উৎসবে আলো গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষঙ্গ। ঘর সাজানোর কথা ভাবতে গিয়ে মনেই থাকে না আলোর কথা। যা এক মূহুর্তে পাল্টে দিতে পারে আপনার মুড, ঘরের সৌন্দর্য! প্রায় একই সঙ্গে আসছে পূজা ও ঈদ। আর তাই উৎসবের এ সময়ে অন্দরে চাই নতুনত্ব। ঘরের নান্দনিকতার এই কাজটা অনায়াসে করতে পারে আলো। পুরোনো ঘর পুরোনো মেজাজ এক লহমায় সরিয়ে ঘরে আনতে পারে আভিজাত্যের ছোঁয়া।
আলোকসজ্জায় যে ঘরের সৌন্দর্য আরো আকর্ষণীয় ও নান্দনিকভাবে প্রকাশ পায় এ সম্পর্কে স্থপতি ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার মুন্না আহমেদ জানান, লাইটিং এক ধরনের আর্ট। ঘরের উপযুক্ত আলোক ব্যবস্থাপনা যেমন ব্যবহারিক, তেমনি সৌন্দর্যবর্ধক।
লাইটিং এর উৎস
মূলত লাইটিংয়ের উৎস দু’টি-
১. প্রাকৃতিক আলো (সূর্যের আলো)
২. কৃত্রিম আলো (বিভিন্ন ধরনের বাতি)
মানুষের মনের ওপর আলোর প্রভাব সুদূরপ্রসারী, এ কথা জানা অনেকেরই। প্রাকৃতিক আলো আসে সাধারণত জানালা বা স্কাইলাইটিংয়ের মাধ্যমে। ভাবুন তো আলোবিহীন একটা জীবন যেখানে শুধু অন্ধকার। এ জীবন আমরা কল্পনাও করতে পারি না। সবারই আশা মনের মত ঘর সাজানোর। আর তাই সবাই চাই নিজের সাধ্যমত ঘরটিকে সাজাতে। অনেকেই ঘর সাজাতে কেবল ঘরের রং আর ফার্ণিচারকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু আলোকসজ্জাও ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কেবলমাত্র সঠিক আলোক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে একটি ঘরকে আরও আকর্ষণীয় করা সম্ভব। সঠিক আলোর ব্যবহার ঘরের রং ও গঠনকে পরিবর্তিতরূপে প্রকাশে সক্ষম। আলোকসজ্জার ওপর নির্ভর করে আপনার চিরচেনা ঘরটি কেমন দেখাবে।
আলোর সঠিক স্থাপনা ও ব্যবহার যেমন ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি ভুল ব্যবস্থাপনা, এনার্জি অপচয় ঘটিয়ে আমাদের শারীরিক ক্ষতির কারণও হতে পারে। ব্যবহারের ভিত্তিতে লাইটিংকে আরও তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়-
১. টাস্ক লাইটিং
২. জেনারেটর লাইটিং
৩.অ্যাকসেন্ট লাইটিং।
টাস্ক লাইটিং
এ ধরনের লাইট সাধারণত পড়া বা ইন্সপেকশনের কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন অনুন্নতমানের রিপ্রোডাকশন পড়ার জন্য ১৫০০ লাক্স (১৫০ ফুট ক্যানডলস) মানের আলোর প্রয়োজন। রান্নাঘরেও এটি বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়।
জেনারেটর লাইটিং
টাস্ক লাইটিং ও অ্যাকসেন্ট লাইটিংয়ের মধ্যবর্তী তীব্রতা বিশিষ্ট আলোই জেনারেল লাইটিং। বাড়ির মধ্যকার সাধারণ বাতি, টেবিল ল্যাম্প অথবা সিলিংয়ের লাইটিং এবং বাহিরের পার্কিংয়ের স্থানে যেখানে নিম্ন তীব্রতার (১০-২০ লক্স) বাতির প্রয়োজন। সেখানে এ ধরনের আলোর ব্যবহার করা হয়। একে বলা হয় অ্যাম্বিয়েন্ট লাইটিং।
