তিতাস পারের ছোট্ট শহর আখাউড়া। ব্রিটিশ শাসনামলের রেলজংশন, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামালের সমাধিসৌধ, ভারতের আগরতলা হয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত ট্রানজিট রুট, স্থলবন্দর এসব কিছুই এলাকাটিকে ব্যবসায়িক গুরুত্ব এনে দিয়েছে। আখাউড়ার শহীদ আমির হোসেন সড়কের মেসার্স নির্মাণ ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী হাজি মো. আইয়ুব খান এলাকার একজন সফল নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায়ী। তাঁর ব্যবসায়িক সফলতার গল্প শুনতে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকাল সকাল চেপে বসলাম মহানগর প্রভাতী ট্রেনে। খানিক বাদেই ছাড়ল আখাউড়াগামী ট্রেনটি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ট্রেনের আরামদায়ক ভ্রমণ শেষে পৌঁছালাম গন্তব্যে। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আখাউড়ার আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান স্টেশনে স্বাগত জানালেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলাম সফল এ ব্যবসায়ীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতার ভিত্তিতে ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব তাঁরই সাফল্য-কাহিনি।
ব্যবসায়ী আইয়ুব খানের জন্ম ১৮ অক্টোবর ১৯৫৮, বি.বাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার তারাগন গ্রামে। বাবা মৃত হাজি মো. হিরন খান ও মা আলহাজ সোনাব্বর নেসা। তিন ভাই, পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। দেবগ্রাম হাইস্কুল থেকে ১৯৭৭ সালে এসএসসি পাসের পরই জড়িয়ে যান ব্যবসায়। বাবা ছিলেন পরিবহন ব্যবসায়ী। ব্রিটিশ আমলের (১৯৩৭) ব্যবসা তাঁদের। পরিবহন বলতে বাস ও ট্রাক। ভারতের আগরতলা রুটেও চলত বাস। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর তা দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের চলাকালীন পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা আগুনে পুড়িয়ে দেয় সব পরিবহন। ফলে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন তাঁরা। এই ঘটনায় তাঁর বাবা এতটাই মর্মাহত হন যে নতুনভাবে কিছু করার সাহস ও মনোবল হারিয়ে ফেলেন। তখন আইয়ুব খান ও তাঁর ভাইবোনদের বয়স অল্প। পরিবারের এই ক্রান্তিকালে হাল ধরেন তাঁর বড় ভাই হাজি মো. শাহনেওয়াজ খান। ১৯৭৪ সালে সাবেক আগরতলা রোডে অব্যবহৃত গাড়ির গ্যারেজে শুরু করেন স্টেশনারি ব্যবসা। প্রায় দুই বছর পর এটা বাদ দিয়ে নেমে পড়েন কাপড়ের ব্যবসায়। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ই লাভজনক হচ্ছিল না। তাই ব্যবসা ছেড়ে দুই ভাই যুক্ত হলেন ঠিকাদারি পেশায়। এবার সাফল্য এল। এরপরও একপর্যায়ে পেশা পরিবর্তন করে আত্মপ্রকাশ করেন নির্মাণপণ্যের বিক্রেতা হিসেবে। সিমেন্ট, রড, পাইপ, ঢেউটিন, টিউবওয়েল, স্যানিটারি পণ্যসহ নির্মাণসংশ্লিষ্ট নানা পণ্যসম্ভার বিক্রি করতে শুরু করেন। এ ব্যবসাটিতে মেলে কাক্সিক্ষত সাফল্য।
আখাউড়ার ব্যবসায়িক পরিসর খুবই ছোট। জনবসতিও তুলনামূলক কম। নির্মাণপণ্যের চাহিদাও ব্যাপক নয়। তবে প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি। ভবিষ্যতে নির্মাণপণ্যের চাহিদা বাড়বে এমন দূরদৃষ্টি থেকেই শুরু করেন এ ব্যবসা। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ক্রমেই বাড়তে থাকে নির্মাণপণ্যের চাহিদা। ব্যবসা প্রসারের কৌশল হিসেবে তুলনামূলক কম মুনাফায় মানসম্মত পণ্য বিক্রি করতে থাকেন। বাজারে যে কোম্পানির পণ্য সবচেয়ে ভালো, সেগুলোই তাঁরা বিক্রি করেন। নিজেদের সততা আর ভালো ব্যবহারে ক্রেতাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। তা ছাড়া পূর্বপুরুষের ব্যবসায়িক সুনামও ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী করে তোলে। সঠিক ওজন, গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য বিক্রির মতো ব্যবসায়িক পন্থা অবলম্বন করে একচেটিয়া বাজার দখল করেন। ব্যবসায় লাভ হওয়ায় কোম্পানিগুলো থেকে নিয়মিত পাচ্ছেন উপযুক্ত উপহার ও সম্মাননা। গত বছরই আকিজ সিমেন্ট পরিবেশনা কেন্দ্র থেকে পেয়েছেন দ্বিতীয় পুরস্কার। এ ছাড়া কোম্পানিটির পক্ষ থেকে নেপালে আনন্দভ্রমণের প্রক্রিয়া অনেকটা চূড়ান্ত। বিভিন্ন সময়ে উপহারস্বরূপ জিতে নিয়েছেন টেলিভিশন, ফ্রিজ, মাইক্রো ওভেন, ডিনার সেট, মোবাইল, নগদ টাকাসহ নানা সামগ্রী।
