প্রতিষ্ঠা করা ছিল এর সহায়ক কর্মসূচি। সাম্প্রতিককালে দেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালও অনুরূপভাবে নির্মিত হচ্ছে, যার মাধ্যমে উন্নত সেবা প্রদান, Trainings, Tecnology Transfer & Capacity Building-এর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে সামরিক বাহিনীসহ সরকারের আরও কিছু বিশেষায়িত বাহিনী ও তাদের কিছু কাজে (Procurement, Training etc) বহু আগে থেকেই এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে, যাকে অনেকে সরকারের মধ্যে অর্থাৎ Govt. to Govt. (সংক্ষেপে G to G) পদ্ধতির উন্নয়ন ও সেবা গ্রহণ বলেও মনে করেন। সে সঙ্গে বিদেশি আর্থিক সহায়তায় (NGOs) বিভিন্ন ধরনের Micro-credit Programs, দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের SME loans প্রদানও এক ধরনের অংশীদারির উন্নয়নের প্রয়াস।     

এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশক থেকে ঢাকায় মনোরেল, স্কাইরেল, মেট্রোরেল, পাতালরেল ইত্যাদি কিছু অবকাঠামোগত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু তখন দেশে এভাবে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কোনো কাঠামো বা Frame Work ছিল না বিধায় প্রকল্পগুলোর গ্রহণ (চুক্তি সম্পাদন) ও বাস্তবায়ন হয়নি। ২০০৪ সালে বিএনপি জোট সরকারের আমলে প্রণীত Public Sector Infrastructure Guidelines (PSIG)-এর আওতায় অংশীদারির ভিত্তিতে PPP প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অনেক প্রচেষ্টা চলে। কিন্তু তখনো এর জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠিত না হওয়ায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। অতঃপর ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেটে চচচ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অর্থ সংরক্ষণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি চচচ ইউনিট। আইন ও বিভিন্ন বিধি-বিধান প্রণয়ন করা হয়। সে থেকে দেশের বিভিন্নস্থানে জোরেশোরে চচচ প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। জানামতে, বর্তমানে প্রায় ৪০টি চচচ প্রকল্প সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুমোদন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন আছে। তন্মধ্যে ২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন সরকারের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকল্পকে অগ্রাধিকার (Fast Track Development) ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এর পরও PPP-তে প্রকল্প বাস্তবায়নের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

নি‍‍র্মাণাধীন ফ্লাইওভার

প্রকল্প বাস্তবায়নে যত সমস্যা

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
উন্নয়নের পূর্বশর্তই হচ্ছে স্থিতিশীলতা ও কর্ম-উপযোগী পরিবেশ। আর জনমুখী উন্নয়ন প্রকল্প হলে তো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। কিন্তু স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও বাংলাদেশের রাজনীতি ও উন্নয়নে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। সবকিছুতে দলাদলি। সামরিক-বেসামরিক এক সরকার যা করে, পরের সরকার তাতে ফাঁক খোঁজে। চলমান প্রকল্প বন্ধ বা পরিবর্তন করে নিজেদের ইচ্ছেমতো বাস্তবায়ন করা হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো প্রকল্প থেকে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশের অনেক জায়গায়-কোনো স্থানে সড়কের কাজ শুরু হয়ে থমকে পড়ে আছে বা ব্রিজ নির্মিত হয়েছে কিন্তু সংযোগ সড়ক নেই ফলে সড়ক পথটি চালু হয়নি, স্কুল ভবন বা হাসপাতাল নির্মিত হয়ে চালু হয়নি ইত্যাদি অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। আবার দেশের ‘উসকিয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে’ও ক্ষমতাসীন সরকার কোনো প্রকল্প গ্রহণ করলে বিরোধী দল স্বভাবগতভাবে বরাবর তার বিরোধিতা করে, প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে দেয় না। অনেক ক্ষেত্রে ‘ষড়যন্ত্র’ চালায়। যে কারণে, পদ্মা সেতু, আড়িয়ল বিলে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ ইত্যাদি প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অনেকের মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়ন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে বিনির্মাণ, মিয়ানমার-চট্টগ্রাম-ঢাকা এশিয়ান হাইওয়ে, চট্টগ্রামের মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ইত্যাদি বিষয়গুলোও একধরনের আঞ্চলিক ও ‘বৈষ্যমের রাজনীতিতে’ পড়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এসব বিভিন্ন কারণে দেশের শিল্পপতিরা অনেকেই তাদের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে বিদেশে চলে গেছেন বা যাচ্ছেন ও বিনিয়োগ করছেন সেখানেই। 