অ্যাকসেন্ট লাইটিং
এটি সাধারণত শোভাবর্ধনে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন আকৃতির ছবি, প্রতিমূর্তি, গাছ অথবা ইন্টেরিয়র ডিজাইন কিংবা ল্যান্ডস্কোপ হাইলাইট করার জন্যে অ্যাকসেন্ট লাইটিং ব্যবহার করা হয়। একটি আদর্শ ঘরে জেনারেল লাইটিং, টাস্ক লাইটিং ও অ্যাকসেন্ট লাইটিং একত্রে নৈপুণ্যের সাথে ব্যবহার করা হয়। যা ঘরে আনে রহস্যময় নান্দনিকতা আর স্বস্তির ছোঁয়া।
অতএব, ঘরের সঠিক আলোক ব্যবস্থাপনার জন্য যেমন প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম আলোক উৎসের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি আলোর সঠিক তীব্রতা নির্ধারণ প্রয়োজন। অনেকে ভাবেন, ঘরে জানালার সংখ্যা বেশি থাকলে কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন কম। কিন্তু এ ধারণাটি সঠিক নয়। কারণ, বেশি সংখ্যক জানালা থাকা সত্তে¡ও ঘরের কিছু অংশ অপর্যাপ্ত আলোকিত থাকতে পারে। রাতের বেলায় জানালাগুলো কালো ছবির ফ্রেম ছাড়া আর কিছুই না। তাই রাতে এ রকম ঘরে বেশি প্রয়োজন আলোর।
আলোক বাতির সমারোহ
বর্তমানে বিভিন্নভাবে ভিন্ন ভিন্ন তীব্রতায় আলোকিত হয় আপনার অন্দর। এখানে বড় একটা বিষয় হল কোথায় কি রকম লাইটিং করা যায় সে বিষয়ে একটু নজর দিন-
সিলিং লাইটিং
এ ধরনের বাতি ছাদে ঝুলন্ত বা অর্ধঝুলন্তভাবে স্থাপিত থাকে। যেকোনো ঘরে সিলিং লাইট ব্যবহার করা সম্ভব। রুমের উজ্জ্বলতা, পরিবেশ পরিবর্তন ও সৌন্দর্যবর্ধনে বিশেষভাবে ব্যবহার করা যায়। কিসেসড লাইট, পট লাইট ইত্যাদি সিলিং লাইট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ঝাড়বাতি
রুমের শোভাবর্ধনের জন্য ঝাড়বাতির জুড়ি নেই। ডাইনিং রুম বা সিঁড়িঘরে এর ব্যবহার বেশি। এছাড়া ড্রয়িংরুমের ফোকাস হিসাবে ঝাড়বাতি ব্যবহার করা হয়।
ট্রাকলাইট
এটি এমন এক ধরনের লাইট, যা সিলিংয়ে স্থাপন করতে হয়। জেনারেল টাস্ক ও অ্যাকসেন্ট লাইট হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
পেনডান্ট লাইটিং
এটি একধরনের ঝুলন্ত বাতি, যা বিশ্রামের ঘর কিংবা রান্নাঘরের বিশেষ স্থানে ব্যবহার করা যায়।
দেয়াল ল্যাম্প
ঘরকে দারুনভাবে সাজাতে দেয়াল ল্যাম্প ব্যবহার করা হয়। বাজারে বিভিন্ন ধরনের দেয়াল ল্যাম্প রয়েছে-
স্কানস
এটি একধরনের দেয়াল বাতি, যা আই লেভেলে স্থাপিত। এই বাতি জেনারেল, টাস্ক এবং অ্যাকসেন্ট লাইটিংয়ের কাজ করতে সক্ষম।
দেয়াল ল্যাম্প
দেয়ালের অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে দেয়াল ল্যাম্প ব্যবহার করা যায়। এর ফলে ঘরে আসে রূপের ভিন্নতা।
ল্যাম্প
ঘরের নান্দনিকতা ছাড়াও আলোর প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরনের ল্যাম্প ব্যবহার করা হয়।