তবে তাঁর এত সব ব্যবসায়িক সাফল্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা অগ্রজ হাজি মো. শাহনেওয়াজ খানের। তিনিই ব্যবসাটির প্রতিষ্ঠাতা ও সত্ত্বাধিকারী। তাঁকে সঙ্গ দিতেই ব্যবসায় আসেন ছোট ভাই আইয়ুব খান। এরপর ঠিকাদারিও করেছেন একসঙ্গে। এর মধ্যেই পালন করেন পবিত্র হজব্রত। হজ করার পর তাঁর জীবনে ঘটেছে আমূল পরিবর্তন। ব্রতী হয়েছেন সম্পূর্ণ সৎ জীবনযাপনে। এর পরপরই ছেড়েছেন ঠিকাদারি। নিজ এলাকায় হাজিগোষ্ঠী হিসেবে তিনি ও তাঁর পরিবার পরিচিত। এলাকার সবার কাছেই তিনি সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র। বংশে এ পর্যন্ত হজ করেছেন ৬২ জন। এ বছরই যাচ্ছেন আরও ১২ জন। আগরতলা রোডে হাজি প্লাজা এবং শহীদ ঈদন খান রোডে হাজি হিরন খান নামে দুটি মার্কেট নির্মাণ করেছেন, যা পরিবারের ঐতিহ্যবাসী ব্যবসায়িক পরিচয় বহন করে। যৌথ পরিবার প্রথা এখনো বজায় রেখেছেন। ছোট ভাই মো. আরিফ খান বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। আইয়ুব খানের স্ত্রী মাহমুদা বেগম। বড় ছেলে মইনুল আহসান খান এইচএসসি ও মেয়ে ফাবিহা খানম এসএসসি পরীক্ষার্থী। বেশ কিছুদিন হলো তাঁর বড় ভাই অসুস্থ। অসম্ভব জীবনীশক্তি নিয়ে অসুস্থতাকে জয় করে অনেকটা সুস্থ তিনি। প্রবাসেও রয়েছে তাঁদের অনেক আত্মীয়স্বজন। বাড়ি সঙ্গেই করেছেন সম্পূর্ণ স্বঅর্থায়নে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বায়তুল মামুর জামে মসজিদ। এলাকার মুসল্লিরা এখানেই নামাজ পড়ে। মসজিদের সঙ্গেই মক্তব। সেখানে প্রায় ১৫০ জন ছেলেমেয়ে পবিত্র কোরআন শিখছে। মসজিদের সামনেই খোলা জায়গা ও ফুলের বাগান। পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশীসহ তাঁদের প্রিয় পোষা কুকুরকে নিয়েই অবসর সময়টা এখানেই কাটে দুই ভাইয়ের। কীভাবে মানুষের কল্যাণে আরও কাজ করা যায় এমন আলোচনাই স্থান পায় পারিবারিক আলোচনায়। সামাজিক কাজেও সময় দেন। তিনি ছিলেন তারাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরপর দুইবারের সভাপতি। তাঁর বড় ভাই আখাউড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও ঈদগাহ ময়দানের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন দীর্ঘ ১২ বছর যাবৎ। প্রতিবছর জাকাতসহ এলাকার গরিব জনগণকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন। নিয়মিত আয়কর দেন। তাঁদের ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত অনেক কর্মচারী আজ সমাজে নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত।
তিতাস নদীতে মাছ ধরা; নৌকায় বেড়ানো, পাখি শিকার, বন্ধুদের সঙ্গে ট্রেনে চড়া, ফুটবল খেলায় মেতে ওঠা এসব করেই কাটিয়েছেন দুরন্তময় এক শৈশব। গ্রামে ক্রিকেটের গোড়াপত্তনও তাঁর হাত ধরে। প্রতিষ্ঠা করেছেন টিসিসি ক্রিকেট ক্লাব; যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। এখনো ক্লাব থেকে খেলা হলে তাঁকে করা হয় প্রধান অতিথি। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ফ্যাশনসচেতন। দুইবার হজ করার পর এখন পুরোটাই সাদামাটা। পরেন ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা। কিন্তু সাদা কাপড় পরলেই যে খাঁটি মানুষ হওয়া যায় না, তা কিন্তু তিনি জানেন। তাই ভেতরটাকেও সাদা রাখার চেষ্টা করেন সাদামনের এ ব্যবসায়ী। তবে সদালাপী এ মানুষটার একটা ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছিলাম, তিনি সবার সঙ্গে আনন্দে থাকেন; সব সময় তাঁর মুখে লেগে থাকে অনাবিল হাসি।
মাহফুজ ফারুক
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪২ তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৩