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
বাংলাদেশের উন্নয়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরেকটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। বিভিন্ন সময়ে নবতর কিংবা বিকল্প পদ্ধতিতে দেশের বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের অনেক প্রস্তাব পাওয়া গেছে, কিন্তু আমলাতন্ত্রের গ্যাঁড়াকলে পরে এগুলোর খুব কমই আলোর মুখ দেখেছে। স্বাধীনতা-উত্তর সময়কালে বিশেষ করে ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর রাজধানী ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নে; যেমন- রাজউক কর্তৃক গৃহীত পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প গ্রহণের পর মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারীদের দ্বারা সেখানে বিভিন্ন ধরনের কিছু উন্নয়ন কাজ (বহুতল আবাসন, গলফ কোর্স ও রিসোর্ট নির্মাণ ইত্যাদি), কতিপয় ইউরোপিয়ন বিনিয়োগকারী কর্তৃক ঢাকায় মনোরেল বা স্কাইরেল নির্মাণের প্রস্তাব ইত্যাদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হিমাগারে চলে যায়। আবার এটাও লক্ষণীয় যে এ ধরনের যেকোনো প্রস্তাব আসার পর সর্বপ্রথম আমলারাই তা দেখা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের কথা বলে বিদেশ সফর করেন এবং বিদেশে বসে তাঁরা (নতুন প্রযুক্তি দেখে) উচ্চাশার কথা বললেও ঘরে ফিরে বিপরীত অবস্থানে চলে যান।প্রসঙ্গক্রমে ব্যক্তিগত একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ না করে পারছি না। ১৯৯৫-৯৬ সালে রাজউক কর্তৃক পূর্বাচল প্রকল্প গ্রহণের পর ওখানে মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী ‘পুত্র-জায়া’র আদলে সেখানে দেশের একটি প্রশাসনিক রাজধানী প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করি। বিভিন্ন পর্যায়ে এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও আমার এই প্রস্তাবটির ওপর আলোচনা হয়, কিন্তু আমলাতন্ত্রের লালফিতায় আটকে বিষয়টি আর এগোয়নি।

শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব
একসময় দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল খুবই শক্তিশালী, কর্মক্ষেত্রে পেশাদারি ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বা কর্মকান্ড বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল। কিন্তু সেই অবস্থা এখন আর নেই। গণপূর্ত অধিদপ্তর (PWD), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (R&H),  পানি উন্নয়ন বোর্ড (WDB),  বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (PDB)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ‘মিনি’ সংস্থায় পরিণত হয়েছে। দেশের উন্নয়নে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতায় অর্থাৎ সরকারি পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে বৃহদাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন ও টেকসই নির্মাণে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে  G to G এ  বা PPP এর মাধ্যমে অংশীদারির উন্নয়ন পরিচালনায়ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অভাবে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে যে  চচচ অফিসটি প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেটিও স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং শক্তিশালী নয়। যার কারণে ২০০৯ সাল থেকে চচচ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তায় Viability Gap Fund (VGP) বাবদ বাজেটে ৩০০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হলেও এই খাত থেকে অদ্যাবধি কোনো খরচ হয়নি বলে জানা যায়। তাই যেকোনো প্রক্রিয়ায় বা পদ্ধতিতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। 

অংশীদারির উন্নয়নে এ ধরনের আরও অনেক সমস্যা বিদ্যমান। বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের Rate of Return বেশি হওয়ারও ঝুঁকি রয়েছে। সর্বোপরি রয়েছে আস্থার সংকট। বাংলাদেশের Strategic Location, Geo-Politics তথা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিদেশিরা অনেকে এখানে বিনিয়োগ করতে চায়, উল্লিখিত বিভিন্ন কারণে আস্থার সংকটে কেউ কেউ অনেকটা এগিয়ে ফেরত যান। সাম্প্রতিককালে G to G প্রক্রিয়ায় একটা উচ্চপর্যায়ের কারিগরি দলে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ভ্রমণে গেলে এসব বিষয়গুলো দৃশ্যমান হয়।  

মেট্রোরেল

প্রতিবেশী দেশসমূহের অবস্থা
স্বাধীনতার পর এশিয়ার অনেক দেশের যেমন- থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের অবস্থা আমাদের চেয়ে ভালো ছিল না। কিন্তু এখন তাদের অবস্থা অন্য রকম। স্ব-স্ব দেশের নেতৃত্বের দূরদর্শিতায় ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততায় শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধকরণে বিভিন্ন ধরনের Concession ও Tax Holiday Packages প্রদান করে সরকার জনগণকে আস্থায় রেখে উন্নয়ন কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় এখন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশেও স্ব-স্ব এলাকার বীরোচিত নেতৃত্বে চোখ-ধাঁধানো উন্নয়ন হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদী তো গুজরাটের চেহারাই পাল্টে ফেলেছেন। বামপন্থী নেতা হয়েও জ্যোতিবসু কলকাতায় মেট্রোরেল ও ফ্লাইওভার নির্মাণ করে কলকাতার গণপরিবহনব্যবস্থা উন্নত করে গেছেন, যার ধারাবাহিকতা তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা ব্যানার্জিও অব্যাহত রেখেছেন। আর নরেন্দ্র মোদীর ‘গুজরাটি মডেল’-এর উন্নয়নে আশান্বিত হয়ে ভারতবাসী তো তাঁকে দেশের প্রধানমন্ত্রীই নির্বাচিত করে বসেছে। আমাদের পাশের আরেক দেশ মিয়ানমারের সামরিক জান্তাও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (!) অং সান সূচির সঙ্গে দেশের অধিকতর উন্নয়নের জন্য সমঝোতায় পৌঁছেছে। এভাবে দেশে দেশে নেতৃত্বের সমঝোতায় ও দূরদর্শিতায় অংশীদারত্বের উন্নয়ন হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশও আজ ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আমাদের সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা কি পারেন না দেশের উন্নয়নের জন্য অনুরূপ একটা সমঝোতায় পৌঁছাতে? নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উপযুক্ত নেতৃত্ব পেলে আমরাও ভারত-মিয়ানমারকে অনুসরণ করতে পারব। শুধু তা-ই নয়, সবাই আন্তরিক হলে ‘সম্ভাবনার দেশ’ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশকে তাদের (ভারত-মিয়ানমার) চেয়েও আরও ওপরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব!  

এম এমদাদুল ইসলাম
প্রধান প্রকৌশলী, রাজউক

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫১ তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৪

+ posts
Scroll to Top