কারমা মূলত কারমা সংস্কৃতির রাজধানী, যা ৫৫০০ বছর আগে বর্তমান সুদানে অবস্থিত ছিল। ছবি: ডিস্প্লোর

সুপ্রাচীন সভ্যতা কারমা

অনেক ইতিহাস লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেও প্রত্নতাত্ত্বিকদের নিরন্তর গবেষণায় উঠে আসা নতুন নতুন তথ্য চমকে দিচ্ছে আমাদের। মেসোপটেমীয়, সিন্ধু, মায়া, রোমান, মিসরীয় সভ্যতাসহ প্রাচীন অনেক সভ্যতার সঙ্গে আমরা পরিচিত। তবে তার চেয়েও প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের জানার পরিধি সীমিত। এমনই এক সভ্যতা কারমা। কৃষি, শিল্প আর বাণিজ্যে সমৃদ্ধ এই সভ্যতা বিশ্বের অন্যতম একটি প্রাচীন সভ্যতা। কারমা সভ্যতার সাত-সতেরো জানাচ্ছেন রিগ্যান ভূঁইয়া

কারমা মূলত কারমা সংস্কৃতির রাজধানী, যা ৫৫০০ বছর আগে বর্তমান সুদানে অবস্থিত ছিল। ৫৫০০ বছর বলা হলেও মূলত এ সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় ৮৩৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। কারমা প্রাচীন নুবিয়ার (মিসরীয় ফেরাউনদের শাসিত একটি অঞ্চল) বৃহত্তম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর মধ্যে একটি। গত কয়েক দশকের ব্যাপক খনন ও গবেষণার ফলে প্রাগৈতিহাসিক এ সংস্কৃতির অনেক নিদর্শন বিশ্ববাসীর সামনে এসেছে। খননে বেরিয়ে এসেছে হাজার হাজার কবর এবং লোয়ার ডেফুফাকে ঘিরে থাকা প্রধান শহরের আবাসিক কোয়ার্টার। কারমার প্রথম বসতি গড়ে উঠেছিল ৮৩৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, মেসোলিথিক সময়কালে। ৫৫০০ এবং ৫১৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এই এলাকাটির বেশির ভাগই পরিত্যক্ত ছিল। ধারণা করা হয়, এই সময়ের ব্যবধানে নীল নদের প্রবাহ কমে যায় এবং সে কারণেই বেশির ভাগ এলাকা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ৪০৫০ এবং ৩৪৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে নীল নদের প্রবাহ আবারও বৃদ্ধি পাওয়ায় কারমায় দ্বিতীয় দফায় বসতি বাড়তে থাকে। সে সময় থেকেই কারমাকে ঘিরে একটি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করতে থাকে। কারমা পরে একটি বৃহৎ শহুরে কেন্দ্রে বিকশিত হয়, যা পশ্চিম ডেফুফা নামে পরিচিত ও একটি বড় অ্যাডোব মন্দিরের চারপাশের জনপদকে নির্দেশ করে। ২৫৫০ এবং ১৫৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে কারমা একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠন করে, যা কারমা সাম্রাজ্য নামে পরিচিত।

কারমা রাজ্য ছিল মূলত সুদানের কারমাকেন্দ্রিক একটি প্রাথমিক সভ্যতা। প্রথম দিকে এটি নুবিয়ার দক্ষিণ অংশে ‘আপার নুবিয়া’ ও উত্তরে ‘লোয়ার নুবিয়া’ এবং পরে মিসরের সীমানা পর্যন্ত উত্তর দিকে প্রসারিত হয়েছিল। মিসরের মধ্য রাজত্বের সময় কারমার রাজনীতি নীল উপত্যকার কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি। মিসরের সঙ্গে কারমার ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্পসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই মিসরের ছাপ ছিল। এই রাজ্যটি প্রায় ১৭০০ থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। বসবাস চিল কমপক্ষে ১০ হাজার লোকের। মিসরের বিভিন্ন শিল্পের থিম এবং বাস্তবায়নে যে চিত্র পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগই কারমানদের কীর্তি। কারমানরা মিসরে স্বাধীনভাবে কাজ করত এবং শিল্পের বিকাশে তাদের অনেক অবদান ছিল। সে কারণে কারমার শিল্পের সঙ্গে মিসরের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে।

