Image

নাগরপুর জমিদারবাড়ি

ব্রিটিশ আমলে এ দেশে হিন্দু জমিদারদের আধিপত্য ছিল। তাদের তৈরি অসংখ্য জমিদারি প্রাসাদ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। অপূর্ব কারুকাজ করা বিশাল ভবন। দেয়ালের পরতে পরতে সৌন্দর্যের ছোঁয়া খুঁজে পাওয়া যায়। অন্যান্য জমিদারবাড়ির চেয়ে একটু হলেও বাড়তি সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার নাগরপুর জমিদারবাড়িতে। 

টাঙ্গাইল শহর থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ধলেশ্বরী নদীবিধৌত উপজেলা নাগরপুর। এ উপজেলাকে আবার দ্বীপ উপজেলাও বলা যায়। একপাশে ধলেশ্বরী, অন্যপাশে যমুনা নদী। উপজেলা সদরেই রয়েছে প্রায় দেড়শ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ি। স্থানীয়ভাবে এটি চৌধুরীবাড়ি নামে পরিচিত। নাগরপুরের তৎকালীন জমিদার রায়বাহাদুর সতীশ চৌধুরী ৫৪ একর জমির উপর এ জমিদারবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর এ বাড়ি থেকেই পরিচালিত হতো জমিদারি শাসনকার্য। এ বাড়িতে পাশাপাশি কয়েকটি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ভবনই স্থাপত্যিক সৌন্দর্যে অনন্য। 

শৈল্পিক কারুকার্যমন্ডিত প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করতেই প্রথমেই চোখ আটকে যাবে দরবার হলে। এ হলের তৃতীয় তলায় জমিদারের ব্যবহৃত পালঙ্ক, আলমারি আর ওয়াল আলমারিগুলো তাদের রূপ জৌলুস আর আভিজাত্যকেই প্রকাশ করে। দেয়ালের পরতে পরতে সৌন্দর্যের ছোঁয়া। বাড়ির ভেতর-বাইরে প্রচুর নকশা। তবে বাড়িতে ভবন কিন্তু অনেক। কোনোটা নায়েবদের জন্য, কোনোটা চাকরবাকরদের, কোনোটা বা আশ্রিতদের জন্য। অতিথি মহলটাও আলাদা। গোটা জমিদারবাড়িকে ছোটখাটো একটা নগর মনে হবে।

শৈল্পিক কারুকার্যমন্ডিত এ বাড়ির ভেতরেই ছিল পরীর দালান। জমিদারসহ তার পরিবারের সদস্যদের চিত্তবিনোদনের জন্য এই দালানের ভেতর ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। নাচ-গান চলত এখানে। রূপসী নারীরা এখানে নাচার কারণেই হয়তো ভবনটির নাম পরীর দালান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরীর দালানের সিঁড়ির পাশেই রয়েছে বিশাল একটি কুয়া। 

জমিদারবাড়ির পশ্চিম পাশে রয়েছে ঘোড়ার দালান। তিনতলা বিশিষ্ট এই ঘোড়ার দালানের মূল ফটকের উপরে রয়েছে বিশাল আকৃতির দুটি ঘোড়ার মূর্তি। জমিদারের ব্যবহৃত ঘোড়াগুলো এখানেই রাখা হতো। বাড়ির একেবারে দক্ষিণে ১১ একর জমির উপর খনন করা হয় বিশাল আকৃতির একটি দীঘি। জমিদারবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রায় বাহাদুরের বাবার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় উপেন্দ্র সরোবর। স্থানীয়ভাবে এটি দীঘি নামে পরিচিত। প্রথমদিকে দীঘির পাশে গান বাজনার আসর বসত। সেই সঙ্গে চলত মেলা। বর্তমানে দীঘির চারপাশে লাগানো হয়েছে অসংখ্য গাছ। প্রজাহিতৈষী এই জমিদার এলাকায় স্কুল, কলেজ, মন্দির, দাতব্য চিকিৎসালয়, খেলার মাঠ ও অনেক হাট-বাজার প্রতিষ্ঠা করেন।

কালের আবর্তে তৎকালীন ক্ষমতাবান এই জমিদার ৫৪ একর জায়গার বাড়ি ও অনেক মূল্যবান জিনিসপত্রসহ শত শত একর জমি ফেলে একদিন রাতের আঁধারে ভারতে চলে যান। তখন থেকে এলাকার প্রভাবশালী মহল এই সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করে চলেছে। বিশাল এই সম্পত্তি দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকায় চুরি হয়ে যায় এর মূল্যবান অনেক জিনিসপত্র। এ ধারা অব্যাহত থাকে প্রায় ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত।

এলাকার সচেতন মহল এই বিশাল সম্পত্তি রক্ষার জন্য তৎকালীন মন্ত্রী নূর মোহাম্মদ খানের কাছে আবেদন করেন। তিনি ১৯৮৯ সালে জমিদারবাড়ির মূল দালানটিতে প্রতিষ্ঠা করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের স্ত্রীর নামানুসারে রওশন এরশাদ মহিলা কলেজ। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী সরকার এই কলেজের নাম পরিবর্তন করে নাগরপুর মহিলা কলেজ নামকরণ করে। এ ছাড়াও জমিদারের সম্পত্তির উপর তৎকালীন মন্ত্রী তার বাবার নামানুসারে নয়ান খান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় ও মায়ের নামানুসারে হামিদা খান মহিলা দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। বিশাল এই জমিদারবাড়ির সৌন্দর্যমন্ডিত প্রাচীন দালানগুলো এখনো তার আভিজাত্য ছড়াচ্ছে।

নাগরপুরের জমিদারবাড়ি গেলে খানিকটা সময়ের জন্য আপনি চলে যেতে পারেন অতীতে। হয়তো চোখের সামনে ভেসে উঠবে, কানে ভেসে আসবে জমিদারবাড়ির আগের কোলাহল। কিছুক্ষণের জন্য হলেও মনটা ভালো হয়ে যাবে। তবে সেই সঙ্গে একটু দুঃখবোধও মনের কোণে উঁকি দিতে পারে। কারণ অবহেলায় জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য ক্রমেই ম্লান হতে চলেছে। সময় থাকতে থাকতে যদি এগুলো সংরক্ষণ করা না হয় তবে এর অপার সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হবে আগত দর্শনার্থীরা। 

লেখা : মেহেদী হাসান

ছবি : লেখকই-মেইল- mehdyhasan2@gmail.com

প্রকাশকাল: বন্ধন ২৭ তম সংখ্যা, জুলাই ২০১২

Related Posts

দরাসবাড়ি মসজিদ: বাংলার সুলতানি স্থাপত্যের হারিয়ে যাওয়া গৌরব

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন দরাসবাড়ি মসজিদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার গৌড় অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদ…

ByBySarwar Alam Oct 9, 2026

কুসুম্বা মসজিদ: বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন

বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে কুসুম্বা মসজিদ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত…

সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি: ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য স্মারক

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের মাটিতে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের নানা নিদর্শন। কোথাও প্রাচীন মসজিদ, কোথাও মন্দির, আবার কোথাও জমিদার বাড়ি…

হারানো মসজিদ: ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায়

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনা। এগুলোর কিছু আজও মানুষের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আবার কিছু…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি