পৃথিবীর উচ্চতম সেতু বালুয়ার্তে ব্রীজ

পৃথিবীর উচ্চতম সেতু কোথায় জানেন? মেক্সিকোর উপকূলীয় শহর মাজাতলান থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরত্বে মেক্সিকোর মধ্য অঞ্চলের মধ্যে। এই দূরত্ব হয়ত এ যুগে খুব বেশী নয়। কারণ ভাল রাস্তা হলে এই ৮০০শ কিলো পাড়ি দিতে ৮-১০ ঘণ্টার বেশী লাগার কথা না।

এখানেও তাই-ই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগেই বলেছি ‘ভাল রাস্তা’ হলে তো কথাই নেই। হ্যা সেই ভাল রাস্তাটা ছিল না এখানে। মেক্সিকোর উত্তর উপকুল অঞ্চল থেকে ৮০০ কিলোমিটার পথে দেশের কেন্দ্রস্থলে যাবার একমাত্র উপায়টা ছিল অনেক জটিল।

অজ উঁচু পাহাড়, নিচু গিরিখাত পার হয়ে সাপের মত আঁকাবাঁকা ক্লান্তিকর রাস্তা পার হয়ে যেতে হত দেশের বড় শহরে। পাহাড়ের কোলে সংকীর্ণ দুই লেনের একটি রাস্তা। পাহাড়ের কাছে এতটাই অসহায় যে পাহাড় যখন যেমন বলেছে ঠিক তেমনভাবেই বাঁক খেয়েছে এই রাস্তা।

অজ ঝুকিপূর্ণ বাঁক। একপাশে পাহাড় আর আরেকপাশে ভয়ংকর গিরিখাত। রাস্তা এতটাই সর্পিল যে অনেক সময় মনে হচ্ছে নিজেই ঘুরে এসে নিজেকে খেয়ে ফেলবে। মানে এখানে কোন গাড়ির চালক যদি সামান্য কোন  ভুল করেন তবে তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু।

আর তাই হরহামেশাই এ পথে হচ্ছে  দূর্ঘটনা। আর একারণে এই মরন বাঁকের অপর নাম ‘ডেভিল’স ব্যাকবোন’। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘শয়তানের মেরুদন্ড’। কিন্তু কারও সাধ্য নেই এর কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার। কারণ এই রাস্তা যতই বিপদজনক হোক না কেন মেক্সিকোর উত্তর উপকুল থেকে দেশের কেন্দ্রের দিকে যাবার রাস্তা যে এটাই! কিন্তু এর একটা সমাধান দরকার।

মেক্সিকো সরকার সমাধানকল্পে তাই খুব বড় ধরনের একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। তারা উপকূলীয় শহর মাজাতলান এর সাথে দেশের মধ্যবর্তী ডুরাঙ্গো এলাকাকে সংযুক্ত করবে। কিন্তু করে ফেলব বললেই তো আর করে ফেলা যায় না। এই দু অঞ্চলের মধ্যবর্তী অসংখ্য গিরিখাত চিন্তায় ফেলে দিল ইঞ্জিনিয়ারদের।

অনেক হিসেব নিকেশ করে তারা দেখলেন এই হাইওয়ে বানাতে সব চাইতে বড় যে চ্যালেঞ্জ সেটা হল গিরিখাতের ভেতর বালুয়ার্তে নদীর উপর উপর সেতু বানানো। যে সেতুর উচ্চতা কিনা হার মানাবে ৩২৪ মিটার উঁচু আইফেল টাওয়ারকেও! এটি হবে পৃথিবীর সব চাইতে উচ্চতম সেতু। 

পৃথিবীর উচ্চতম সেতু
একপাশে পাহাড় আর আরেকপাশে ভয়ংকর গিরিখাত। ছবি: ট্রিপ এডভাইজার