ধ্বংসপ্রাপ্ত কারমা সভ্যতা, সুদান। ছবি: উইকিপিডিয়া

ইকো-রাজনৈতিক কাঠামো
কারমা সভ্যতা, সাম্রাজ্য বা সংস্কৃতি আমরা যাই বলি, সেটি শুধু তার নিজস্ব মেট্রোপলিটন শহর, কবরস্থানকেন্দ্রিক সুদানের একটি এলাকা হিসেবেই পরিচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ও খননে কারমার অন্তর্ভুক্ত অনেকা এলাকা চিহ্নিত করা গেছে। এতে রয়েছে নীল নদের অনেক চ্যানেল, যা বর্তমানে নীল নদের আধুনিক গতিপথ পরিবর্তনের ফলে শুকিয়ে গেছে, তবে সেগুলো আগে প্রবহমান ছিল। জরিপে দেখা যায়, আবু হামাদ/মোগ্রাত দ্বীপের উজানে যে বাঁধ ছিল তারও অনেক উজানে কারমার অবস্থান। বিভিন্ন মিসরীয় রেকর্ড ও দলিলে এর সমৃদ্ধ এবং জনবহুল কৃষি অঞ্চলের কথার উল্লেখ রয়েছে। মিসরীয় সভ্যতা ছিল বিস্তৃত। তবে কারমা ছিল তার সম্পূর্ণই বিপরীত। একাধিক জরিপে দেখা যায়, কারমা ছিল একটি কেন্দ্রীভূত সভ্যতা। তবে এর শক্তি, কার্যক্রম এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রসার ছিল মিসরের চেয়েও বিস্তৃত।

কারমা অঞ্চলে আবাদি জমির পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বসতির সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে কিছু এলাকায় পশুপালনই ছিল মুখ্য। ছিল সোনা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রও। কোনো কোনো শহর ছিল কৃষিজ পণ্যসহ বাণিজ্য কেন্দ্রীভূত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খননে এসব অঞ্চলের রাজকীয় সমাধিগুলোতে পাওয়া গেছে প্রচুর গবাদিপশুর খুলি। এর বিশ্লেষণ থেকে গবেষকেরা ধারণা করেন, রাজাদের মৃত্যুতে শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবেই হয়তো গ্রামের বাসিন্দারা অনেক দূর-দূরান্ত থেকে এগুলো সমাধিতে অর্পণ করেছিল। পরে আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলের রাজকীয় সম্পত্তি হিসেবে গবাদিপশুর গুরুত্বকে সমান্তরাল মূল্যমান বিবেচেনা মনে করেন গবেষকেরা।

শুধু কারমা এবং সাই দ্বীপের কেন্দ্রগুলোতেই বিশাল শহুরে জনসংখ্যা ছিল বলে ধারণা করা হয়। হয়তো আরও খনন করা হলে অন্যান্য আঞ্চলিক কেন্দ্র ভবিষ্যতে প্রকাশ হতে পারে। ধনী শ্রেণির মানুষ এবং একশ্রেণির বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বসতির অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁরা দূরবর্তী দেশ থেকে আগত পণ্যদ্রব্যের বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ করতেন এবং প্রশাসনিক ভবন থেকে পাঠানো চালানের তত্ত্বাবধান করতেন। স্পষ্টতই, কারমা মধ্য আফ্রিকার ভেতর থেকে মিসর পর্যন্ত বিলাসবহুল পণ্যের বাণিজ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করত।

কারমা সভ্যতার ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার একাংশ। ছবি: রিমোটকগ

কারমার কবরস্থান এবং রাজকীয় সমাধি
কারমাতে ৩০ হাজারের বেশি কবরসহ একটি কবরস্থান রয়েছে। কবরস্থানটি একটি সাধারণ প্যাটার্নে সজ্জিত হলেও রয়েছে বিশেষত্ব। বড় কবরগুলো ছোট ছোট কবর দ্বারা রিং করা, যা সামাজিক স্তরবিন্যাসের নিদর্শনকে বোঝায়। সাইটটির দক্ষিণ সীমানায় কবরের ঢিবি রয়েছে, যার চারটি ৯০ মিটার (৩০০ ফুট) ব্যসে প্রসারিত। এগুলোর মোটিফ ও আর্টওয়ার্ক থেকে কারমার শাসকদের কবর বলে ধারণা করা হয়, যা হোরাসের মতো মিসরীয় দেবতাদের নকশার সাদৃশ। মৃৎপাত্রেও মিসরীয় নকশার প্রমাণ মেলে। কারমান স্কারাব সিল এবং তাবিজের মতো বস্তুতে প্রচুর শিল্পকর্মের প্রমাণ রয়েছে, যা প্রাচীন মিসরের সঙ্গে কারমার ব্যাপক বাণিজ্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ধারণার বিনিময়ের সাক্ষ্য দেয়।

কারমার ইতিহাস
ইতিহাস সম্পর্কে কারমানদের রেকর্ডকৃত কোনো নথি পাওয়া যায় না। তবে মিসরীয় ইতিহাসের অনেক নথিতে কারমানদের কথা উল্লেখ রয়েছে। একসময় কারমা ছিল মিসরের নাকাদা গোষ্ঠীর শাসনাধীন। নাকাদারা তাদের ‘নুবিয়া’ বলে উল্লেখ করত। নাকাদা সম্রাটরা সাম্রাজ্য বিস্তারে নুবিয়া জয় করে পুরো নীলনদে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের স্বপ্ন দেখতেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নুবিয়া জয় করে তাঁরা দীর্ঘদিন শাসন করেন। তবে শাসনব্যবস্থা পুরোনো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাও ক্ষয়িষ্ণু হয়। সে কারণেই ক্রমেই নুবিয়ার দক্ষিণ অঞ্চল মিসরীয় নাকাদাদের হাতছাড়া হয়ে পড়ে। নীলনদের দক্ষিণাঞ্চল দখলের বিষয়কে মিসর মনে করে বহিরাগতরা দখলে নিয়েছে। কিন্তু তখনো মিসরে আসা বহিরাগতদের অতিথি হিসেবেই মেনে নিত ফেরাউনরা। কারমানসহ অন্যান্য অঞ্চলের বহিরাগতরা এখানে অস্থায়ী বসতি গড়ে মিসরীয়দের সঙ্গে গড়ে তোলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক। তবুও মাঝে মাঝেই সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করত, তবে বিশেষ কোনো ক্ষয়ক্ষতি হতো না। উভয় পক্ষই ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সীমানা লঙ্ঘন করত না।

কামানদের উত্থানে সবচেয়ে বেশি যাদের অবদান, তারা হলো হিকসোস। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮ শতকের শুরুতে ফিলিস্তিন থেকে মিসরে অভিবাসীদের আগমনের কারণে মিসরে হিকসোস রাজাদের উত্থান হয়েছিল। মিসরে আগত ফিলিস্তিনি অভিবাসীরাই ছিল হিকসোস। অভিবাসীরা তাদের সঙ্গে ঘোড়া ও রথ, তির-ধনুক এবং উন্নত ধাতব অস্ত্রসহ নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এসেছিল। তাদের বেশির ভাগই নীল বদ্বীপের পূর্ব অংশে বসতি স্থাপন করেছিল। কারমানদের সঙ্গে তাদের ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ জোট সম্পর্ক। কারমানরা তাদের বাণিজ্যিক যাত্রাপথের সুবিধা এবং আফ্রিকান সাহারা মরুভূমির সম্পদের অধিগ্রহণকে কাজে লাগিয়ে সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির শীর্ষে আরোহণ করার স্বপ্ন দেখত। কারমানদের এ স্বপ্নের পথে শক্তিশালী বাধা ছিল মিসরীয় সাম্রাজ্য। তারা ছিল একমাত্র পথের কাঁটা, যা সরাতে নীলনকশা এঁকেছিল কারমানরা।

ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজকীয় সমাধির পাশে গবাদিপশুর খুলি। ছবি: দ্য আফ্রিকান হিস্টোরি

