প্রকৌশলী মো. খোরশেদ আলম খান

দক্ষ প্রকৌশলী উপহার দেন টেকসই নির্মাণ

মানুষ সারা জীবনের সঞ্চয়কে কাজে লাগিয়ে নিরাপদ বাসস্থান তৈরির স্বপ্ন লালন করে আজীবন। স্বপ্নের এই আবাসন নির্মাণের আগে বেশ কিছু ধারণা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন, যাতে তার কষ্টার্জিত অর্থ-শ্রম-সময় কোনোটিই বৃথা না যায়। পরিকল্পিত আবাসনের মাধ্যমে টেকসই বসতি, আবাসিক সুবিধানির্ভর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কল্যাণ নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে আবাসনের সুষ্ঠু ব্যবহার ও জমির অপচয় রোধ হয়। একজন দক্ষ স্থপতি বা নির্মাণ শিল্পী নির্মাণ এলাকার পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য, বিন্যাস, সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভবন মালিকের আর্থিক ও পারিপাশির্^ক অবস্থা এসব কিছু পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণপূর্বক যে চিত্রটি আঁকেন, সেটিই ‘পরিকল্পনা’। প্রকৌশলী মো. খোরশেদ আলম খান অন্তত তেমনটিই মনে করেন। তিনি হোম ডিজাইন কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কনসালটেন্ট এর প্রধান প্রকৌশলী। একই সঙ্গে চাঁদপুর পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট- এর কনস্ট্রাকশন টেকনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। বন্ধনের নিয়মিত আয়োজন ‘প্রকৌশলীর গল্প’ পর্বে এবার এমন একজন নির্মাণশিল্পী বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের কথায় জানাবো। 

মো. খোরশেদ আলম খান ১৯৮৫ সালের ১ মে চাঁদপুরে জন্মগ্রহন করেন। বাবা মরহুম আব্দুস সোবহান খান ও মা মোছা. ছায়েরা বেগম। তিনি ২০০০ সালে ডাসাদী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ২০০৪ সালে কুমিল্লা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ২০১২ সালে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় (ডুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বি.এস.সি ও ২০১৪ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে এম.এস.সি সম্পন্ন করেন। ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার পরপরই তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের ডিজাইন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এম.এস.সি শেষ করার পর ঢাকার একটি ডেভেলপারস কোম্পানিতে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি বাবার স্বপ্ন পূরণে মহান পেশা হিসেবে চাঁদপুর পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে শিক্ষকতা বেছে নেন। পাশাপাশি একাধিক ডিজাইন কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রকৌশল চর্চা। 

প্রকৌশলী মো. খোরশেদ আলম খান তাঁর শিক্ষার্থীদের মেটেরিয়ালস, স্ট্রাকচার, জিওটেকনিক ও অন্যান্য বিষয়ে থিওরির পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান দানের জন্য বিভিন্ন নির্মানাধীন কনস্ট্রাকশন সাইটে ভিজিট করান। কিভাবে বিল্ডিং মেটেরিয়ালের ফিজিবিলিটি টেস্ট করতে হয় সেগুলোও হাতে কলমে শেখান। শিক্ষার্থীরা এতে নির্মাণ কাজের খুটিনাটি বিষয় আনন্দের সঙ্গে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এভাবেই তারা থিওরির পাশাপাশি বাস্তবমুখী শিক্ষা গ্রহনের মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে।  

খোরশেদ আলম খান মনে করেন, যেকোনো নির্মাণই পরিবেশবান্ধব হওয়া উচিত। কোন দিকে বাড়ির সম্মুখভাগ হবে, কোন দিকে দরজা-জানালা থাকবে, রান্নাঘর কোথায় হলে ভালো হবে, বেডরুম ও বারান্দা কোন দিকে ইত্যাদি পর্যালোচনার বিষয়। অন্য সকল কিছুর মতো ইমারত নির্মাণেও রাষ্ট্রীয় বিধি বিধান বা আইন কানুন রয়েছে, যা প্রত্যেক ভবন মালিক ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। সম্প্রতি দেশের বিভিন্নস্থানে ভবনধসে নিহত হওয়ার ঘটনা এবং কয়েকটি ভবন হেলে পড়ায় সারা দেশের লোকজনই আতঙ্কিত। ভবন নির্মাণে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা বিল্ডিং কোড মেনে না চলাই এ ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। রাষ্ট্রীয় বিধিবিধানের প্রেক্ষিতে ও পারিপাশির্^ক বিভিন্ন কারণে অনেকে এখন ভবনের ড্রইং-ডিজাইন একজন প্রকৌশলীর মাধ্যমে করিয়ে নেন কিন্তু ভবনটি নির্মাণের সময় ঐ প্রকৌশলীর ডিজাইন অনুসরণ না করে অদক্ষ ঠিকাদার ও রাজমিস্ত্রির পরামর্শে অনেক কিছুই পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে ফেলেন। কেউ অপ্রয়োজনীয় কলাম, বীম ইত্যাদি সংযোগ করেন আবার কেউ বীমবিহীন ¯ø্যাব তৈরী করেন যা কনসাল ছাদ হিসেবে পরিচিত। এটা মোটেও উচিত নয়। কারণ একটি ভবনের মূল হচ্ছে স্ট্রাকচার। স্ট্রাকচার ডিজাইন করা হয় ঐ স্থাপনার এরিয়া ও উচ্চতার ভিত্তিতে সয়েল টেস্ট, লাইভ ও ডেড লোড, উইন্ড লোড ও ভূ-কম্পিত লোড ক্যালকুলেশন করে। পাশাপাশি ঐ স্থানের মাটি ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় নেয়া হয়। ভবনের প্রতিটি কাঠামোই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। যদি এর কোন একটিতে গড়মিল হয়, তাহলে ভবনটি হবে ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থাপনা নির্মাণে সকলেরই উচিত, আইএবি বা আইইবি এর সদস্যপদপ্রাপ্ত একজন অভিজ্ঞ স্থপতি ও প্রকৌশলী দ্বারা মজবুত, নিরাপদ ও ভূমিকম্প সহনশীল করে ডিজাইন করা। এছাড়া ঠিকাদার নিয়োগের সময় অবশ্যই অভিজ্ঞ ঠিকাদার নির্বাচন করতে হবে এবং ঠিকাদারকে অবশ্যই প্রকৌশলী কর্তৃক প্রদানকৃত ডিজাইন সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। বিল্ডিং কোন না মেনে অনুমান করে ডিজাইন করা বাড়ি ভূমিকম্প প্রতিরোধে শতভাগ ঝুঁকিপূর্ণ যা আপনার অপূরনীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। এছাড়াও ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা কী এ সম্পর্কে প্রত্যেকেরই জানা উচিত। আর সে অনুসারে দক্ষতার সাথে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করলেই একটি পরিবেশবান্ধব টেকসই স্থাপনা গড়ে উঠবে এবং ভবন মালিকের ‘স্বপ্ন’ বাস্তবায়ন হবে।

