নির্মাণ সাইটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste Management) বলতে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার (Recycling) এবং নিষ্কাশনের (Disposal) সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এই শব্দটি দিয়ে সাধারণত মানুষের কার্যকলাপে সৃষ্ট অপ্রয়োজনীয় বস্তুসংক্রান্ত কাজকে বোঝানো হয়; উপজাত বস্তুর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমন কিংবা পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষার কর্মকাণ্ডই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় রয়েছে আবর্জনা থেকে সৃষ্ট পরিবেশের ক্ষতিরোধের পাশাপাশি আবর্জনা থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বস্তু আহরণ। এতে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে দক্ষতার সঙ্গে কঠিন, তরল কিংবা বায়বীয় বর্জ্য নিরসনসংক্রান্ত কাজ করা হয়।

নির্মাণবর্জ্যরে উৎস

বিভিন্ন ধরনের উৎস থেকে নির্মাণবর্জ্যরে সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি উৎস হলো-

১) ডেমুলেশন বা ভাঙার সময়ের বর্জ্য : এই বর্জ্য মূলত পুরোনো ভবন ভাঙার সময় হয়ে থাকে। 

২) কনস্ট্রাকশনাল ওয়েস্ট বা ভবন তৈরিকালীন বর্জ্য : যেটা ভবন তৈরির সময় হয়ে থাকে। এটা সাধারণত ইট-সুরকি ভাঙার ফলে এবং বিভিন্ন মেশিনারিজের ব্যবহারের ফলে তেল-মবিল ইত্যাদি থেকে আসে। বড় বড় বিল্ডিং করার সময় একসঙ্গে অনেক শ্রমিক কাজ করার ফলে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় সেখানকার পরিবেশ দূষিত হয়।

নির্মাণ সাইটের বর্জ্যসমূহ

ইট, নুড়ি, বালু, ধাতু, রং, কাঠ, চীনামাটির বাসন, প্যাকেট করা প্লাস্টিক বস্তা, জানালার কাচ, মাঠ পর্যায়ের কাজের অবশিষ্টাংশ (কাগজ, ক্যান, কাচ, প্লাস্টিক বোতল, কাঠবোর্ড), ইন্স্যুলেশন, ছাদের টালি, কার্ডবোর্ড, গালিচা গদি, শুকনো দেয়াল, ফ্লুরোসেন্ট বাল্ব, ব্যালাস্ট ইত্যাদি।

নির্মাণ সাইটের মাটি ভরাটকরণ

নির্মাণকালীন দূষণ

শব্দদূষণ

নির্মাণ সাইটে শব্দের ঝনঝনানি একটি বড় সমস্যা। নির্মাণে শব্দের উৎসের শুরু মাটি কাটা থেকে। মাটি কাটায় ব্যবহৃত হয় রোলার স্কাবার আর মাটি সরাতে ব্যবহৃত হয়  ট্রাক, যা বিকট শব্দের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া রয়েছে ভবনের নির্মাণস্থলের কংক্রিট মিকচারের শব্দ। হাইরাইজ বিল্ডিংয়ে ব্যবহার করা হয় কংক্রিট ক্রেন। কংক্রিট জারে ওঠানোর সময় বিকট শব্দ হয়। কোথাও কোথাও লোডশেডিংয়ের কারণে যে জেনারেটর চালানো হয়, তাতে শব্দ হয়। আবার পাইলিং করার সময়ও শব্দের উৎপত্তি ঘটে। পাইল ভাঙতেও শব্দ হয়। কংক্রিট ব্রেসিং, এয়ার ব্রয়ার, ইলেকট্রিক করাত এসব ব্যবহারেও বিকট শব্দের সৃষ্টি হয়। আর তাই শব্দের বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রিত একটা মান রয়েছে, যা অতিক্রম করলে মানবদেহের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। শব্দের এ মাত্রার দুটো লেভেল আছে; একটি শ্রমিকের জন্য অন্যটি সাধারণ মানুষের। নির্মাণশ্রমিকের শব্দের সহনীয় মাত্রা ৯০ ডেসিবল, এর ওপরে হলে শুনতে সমস্যা হবে, আক্রান্ত হবে নানা রোগব্যাধিতে। সাধারণ মানুষের শব্দের সহনমাত্রা ৫৫ ডেসিবল। নির্মাণ সময়ে ৫৫ ডেসিবলের ওপর শব্দের উৎপত্তি হলে তা অভিযোগযোগ্য। তবে সেই শব্দের তীব্রতা নির্মিত ভবনের বাইরে হলেই কেবল অভিযোগ করা যাবে। 

নির্মিতব্য ভবনের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে 

তিন উপায়ে নির্মিত ভবনের শব্দের দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। 

  • প্রকৌশলগত নিয়ন্ত্রণ
  • প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
  • নিজস্বভাবে নিয়ন্ত্রণ

প্রকৌশলগত নিয়ন্ত্রণ

ভবন নির্মাণের সময় প্রকৌশলগতভাবে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে শব্দদূষণ কমানো যায়।

যত্রতত্র ফেলে রাখা নির্মাণ সামগ্রী

প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ

এটা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব ভবন নির্মাণকারী উদ্যোক্তাদের। শব্দদূষণ না করে কীভাবে কাজটি করা যায়, নিজেরাই সেটা নিয়ন্ত্রণ করবে। অধিক শব্দের সৃষ্টি হয় এমন যন্ত্র ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।

নিজস্বভাবে নিয়ন্ত্রণ

অতিরিক্ত শব্দ কাজের ব্যাঘাত ঘটায়। এ জন্য মালিক বা শ্রমিকদের কানে এমন কিছু ব্যবহার করা, যাতে অতিরিক্ত শব্দ বাধার সৃষ্টি করতে না পারে। যদিও শ্রবণের ক্ষেত্রে সহনীয় মাত্রা ৯০ ডেসিবল কিন্তু ৮৫ ডেসিবল হলেই কানে হেয়ার প্লাগ পরতে হবে, যা  নির্মাণ সাইটে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

নির্মাণ সাইটে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় নানাভাবে। এ ক্ষেত্রে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে, যা নির্মাণস্থলে শব্দের তীব্রতা কমাবে। এ ক্ষেত্রে শব্দ শোষক যন্ত্র বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। অপরপক্ষে যেসব যন্ত্রপাতি অধিক শব্দ সৃষ্টি করে, সেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করাই উচিত। যদি একান্তই করতে হয় তবে সেগুলোর নাট-বল্টু ঠিকভাবে পরীক্ষা করে দেখা জরুরি। অথবা খুব বেশি শব্দ হলে তা দূরে স্থাপন করাই শ্রেয়।

ধূলিকণা

ধুলাবালু বা ধূলিকণা বাতাসের চরম শত্রু। ধুলাবালু মারাত্মকভাবে পরিবেশের দূষণ ঘটায়। নির্মাণ সাইটে ধূলিকণার নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব নয়। ধূলিকণা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তবে একেবারে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও পরিবেশে যাতে কম দূষণ হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। সাধারণত ধুলা-ময়লার উৎপত্তি হয় নির্মাণসামগ্রী ইট, কংক্রিট, বালু, সিমেন্ট ও টাইলসের মাধ্যমে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে সিলিকা। 

যত্রতত্র ফেলে রাখা নির্মাণ সামগ্রী

নির্মাণসামগ্রীর ক্ষতির শতকরা হারের তুলনামূলক চিত্র 

      নির্মাণসামগ্রী       শতকরা পরিমাণ 

               ইট             ৩০

            কংক্রিট           ২৫-২৭

             সিমেন্ট           ২৫-২৭

            টাইলস           ৩০-৪৫

            গ্রানাইট             ৩০

সাধারণত নির্মাণসামগ্রী (ইট, কংক্রিট, সিমেন্ট, টাইলস, গ্রানাইট) যখন সলিড অবস্থায় থাকে তখন সিলিকা ক্ষতি করে না। কিন্তু যখন নির্মাণের জন্য ভাঙা হয় তখন এগুলোর ভেতর থেকে ক্ষতিকারক সিলিকা বেরিয়ে আসে। ভবন ভাঙার সময় বিশেষত পুরোনো ভবনের ক্ষেত্রে সিলিকা অধিক পরিমাণে বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশের দূষণ ঘটায়।

ধুলাবালুতে যে ক্ষতি হয় 

  • শ্বাসকষ্ট
  • চর্মরোগ
  • হাঁপানি
  • ত্বকের বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক ব্যাধি
  • ক্যানসার।

যেভাবে রক্ষা পাবেন 

শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। পদ্ধতিগুলো যথাযথভাবে জেনে তা প্রয়োগে উদ্যোগী হতে হবে। নির্মাণশ্রমিকদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা নির্মাণবর্জ্য সম্পর্কে জানতে পারে। মূলত কাটিং থেকে ধুলোর উৎপত্তি হয়। এ ক্ষেত্রে কাটিং করার সময় পানির ব্যবস্থা করলে ধুলার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। ইলেকট্রিক করাত ব্যবহারে শ্রমিকদের হাতে গ্লাভস, চশমা ও মুখে মাস্ক পরিধান করতে হবে। আশপাশের নির্মাণবর্জ্য যাতে বাতাসে না মেশে সে জন্য চট দিয়ে নির্মাণাধীন ভবন ঢেকে দিতে হবে।    

এক্সকেভেটরের সাহায্যে কংক্রিট বর্জ্য অপসারণ

অনেক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আছে, যারা নষ্ট ও পরিত্যক্ত জিনিস ব্যবহার করে নতুন কিছু করার চেষ্টা করে। এই নতুন কিছু করার ফলে বর্জ্য উপাদান মারাত্মকভাবে দূষণ ঘটায়। আর তাই এগুলোকে মাটিচাপা দিয়ে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে।

বর্জ্য যে কারণে পুনর্ব্যবহারযোগ্য 

ব্যয় কমাতে : নির্মাণ সাইটে একই জিনিস বারবার ব্যবহারের ফলে নির্মাণব্যয় কমে আসায় ভবন নির্মাতারা বর্জ্য ব্যবহারের প্রতি আকৃষ্ট হন।

বিপণন সুযোগ : বর্জ্য কার্যকরভাবে কমাতে এবং পুনর্ব্যবহার করতে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়িক সাশ্রয়ে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।  

বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে করণীয় 

জমির মালিক : একজন জমির মালিক, জমির ব্যবস্থাপক হিসেবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে নেবেন। জমির মালিকের উচিত সফলভাবে বর্র্জ্যনিরোধকের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বর্জ্য নিরোধনে কী প্রয়োজন তা ঠিক করা : বর্জ্য নিরোধনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ  পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এর সফল বাস্তবায়ন। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ নির্মাণ এবং স্থাপনার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এসব কাজ সুচারুভাবে করতে গেলে প্রয়োজনীয় দিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে।

লক্ষ্য স্থির করা

নির্দিষ্ট কাজের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কাজের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। লক্ষ্য ঠিক রেখে কাজের সমন্বয় সাধন করতে হবে। সেক্ষেত্রে নির্মাণ ও স্থাপত্য বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দিয়ে কাজ করাতে হবে। তাঁদের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তাব দিতে হবে। প্রস্তাবটি লিখিত আকারে চুক্তি বা দলিলের মাধ্যমে হতে হবে।

কাজে সহায়তা করা 

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজের অগ্রগতির জন্য তত্ত্বাবধায়কে সাহায্য করতে হবে। কনট্রাক্টরের কাছে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হবে।

নির্মাণ সাইটের সুব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা জরুরী

হচ্ছে গবেষণাও

ভূমিস্বল্পতার কারণে পুরোনো ও অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার ভবন ভেঙে বাড়ছে সুউচ্চ ও বহুতল ভবন নির্মাণ। ফলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক দিকে বাড়ছে কংক্রিটের (ইট, বালু, পানি আর সিমেন্টের মিশ্রণ) চাহিদা, অপর দিকে বাড়ছে কংক্রিট-বর্জ্য। এক গবেষণায় জানা যায়, প্রতিবছর ভবন, সেতু, মহাসড়ক, বাঁধসহ বিভিন্ন পুরকৌশলবিষয়ক নির্মাণে গড়ে ১২ বিলিয়ন টন কংক্রিট দরকার। যার জন্য ১০ বিলিয়ন টন এগরিগেট (ইট, পাথর) প্রয়োজন। ফলে ইট তৈরি, পাথর উত্তোলন এবং কংক্রিট-বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে, বাড়াছে বৈশ্বিক উষ্ণতা।

তাই পরিবেশদূষণ ও নির্মাণব্যয় কমাতে নতুন ইট বা পাথরের কিছু অংশের পরিবর্তে পুরোনো কংক্রিটের একাংশ পুনর্ব্যবহার নিয়ে কাজ করার সময় এসেছে।

পুরোনো কংক্রিট সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। এর কোনো বাজারমূল্য নেই। তাই নতুন ইট বা পাথরের কিছু অংশের পরিবর্তে পুরোনো কংক্রিট ব্যবহার করলে পরিবেশদূষণ কমানোর পাশাপাশি কমবে নির্মাণের খরচ। বিভিন্ন পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের বার্ষিক কংক্রিটের চাহিদা ১৮ বিলিয়ন টনে পৌঁছাবে। ফলে বাড়বে এগরিগেটের চাহিদাও। আর এ এগরিগেটের চাহিদা মেটাতে বাড়াতে হবে ইটভাটা অথবা পাথর উত্তোলন, যা কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ বৃদ্ধি করবে, বাড়বে বৈশ্বিক উষ্ণতা। তাই কোর্স এগরিগেটের (ইট, পাথর) কিছু অংশের পরিবর্তে পুরোনো কংক্রিটের একাংশ পুনর্ব্যবহার করে কংক্রিট তৈরি করলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের কম নিঃসরণ ঘটবে। অপর দিকে, পুরোনো কংক্রিট ফেলে দেওয়ার ফলে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এ পুরোনো কংক্রিট কোর্স এরিগেটের কিছু অংশের পরিবর্তন করে ব্যবহার করা গেলে একদিকে কমবে পরিবেশদূষণ, অপর দিকে কমবে নির্মাণের খরচ। ফলে পুরোনো কংক্রিটের পুনর্ব্যবহার হবে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব; সেই সঙ্গে নির্মাণ-সহায়ক।

নির্মাণ সাইটে ফেলে রাখা উন্মুক্ত রড

পরিসংখ্যান আলোকে

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে প্রতিবছর গড়ে ১৮০ মিলিয়ন টন কংক্রিট-বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এতে দেখা যায়, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিটি নাগরিক প্রতিবছর গড়ে ৫০০ কেজি কংক্রিট-বর্জ্য উৎপন্ন করে, যার প্রায় ১০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়।

আগের বিভিন্ন গবেষণায় জানা যায়, নেদারল্যান্ডে প্রতিবছর গড়ে ১৪ মিলিয়ন টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার ৮ মিলিয়ন টনই আনবন্ড রোড বেস কোর্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জার্মানিতে প্রতিবছর ২৮৫ মিলিয়ন টন নির্মাণ-বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ৭৭ মিলিয়ন টন ডেমলিশড কংক্রিট, যার প্রায় ৭০ শতাংশ নতুন নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়। ফ্রান্সে প্রতিবছর গড়ে ১৩ মিলিয়ন টন, জাপানে ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন টন ও হংকংয়ে ২০ মিলিয়ন টন কংক্রিট-বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার অধিকাংশই নানা কাজে পুনর্ব্যবহার করা হয়।

বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল অনুসারে, নতুন ইট বা পাথরের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পুরোনো কংক্রিট দিয়ে অপসারণ করলে যে শক্তিসম্পন্ন কংক্রিট পাওয়া যায় তা দিয়ে নির্মাণকাজ করা সম্ভব। তবে সে ক্ষেত্রে পুরোনো কোর্স এগরিগেটের (ইট, পাথর) ঘনত্ব ২১০০ কেজি/ঘনমিটারের বেশি, শোষণ ক্ষমতা ৫০ শতাংশের কম এবং অপদ্রব্য ১ শতাংশের কম হওয়া দরকার।

এ বিষয়ে আরও বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন। বিশেষ করে, বিভিন্ন অনুপাতের সিমেন্ট, ফাইন এগরিগেট (বালু) ও কোর্স এগরিগেটের (পাথর) মিশ্রণ, বিভিন্ন ওয়াটার সিমেন্ট অনুপাত, কিউরিং পিরিয়ড এবং বিভিন্ন ফাইন্যান্স মডুলাসের (এফএম) ফাইন এগরিগেট (বালু) ব্যবহার করে কংক্রিটের শক্তি পরীক্ষা করা যেতে পারে। এতে কোন অনুপাত মাত্রায় পুরোনো ও নতুন এগরিগেটের মিশ্রণ ব্যবহার সর্বাধিক সাশ্রয়ী ও গ্রহণযোগ্য হবে তা নিরূপণ সহজ ও সঠিক হবে।

কংক্রিট বর্জ্য থেকে এগ্রিগেট

এ প্রসঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম বলেন, নির্মাণের সময় রাজউক থেকে বলা হচ্ছে বিএনবিসি ফলো করতে। বিএনবিসিতে নির্মাণকালীন বেশ কিছু সেফটি সম্পর্কে বলা হয়েছে। আশপাশের যাতে পরিবেশদূষণ না হয় এ জন্য চারদিকে নেটিং করে লাগানো কিংবা আধুনিক সেটার ব্যবহার করা। আমাদের দেশে সাধারণত চটের নেট ব্যবহার করা হলেও বাইরের দেশে কিন্তু অন্য জিনিস ব্যবহার করে। বিদেশে একজন অন্যজনের সমস্যা করলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিদেশে সাধারণত মাইক্রো নেটিং দিয়ে এ কাজ করা হয়। আমাদের বিল্ডিং প্ল্যানেও বলা আছে, আধুনিক পদ্ধতিতে যেন বিল্ডিংয়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হয়। বিল্ডিং কোডে লেখা আছে বাড়ি করার সময় এমন কোনো শব্দ সৃষ্টি করা যাবে না, যাতে পাশের বাড়ির সমস্যা হয়। এটা অমান্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে জেল-জরিমানা পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি আবদুল মতিন বলেন, পরিবেশ নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলে কিন্তু সবখানে সব জায়গায় পরিবেশদূষণের মহোৎসব চলছে। আইন থাকলেও দেখার যেন কেউ নেই। তবে বর্তমানে বেশ কিছু জায়গায় বিধিসম্মতভাবে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। পুরোনো ও নতুন এগরিগেটের মিশ্রণ ব্যবহার ক্রমেই সর্বাধিক সাশ্রয়ী ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে নির্মাণবর্জ্যরে দূষণ রোধ সহজ হবে।  

‘নির্মাণবর্জ্যে ক্ষতির প্রধান শিকার হয় পরিবেশ, পরিবেশগত ক্ষতির ফলে মানবস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকে’

ড. মো. আশরাফ আলী

অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) 

পরিচালক, ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং নেটওয়ার্ক (আইটিএন) সেন্টার ফর ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট, বুয়েট

কংক্রিট বর্জ্যকে এগ্রিগেটে রূপান্তর প্রক্রিয়া

নির্মাণবর্জ্য হচ্ছে নির্মাণকাজের অবশিষ্টাংশ থেকে সৃষ্ট এক প্রকার কঠিন বর্জ্য, যার উৎপত্তি ভবন নির্মাণস্থল থেকে। নির্মাণবর্জ্যে ক্ষতির প্রধান শিকার হয় পরিবেশ, পরিবেশগত ক্ষতির ফলে মানবস্বাস্থ্য প্রচণ্ড ঝুঁকিতে থাকে। রাস্তার পাশে নির্মাণসামগ্রী রাখার ফলে যান চলাচল ব্যাহত হয়। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি হয়। এ থেকে পরিত্রাণ খুব কঠিন নয়। আমরা ভবন তৈরির সময় ইট, বালুর যে স্তূপ করে রাখি, সেখানে বালুর স্তূপের ওপর প্রতিদিন পানি ছিটিয়ে দিলে বালু আর বাতাসে উড়বে না। ফলে বালুর অপচয় কম হবে; পরিবেশও সুন্দর থাকবে। নির্মাণ যন্ত্রপাতিগুলো অকেজো কি না সেগুলো পরীক্ষা করে চালাতে হবে। আবার বড় বড় বিল্ডিং করার সময় একসঙ্গে অনেক শ্রমিক কাজ করে। তাদের মলমূত্র ত্যাগের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করা, যাতে সেগুলো বাইরে এসে পরিবেশের দূষণ না ঘটায়। 

কৃতজ্ঞতায়

ড. জি এম সাদেকুল ইসলাম 

সহকারী অধ্যাপক, চুয়েট 

 ম. শাফিউল আল ইমরান

প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৩ তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৩

+ posts