ভূমিকম্পের সময় যে বিপুল পরিমাণ শক্তি মুক্ত হয়, তা ভূ-স্তরের মাধ্যমে ভূমিকম্প তরঙ্গ আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভূ-অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্তরে এর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ ঘটে। এই ভূমিকম্প তরঙ্গ দুই ধরনের হয় Body Waves এবং Surface Waves (চিত্র: ১)। Body Waves মূলত Primary Waves (P-তরঙ্গ) এবং Secondary Waves (S-তরঙ্গ) সমন্বয়ে গঠিত। Surface Waves পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছকাছি সীমাবদ্ধ, যা Love Waves (L-তরঙ্গ) এবং Rayleigh Waves (R-তরঙ্গ) দ্বারা গঠিত। P-তরঙ্গের ক্ষেত্রে, তরঙ্গের শক্তি সঞ্চালনের দিক বরাবর বস্তুকণার সংকোচন ও প্রসারণ ঘটে কিন্তু S-তরঙ্গের ক্ষেত্রে এটি সমকোণে দুলতে থাকে (চিত্র: ২)। P-তরঙ্গ দ্রুততম, এরপর ক্রমানুসারে S, L ও R-তরঙ্গ। উদাহরণস্বরূপ, গ্রানাইটের মধ্যে P এবং S-তরঙ্গের গতি যথাক্রমে ~৪.৫ কি.মি/সেকেন্ড এবং ~৩ কি.মি./সেকেন্ড হয়। S-তরঙ্গের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি তরল মাধ্যমে সঞ্চালিত হতে পারে না। ভূ-পৃষ্ঠে L-তরঙ্গের দ্বারা S-তরঙ্গের অনুরূপ গতি সৃষ্টি হতে পারে, তবে কোনো উল্লম্ব উপাংশ থাকে না। অপর দিকে, R-তরঙ্গ বস্তুকণাকে উল্লম্ব সমতলে (শক্তি সঞ্চালনের দিক বরাবর অনুভূমিক গতির সঙ্গে) একটি উপবৃত্তাকার পথে দোলাতে থাকে। সম্মিলিতভাবে L-তরঙ্গের প্রভাব ও S-তরঙ্গ পৃষ্ঠের উপর উল্লম্ব ও অনুভূমিক দিকে তীব্র গতি দ্বারা যেকোনো বিল্ডিং বা কাঠামোর সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন করে থাকে। যখন P এবং S -তরঙ্গ ভূ-পৃষ্ঠে পৌঁছে, তাদের অধিকাংশ শক্তিই প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। এই শক্তির কিছু অংশ মাটিতে বাকিটা শিলা স্তরে প্রতিফলিত হয়ে ভূ-পৃষ্ঠে ফিরে আসে। ভূ-পৃষ্ঠের কম্পন ভূ-গর্ভের চেয়ে আরওা তীব্রতর (প্রায় দ্বিগুণ) হয়। একটি বিল্ডিং ডিজাইনের ক্ষেত্রে ভূ-পৃষ্ঠের ওপরতলের স্থাপনার চেয়ে ভূ-গর্ভস্থ স্থাপনার জন্য ত্বরণ বিবেচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
কম্পন পরিমাপ যন্ত্র
ভূমিকম্পের সময় কম্পন পরিমাপ করার যন্ত্রের নাম সিস্মোগ্রাফ, যার রয়েছে তিনটি উপাদান- সেন্সর, রেকর্ডার ও টাইমার। এটি যে সরল নীতির ওপর কাজ করে, সেটি প্রথম দিকে তৈরি সিস্মোগ্রাফে (চিত্র: ৩) স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়, যাতে একটি কলম দোলায়মান সরল দোলকের অগ্রভাগে যুক্ত থেকে নির্দিষ্ট বেগে ঘূর্ণনরত ড্রামের ওপর একটি গ্রাফ কাগজে কম্পন চিহ্নিত করতে পারে। সুতার চারদিকে একটি চুম্বক কম্পনের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে। সুতা, চুম্বক ও দোলক ভরে একসঙ্গে সেন্সর গঠিত হয়; সমন্বিতভাবে ড্রাম, কলম ও গ্রাফ কাগজ মিলে রেকর্ডার ও দ্রুতগতিতে ড্রামের ঘূর্ণন সৃষ্টিকারী মটরই টাইমার। এ ধরনের যন্ত্র দুই লম্ব অনুভূমিক দিকের (যেমন: পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণ) প্রতিটিতে একটি