পারিবারিক জীবনে প্রকৌশলী মো. খোরশেদ আলম খান, তাঁর স্ত্রী সামসাদ আলম ও ২ সন্তানকে নিয়ে সুখী দম্পত্তি। বড় ছেলে কে.এম. ইব্রাহিম আজিমিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। মেয়ে মারিয়াম আলম, বয়স ৪ বছর। শিক্ষকতা ও প্রকৌশল চর্চার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন পেশাজীবি ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত। দ্য ইন্সটিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) এর সদস্য, ইন্সটিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) চাঁদপুর শাখার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং চাঁদপুর ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি তিনি। সামাজিক দাতব্য সংগঠন এস.এস ফাউন্ডেশন এর সভাপতি ও হাজী আহমেদ খান জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর অধীনে নিশ্চিত হয়েছে অন্তত ২০জন মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান। 

প্রকৌশলী মো. খোরশেদ আলম খান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য বানিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনার ডিজাইন ও নির্মাণ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রকল্পের তালিকা তুলে ধরা হল-  

এ. জে প্লাজা, হাজিগঞ্জ, চাঁদপুর (৮ তলা)

ইমাম টাওয়ার, কচুয়া, চাঁদপুর (৯ তলা)

ফরিদা টাওয়ার, চাঁদপুর (৯ তলা)

ড. ওমর ফারুক মিয়াজী, চাঁদপুর (৭ তলা)

হরিপদ চক্রবর্তী, চাঁদপুর (৪ তলা)

হাবিব ভিলা, কচুয়া, চাঁদপুর (৬ তলা)

জহিরুল ইসলাম গং, হাজিগঞ্জ, চাঁদপুর (ডুপ্লেক্স)

কাশেম বেপারী, হাজিগঞ্জ, চাঁদপুর (৬ তলা) 

মো. আব্দুল আলী, কচুয়া, চাঁদপুর (৫ তলা)

বীর প্রতীক মমিন উল্যাহ পাটোয়ারী একাডেমী, চাঁদপুর (৫ তলা)

শাহজাহান খান, চাঁদপুর (ডুপ্লেক্স)

শাহিন কমপ্লেক্স, সানারপাড়, ঢাকা (৮ তলা)

নজরুল ইসলাম, মতলব, চাঁদপুর (৭ তলা)

ডাঃ আরিফুল হাসান, মেডিল্যাব হসপিটাল, চাঁদপুর (৬ তলা)

মাহফুজ ফারুক

প্রকাশকাল: বন্ধন ১৫৮ তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২৩

Related Posts

ব্যবসার সাফল্যে চাই পরিকল্পনা

জীবন মানে যুদ্ধ; আর যুদ্ধে জেতার বড় উপায় কৌশল। তেমনি ব্যবসায় সাফল্য পেতেও হতে হয় কৌশলী; দিতে হয়…

ব্যবসায় সফলতায় চাই মনোবল

দেশের প্রাচীন জনপদ নওগাঁ। ছোট ছোট নদীবহুল বরেন্দ্র এ ভূমি প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিকাজের জন্য প্রসিদ্ধ। কৃষিকাজের উপযোগী হওয়ায়…

সততায় যিনি আপসহীন

একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সকলে তাঁকে আদর্শ মানলেও ব্যবসায়িক জীবনের শুরুতে অনেক ব্যবসাতেই  হয়েছেন ব্যর্থ। ব্যক্তিজীবন ও সংসারেও…

ব্যবসায়ীকে হতে হবে সাহসী

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জ। ঢাকার সঙ্গে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার; গড়ে উঠছে অসংখ্য…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq