বার্লিন ওয়াল গুড়িয়ে দেয়ার পরও বার্লিন জার্মানির (বর্তমানে Federal Republic of Germany) রাজধানী। জার্মানি বিশ্বে বহুল আলোচিত একটি দেশ, যার আদিনাম Deutschland. মধ্য ইউরোপের এই দেশটির রয়েছে দীর্ঘ ও বিস্তীর্ণ ইতিহাস। একসময় দেশটি রোমান ফ্রাঙ্কিস ও অটোম্যান-রোমান সাম্রাজের অধীনে ছিল। অতঃপর বিভিন্ন ধর্মযুদ্ধ, বিদ্রোহ-বিগ্রহ ও সংস্কারপ্রক্রিয়ার (যেমন Protestant Reformation, Thirty Year’s War, Napoleonic Wars, Industrial Revolution, Socialist Movement, Peasants War, Counter-Reformation, French Revolution, German Empire/Confederation with Prussia-Bavaria-Saxony estates etc.) মাধ্যমে ১৯০০ দশকে এখানে এডলফ হিটলার ও তাঁর নাজি বাহিনীর রাম-রাজত্ব চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর কাছে হেরে দেশটি পুুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দুই জার্মানিতে বিভক্ত হয়।
যা যা থাকছে …
দীর্ঘদিন পর আবার দুই জার্মানি একীভূত হয়। এর সঙ্গে বহুল আলোচিত ‘বার্লিন ওয়াল’ ভেঙে ফেলা হয়। তা ছাড়া বিশ্বের নামীদামি গাড়ি প্রস্তুতকারী, উন্নতমানের যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী এবং কয়েকবার বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জয়ী ও ইতিহাসের নানা ঘটন-অঘটনের দেশ জার্মানি ভ্রমণের ইচ্ছে আমার বরাবরই। অবশেষে এ বছরের সেপ্টেম্বরে রাজউকের এক শিক্ষাসফরে জার্মান ভ্রমণের সুযোগ হয়। ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন পূর্তসচিব মো. গোলাম রব্বানী, রাজউক চেয়ারম্যান জি এম জয়নুল আবেদীন ভুঁইয়াসহ আরও কয়েকজন। তবে এবার কিন্তু জার্মানিতে থাকছে না বার্লিন ওয়াল।

দুই মাস আগেই জার্মানি চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জিতেছে, তাই ধারণা করছিলাম হয়তো বছরজুড়ে সেখানে জয়ের আনন্দ-উৎসব চলছে। না, সবকিছুই চলছে স্বাভাবিক নিয়মে। রাজধানী বার্লিনের কোথাও বিশ্বকাপ ফুটবল জেতা ও অন্য কোনো বিষয়ক (যেখানে ভ্রমণ করেছি) বিলবোর্ড বা পোস্টার চোখে পড়েনি। এবার বিশ্বকাপ ফুটবল জয়ের আনন্দ নাকি শুধু ফাইনালের রাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। এভাবে জার্মানির জনজীবনে কোনো কিছু নিয়েই নেই তেমন বাড়াবাড়ি। অথচ ভাবছিলাম, রাজধানী ঢাকা তথা দেশের দেয়ালগুলো ও নগর আকাশের কথা। যত্রতত্র বৈধ-অবৈধ পোস্টার, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড আর হাল জমানার পেনাফ্লেক্স, যার কারণে নগরের আশপাশের কিছুই দেখা যায় না। রাস্তায় ঝাড়– দেওয়ার জন্য ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে কোনো লোক নেই, অথচ তাদের প্রতি ইঞ্চি জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। রাস্তার ধারে ও বিভিন্ন জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য তিন রঙের তিনটি ডাস্টবিন রাখা হয়েছে, যেখানে সবাই ডাস্টবিনে ময়লা-আবর্জনা ফেলে। আর আমাদের রাজধানী তথা শহরগুলোর কী অবস্থা! এর মধ্যে আবার কোনো একটা উপলক্ষ বা আয়োজন হলে তো কথাই নেই, পোস্টার-বিলবোর্ড-পেনাফ্লেসে রাতারাতি ঢেকে যায় সবকিছু।
জার্মানিতে বার্লিন ওয়াল নেই তবে তাবৎ দুনিয়ার উন্নতমানের সব গাড়ি (যেমন Mercedes-Benz, BMW, SAP, Volkswagen, Audi, Porsche etc.) আর উন্নত যন্ত্রাংশ তৈরি হয় জার্মানিতে, কিন্তু এতেও কোনো পর্যায়ে তাদের নেই কোনো বাগাড়ম্বর। তবে জাতি হিসেবে জার্মানরা খুবই ‘নাক-উঁচা’। বার্লিন ওয়াল তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কথিত আছে, জার্মান জাতি তাদের অতীত ইতিহাসের তাড়না (যেমন হিটলারের বিশ্বজয়ের অপচেষ্টা!) থেকেই অতি উচ্ছ্বাস বা আগ্রাসী ভূমিকা ত্যাগ করে সংযম, শ্রম ও সমন্বিত উন্নয়নে ঐক্যপ্রয়াসী। তদুপরি একদা বিভাজিত দুই জার্মানি দুই যুগ আগে পুনরেকত্রীকরণ হলেও তাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে এখনো সতর্ক আর সাবধানে পথচলার ব্যাপারটি রয়ে গেছে। সাবেক পূর্ব জার্মানির সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর অনুন্নত এলাকার ইতিমধ্যে যথেষ্ট উন্নতি সাধন ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জানা যায়, জার্মানির সবাই শিক্ষিত, কর্মঠ কিন্তু খুবই অন্তর্মুখী। এ ছাড়া বড় উদ্বেগের বিষয় বর্তমানে জার্মানির জনসংখ্যায় নেতিবাচক বৃদ্ধি (Negative Growth) চলছে। প্রকাশ, জার্মানির বর্তমান প্রজন্ম নাকি পরিবার বৃদ্ধির বিপক্ষে। এতে জার্মান সরকার দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে যারপরনাই চিন্তিত!

বার্লিন সফরের পাঁচকাহন
ঢাকা থেকে এমিরেটস এয়ারলাইনে আমাদের প্রথম গন্তব্য জার্মানির ডাসেলড্রফ শহর। কথা ছিল, ডাসেলড্রপ থেকে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে লোকাল ফ্লাইটে বার্লিনের উদ্দেশে রওনা দেব, কিন্তু তা আর হলো না। কারণ, সাতজনের প্রতিনিধিদলের মধ্যে দুজনের লাগেজ ডাসেলড্রপ বিমানবন্দরে পৌঁছালেও অবশিষ্ট পাঁচজনের লাগেজ আসেনি। রাতে স্থানীয় এই বিমানবন্দরটিতে খোঁজ নিয়ে লাগেজের কোনো খবর মিলল না। এদিকে দীর্ঘক্ষণ লাগেজের খোঁজাখুঁজি ও অপেক্ষায় থেকে আমরা এয়ার বার্লিনের নির্ধারিত ফ্লাইট মিস করায় ওই রাতে বার্লিনমুখী আর কোনো ফ্লাইট না থাকায় আমাদের অগত্যা ডাসেলড্রপ বিমানবন্দরে অবস্থান করতে হলো। অনেক চেষ্টা করলাম, স্থানীয় কোনো হোটেলে রাতযাপনের বা রাতে বিকল্প কোনো পন্থায় (ট্রেনে বা গাড়িতে) বার্লিনের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার। কিন্তু না, তাও হলো না। ভাষা সমস্যায় বাধাগ্রস্ত হলাম। জার্মানিরা সহজে ইংরেজি বলে না, তাই রাতে রওনা দেওয়া ঠিক হবে কি না, কখন পৌঁছাব ইত্যাদি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অস্পষ্টতায় রাতে বিমানবন্দরে অবস্থান করে পরদিন ভোরে নতুন করে টিকিট কেটে প্রথম ফ্লাইটে বার্লিন রওনা হই। আশ্চর্যের বিষয়, পূর্তসচিব রব্বানী সাহেব ছিলেন সস্ত্রীক। তাঁকে আমরা অনুরোধ করলাম রাতে আশপাশের কোনো হোটেলে অবস্থান করার জন্য। এ জন্য তাঁকে বিমানবন্দরসংলগ্ন শেরাটন হোটেলেও নিয়ে গেলাম। কিন্তু না, কুমিল্লার সাধারণ ঘর থেকে ওঠে আসা সরকারের এই সচিব রব্বানী সাহেব আমাদের ছেড়ে হোটেলে গেলেন না, তিনি ভাবিসহ আমাদের সঙ্গে বিমানবন্দরেই রাত কাটালেন, যা তাঁর পর্যায়ের বাংলাদেশ সরকারের অন্য কোনো সচিবের কাছ থেকে কখনো পাওয়া যেত কি না সন্দেহ!
বার্লিন বিমানবন্দরে পৌঁছার পর সেখানে আমাদের সফরের গাইড কাম কো-অর্ডিনেটর মালয়েশিয়ান বংশোদ্ভূত ইউসুফ আমীর হামজাকে পাই। তিনিসহ আমরা মিলে হারানো লাগেজের বিষয়ে বিমানবন্দরের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড (Lost & Found) সেকশনে অভিযোগ করে হোটেলের উদ্দেশে রওনা দিলাম। দু-তিন পর সবার লাগেজ হোটেলে পৌঁছাল। জানা গেল, আমাদের লাগেজগুলো ঢাকা থেকে সরাসরি বার্লিনে বুক করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা ডাসেলড্রপে থাকায় লাগেজগুলো বার্লিন বিমানবন্দরের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সেকশনে চলে যায়। পূর্ব বার্লিনের স্প্রে রিভার (Spree River) এর ধারে একটা সুন্দর জায়গায় হলিডে ইন হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। আগের রাতে নির্ঘুম থাকায় ও কাপড়চোপড় পরিবর্তন করতে না পারায় পরের দিন সকালে স্বাভাবিকভাবে আমাদের পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রামটি (German Association of Towns and Municipalities এর সঙ্গে) বাতিল করা হয়। তবে বিকেলের প্রোগ্রামটি ঠিক থাকে।

বার্লিন টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির Urban Planning & Development Studies-এর তুর্কি বংশোদ্ভূত গবেষক কাম অধ্যাপক Dr. Umar Duyer-Kienast বার্লিন তথা জার্মানির নগর পরিকল্পনা ও নগরায়নের চ্যালেঞ্জের ওপর একটি বিস্তারিত প্রবন্ধপত্র উপস্থাপন করেন। বার্লিন তথা জার্মানির শহর পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দেখে ঢাকা তথা বাংলাদেশের শহরসমূহের এলোপাতাড়ি উন্নয়ন বা সম্প্রসারণের প্রতিচ্ছবিটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। পরদিন বার্লিন Senate Department of Urban Planning and Environment-এর সঙ্গে একটা আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ফ্রাঙ্কফ্রুট শহরে Frankfurt City Planning Authority-এর সঙ্গেও আমাদের একটা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়। প্রসঙ্গক্রমে, জার্মানিতে ঐতিহাসিকভাবে অনেক তুর্কি মুসলমানদের বাস। জার্মানির বিভিন্ন স্থানে তাদের অনেক ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশিরও কিছু রেস্টুরেন্ট রয়েছে। ফলে জার্মানিতে অবস্থানকালে আমাদের খাওয়াদাওয়ায় তেমন কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়নি, যদিও যাওয়ার আগে শুনেছি যে জার্মানিতে ‘হালাল’ খাবারের বড্ড অভাব। এক রাতে বার্লিনের বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডরের বাসায় এবং আরেক রাতে ফ্রাঙ্কফ্রুটে একজন পরিচিত বাঙালির বাসায় দাওয়াত খাওয়ারও সুযোগ হয়। সুযোগ হয় বার্লিন ওয়াল সম্পর্কে স্পট ভিজিট করে অনেক কিছু জানারও।
বার্লিন ও ফ্রাঙ্কফ্রুট অবস্থানকালে আমরা দুটি নগরের যথাসম্ভব ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো পরিদর্শন করি। তন্মধ্যে অন্যতম হলো Berlin Wall, CheckPoint Charlie, Brenden Burg, Parliament Square, Victory Tower, Dome of Berlin, Strret of June, War Memorial/Cemetry, Tear Park, Shalet Burg, Olympic Stadium, Bunebtic Forest, Wannsee Lake, Park Sanssouci, PortsDam Town, Mine River Sides, Old Parliament Complex (of Adlof Hitler), Gothen University Campus, ‘Love-Lock’ Bridge প্রভৃতি। সমগ্র জার্মানিতে এ ধরনের অসংখ্য ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। তন্মধ্যে ৩৯টি স্থাপনা বা জায়গাকে ইতিমধ্যে UNESCO Inscribed Heritage হিসেবে ঘোষণা ও সংরক্ষিত স্থান করা হয়েছে। এসব প্রতিটি জায়গা বা স্থাপনা যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থাপনাগুলো পরিদর্শনকালে বারবার মনে হচ্ছিল, আমরা কীভাবে আমাদের একমাত্র UNESCO Inscribed Heritage রক্ষণাবেক্ষণ করছি! তা ছাড়া স্প্রে রিভার ও মাইন রিভারের উভয় পাশে পরিকল্পিত ও সাজানো-গোছানো বার্লিন ও ফ্রাঙ্কফ্রুট নগরকে দেখে ভেতরে ভেতরে আপসোস হচ্ছিল, কেন আমরা বুড়িগঙ্গা ও ঢাকার অন্য নদীগুলো বা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীকে সেভাবে সংরক্ষণ ও কাজে লাগাতে পারলাম না?

জার্মান শিক্ষাব্যবস্থা খুবই উন্নত, কিন্তু ভাষা সমস্যার কারণে (জার্মান ভাষায় লেখাপড়া হয় বিধায়) খুব কমসংখ্যক বিদেশিরা সেখানে লেখাপড়া বা উচ্চশিক্ষার জন্য যায়। জার্মানির বাংলাদেশ অ্যাম্বাসেডরের সঙ্গে আলাপকালে জানলাম, বর্তমানে বিভিন্ন জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতেগোনা কিছু বাঙালি ছাত্র আছে। আমরাও বার্লিন টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি ও গোথেন ইউনিভার্সিটি পরিদর্শনকালে সেখানে বাংলাদেশ তথা এশিয়ার কোনো ছাত্রই চোখে পড়ল না। জার্মানির শহরগুলোর আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় হলো, এখনো সেখানে ট্রাম সার্ভিস বহাল তবিয়তে বর্তমান। বার্লিন ওয়াল এখন আর নেই। সড়কে আধুনিক যুগের স্মার্ট ‘ন্যানো’ গাড়িও চলছে, অন্যদিকে পাশাপাশি ধীরগতির ট্রাম চলছে। একইভাবে নগরের কোনো বাসায় ও ছোটখাটো অফিসসমূহে নিজস্ব পার্কিং নেই। পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সড়কের ওপর গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জার্মান জীবনব্যবস্থার এ রকম আরও কিছু বিশেষ দিক রয়েছে, যার জন্য জার্মানিরা গর্ব করতেই পারে। প্রায় সবাই উন্নত ব্র্যান্ডের (Mercedes-Benz, BMW ইত্যাদি) গাড়ি চালায় এমনকি রাস্তার ভাড়ায় চলা ট্যাক্সিগুলো ব্রান্ডের। তা ছাড়া দেশটিতে কোনো ধরনের বর্ণবিদ্বেষ নেই এবং অপরাধের মাত্রা প্রায় শূন্যের কোটায়। এতসব আধুনিকতার মধ্যেও বর্তমান প্রজন্মের জার্মানদের একটি কুসংস্কারের কথা না বললেই নয়। স্প্রে ও মাইন নদী পরিদর্শনকালে কয়েকটি ব্রিজের রেলিংয়ে শত-হাজারো লক (তালা) দেখা যায়, যা নাকি জার্মান যুবক-যুবতী ও দম্পতিরা তাঁদের বন্ধন যাতে চির অটুট থাকে সে জন্য এসব তালা লাগিয়ে চাবিগুলো নদীতে ফেলে দিয়েছেন, যেভাবে আমাদের দেশের মাজারে অশিক্ষিত লোকজন বিভিন্ন ধরনের ফিতা বেঁধে বা কঠিন গিঁট দিয়ে রাখতে দেখা যায়!
বার্লিন ওয়াল
১৯৪৩-৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রবাহিনীর (মূলত মার্কিন-পশ্চিম ইউরোপ ও সোভিয়েট রাশিয়ার সমন্বয়ে গঠিত) হাতে হিটলার ও নাজি বাহিনীর পরাজয়ের মাধ্যমে ‘পুঁজিবাদী’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ বলয়ের প্রভাবে জার্মানি বিভক্ত হয় বার্লিন ওয়ালের মধ্য দিয়ে। জার্মানির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত বার্লিনই দেশটির প্রধান নগর। কিন্তু বার্লিন ওয়ালের মাধ্যমে বিভক্তিকালে বার্লিন নগরের বেশির ভাগ এলাকা পূর্ব জার্মানির আওতায় পড়ে। সে সময় বিশ্বজুড়ে চীন-রাশিয়া-কিউবার সমাজতান্ত্রিক বলয়ের প্রভাবে পূর্ব জার্মানির অবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই ভালো ছিল। তাই, পূর্ব জার্মানির তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শাসকেরা তখন চাইছিলেন না, পশ্চিম জার্মানি বিশেষ করে পশ্চিম বার্লিন থেকে লোকজন পূর্ব বার্লিনে আসুক, গণপ্রবেশ ঘটুক ও ব্যবসা-বাণিজ্য চলুক। ওই অবস্থায় পশ্চিম জার্মান বার্লিন থেকে ট্রিপাস (Trespass) রোধে ১৯৬১ সালে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর অনেকটা রমরমা অবস্থায় বিশেষ করে সোভিয়েট রাশিয়ার প্রভাব ও সহায়তায় পূর্ব জার্মানির সমাজতন্ত্রী সরকার কর্তৃক তাদের ভাষায় জনগণের ‘will of the people’ protect করার জন্য বার্লিন নগরের বিভক্তি লাইনে ১৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট উচ্চতায় বার্লিন ওয়াল নির্মাণ করে, বাস্তবে যা কখনো বার্লিনবাসী তথা সাধারণ জার্মানদের কাছে কাম্য ছিল না। কারণ, এতে একই শহরের পূর্ব-পশ্চিমে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত অনেকেই তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বিচ্ছেদসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।

তথাপি জনগণের প্রচণ্ড আপত্তির মুখে পূর্ব জার্মানির সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আর্মি ও পুলিশের ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে বার্লিন ওয়ালের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ট্রিপাস রোধে বার্লিন ওয়ালের বিভিন্ন স্থানে অনেক death trap (anti-vehicle trenches, ploughed earth (fakir beds), mined fields, watch towers, bunkers, iron curtain etc.) রাখা হয়। যাতে বিভিন্ন সময়ে বার্লিন ওয়ালটি টপকাতে গিয়ে বর্ডার সিকিউরিটির হাতে পূর্ব-পশ্চিম জার্মানির কয়েক শ মানুষ গুলিবিদ্ধ বা আটকে মারা পড়ে। এ জন্য জার্মানিরা তখন বার্লিন ওয়ালকে তাদের ‘লজ্জা’ বা ‘Wall of Shame’ হিসেবে মনে করত। কিন্তু পূর্ব জার্মানির সমাজতান্ত্রিক সরকারের দৃষ্টিতে ‘the Wall was an antic-fascist protective rampart intended to dissuade aggression from the West’.
অতঃপর ১৯৮০-৯০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ধস নামার পর বিশেষত পূর্ব জার্মানি থেকে প্রায়ই লোকজন কাজ ও উন্নতজীবনের সন্ধানে বার্লিন ওয়ালের উভয় দিকে বসবাসরত লোকজন টপকিয়ে পূর্ব-পশ্চিম বার্লিন তথা জার্মানিতে আসা-যাওয়া করতে থাকে। যখন পূর্ব জার্মানির অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে দেশটির শিক্ষিত ও পেশাজীবীদের মধ্যে গণমেধা পাচারও শুরু হয়। আর বার্লিন ওয়ালের ডেথ ট্র্যাপে পড়ে তখন পলায়নরত অসংখ্য জার্মানবাসীর মৃত্যুতে উভয় পাড়ের লোকজন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ওয়ালটির কারণে পশ্চিম ও পূর্ব ইউরোপের মধ্যে একটা বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় ক্ষুব্ধ বার্লিনবাসী তথা ইউরোপের সাম্য ও শান্তিবাদী লোকজনসহ বিভিন্ন সময়ে বার্লিন ওয়ালের অনেক জায়গা ভেঙে ফেলতে শুরু করে, যা নিয়ে ইউরোপজুড়ে দীর্ঘদিন চলে ঠান্ডা লড়াই। জার্মান যাওয়ার আগে শুনেছিলাম, জার্মান পুনরেকত্রীকরণ হওয়ার পর নাকি অভিশপ্ত বার্লিন ওয়ালটি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে! না, সব জায়গায় নয়। আমাদের হোটেলের পাশে স্প্রে নদীর ধারঘেঁষে বার্লিন ওয়ালের একটা বিশাল অংশ এখনো রয়ে গেছে, যা আসলে রেখেই দেওয়া হয়েছে।
বার্লিন ওয়ালের এই অবশিষ্টাংশের ওপর বিশ্বের নামীদামি চিত্রশিল্পীদের নানা ধরনের অনেক graffiti arts ও কিছু আলোচিত বিশ্বনেতাদের ছবি বা কার্টুন ও বেদবাক্য শোভা পাচ্ছে। ইউরোপে দীর্ঘ ঠান্ডা লড়াই ও আলোচনা-সমঝোতার পর যেদিন বার্লিন ওয়ালটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভাঙা হয়, সেই দিনটি অর্থাৎ ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর তারিখটি জার্মান Reunification বা Unity Day হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। একীভূত বার্লিনের কেন্দ্রস্থল Brandenburg-এ যেখানে সেদিন বিশ্বনেতারা দিনটির উদ্যাপন করেছিলেন সেখানকার (Brandenburg Gate) স্যুভেনির শপ থেকে বার্লিন ওয়ালের ধবংসাবশেষের এক টুকরো স্মৃতি সংগ্রহ করি।
অনুরূপভাবে Check Point Charlie এলাকাটি জার্মান তথা বিশ্ব ইতিহাসের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

বার্লিন ওয়াল নির্মাণ নিয়ে ঠান্ডা লড়াই শুরু হলে মার্কিন ও সোভিয়েট রাশিয়ার প্রভাবে Friedrichstra Be নামক স্থানে বার্লিন ওয়ালের Crossing Point-এ মার্কিন ও পশ্চিমা ব্লকের ন্যাটো যৌথবাহিনীর (Allied Forces) তত্ত্বাবধানে এই Border Check Point-টি স্থাপিত হয়, যার সঙ্গে ‘Charlie’ নামটি NATO-এর phonetic alphabet থেকে সংযোজিত বলে প্রকাশ। Charlie Point-টি পরিদর্শনকালে সেখানে একটি মিউজিয়াম আকারে বার্লিন ওয়াল নির্মাণের ইতিবৃত্তান্ত প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বার্লিন ওয়াল থাকাবস্থায় অবরুদ্ধ জনগণ যেভাবে Charlie Point দিয়ে প্রবেশ-প্রস্থান ও নিয়ন্ত্রণ করা হতো, সেভাবে এখনো, সেখানে একটা পাহারা চৌকি রাখা হয়েছে। পর্যটকেরা এখানে মার্কিন সেনাবেশী জার্মান সেনাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। আমরাও সুযোগটি হাত ছাড়া করিনি। আশ্চর্যের বিষয় হলো যখন আমরা তাঁদের সঙ্গে ছবি তুলছিলাম তখন তাঁরা আমাদের ‘নমস্তে’ ও ‘শাহরুখ খান’ বলছিল! যাতে বোঝা যায়, জার্মানদের কাছে আমরা এখনো ‘ভারতবাসী’ হিসেবে বিবেচিত! হায়রে কপাল, কবে যে আমরা বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের আসল পরিচয়ে (বাঙালি/বাংলাদেশি হিসেবে) পরিচিত হব?
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বার্লিন প্রাচীর কোথায় অবস্থিত?
বার্লিন ওয়াল কেন নির্মাণ করা হয়?
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৫ তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৪
(অথর যুক্ত করুন)