মিসরের মধ্য সাম্রাজ্য ছিল তিন সাম্রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল এবং ক্ষণস্থায়ী। তাদের নিজেদের ভেতর ছিল দ্বন্দ্ব আর কলহ। ১৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে তাদের পতন ঘনিয়ে আসে। মধ্য সাম্রাজ্যের এই দুর্বলতার সুযোগে হিকসোসদের সহযোগিতায় মিসরীয় ফারাওদের মধ্য সাম্রাজ্যে আক্রমণ করে বসে কারমানরা। একসময় নীল নদের পুরো দক্ষিণাঞ্চল নিজেদের দখলে নিয়ে আসে কারমানরা। মিসরীয় মধ্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করে হিকসোস রাজা। হিকসোসদের নব্য রাজা আভারিস থেকে নীলনদের বদ্বীপে তাদের রাজধানী স্থানান্তর করে। মিসরীয় সাম্রাজ্যের মতো কারমা সাম্রাজ্যও প্রাক্-কারমীয় সাম্রাজ্য, মধ্য কারমীয় সাম্রাজ্য এবং শ্রেষ্ঠ কারমীয় সাম্রাজ্য; এই তিন যুগে বিভক্ত ছিল। প্রাক্-কারমীয় সাম্রাজ্য চলমান ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২০৫০ অব্দ পর্যন্ত। এই যুগ সম্পর্কে খুব অল্পই জানা যায়। মধ্য কারমীয় সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে খ্রিষ্টপূর্ব ২০৫০ অব্দের দিকে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৫০ অব্দ পর্যন্ত ছিল এর স্থায়িত্বকাল। এই সময়েই কারমা ছিল মিসরের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দ্বী।

গ্যাশ গ্রুপ, একটি নিওলিথিক সংস্কৃতি, যা ইরিত্রিয়া এবং পূর্ব সুদানে ৩০০০ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বিকাশ লাভ করা একটি সভ্যতার অংশ। এর বিকাশের পুরো সময়কালে গভীর যোগাযোগ ছিল কারমার সঙ্গে। বহু শতাব্দী ধরে, গ্যাশ জনগণ মিসর এবং নীল উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের সার্কিটে অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাই মহল টেগ্লিনোস কারমা সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে ওঠে। এই বাণিজ্য কার্যকলাপ স্পষ্টভাবে এই অঞ্চলের সামাজিক উত্থানে বিশেষ অবদান রাখে। ২৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে প্রাথমিক সি-গ্রুপ সংস্কৃতিও লোয়ার নুবিয়াতে আবির্ভূত হয়েছিল। এই সংস্কৃতি ডঙ্গোলা রিচ (কারমার কাছাকাছি এলাকা) থেকে কারমা সাম্রাজ্যে বিস্তার লাভ করে বলে ধারণা করা হয়। এভাবে, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মধ্যে, কারমা একটি বৃহৎ রাজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা সম্ভবত পূর্ব সুদানে প্রথম এবং মিসরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল।

প্রত্নতত্ত্ব
কারমাতে প্রারম্ভিক প্রত্নতত্ত্ব শুরু হয়েছিল একটি মিসরীয় এবং সুদানি জরিপের মাধ্যমে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জর্জ এ রেইসনার এবং মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস, বোস্টনের যৌথ উদ্যোগে এ জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। রেইসনার ‘হার্ভার্ড-বোস্টন’ নামের এই জরিপ কার্যক্রমটি তিনটি ফিল্ড মৌসুম (১৯১৩-১৯১৬) পর্যন্ত পরিচালনা করেন। কারমা-ই ছিল দক্ষিণ সুদানের এই অঞ্চলে খনন করা সবচেয়ে প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। রেইসনারের হার্ভার্ড-বোস্টন অভিযানের ভিত্তিতে কারমা সংস্কৃতির একটি মৌলিক কালপঞ্জি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই জরিপকে পরবর্তী সব জরিপ ও গবেষণার জন্য গাইড হিসেবে মানা হয়। রেইসনারের সুনির্দিষ্ট খনন কৌশল, সাইট রিপোর্ট এবং অন্য প্রকাশনাগুলো পরবর্তী সময়ে তার ফলাফলের পুনর্ব্যাখ্যা করা সম্ভব করে তোলে।

শিল্পতুলিতে কারমান সভ্যতা। ছবি: পিন্টারেস্ট

কারমা প্রত্নতত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ডেফুফা। লোয়ার/ওয়েস্টার্ন ডেফুফা (একটি বিশাল সমাধির কাঠামো) নদীর কাছাকাছি পাওয়া গেছে। আপার/ইস্টার্ন ডেফুফা নদী থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে পাওয়া গেছে। রেইসনার স্থাপত্য কৌশল এবং নিম্ন/পশ্চিম ডেফুফা (৫২.৩ মি × ২৬.৭ মি, বা ১৫০ × ১০০ মিসরীয় হাত) থেকে আবিস্কৃত মূর্তির সঙ্গে প্রাচীন মিসরীয় সংস্কৃতির অনেক মিল পেয়েছেন রেইসনার। তিনি ধরে নিয়েছিলেন এটি একটি দুর্গ। তিনি লোয়ার ডেফুফাকে ঘিরে সন্দেহভাজন বসতিটির এর বেশি আর খনন করেননি। জর্জ এ রেইসনার এই প্রত্নতত্ত্বকে নীল নদের তীরে প্রাচীন মিসরীয়দের একটি উপগ্রহ শহর (স্যাটেলাইট টাউন) হিসেবে মনে করেন। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে চার্লস বননেট এবং জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত খনন কার্যক্রম নিশ্চিত করে যে এটি এমন নয়। খননে তারা একটি বিশাল স্বাধীন শহুরে কমপ্লেক্স উন্মোচন করেছেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শ্রেষ্ঠ কারমীয় সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ অংশকে শাসন করেছে।

দেশে দেশে আজ যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ। ভালো নেই সুদানের অবস্থাও। তবে সুদানের অবস্থা ভালো না হলেও তাদের ইতিহাস আমাদের অনেক কিছুই শিক্ষা দেয়। জাতিগত উত্থান, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সভ্যতার বিকাশে নীল নদ ও কারমার ইতিহাস আধুনিক সভ্যতার জন্য এক বিশাল শিক্ষণীয় ইতিহাস। কারমানদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ইতিহাস উন্মোচন হলে যুদ্ধবাজ আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির পথ ত্বরান্বিত হলেও হতে পারে।

প্রকাশকাল: বন্ধন ১৬৬ তম সংখ্যা, জুন ২০২৪

Related Posts

কার্থেজ: তিউনিসিয়ার ধ্বংসপ্রায় ইতিহাসের ক্রন্দন

বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটি হলো কার্থেজ সভ্যতা। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি হলো কার্থেজ। এই শহরকে কেন্দ্র…

ইরানের প্রাচীন বিষ্ণু মন্দিরে ভারতীয় ঐতিহ্যের ছাপ

সম্প্রতি ভারতের কালজয়ী অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইরানের বন্দর আব্বাসে অবস্থিত ১৩৪ বছরের পুরনো একটি প্রাচীন…

মুসলিম স্থাপত্যে স্পেনের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ‘আল হামরা’

আল হামরা। স্পেনের একটি বিখ্যাত রাজ প্রাসাদ। আরবি ‘আল হমরা’ শব্দের অর্থ লাল। এই প্রাসাদের বাইরের দেয়ালও লাল…

নগর ও নারী: স্পেসের ভেতর নির্মিত বৈষম্য

জেন্ডার, স্পেস, ক্ষমতা এবং স্থাপত্য এই চারটির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আমাদের জানাশোনা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ সময়ের সাথে সাথে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

রাস্তা থেকে রেস্তোরাঁ: কাপ-পিরিচে মন হাল্কা করার স্থাপত্যের গল্প
নাভিদ বারাতির ‘হিডেন সিটি’ 
বিশ্বকাপ ২০২৬: স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক মেগা-ইভেন্টের নতুন মানচিত্র
মে মাসের সেরা পাঁচটি আবাসিক স্থাপত্য
প্রেইরির নীরবতায় অবতরণ করা এক ভবিষ্যত স্থাপত্য
নিখিল: নৃত্যের ছন্দে গড়া স্মৃতির অনুরণন
Carthage
Dhanmondi Mogal Eidgah
Kaba Ghor