জনসংখ্যা বাড়ছে; কমছে চাষের জমি। বিশেষ করে নগরে অপরিকল্পিতভাবে আবাসন নির্মাণের ফলে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ বিলীন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো ভবিষ্যতে শখের বাগান করার জন্য কোনো জায়গা থাকবে না। এই ভাবনা থেকেই বিজ্ঞানীরা বিকল্প উপায়ে বাগান করার পথ উদ্ভাবন করছেন। এই বাগান শুধু বাড়ি বা নগরের সৌন্দর্যই বাড়াবে না, বরং এখানে মিলবে সবজি, ফল ও ফুল। এই বাগান সৃষ্টিতে লাগবে না কোনো ধরনের মাটি! চোখ কপালে উঠল নাকি? হ্যাঁ, মাটি ছাড়া গাছ; এমন বাগান ভাবনায় অবিশ্বাস্য মনে হলেও বিকল্প এ পদ্ধতির নাম হাউড্রেপোনিক।
হাউড্রেপোনিক পদ্ধতি আসলে সয়েল লেস বা মাটিবিহীন পদ্ধতি। অর্থাৎ এ পদ্ধতিতে উদ্ভিদ উৎপাদনে মাটির প্রয়োজন হয় না। মাটি থেকে গাছ যেসব পুষ্টি সংগ্রহ করে বেড়ে ওঠে, তা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বিকল্প পদ্ধতিতে পানির মাধ্যমে গাছে প্রবেশ করানো হয়, ফলে মাটির প্রয়োজন হয় না। দুনিয়াজুড়ে শহরগুলোতে ক্রমেই এই পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ফল বা ফুলের প্রয়োজনেই হোক অথবা শখের বশেই হোক, বিকল্প ব্যবস্থায় অনেকেই বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় এ ধরনের বাগান গড়ে তুলছেন। এমনকি ঘরের এক কোণেও এ পদ্ধতিতে কিছু গাছ লাগানো সম্ভব।
বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে এ পদ্ধতিতে বাগান করা ও গবেষণার কাজ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র স্ট্রবেরি, ক্যাপসিকাম, বেগুন, লেটুস, শশা, টমেটো, ফুলকপি, ক্ষীরা, বাঁধাকপি, জারবেরা, এনথারিয়াম, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড, চন্দ্রমল্লিকা ইত্যাদি ফল ও ফুল উৎপাদন করতে সফল হয়েছে। জাপান, চীন, আমেরিকা, হল্যান্ড, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে অনেক আগে থেকেই এ পদ্ধতিতে চাষ হয়ে আসছে।
কেন করবেন
হাউড্রেপোনিক পদ্ধতির সুবিধা হলো, কম জায়গায় বেশি গাছ লাগানো যায়। যেকোনো সময় সুবিধামতো যেকোনো স্থানে স্থানান্তর করা যায়। মাটিতে উৎপন্ন গাছের তুলনায় শতকরা ৩০ থেকে ৫০ ভাগ বেশি বৃদ্ধি পায় ও ফলন হয় বেশি। ক্ষতিকর কীটনাশক বা বালাইনাশক ব্যবহৃত হয় না বলে উৎপাদিত ফল মানবদেহের কোনো ক্ষতি করে না। যেহেতু মাটির ব্যবহার নেই, সেহেতু গাছের মাটিবাহিত বা কৃমিজনিত রোগ-বালাই নেই। এটি হোম ফার্মিংয়ের জন্য একটি আদর্শ প্রযুক্তি, অর্থকরী ও লাভজনক।
কোথায় করবেন
আপনার বাসার বারান্দায় বা জানালার পাশে যেখানে প্রতিদিন কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা সূর্যের আলো থাকে অথবা বাসার ছাদে। তবে যেখানেই করুন না কেন, ন্যূনতম ছয় ঘণ্টা সূর্যের আলো বা বিকল্প আলোর ব্যবস্থা (যেমন, সিএফএল বাল্বের বা টিউব লাইটের আলো) থাকতে হবে।
কীভাবে করবেন
বাণিজ্যিকভাবে হাউড্রেপোনিকের বিভিন্ন রকম পদ্ধতি রয়েছে। যেমন-
- Wick System
- Water Culture
- Ebb and Flow
- Drip System
- Nutrient Flim Technique
- Circulating System
- Non-Circulating System ইত্যাদি।
তবে আমাদের দেশে বাসার ছাদ বা বারান্দায় Non-Circulating System অনেক বেশি ফলপ্রসূ। এই পদ্ধতিতে ট্রে, প্লাস্টিকের বালতি, অব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল বা এ ধরনের কোনো পাত্রে সবজি, ফুল বা ফল সহজেই উৎপাদন করা যায়।
যে পাত্রে চারা লাগানো হবে তা ভালোভাবে পরিষ্কার করে বিশেষভাবে উৎপাদিত চারা রোপণ করতে হয়। যেহেতু এ পদ্ধতিতে কোনো মাটির ব্যবহার নেই, তাই চারা রোপণের জন্য একটি জালিপাত্রে বা বোতলে (ছবিতে দেখুন) নুড়ি পাথর, নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া বা রক উল-জাতীয় কোনো বস্তু মাটির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এরপর গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টিসমূহ পরিমিত মাত্রায় পানির সঙ্গে মিশিয়ে গাছে সরাসরি সরবরাহ করা হয়। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের জার বা বোতল ব্যবহার করলে তা কাগজ দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, যাতে ভেতরে আলো না ঢুকতে পারে এবং বায়ু চলাচলের জন্য ওপরের দিকে কয়েকটি ছিদ্র করে দিতে হবে।
হাইড্রেপোনিক পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের জন্য স্পঞ্জ ব্লক ব্যবহার করা হয়। সাধারণত স্পঞ্জকে ৩০দ্ধ৩০ সেন্টিমিটার সাইজে কেটে নিতে হয়। এই স্পঞ্জকে ২.৫ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য এবং ২.৫ সেন্টিমিটার প্রস্থ বর্গাকারে, ডট ডট করে কেটে নিতে হয় এবং এর মাঝে ১ সেন্টিমিটার করে কেটে প্রতিটি বর্গাকারে স্পঞ্জের মধ্যে একটি করে বীজ বপন করতে হয়। বীজ বপনের আগে বীজকে ১০ শতাংশ ক্যালসিয়াম অথবা সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। বীজ বপনের পর স্পঞ্জকে একটি ছোট ট্রেতে রাখতে হবে। এই ট্রের মধ্যে ৫-৮ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হবে, যাতে স্পঞ্জটি পানিতে সহজে ভাসতে পারে। চারা গজানোর দুই-তিন দিন পর প্রাথমিক অবস্থায় ৫-১০ মিলিলিটার খাদ্যোপাদানসংবলিত দ্রবণ একবার এবং চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর থেকে চারা রোপণের আগ পর্যন্ত প্রতিদিন ১০-২০ মিলিলিটার দ্রবণ দিতে হবে।
কেউ যদি এত ঝামেলায় যেতে না চান সে জন্য রয়েছে অন্য ব্যবস্থা। আর তা হলো, সাধারণভাবে মাটিতে উৎপাদিত চারা ভালোভাবে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে সরাসরি পাত্রে বসিয়ে দেওয়া। খেয়াল রাখতে হবে যাতে চারার শিকড়ে অথবা অন্য কোথাও কোনো মাটির কণামাত্রও না থাকে। এভাবে সংগৃহীত চারার ক্ষেত্রে গাছটিতে মাটিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
রাসায়নিক দ্রব্যের পরিমাণ ও তৈরির পদ্ধতি
জলীয় খাদ্য দ্রবণ তৈরিতে প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের পরিমাণ ও প্রস্তুত প্রণালি পদ্ধতি-
পানিতে প্রয়োজনীয় রাসায়নিকে পরিমাণ (প্রতি ১০০ লিটার পানির জন্য)
| রাসায়নিক উপাদান | পরিমাণ (গ্রাম) | |
| ১ | পটাশিয়াম হাইড্রোজেন ফসফেট (KH2PO4) | ২৭.০ |
| ২ | পটাশিয়াম নাইট্রেট (KNO) | ৫৮.০ |
| ৩ | ক্যালসিয়াম নাইট্রেট (Ca(NO3)2.4 H2O) | ১০০.০ |
| ৪ | ম্যাগনেসিয়াম সালফেট (MgSO4.7H2O) | ৫১.০ |
