নিস্তব্ধ সবুজ বন। মাটিতে ঝরাপাতার স্তূপ। গাছের লম্বা লম্ব^া সারি। তার মধ্যেই মেটাল কন্টেইনার। কয়েক দিক দিয়ে রশি টানা দিয়ে ঝুলে আছে। বস্তুত, এটা একটি ঘর। সারা দিন অহেতুক কোনো শব্দের ঝুট-ঝামেলা নেই। নেই ধুলো আবর্জনা, দুর্গন্ধ অথবা বিরক্তিকর উদ্ভট কোনো সমস্যা। আছে পাখির মধুর গান, বাতাসের চিকন সুর কখনো বা বন্য সরীসৃপের চলে যাওয়ার সরসর শব্দ। নিশ্চিত প্রাকৃতিক জীবনধারণের জন্য এর চেয়ে ভালো সমাধান আর আছে কি না সন্দেহ!
পরিবেশটা আপনার পছন্দ। কিন্তু গাছে ঝুলতে পারবেন না। কোনো সমস্যা নেই, আপনি নদীর বুকে ভেসে যান ফ্লোটিং হাউস বানিয়ে, নদীকে আপন করে বাস করুন এরই মাঝে। প্রয়োজনে কেবল তীরে আসুন, অন্যথায় নদীই আপনার ঠিকানা। ভাসতে ভয় লাগলে খুব বেশি ভেতরে না যাওয়াই ভাল। পানির গা-ঘেঁষে বানিয়ে নিন আপনার ঘর। আরেকটু মজা করতে ঘরের আকৃতি বানান বসে থাকা ব্যাঙের মতো। ব্যস, ব্যাপারটি খুব সাধারণ কিন্তু প্রযুক্তি আর আধুনিকতার এই চরম উৎকর্ষের যুগে এটাই হতে পারে আপনার আগামী দিনের পছন্দের বাড়ি। কারণ আর কিছুই নয়, স্রেফ আপনার শখ।
সন্দেহ নেই বাসস্থান মানুষের মৌলিক চাহিদা। আবশ্যকীয় অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। বাস করার জন্য চাই নিরাপদ আবাস। শুধু নিরাপদ হলেই হবে না, হতে হবে মানানসই, টেকসই, ব্যবহারযোগ্য; সর্বোপরি যিনি থাকবেন তাঁর পছন্দের। আদিম যুগে মানুষ পাহাড়ের গুহায়, গাছের আশ্রয়ে, পাথরের আড়ালে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতো। বুদ্ধি ও কৌশল দিয়ে আবিষ্কার করেছে কীভাবে বাড়িঘর তৈরি করতে হয়। এরপর যতই দিন গেছে, নিজের শখ, পছন্দ, প্রয়োজন ও সাধ্য বিবেচনায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িঘরকে করেছে উন্নত ও সুদৃশ্য। একসময় জন্ম দিয়েছে সুরম্য অট্টালিকার। তবে যতই উন্নত হোক মানুষের উচ্চাশা কিন্তু থেমে নেই। একবিংশ শতাব্দীর এই প্রযুক্তি ও অগ্রগতির যুগে মানুষের চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন হয়েছে অনেক। পরিবর্তন এসেছে মানুষের চাহিদা ও পছন্দে। সমসাময়িক অনেক বিষয় যুক্ত হয়েছে এর সঙ্গে। ভবিষ্যতের বাড়িঘর কেমন হবে তার ওপর মানুষের গবেষণা এবং এর বিভিন্ন প্রদর্শনীও কিন্তু এগিয়ে সমানতালে। এখানেই পাওয়া যায় মজার মজার বিচিত্র সব চিন্তা ও অভিজ্ঞতার পরিচয়।
আগামী দিনের ঘরবাড়ি আর এখনকার ঘরবাড়ির মধ্যে আসলে পার্থক্য কতটুকু? কিংবা কেনই বা পার্থক্য হবে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বলতে হয় কয়েকটি কারণে এ পরিবর্তন অনিবার্য। প্রথমত প্রয়োজন। যেমন বর্তমানে এনার্জি-সংকট অনেক বেশি। সুতরাং মানুষ এখন এমনভাবে ঘরবাড়ি তৈরির চেষ্টা করছে, যা এনার্জি সেভিং মুডের হবে এবং প্রয়োজনীয় এনার্জি উৎপাদনও করতে পারবে। ফ্লোটিং হাউসের ছাদ তৈরিই হচ্ছে সোলার প্যানেল দিয়ে। যেকোনো সময় যেকোনো অবস্থায়ই এই বাড়ি সোলার বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারবে।
স্থপতি ফিলিপ জনসন ১৯৪৯ সালে বাড়ি তৈরি করেছিলেন সম্পূর্ণ গ্লাস দিয়ে। শুধু টয়লেট ছাড়া আর সবকিছুই দৃশ্যমান ‘গ্লাস হাউস’ নামে পরিচিত ছিল বাড়িটির। উদ্দেশ্য ছিল দিনের আলোয় ঝকঝক করবে সমস্ত বাড়ি আর সেই সঙ্গে মনে হবে যেন খোলামেলা প্রকৃতির মাঝে বসে আছি। ওই সময় যেকোনো কারো চোখে এ কাজটি ছিল পাগলামি মাত্র। তবে এই পাগলামি আবার ফিরে আসছে এনার্জি-সচেতন মানুষের আগামী দিনের প্রয়োজন পূরণ করতে। মানুষ এখন বুঝতে পারছে যত বেশি প্রাকৃতিক আলো নেওয়া যাবে, ততই হবে এর সাশ্রয়। পার্থক্য হচ্ছে, এবার গ্লাসটি হবে একটু ভিন্ন চরিত্রের, প্রয়োজন অনুযায়ী সুইচ টিপে গ্লাসগুলো একটু কমবেশি ঘোলাটে করার সুযোগ থাকছে। সুতরাং প্রাইভেসি নিয়ে থাকছে না আর কেনো সমস্যা।
আসলে বাড়ি করার কতগুলো নির্দিষ্ট উপাদান রয়েছে। মানুষের সার্বক্ষণিক বসবাসের জন্য, থাকার জন্য একটা স্বীকৃত ব্যবস্থা আছে, যা তাকে সব সময় ঠিক রাখতে হয়। সবকিছু ঠিক রেখেও মানুষ নতুন কিছুর সন্ধানে ব্যস্ত। সবার থেকে আলাদা কিছু করতে গিয়ে অদ্ভুত ধরনের আকৃতিবিশিষ্ট বাড়ির চিন্তা মাথায় আসছে। ‘সেরেনিটি ড্রিম হাউস’ পাখির চোখে দেখলে মনে হবে কয়েকটি ঝিনুকের খোল উল্টো করে গায়ে গায়ে লেগে পড়ে আছে। একেকটি খোলের কোনোটির নিচে ড্রয়িংরুম, কোনোটিতে ডাইনিং আবার কোনোটি বেডরুম। সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের বাড়ি। স্থপতি জ্যভিয়ার সেনোসিয়াইনস-এর করা হাউস ‘নটিলাস’ দেখলে আরও অবাক হতে হয়। রীতিমতো মনে হবে যেন একটি শামুক। শুধু শামুক আর ঝিনুক নয়, মাছ, ব্যাঙ, ডিম, পিরামিড, গোলককে অনুষঙ্গ করে বিচিত্র আকৃতির বাড়ি তৈরি করছে মানুষ। ইঁদুরের গর্ত কিংবা পাখির বাসা, তাও আছে মানুষের অনুকরণের তালিকায়। প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান থেকে ধারণা নিয়ে স্থাপত্যচর্চার এ ধারাকে জৈব-স্থাপত্য বা Bio-Architecture বলা হয়। এগুলো নির্মাণ করাও কিন্তু খুব কঠিন কিছু নয়। স্প্রে করা যায় এমন একধরনের সিরামিক কংক্রিট দিয়ে ইচ্ছামতো আকৃতিতে বাড়ির দেয়াল বা ছাদ তৈরি করা যায়।

জাপানি স্থপতি তেরুনবু ফুজিসোরি সম্প্রতি একটি ছোট্ট ঘর বানিয়ে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছেন। ঘরটির নাম ‘ট্রি হাউস’। বাড়িটি দূর থেকে দেখলে মনে হবে একটি কচ্ছপ, যা কি না মাটি থেকে ওপরে ঝুলে আছে। ওপরে ঝুলিয়ে রাখার উদ্দেশ্য ছিল বাড়িটি যেন নিচের জায়গা কোনোভাবে নষ্ট না করে। কোনো দরিদ্র কৃষক চাইলে নিজের জমির ওপর বাড়ি করতে পারবে, তাতে তাঁর কৃষিজমির কোনো কমতি হবে না।
কথা হচ্ছে, নিজের বাড়ি যেকোনোভাবেই করা সম্ভব। বানানোও যায় ইচ্ছেমতো আকৃতির। ঝুলে থাকা যাবে, ভেসে থাকা যাবে, ইচ্ছে হলে ব্যাঙের মতো নদীর তীরে বসেও থাকা যাবে কিন্তু অনেক পরিবারবিশিষ্ট বহুতল ভবনে এমন কাণ্ড করার সুযোগ সীমিত। আকাশচুম্বী ভবনগুলোর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। মাটি থেকে উচ্চতায় বসবাস, ভবনের কাঠামোগত দিক, জরুরি অবস্থায় নিরাপত্তা, আবহাওয়া ও বায়ুপ্রবাহ, ভূমিকম্প ইত্যাদি। তারপরেও স্থপতি ও প্রকৌশলীরা তাঁদের মেধা ও মননশীলতা কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করছেন এই সীমাবদ্ধতা নিয়েও নতুন ডিজাইন কিভাবে করা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে ‘অং সান টাওয়ার’ নামে একটি বিলাসবহুল আকাশচুম্বী ভবনের ডিজাইন করেছে এমবিআরডিভি নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি দুটো টাওয়ার যথারীতি উঠে গেছে কিন্তু দৃষ্টি কাড়ে ভবনের মাঝের দিকে, যেখানে তাকালে মনে হবে যেন কোনো বিস্ফোরণে দুটি টাওয়ারই ঠিক মাঝখান থেকে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। ডিজাইনারের চিন্তা ছিল এই দেখতে বিস্ফোরিত অংশে ভবনের সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ও বিনোদনমূলক অংশটি রাখা হবে এবং বাকি পুরো টাওয়ার হবে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। ডিজাইনের চিন্তা যা-ই থাকুক, হঠাৎ করে যে কেউ দেখলে ৯/১১-এ সন্ত্রাসী হামলায় ভেঙে পড়া টুইন টাওয়ার দেখার মতন চমকে উঠবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ভবনের ডিজাইন নিয়ে প্রচুর সমালোচনাও হয়েছে এ জন্য।
আকাশচুম্বী ভবন মানেই একঘেয়ে এই ধারণাকে পাল্টে দিতে ‘সোমা’ নামক অস্ট্রিয়ান এক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘ফাইব্রোস টাওয়ার’ ডিজাইন করেছে সম্পূর্ণ অরগানিক প্যাটার্নে। তাইওয়ানের একটি ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য এর ডিজাইন করা হয় এবং এটি প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। ফাইব্রোস টাওয়ারের চারপাশ থেকে উঠে আসা কয়েকটি লতা পরস্পর জড়াজড়ি করে একটি ভবনে রূপ নিয়েছে এবং শীর্ষভাগ দেখতে ঠিক যেন জবা ফুলের পরাগদণ্ড। তবে এ ধরনের ডিজাইন বাস্তবে রূপদান সম্ভবপর নয়, সুবিধাজনক নয় আবাসিক ভবন হিসেবে ব্যবহারের জন্যও। ভবনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ঠিক রেখে একধরনের ডায়নামিক চরিত্রের ডিজাইন বরং এর চেয়ে জনপ্রিয়। হংকংয়ের প্রাণকেন্দ্রে ‘মডিউলার জেংগা টাওয়ার’ তার গ্রাহকদের সব চাহিদা পূরণের অঙ্গীকার নিয়ে ডিজাইনকৃত। এর প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে ভবনের ঘূর্ণায়মান বৈশিষ্ট্য। অধিবাসীদের কষ্ট করে ঘুরতে হবে না। একদিকে দেখতে দেখতে যখন একটু পুরোনো হয়ে যাবে, তখন একটা সময় পর ভবন নিজেই ঘুরে যাবে। চারপাশে আপনাআপনি একটু নতুনত্বের ছাপ চলে আসবে। আবার এর ভেতরের কক্ষ বিভাজন দেয়াল এমন মডিউলে করা হবে যে নিজেরা সরিয়ে নিয়ে ভেতরে কক্ষসজ্জায় পরিবর্তন করা যাবে। পুরো ভবনটি বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে হালকা মোচড় খেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে বাড়ির ডিজাইনে এ ধরনের মডিউল সিস্টেম বেশ জনপ্রিয়তা পাবে বলে ধারনা করা হয়। আগামী প্রজন্মের স্থপতিরা এই মডিউল নিয়ে বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার চেষ্টা করছেন। আদতে ভবন বলতে থাকবে এই মডিউল আর মডিউলগুলোকে একত্রে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ফ্রেম স্ট্রাকচার। এগুলোকে ইচ্ছামতো এখান থেকে ওখানে টেনে নিয়ে বেড়ানো যাবে। আনেকটা খেলনা ব্লকের মতো। ১৯৫৬ সালে ‘ডিজাইন ফর ড্রিমিং’ চলচ্চিত্রে একধরনের ভবিষ্যৎমুখী রান্নাঘরের চিত্র দেখানো হয়, যেখানে সবকিছু এক জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রন করা যায় এবং এমনকি একটি কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে পছন্দ করে রেসিপির অর্ডার দিলে সে অনুযায়ী রান্না হয়ে আসবে। ১৯৬১ সালে ‘টাচ অব ম্যাজিক’ নামে আরেকটি চলচ্চিত্রেও এ ধরনের ভিন্নধর্মী রান্নাঘর দেখানো হয়। এখন মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রিক বার্নার, ব্লেন্ডার, টোস্টার, রেফ্রিজারেটর, মিক্সারসহ খুঁটিনাটি সব প্রযুক্তি হাতের নাগালেই। কেবল একটি সেন্ট্রাল অটোমেটেড সিস্টেম ডেভেলপ করলেই ১৯৫৬ সালের কল্পনা পাওয়া যাবে বাস্তবে। আগামী দিনের লিভিং মডিউলগুলো এমনিভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়বে। একটি লিভিং মডিউলে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ড্রয়িং, ডাইনিং, বেডরুম ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা থাকবে। সবকিছুই হবে অটোমেটেড। ব্যস্ত মানুষ কেবল পছন্দ বাছাই করে সুইচ চাপলেই প্রয়োজনীয় সবকিছু তাঁর হাতের নাগালে পাবেন। হয়তো দেখা যাবে মডিউল নিজেই গাড়ির মতো রাস্তায় চলাচল করছে, এর ভেতরের সব অফিশিয়াল কাজ চলছে। মডিউলটি নিজেই এনার্জি তৈরি করছে। সারা দিন কাজ শেষে নিজের ফ্রেম স্ট্রাকচারের কাছে আসতেই একটা রোবটিক হাত এটিকে উঠিয়ে জায়গামতো বসিয়ে দেবে।
বহুতল আকাশছোঁয়া ভবন ডিজাইন ও নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি বড় ধরনের প্রভাবক। তবে স্থপতি ও প্রকৌশলীদের এখনকার সবচেয়ে বড় মনোযোগ হচ্ছে সাসটেইনেবল প্রযুক্তি বা গ্রিন প্রযুক্তি। এর মূল কথা হচ্ছে যেকোনো স্থাপনা হবে জ্বালানিসাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব; এর ব্যবহৃত উপকরণ হবে পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য। গ্রিন ও সাসটেইনেবিলিটির পাশাপাশি ইকো সিটি, ইকো ভিলেজ, ইকো টোপিয়া কিংবা ইকোলজি এখন ডিজাইনের জন্য প্রয়োজনীয় শব্দ।
বার্লিনের ‘স্পাইরাল টাওয়ার’ নামে সাব-আরবান লিভিং প্রজেক্টে প্রতিটি লিভিং স্পেসের সামনে বাগান করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে টাওয়ারের গঠন কাঠামোর কারণে যে খোলা সবুজ বারান্দা পাওয়া যাচ্ছে, তা ব্যবহৃত হচ্ছে বৃষ্টির পানি সংগ্রহে। টাওয়ারের বিভিন্ন দিকে সোলার প্যানেল ও বায়ুচালিত টারবাইন ব্যবহৃত হবে।
২০১০ সালে দ্বীপরাষ্ট্র হাইতির প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহীন পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য যে ইকো ভিলেজের প্রস্তাব করা হয়, তাতে পাশাপাশি সমান্তরালে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বৃহদাকার ভবন মূলত একটি মেটাল ফ্রেমের বহুমুখী মডিউলের সমন্বয়। সামুদ্রিক শৈবাল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এর ডিজাইন করা। মডিউলগুলো সাজানোর সময় এমনভাবে ওপরে-নিচে এবং পাশাপাশি কমবেশি করা হবে, যেন দূর থেকে একটি সামুদ্রিক ঢেউয়ের আকৃতি পাওয়া যায়। এই গ্রামটিকে স্বনির্ভর করার জন্য নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হবে সামুদ্রিক স্রোত, বাতাসের গতি ব্যবহার করে টারবাইন ঘুরিয়ে। ছাদে পুরোপুরি সবজি চাষাবাদের ব্যবস্থা থাকবে, থাকবে মৎস্য খামার।

লিভিং মডিউল
ইকোলজি ও গ্রিন টেকনোলজির পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনও আগামী দিনের বসবাসের ক্ষেত্রে অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। মালদ্বীপ কিংবা নেদারল্যান্ডের মতো সাগর পরিবেষ্টিত দ্বীপ কিংবা বাংলাদেশের মতো পানিপ্রধান সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলোর অন্যতম সমস্যা হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পানির উচ্চতা বৃদ্ধি। স্বপ্নবাজ স্থপতি ভিনসেন্ট জলবায়ু শরণার্থীদের জন্য ‘ইকো পোলিস’ নামে যে শহরের মডেল তৈরি করেছেন, তার পুরোটাই ভাসমান ও পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ সবুজ শহর।
স্থপতি ও প্রকৌশলীদের চিন্তা, কল্পনা ও মডেলে আগামী দিনের জন্য বাসস্থলের যে চিত্র উঠে আসছে, তার সবটাই যে বাস্তবে পাওয়া যাবে তার সম্ভাবনা কম। তবে সামনের দিনের প্রয়োজন পূরণ ও প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করতে বাড়ির ভেতর-বাইরে এবং আনুষঙ্গিক চারদিকের একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, নির্মাণ উপকরণের নতুন নতুন আবিষ্কার, এই পরিবর্তনকে করবে আরও বৈশিষ্ট্যময়।
বক্স আইটেম-১
গ্রিন টাওয়ার, সিউল
দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি সবুজ ক্যাকটাসগুলো আসলে একেকটি বহুতল ভবন। ঘন বসতি ও কোলাহলপূর্ণ সিউল শহরের বাইরে এসে বহুতল ভবনবিশিষ্ট এই প্রজেক্ট আগামী দিনের ভাবনায় একটি ইকো সিটি। এখানে ছোট ছোট মডিউল আকারে প্রত্যেক অধিবাসীর জন্য নিজস্ব জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবার তার নিজ নিজ প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুসারে জায়গা কিনে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারবে। তবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা তৈরির দিকে, যা কি না সব জনগোষ্ঠী মিলে ব্যবহার করতে পারবে। পুরো ভবনগুলোকে সবুজ চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে একদিকে তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আবার সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করবে। ২০২৬ সালে এই প্রজেক্ট সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বক্স আইটেম-২
সিটি ইন দ্য স্কাই, নিউইয়র্ক
সিটি নিউইয়র্কের মানচিত্রে নতুন করে ভবন তৈরির কোনো সুযোগ আর নেই। এই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে বুলগেরিয়া বংশোদ্ভূত ইংলিশ স্থপতি টিভেটান টস্কোভ দুঃসাহসী একটি কল্পনা করছেন। ‘সিটি ইন দ্য স্কাই’ নাম দিয়েছেন এই স্বপ্ন নিবাসের।
টস্কোভের ভাষায়, একটি অত্যাধুনিক শহরের ঝঞ্ঝাট এবং নিত্যদিনের শব্দ ও পরিবেশদূষণ এড়িয়ে আদর্শ নিবাসের কল্পনা এটি। স্কাই সিটির ডিজাইন আইডিয়া এসেছে পদ্ম ফুল থেকে। সাধারণ উচ্চতায় উঠে এটি পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়েছে। পাপড়ির জমিনে সবুজ উদ্যান। এক পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটি শহর, যা তার অধিবাসীদের উন্মুক্ত আকাশের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। টস্কোভ জানেন এটি এ মুহূর্তে বাস্তবে রূপদান সম্ভব নয় কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো এক প্রজন্ম এই চ্যালেঞ্জ সফল করবে। এটি যে একসময় করা সম্ভব হবে তা প্রমাণ করার জন্য এর একটি ভিডিওচিত্র তৈরি করে টস্কোভ অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
বক্স আইটেম-৩
ইকো ভিলেজ, হাইতি
ভিনসেন্ট আর্কিটেকচার ২০১০ সালে দ্বীপরাষ্ট্র হাইতির প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহীন পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য একটি ভিন্নধর্মী ইকো ভিলেজের প্রস্তাব করে। সামুদ্রিক শৈবাল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যে স্বনির্ভর গ্রামের প্রস্তাব করা হয়, তাতে পাশাপাশি সমান্তরালে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বৃহদাকার ভবনের প্রস্তাব করা হয়, যেগুলোতে মূলত একটি মেটাল ফ্রেমে অনেক মডিউল থাকবে।
মডিউলগুলো সাজানোর সময় এমনভাবে ওপরে-নিচে এবং পাশাপাশি কমবেশি করা হবে যেন দূর থেকে একটি সামুদ্রিক ঢেউয়ের আকৃতি পাওয়া যায়। এই গ্রামটিকে স্বনির্ভর করার জন্য নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা করা হবে সামুদ্রিক স্রোত, বাতাসের গতি ব্যবহার করে টারবাইন ঘুরিয়ে। ছাদে পুরোপুরি সবজি চাষাবাদের ব্যবস্থা থাকবে, থাকবে মৎস্য খামারও।
ফার্মস্ক্রাপার
ক্রমাগত শহরায়নের কারণে ঝুঁকিতে পড়ে যাওয়া চীনের সেনজেন অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একধরনের ভবনের ধারণা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ফার্মস্ক্রাপার (Farmscraper)। এগুলোকে ভবন না বলে বহুতল খামার বা ফার্ম বলাই শ্রেয়। ভবনের মূল অংশে বাসস্থান হলেও এর সংলগ্ন একটি খোলা উঠোনের মতো থাকবে, যা আসলে প্রত্যেক বাসিন্দার সবজি বাগান কিংবা মাছের খামার। উঠোনগুলো এমনভাবে আগে-পিছে করে বিন্যস্ত হবে, যেন প্রতিটি উঠোনে কম-বেশি সূর্যের আলো পড়ে। পুরো প্রজেক্টের ছয়টি ভবনের প্রতিটি এমন সবুজে ঘেরা থাকবে এবং কার্বন নিঃসরণ এবং জৈব বর্জ্য পদার্থ নিরসনে ভূমিকা রাখবে। এই উঠোনগুলোর কারণে ভবনের বহির্দৃশ্যের একটু ব্যতিক্রমধর্মী চেহারা পেয়েছে। ফার্মস্ক্রাপারকে কেউ কেউ মনে করেন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির লেখক ব্রুস স্টারলিং ‘ভিরিডিয়ান ডিজাইন মুভমেন্ট’ বলে যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, তারই একটি প্রভাব, যার মূল কথা ছিল পরিবেশ, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অভিবাস বিবেচনায় নিয়ে একটি সবুজ আন্দোলন।
প্রিসিংকট-৪
গ্রিন আর্কিটেকচার ও গ্রিন বিল্ডিং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরেকটি নতুন ধারা অর্জন করেছে, যেখানে ভবনের প্রযুক্তিগত বিষয়ের পাশাপাশি, বাহ্যিক নান্দনিকতা ও নতুনত্বও বেশ সাড়া জাগাচ্ছে। মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক শহর পুত্রজায়ায় এমন একটি আবাসিক প্রজেক্টের চিন্তা হচ্ছে, যা মালয়েশিয়ার সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থা ও ইসলামি ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হবে। পুত্রজায়ার কৃত্রিম লেককে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে গ্রিন ও বায়ো-ক্লাইমেটিক টেকনোলজিতে একাত্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ইতালিয়ান স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নিকোলেট অ্যাসোসিয়েটসকে। যদিও মূল স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন হিজাজ কস্তরি। টেরাস বা উন্মুক্ত বারান্দা, নান্দনিক সানশেড, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ও উপভোগ করার মতো শ্যামলিমা অন্তঃপরিসর এই স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ ফিচার। পাশাপাশি সম্ভব হবে বিভিন্ন প্রযুক্তির সাহায্যে সমসাময়িক অন্য যেকোনো আবাসিক স্থাপনার চেয়ে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানো।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫
(অথর যুক্ত করুন)


