পৃথিবীর উচ্চতম সেতু নির্মাণের গল্প

ভাবা যায়! এমন প্রজেক্টে কাজ করতে হলে যে কোন ইঞ্জিনিয়ারের নাভিশ্বাস হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে কি থেমে যাবেন ইঞ্জিনিয়াররা। নাহ, তা কি আর হয়। তারা মোটেই থেমে যাননি। অতএব অনেক জল্পনা-কল্পনা শেষে ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের এক স্নিগ্ধ সকালে শুরু হলো পৃথিবীর উচ্চতম সেতু বালুয়ার্তে ব্রীজের কাজ।

শুরু হলো পৃথিবীর উচ্চতম সেতুর নির্মাণযজ্ঞ। ১৫০০শ ইঞ্জিনিয়ার ও কর্মীর রাতের ঘুম হারাম করে চলল ব্রিজের নির্মাণ। শুধু সেতুর নিচের অংশের ফাউন্ডেশন তৈরী করতেই পাথর ব্যবহার করতে হলো ৪ লক্ষ ৪৭ হাজার ঘনমিটার। এরপর কেটে গেল প্রায় চার বছর। এ সময়ে খরচ হয়ে গেল ১২০০ টন স্টিল আর ৯০ হাজার ঘনমিটার কনক্রিট।

আর এই সময়ের ভেতরে কত ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো আরও কত বাঁধা যে আসল, কিন্তু তাতে কি! পৃথিবীর উচ্চতম সেতুর কাজ বলে কথা। কাজ কিন্তু চললো পুরো দমে।

এবং সবশেষে এ বছরের ৫ জানুয়ারি এই বালুয়ার্তে ব্রিজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করলেন মেক্সিকোর রাষ্ট্রপতি ফেলিপে ক্যালডেরন। স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের ২০০ বছর উদযাপনকে স্মরণীয় করে রাখল পৃথিবীর উচ্চতম সেতু বালুয়ার্তে ব্রীজ।

কারণ একই দিনে তারা মুক্তি পেল ‘ডেভিল’স ব্যাকবোন’ থেকেও। এখন উপকূলীয় মাজাতলান শহর থেকে ডুরাঙ্গো এলাকায় পৌঁছতে আর বিপদজনক ‘ডেভিল’স ব্যাকবোন’ ব্যবহার করতে হয় না।

তার মানে ঝুকিপূর্ণ ১০ ঘণ্টার পথ এখন পৃথিবীর উচ্চতম সেতু বালুয়ার্তে ব্রিজের কল্যানে হয়ে উঠবে নয়নাভিরাম পথ, তাও আবার মাত্র দেড় থেকে দু’ঘন্টার পথ। ভাবা যায়! এই ব্রিজটি যে শুধু স্থাপত্য শিল্পের কথা বলছে তা কিন্তু নয়, এটি যেন প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রকে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত মেক্সিকোর ছুড়ে দেওয়া একটা চ্যালেঞ্জও বটে। 

এক নজরে বালুয়ার্তে ব্রিজ

  • অবস্থানঃ বালুয়ার্তে, মেক্সিকো
  • ধরনঃ ঝুলন্ত ব্রিজ (ক্যাবল বেসড)
  • দৈর্ঘ্যঃ ১১২৪ মিটার (৩৬৮৮ ফুট)
  • প্রস্থঃ ২০ মিটার (৬৬ ফুট)
  • লেনঃ ৪টি
  • সবচাইতে দীর্ঘ স্প্যানঃ ৫২০ মিটার (১৩২২ ফুট)
  • উচ্চতাঃ ৪০৩ মিটার (১৩২২ ফুট)
  • নির্মাণের সময়কালঃ ২০০৮-২০১২

.

ফয়সাল হাসান সন্ধী

ইমেইলঃ faisal_hasan_sondhy@ymail.com

প্রকাশকাল: বন্ধন ২৩ তম সংখ্যা, মার্চ ২০১২

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top