করে প্রয়োজন হয়। অবশ্য, উল্লম্ব স্পন্দনের পরিমাপের জন্য স্ট্রিং দোলক (চিত্র: ৩) একটি অবলম্বনের চারদিকে স্পন্দনরত একটি স্প্রিং দোলক দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়। কিছু যন্ত্রের টাইমার ডিভাইস থাকে না (অর্থাৎ, গ্রাফ কাগজসংবলিত ড্রাম আবর্তিত হয় না)। এ ধরনের যন্ত্র শুধু ভূমিকম্পের সময় সর্বোচ্চ গতি পরিমাপ করে; এই কারণে এদের Seismoscopes বলা হয়। অ্যানালগ যন্ত্রপাতির আগে ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া গেছে, কিন্তু বর্তমানে আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল যন্ত্র আরও সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়। ডিজিটাল যন্ত্রে ভূ-কম্পন মাইক্রো প্রসেসরের মেমরিতে রেকর্ড হয়। সিস্মোগ্রাফের রেকর্ডকে Seismogram বলা হয়।
শক্তিশালী ভূ-কম্পন
ভূপৃষ্ঠের কম্পন হলো সিস্মিক চ্যুতিতে সৃষ্ট ভূমিকম্পের ফলে ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রে মুক্ত শক্তি দ্বারা সৃষ্ট সিস্মিক তরঙ্গ-গতির সার্বিক ফলাফল। বিভিন্ন বিস্তার ও শক্তিমাত্রার তরঙ্গগুলো বিভিন্ন সময়ে পৃষ্ঠে পৌঁছায়। সুতরাং, সময়ের সঙ্গে কোনো স্থানের ভূ-কম্পনের বিস্তার এবং তার দিকের পরিবর্তন হয়। বড় মাত্রার ভূমিকম্প উৎপত্তিস্থল থেকে অনেক দূরত্বে দুর্বল গতি তৈরি করে, যা কাঠামোর ক্ষতি করে না বা মানুষ টের পায় না। কিন্তু, সংবেদনশীল যন্ত্র তা রেকর্ড করতে সক্ষম, যার কারণে দূরবর্তী ভূমিকম্পের মাত্রা শনাক্ত করা সম্ভব। তবে প্রকৌশল দৃষ্টিকোণ থেকে যেসব কম্পন কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর, সেগুলো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শক্তিশালী ভূ-কম্পনের বৈশিষ্ট্য
কোনো স্থানের চ্যুতি, বেগ বা ত্বরণের দ্বারা ভূ-কম্পন ব্যাখ্যা করা যায়। কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে ভূমিকম্পের সময়ের সঙ্গে ভূ-ত্বরণের রেকর্ড প্রকাশ করার পদ্ধতিকে Accelerogram বলা হয়। Accelerogram-এর প্রকৃতি কোনো উৎসের মুক্ত শক্তি, সিস্মিক চ্যুতিতে স্লিপের ধরন, চ্যুতি থেকে পৃথিবীর পৃষ্ঠের ভ্রমণপথের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং স্থানীয় মাটির বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। Accelerogram-এর রেকর্ড ভূ-কম্পনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে; সর্বোচ্চ বিস্তার, শক্তিশালী কম্পনের সময়কাল, কম্পাঙ্ক (যেমন, প্রতিটি কম্পাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত কম্পনের বিস্তার), শক্তিমাত্রা (অর্থাৎ, প্রতিটি কম্পাঙ্কে কম্পনস্থল দ্বারা বাহিত শক্তি) এবং এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যবহার করা হয়। Accelerogram-এর রেকর্ড দ্বারা খুব সহজেই মাটির সর্বোচ্চ ত্বরণের (Peak Ground Acceleration) মান হিসাব করা যায়। আর এই PGA ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পন হিসাব করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ নির্ধারক, যা ভূমিকম্প প্রকৌশলবিদ্যায় বিল্ডিং ডিজাইন করার জন্য অর্থপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, একটি আনুভূমিক PGA-এর মান ০.৬g (= অভিকর্ষজ ত্বরণের ০.৬ গুণ) দ্বারা বোঝায় ভূ-কম্পনের কারণে দৃঢ় কাঠামোর ওজনের প্রায় ৬০% সমান আনুভূমিক বল সৃষ্টি করে।
একটি স্থানের দৃঢ় কাঠামোর প্রতিটি বিন্দুতে একই পরিমাণ কম্পন সৃষ্টি হয় এবং ভূমির সঙ্গে সমপরিমাণে আন্দোলিত হয়, পাশাপাশি একই পরিমাণে সর্বোচ্চ ত্বরণ অনুভব করে। অতীতে অনেক ভূমিকম্পের সময় অনুভূমিক PGA-এর মান ১.০ম এর চেয়েও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে (যেমন, ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে Northridge ভূমিকম্প)। শক্তিশালী ভূ-কম্পন বিশাল পরিমাণে শক্তি বহন করে, যার কম্পাঙ্ক সাধারণত ০.০৩ Hz থেকে ৩০ Hz-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সাধারণত, দুই লম্ব দিকে (পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণ) অনুভূমিক গতির সর্বোচ্চ বিস্তার একই হয়। তবে উল্লম্ব দিকে সর্বোচ্চ বিস্তার অনুভূমিক দিকের চেয়ে কম হয়। বিল্ডিং কোড অনুসারে, বিল্ডিং ডিজাইন করার সময় উল্লম্ব ত্বরণের ও অনুভূমিক ত্বরণের যথাক্রমে ১/২ এবং ২/৩ অংশ হিসাব করা হয়।
উপকেন্দ্রিক অবস্থান নির্ণয়
যেকোনো Accelerogram কিংবা Seismogram থেকে সহজেই ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট তরঙ্গসমূহের পার্থক্য চিহ্নিত করা যায়। P-তরঙ্গ সবচেয়ে দ্রুততম তাই যেকোনো স্থানে এটিই প্রথমে পৌঁছায়, S-তরঙ্গের গতিবেগ অপেক্ষাকৃত কম বলে পরে পৌঁছায় এবং পরে Surface Waves পৌঁছায়। সিস্মোগ্রাফের রেকর্ড থেকে P -তরঙ্গ ও S -তরঙ্গের গতিবেগ নির্ণয় করা যায়। কোনো একটি স্থান থেকে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র যত কাছে, P-তরঙ্গ তত তাড়াতাড়ি পৌঁছায়। P-তরঙ্গ ও S -তরঙ্গের গতিবেগ জানা থাকায় ওই স্থানের সিস্মোগ্রাফ রেকর্ডে P-তরঙ্গ ও S-তরঙ্গ পৌঁছানোর সময়ের পার্থক্য থেকে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রিক দূরত্ব হিসাব করা হয়। ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রস্থল সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য কমপক্ষে তিনটি স্থানের সিস্মোগ্রাফ রেকর্ড প্রয়োজন হয়। প্রতিটি স্থানের সিস্মোগ্রাফ রেকর্ড থেকে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের দূরত্বের সমান ব্যাসার্ধ নিয়ে অঙ্কিত বৃত্তত্রয়ের ছেদবিন্দুই ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র (চিত্র: ৫-এর মতো)।
চিত্র: ১ উৎপত্তিস্থল থেকে ভূমিকম্প তরঙ্গ সঞ্চালনের (উৎস: EQ Tips, IITK)
চিত্র: ২ ভূমিকম্পের তরঙ্গ (উৎস: EQ Tips, IITK)
চিত্র: ৩ প্রথম দিকের তৈরি সিস্মোগ্রাফ (উৎস: EQ Tips, IITK)
চিত্র: ৪ সিস্মোগ্রাফ ধারণকৃত ভূমিকম্পের রেকর্ড (Seismogram)
চিত্র: ৫ উপকেন্দ্রের অবস্থান নির্ণয়
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৯তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৫
(অথর যুক্ত করুন)