| ৫ | ইডিটিএ আয়রন (EDTA Iron) | ৮.০ |
| ৬ | ম্যাঙ্গানিজ সালফেট (MnSO4.4H2O) | ০.৬১ |
| ৭ | বরিক অ্যাসিড (H3BO3) | ০.১৮ |
| ৮ | কপার সালফেট (CuSO4.5H2O) | ০.০৪ |
| ৯ | অ্যামোনিয়াম মলিবটেড (NH4)6MO7O2H2O) | ০.০৩৮ |
| ১০ | জিঙ্ক সালফেট (ZnSO4.7H2O) | ০.০৪৪ |
মিশ্রণ প্রক্রিয়া
জলীয় খাদ্যদ্রবণ তৈরির সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রথমে Stock Solution তৈরি করতে হবে। এই Stock তৈরি করার সময় ক্যালসিয়াম নাইট্রেট এবং EDTA Iron-কে পরিমাপ করে ১ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে দ্রবণকে Stock Solution “A” নামে নামকরণ করতে হবে। অবশিষ্ট রাসায়নিক পরিমাপমতো একসঙ্গে ১ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে Stock Solution “B” নামে নামকরণ করতে হবে। ১০০ লিটার জলীয় দ্রবণ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে ১০০ লিটার পানি ট্যাঙ্কে নিতে হবে। তারপর Stock Solution “A” থেকে ১ লিটার দ্রবণ ট্যাঙ্কের পানিতে ঢালতে হবে এবং একটি অধাতব দণ্ডের সাহায্যে নাড়াচাড়া করে ভালোভাবে মেশাতে হবে। এরপর Stock Solution “B” থেকে আগের মতো ১ লিটার ট্যাঙ্কে নিতে হবে এবং আগের মতো অধাতব দণ্ডের সাহায্যে পানিতে Stock Solution-গুলো সমানভাবে মেশাতে হবে। (সূত্র : বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ গ্রিন রুফ মুভমেন্টের যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মশালা)
কোথায় পাবেন এসব রাসায়নিক
পল্টনের বা টিকাটুলির রাসায়নিক দ্রব্যের দোকান থেকে কিনতে পারেন এসব অথবা চলে যেতে পারেন মিটফোর্ডের পাইকারি দোকানে। এখানে বলে রাখা ভালো যে Solution তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক অনুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সাধারণের কাছে বিক্রয় নিষিদ্ধ। তাই কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বা এ ধরনের প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে পারেন। আরও সহজ উপায় হচ্ছে বাজার থেকে তৈরি Solution কিনে নেওয়া। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) নির্দেশিত ফর্মুলায় কিছু প্রতিষ্ঠান এ ধরনের Solution তৈরি ও বাজারজাত করছে। আপনি যোগাযোগ করতে পারেন তাদের সঙ্গেও।
সব শেষে বলতে হয়, এ পদ্ধতিতে সফলভাবে ফুল বা ফল উৎপাদন করতে চাইলে কিছু অভিজ্ঞতার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। যেমন, দ্রবণ প্রস্তুতি, দ্রবণের অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব মাপমতো রাখা বা পানির PH অথবা খাদ্যোপাদানের অভাবে কী কী লক্ষণ দেখা যায় আর কী ব্যবস্থা নিতে হয়। কিন্তু এটা তো ঠিক যে কোনো কাজে যুক্ত না হয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করা যায় না। তাই শুরু করুন স্বল্প পরিসরে। আর ইন্টারনেট তো আছেই, যেখানে অনেক সাইট রয়েছে আপনাকে সহযোগিতা করার জন্য। তারপর সবকিছু ঠিকমতো হলে শুরু করুন বাণিজ্যিকভাবে। শত ভেজালের মধ্যে নিজের জন্য হলেও কিছু খাঁটি জিনিস উৎপাদন করুন, ছড়িয়ে দিন সবার মাঝে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