ফ্লোর ল্যাম্প
এটি সাধারণত মাটিতে স্টান্ডের উপর বসানো হয়, যা মেঝে থেকে ৫০-৭০ ইঞ্চির মত উচুঁতে থাকে। জেনারেল লাইট হিসাবে ফ্লোর ল্যাম্প বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে টাস্ক লাইটিংয়ের কাজেও এই লাইট ব্যবহার করা যেতে পারে।
টেবিল ল্যাম্প
জেনারেল, টাস্ক এবং অ্যাকসেন্ট লাইটিং, এই তিন ধরনের লাইটিংয়ের জন্যই এই ল্যাম্প ব্যবহার করা যায়। এগুলো টেবিলের উপর স্থাপন করা হয় কম উচ্চতায়।
টিজাজনি ল্যাম্প
এ ধরনের ল্যাম্প ঘরে ক্ল্যাসিক্যাল ট্রেডিশনেবল মুড নিয়ে আসে।
ডেস্ক ল্যাম্প
সাধারণত রিডিংরুমের ডেস্কে ব্যবহার করা হয় এ ধরনের ল্যাম্প।
সোলার লাইটিং
ঘরের সাজে পরিবেশবান্ধব সোলার বাতি ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে খরচও হয় কম। এছাড়াও বাগানে বিশেষ ধরনের আলোক বাতি ব্যবহার করা যায়, যা ঘরের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
আলোকসজ্জা প্ল্যানিং
বাসার আলোকসজ্জা প্ল্যানিং করার আগে যে প্রশ্নগুলির উত্তর জেনে নেওয়া প্রয়োজন-
১. ঘরে কি কি কাজ সম্পাদন করা হবে? ঘরে কি বিভিন্ন ধরনের কাজ করা হবে? প্রতিটি কাজের জন্য কি পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা সম্ভব?
২. ঘরে কি সঠিকভাবে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা সম্ভব, যেন অতিরিক্ত লাইটিং না হয়।
৩. লাইটিংয়ের সুব্যবস্থা করার জন্য বর্তমান বা নতুন ইলেকট্রিক কেব্ল, বক্স, সুইচ ও আউটলেট আছে কি?
৪. ঘরের আলোকসজ্জা করার জন্য দ্রব্যাদি কেনার আগে একটু গবেষণা করে নিন। বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখুন। বিভিন্ন পত্রিকা ও ইন্টারনেটে বিভিন্ন আলোক বাতি সম্পর্কে ধারণা নিন।
বিভিন্ন ধরনের আলোক বাতিকে কি মিলিয়ে সাজানো সম্ভব?
ক. বিভিন্ন ধরনের বাতি মিলিয়ে দেখুন। যেমন একটি সমন্বয় হতে পারে হ্যাভিং পেনড্যানট ট্রাক লাইটিং (Track Lighting) এবং ফ্লোর ল্যাম্প (Floor Lamp).
অথবা
খ. বিভিন্ন ধরনের তীব্রতা বিশিষ্ট আলোর সমন্বয়ে (হ্যালোজেন ও ইলেক্যানডেসেন্ট)
৬. লাইটিংয়ের পরিবর্তন রিমডেলিং আধুনিকায়ন কোনটি সাশ্রয়ী?
৭. ঘরের রং, টেক্সচার ও আকার বিবেচনা করে আলোকসজ্জা ঠিক করতে হবে।
৮. অনেক সময় কেবল একটি নতুন আলোকবাতি সংযোজন বা অপসারণ পুরো ঘরের পরিবেশ পরিবর্তন করতে পারে। তাই বর্তমান ঘরের আলোকব্যবস্থা চূড়ান্ত করার আগে আবার ভেবে নিন।
উন্নতমানের কৃত্রিম আলোকবাতি ঘরকে করে আরও উজ্জ্বল, রঙিন ও সজীব। বাতির সঠিক ব্যবহারের ওপর ঘরের কার্যক্রম, রুচিবোধ ও সৌন্দর্য জড়িত।
শামস আহমেদ
shamsahmed13@gmail.com
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৪ তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৪